ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

একটি ডকুমেন্টারি নিয়ে শীর্ষ মার্কিনি সমাজে এখন নানা তোড়জোড়। এর নাম ‘দ্যা থার্ড জিহাদ’। এই ডকুমেন্টারিটি করা হয়েছে মার্কিনি মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত করে। সবচেয়ে অবাক করা কান্ড হচ্ছে এই ডকুমেন্টারিটি নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের (এনওয়াই পিডি) সদ্য যোগ দেয়া সদস্য অর্থাৎ ক্যাডেটদের দেখানো হচ্ছে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস’ এ বিষয় নিয়ে একটি রিপোর্ট করার পর হৈচৈ শুরু হয় গোটা যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনে। রিপোর্টে বলা হয়, ২০১০ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে নতুন যোগ দেয়া পুলিশ ক্যাডেটদের সেমিনার এবং ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় দেড় হাজার নতুন পুলিশ সদস্য যোগদান করেন। সেখানে, সেমিনার রুমের পাশেই অন্য একটি রুমে বড় টিভি স্ক্রিনে ‘দ্যা থার্ড জিহাদ’ ডকুমেন্টারিটি বারবার প্রদর্শিত হয়।

মুসলমান সমাজকে সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে বাহাত্তর মিনিটের এই ডকুমেন্টারিটি এমনভাবে দেখানো হয়, যেন তা ছিল- পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেয়া নবিশদের ট্রেনিংয়েরই একটি অংশ! এক তরুণ ক্যাডেটের প্রবল আপত্তির মুখে পড়ে তা বন্ধ করা হয়। ঘটনাটি এক বছরেরও বেশি সময় ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল।

উগ্রবাদিতায় মুসলিম সমাজই নেতৃত্ব দিচ্ছে, এমন প্রতিফলন ঘটিয়ে ২০০৮ সালে নির্মাণ করা হয় এ তথ্যচিত্রটি। একটি নন প্রোফিট অর্গানাইজেশনের অর্থায়নে নির্মিত হয় তথ্যচিত্রটি। একই সংস্থা এর আগে ‘র‌্যাডিকেল ইসলাম’স ওয়ার এগেইনস্ট দ্যা ওয়েস্ট’ শিরোনামে একটি তথ্যচিত্রের অর্থায়ন করে।

প্রশ্ন উঠেছে এমন বিতর্কিত, অশুভ উদ্দেশে পরিকল্পিত একটি তথ্যচিত্র আমেরিকান পুলিশ একাডেমিতে কেন দেখানো হলো? কীভাবে দেখানো হলো?

পত্র-পত্রিকায় সংবাদটি ফলাও করে প্রচারিত হওয়ার পর পরই মুখ খোলেন নিউইয়র্কের মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ। তিনি এমন কর্মকা-কে ‘জঘন্যতম বিবেচনা’ বলে আখ্যায়িত করে বলেন, এমন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকা- যুক্তরাষ্ট্র গ্রাহ্য করেনি, করবেও না। মেয়র বলেন, ওই ডকুমেন্টারি সেখানে দেখানো হবে বা হচ্ছে তেমন কোন তথ্য পুলিশ কমিশনার মি. র‌্যামন্ড কেলিরও জানা ছিল না। মেয়র জানান, প্রশাসনের গোচরে আসার পর পরই তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

পুলিশ বিভাগের মুখপাত্র মি. পল ব্রাউন বলেন, পুলিশ বিভাগ এমন কোন তথ্যচিত্র প্রদর্শনের কোন অনুমতি দেয়নি এবং তা ট্রেনিং সেশনের কোন অংশও ছিল না। পল ব্রাউন জানান, সেমিনার রুমের পাশেই অন্য একটি রুমে এই ভিডিওটি দেখানো হচ্ছিল। যেখানে নতুন অফিসাররা কাগজপত্র ফিলাপসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক কাজকর্ম সারছিলেন। এক অফিসার আপত্তি জানানোর পর পরই তা সরিয়ে নেয়া হয়। তিনি আরও জানান, যে সার্জেন্ট এই তথ্যচিত্রটি সংগ্রহ করে সেখানে প্রদর্শন করার ব্যবস্থা করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ এরই মধ্যে গৃহীত হয়েছে।

সংবাদটি মিডিয়ায় সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার পর ‘দ্যা থার্ড জিহাদ’ তথ্যচিত্রের নির্বাহী প্রযোজক রাফায়েল শোর নিজেদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমরা মনে করি এই তথ্যচিত্রটি গোটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি ল’ অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির সদস্যদের দেখা দরকার। কারণ মুসলিমরা কেমন উগ্রবাদিতা লালন ও পৃষ্ঠপোষকতা করছে তা সবার জেনে নেয়া উচিত।

মেয়র বস্নুমবার্গের ‘জঘন্যতম বিবেচনা’ আখ্যায়নের কোন উত্তর দিতে সাহস দেখায়নি পুলিশ বিভাগ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবতাবাদী এবং ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনেক সংগঠন এমন হীন ও ঘৃণ্য কর্মকা-ের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে। সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতিক আইন বিশ্লেষকরা একবাক্যে বলেছেন, কোন ধর্মাবলম্বীদের টার্গেট করে আমাদের পুলিশ প্রশাসন গড়ে উঠতে পারে না। এমন দুঃসাহসের ইন্ধন কে দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে?

