ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

চারদিকে বেশ শঙ্কার ছায়া। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, কালোমেঘ এখনো কেটে যায়নি। যারা ষড়যন্ত্রকারী তারা এখনো তৎপর। সে প্রমাণ আমরাও দেখছি। বাংলাদেশে হিযবুত তাহরীর একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল। এই দলের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। একজন চিকিৎসককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, এই জঙ্গিবাদী সংগঠন চারদিকে ফণা মেলছে।

১৯ জানুয়ারি ২০১২ সেনা সদর দপ্তরের প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয় একটি সেনা অভ্যুত্থান কিংবা সরকার উৎখাতের চেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়া হয়েছে। এই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে প্রকাশ্যে এমন খবর দেশের জনগণ জানতে পারেননি। এই দেশে সেনা অভ্যুত্থান আরো অনেকবার হয়েছে। প্রকাশ্যে-গোপনে। আমরা জানি, এদেশে এর আগেও বহুবার ক্যু করার চেষ্টা করা হয়েছে। পনেরই আগস্টের কালরাতে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করেছিল কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য। এর পরে আরো অনেকবার বিভিন্ন সময়ে এমন জঘন্য অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা চলেছে। যা পুরো জাতির জন্য ছিল দুর্ভাগ্যজনক। যা এই প্রজন্মকে বারবার ভীত করেছে। পিছিয়ে দিয়েছে অনেকাংশে।

এই প্রথমবারের মতোই সেনা সদর থেকে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে গোটা জাতিকে জানানো হয়েছে, কী ঘটতে যাচ্ছিল। বা কারা এর নেপথ্যে ছিল কিংবা আছে। খুবই পরিতাপের কথা, বিদেশের কোনো কোনো স্থান থেকে এমন নাশকতা চালাবার ধৃষ্টতা দেখানো হচ্ছে। ইন্ধন জোগানো হচ্ছে। এই ইন্ধনদাতারা কারা? কী তাদের আসল উদ্দেশ্য, তা দেশবাসীর না জানার কথা নয়। প্রেস ব্রিফিংয়ে সেনা সদরের পক্ষে সেনাবাহিনীর পরিচালক (পিএস পরিদপ্তর) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মাসুদ রাজ্জাক জানান ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কিছু কর্মকর্তা গত ডিসেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালান। এমন কর্মকর্তার সংখ্যা ১৪-১৫ জনের বেশি নয়। এদের মধ্যে দুজনকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খোঁজা হচ্ছে আরেকজনকে। গঠন করা হয়েছে তদন্ত আদালত।

সেনা সদরের এই ব্রিফিং দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার ঝড় তুলেছে। দেশে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ চলছে, তখন এমন সরকার উৎখাতের যড়যন্ত্রে কাদের হাত থাকতে পারে তা অনুমান করা কঠিন নয়। হাল-সুরত থেকে দেখা যাচ্ছে, একটি মহল ঠিক তালেবানি কায়দায় বাংলাদেশে একটি ‘বিপ্লব’ ঘটাবার স্বপ্ন দেখছে। এরা মূলত জঙ্গিবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা দেবার জন্য মরিয়া হয়ে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর মঝে বিভেদ সৃষ্টি করার পাঁয়তারা করছে। যা এই বাংলাদেশের লাখো শহীদের রক্তস্নাত মাটি ও মানুষ কখনই মেনে নেবেন না। নেবার কথাও নয়। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার। একটি রাষ্ট্রে যখন কোনো সংগঠন নিষিদ্ধ হয় তখন তাদের কাজকর্ম দেশের বিরুদ্ধে বলেই বিবেচিত হয়। এর কোনো সদস্য গ্রেপ্তার হলে এরা জামিন পাবার কোনো কথা নয়। আমরা দেখেছি, গেলো তিন বছরে বেশ কিছু নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে। তারা এখন কোথায় আছে, কেমন আছে, তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে কিনা এমন তথ্য বাংলাদেশের মিডিয়া, জনগণ কারো কাছেই স্পষ্ট নয়। যে কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনই ‘রাষ্ট্র-বিরোধী কাজে লিপ্ত’ এমন তথ্য জানার পরই রাষ্ট্র এদেরকে নিষিদ্ধ করে। তারপরও বাংলাদেশে এরকম সংগঠন তাদের প্রচারণা, প্রকাশনা, সাংগঠনিক তৎপরতা চালাবার সাহস কিভাবে দেখাচ্ছে? বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের মদত কারা দিচ্ছে তা কিছুটা হলেও এদেশের মানুষ জানেন। এই মদত দানকারীদের ঠেকাতে সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা দরকার। কিন্তু তা না করে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল পারস্পরিক দোষারোপে লিপ্ত হয়েছে। বিষয়টি যেহেতু সেনা আইনে তদন্তাধীন, তাই কাউকে ঢালাওভাবে দোষ দেয়া কোনো বিচক্ষণ রাজনীতির লক্ষণ নয়। যদি কোনো সিভিলিয়ান এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত থেকে থাকে, তার বিচার হবে রাষ্ট্রীয় আইনে। বিষয়গুলোকে সিরিয়াসভাবেই নিতে হবে সরকারকে। এখানে কোনো ‘ব্লেমগেম’ করার সময় আছে বলে ধরে নেয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা দেখেছি, সেনাবাহিনী একটি বিবৃতি ইতোমধ্যে দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ইদানীং এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সেনা সদস্যদের নাম উল্লেখ করে বিভিন্ন ধরনের সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে, যা সঠিক ও দ্রুত তদন্তের স্বার্থে সমীচীন নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের সূত্র হিসেবে সেনা সদরের উদ্ধৃতি দেয়া হচ্ছে, যা সঠিক নয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। মহৎ পেশার এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্মানের বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। বৃহত্তর সামরিক শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে শৃঙ্খলা-বহির্ভূত কর্মকান্ডের জন্য এখানে সেনা আইনে শাস্তি প্রদান করা হয়ে থাকে।