মুসলিম আমেরিকান গ্রুপস বলেছে, এ ঘটনার মাধ্যমে বস্নুমবার্গ প্রশাসন তার জবাবদিহিতা এবং গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। ঘটনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে, ‘দ্যা থার্ড জিহাদ’ তথ্যচিত্রে পুলিশ কমিশনার র‌্যামন্ড কেলির উপস্থিতির কারণে। কেলি কোন মতলবে ওই তথ্যাচিত্রের শেষাংশে ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন তাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

এই তথ্যচিত্রে আর যাদের সাক্ষাৎকার ধারণ করা হয়েছে এর মাঝে রয়েছেন, নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র রুডি জুলিয়ানি এবং কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের সিনেটর জোসেফ লিবারম্যান।

সংবাদটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ার পর দাবি ওঠে পুলিশ কমিশনার র‌্যামন্ড কেলির পদত্যাগের। ২৫ জানুয়ারি ২০১২ বুধবার গোটা মুসলিম সমাজের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন পুলিশ কমিশনার র‌্যামন্ড কেলি। তিনি বলেন, যা হয়েছে তা আমার অজান্তে হয়েছে। এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলছে এবং অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কিন্তু পুলিশ কমিশনারের এই ক্ষমা প্রার্থনাকেই শেষ কথা বলে মেনে নিতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। ফর্ডহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক লিশান বার্নি বলেছেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার কোন রাষ্ট্রে, কোন বিশেষ ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কোন অপমতলবে তা করা হয়েছে, তার শিকড় খুঁজে দেখতে হবে।

সিভিল রাইটস গ্রুপের মুখপাত্র সাইরাস ম্যাগোল্ডরিক বলেছেন, এমন অপচেষ্টার মাধ্যমে নিউইয়র্কের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও নিরাপত্তাকর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। তারা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন।

সবমিলিয়ে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, তা হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমাজের উত্থানকে মানতে পারছে না একটি গ্রুপ। ধর্মীয় উগ্রবাদী সব ধর্মেই রয়েছে। ওহাইও অঙ্গরাজ্যে বোমা মেরে যে খুনি শিশু-নারী বৃদ্ধ, বৃদ্ধাকে হত্যা করেছিল সেই পাষ- টিমথি ম্যাকভে খ্রিস্টান ধর্মের অনুশীলনে বিশ্বাস করত। উগ্রবাদিতা এক ধরনের সামাজিক ব্যাধি।

এই ব্যাধিতে যে কোন ধর্মের মানুষ, যে কোন বর্ণ-গোত্রের মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। তাই বলে ঢালাওভাবে ওই গোটা ধর্মকে দোষ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। এমনটি বিশ্বসভ্যতা গ্রহণও করবে না। তারপরও এমন চর্চার ব্যাপ্তি প্রজন্মকে হতাশ করছে।

এ ঘটনার মাত্র দুদিন পরই পুলিশ কমিশনার র‌্যামন্ড কেলির ছেলে মি. গ্রেগ কেলি জড়িয়ে পড়েছেন একটি নারীঘটিত কেলেঙ্কারিতে। এক মহিলা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন কেলির ছেলে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছেন এবং তিনি অন্তঃসত্ত্বা বলেও দাবি করেছেন বিভিন্ন মিডিয়ায়। পুলিশ কমিশনারের ছেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সব সুপারিশ সম্পন্ন করেছেন নিউইয়র্ক ডিস্ট্রিক অ্যাটর্নি অফিস।
ঘটনাটি র‌্যামন্ড কেলিকে সমাজে চরম লজ্জিত করে তুলেছে। জোরদার হয়েছে তার পদত্যাগের কিংবা অপসারণের দাবি।
নীতিবহির্ভূত কাজ করে কেউ রেহাই পাবে না, এমন বাণী উচ্চারণ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

সাবেক মেরিন সদস্য, কেলি ছেলের এই হীন কা- প্রমাণ করেছে ক্ষমতার দাপট মানুষকে বেহিসাবি করে তোলে। যদিও গ্রেগ কেলি বলছেন, ওই মহিলার সঙ্গে যা হয়েছে তা হয়েছে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে। জোর খাটানোর কোন প্রশ্নই ছিল না।

বিশ্বের নানা দেশেই ক্ষমতাবানদের অবৈধ অনুশীলন আমরা দেখি। এর মাঝে ঘৃণ্য এবং বর্বরতম কাজটি হচ্ছে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয়া। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ এ নীতিবাক্যটি বারবার উচ্চারিত হওয়ার পরও তার প্রয়োগের ব্যাপারে শীর্ষ কোন কোন রাজনীতিকের উদাসীনতা আমাদের আহত করে। কারণ ধর্মের ব্যবহার করে তারা সস্তা রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে লিপ্ত হন। আর এই সুযোগে অন্য একটি পক্ষ কোন কোন গোটা ধর্মকেই আক্রমণ করার প্রয়াসী হয়।

বিশ্বের প্রতিটি ধর্মই শান্তির অনুশীলনকে উৎসাহিত করে। নান্দনিক সৃজনশীলতার বাণীবন্দনা গায়। সব ধর্মেই বিভিন্ন সময়ে উগ্রপন্থিদের বিচরণ আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু আশার কথা, গোটা বিশ্বের সিংহভাগ মানুষই শান্তিকামী। বিশ্বের নানা দেশে যারা ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করতে চাইছে, আবার যারা বিভিন্ন ধর্মকে অহেতুক কটাক্ষ করতে চাইছে। উভয়পক্ষের বিরুদ্ধেই শান্তিপ্রিয় মানবসমাজকে দাঁড়াতে হবে। প্রজন্ম অবশ্যই নিজ নিজ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, তবে তা কোন কট্টরবাদিতাকে প্রশ্রয় দিয়ে নয়।