ঐ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যে কোনো সংবাদ মাধ্যমে আন্দাজ নির্ভর কোনো সংবাদ, কমর্রত সেনাসদস্যদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য সকল সংবাদ মাধ্যমকে সেনাবাহিনী/সেনাসদস্য সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অতীতের মতো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে অনুরোধ করা হলো। আমি মনে করি, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুমান নির্ভর সংবাদ ছেপে রাষ্ট্রীয় কাজের ব্যাঘাত ঘটানো কারোই উচিত নয়।

ঠিক একইভাবে রাজনীতিকদেরও উচিত সংযত হয়ে কথাবার্তা বলা। আমরা দেখছি, পাকিস্তানে একটি মৌলবাদী চক্র সে দেশের মানুষের ভোটে জিতে আসা সরকারকে উৎখাত করার পাঁয়তারা করছে। বাংলাদেশে ওদের প্রেতাত্মা ভর করার কোনো সুযোগ থাকার কথা নয়। কারণ পাকিস্তানি সকল সামরিক জান্তাদের বিষদাঁত ভেঙে দিয়েই বাংলাদেশ তার বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। তাই ধর্মান্ধতার দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যকে যারা বিপথে পরিচালিত করতে চাইছে, তাদের সমুচিত শাস্তি ইতিহাসের দাবি। মনে রাখতে হবে, যড়যন্ত্রকারীরা বসে নেই। দেশের প্রধানমন্ত্রী এই উদ্ভূত পরিস্থিতি সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন। তাকে আরো প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে

যেতে হবে। এই নবম জাতীয় সংসদ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পরপরই ঘটে যায় পিলাখানা ট্রাজেডির মতো নির্মমতম হত্যাযজ্ঞ। যে শোক জাতি চিরদিন বয়ে যাবে। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি চক্র রাতদিন কাজ করে যাচ্ছে। এমন খবর আমরা মিডিয়ায় প্রায় প্রতিদিনই দেখছি। এমন একটি সংবাদের ভয়াবহতা এখানে শেয়ার করা দরকার মনে করছি। ২৪ জানুয়ারি ২০১২ দৈনিক সংবাদ প্রথম পাতায় খবর ছেপেছে- ‘গত সপ্তাহের শেষের দিকে এক পাকিস্তানি নাগরিককে আটক করা হয় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য ছিল আটককৃত ওই ব্যক্তি পাকিস্তান ও কাশ্মিরভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ঢাকা হামলার ছক সম্পর্কে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে ওই ব্যক্তিকে বিমানবন্দরে আটক করা হয়। পরে সেখানে তার কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান গোয়েন্দারা। পাকিস্তানি ওই নাগরিকের দেয়া তথ্য ও আরো কয়েকটি মাধ্যমে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে হামলার পরিকল্পনার ব্যাপারে নিশ্চিত হন গোয়েন্দারা। গোয়েন্দাদের কাছে আরো তথ্য ছিল লস্কর জঙ্গিরা স্থল ও আকাশপথে এদেশে আসছে। জঙ্গিরা পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে ভ্রমণ ও ব্যবসায়িক ভিসায় আকাশপথে ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশে। আর স্থলসীমান্ত দিয়ে পরিচয় গোপন করেও ঢুকছে। এদেশে ঢুকেপড়া জঙ্গিরা রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জঙ্গিরা একযোগে রাজধানীর থানাগুলো বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল। পাশাপাশি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও বোমা হামলার ছক কষেছিল। সর্বশেষ রোববার গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য আসে ৫০ লস্কর জঙ্গি বাংলাদেশে ঢুকবে। এরা রাজধানীর থানাগুলোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালাবে।’

এমন খবরের পরও দেশের শীর্ষ ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা বাতাসে ঘুষি মারবেন, নাকি জরুরিভিত্তিতে পরিস্থিতি সামাল দেবেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যারা এই অপকর্ম করতে চাইছে, তারা কাদের পারপাস সার্ভ করছে তা ভাবা দরকার। সংবাদ মাধ্যমকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার ডিসি ও ডিএমপির মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম বলেছেন, হিযবুত তাহরীর দেশের প্রচলিত শাসন ব্যবস্থা ভেঙে ডাস্টবিনে ফেলে ইসলামি খিলাফত কায়েম করতে চায়। গেলো ২০০২ সাল থেকে ২০০৩ সালের দিকে এ সংগঠন তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে এই সংগঠনের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা নিজেদের চাঁদা ও বিদেশ থেকে আর্থিক সাহায্য নিয়ে সংগঠন পরিচালনা করছে। চলতি বছরের গতকাল পর্যন্ত পুলিশ এ সংগঠনের ৫শ নেতাকর্মী আটক করেছে। জেএমবির প্রধান গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গি মওলানা সাইদুর রহমান তার স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, তাদের সঙ্গে জামাত ও হিযবুত তাহরীরের সম্পর্ক রয়েছে।

দেখা যাচ্ছে, সব রসুনের গোড়া একখানে। বিষয়গুলো এই প্রজন্মকে ভাবতে হবে। যারা এই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে চায়, রাষ্ট্র তাদের তৎপরতা কি শুধু এভাবে চেয়েই দেখবে? এরা জামিন পাচ্ছে কিভাবে? কেন বারবার দেশের ওপর হামলে পড়ার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে? একটি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা মানেই এদের বিষদাঁত ভেঙে দেয়া হচ্ছে না। তাই সমাজকে সচেতন হতে হবে। রাজনীতিকদের সংযত হয়ে তা মোকাবেলায় এগিয়ে আসতে হবে।