ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

‘দুর্ঘটনা তো দুর্ঘটনাই’ কিংবা ‘হত্যা তো হত্যাই’- এমন কিছু শব্দের ধ্বনি অথবা বাক্যের বুলি আমরা এখন শুনছি বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর মুখে, বাংলাদেশে। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যখন বলেন, ‘অ্যাক্সিডেন্ট ইজ অ্যাক্সিডেন্ট’ তখন আমরা একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য শুনলাম। এ ধরনের মন্তব্য সমাজের মনন ও মেধাকে ক্ষত করে। প্রজন্মের মসৃণ চলার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তোলে।

বাংলাদেশে সাংবাদিক দম্পতি খুন হয়েছেন। সাগর সরওয়ার এবং মেহেরুন রুনি দুজনই দুটি টিভি চ্যানেলে কর্মরত ছিলেন। তারা জার্মানিতে ছিলেন। সেখানে ডয়েচে ভেলেতে কর্মরত ছিলেন সাগর সরওয়ার। দেশের টানে, মানুষের কল্যাণে ব্রত হতে স্বদেশে ফেরেন। মাছরাঙা টিভির বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। মেহেরুন রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার প্রতিবেদক।

এ দুজনকে কত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে- এই বীভৎস দৃশ্য মিডিয়ায় গোটা বিশ্ববাসী দেখেছেন। ঘটনার পরপরই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীরা পাকড়াও হবেই।

নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হওয়ার ক্ষণে পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, শীঘ্রই খুনিদের গ্রেফতারের বিষয়ে দেশবাসীকে জানানো হবে। যেহেতু বিষয়টি তদন্তাধীন, তাই তারা এর স্বার্থেই বেশি কিছু বলতে চাইছেন না।

হত্যাকারী কে বা কারা হতে পারে, তা নিয়ে নানা কথাই মিডিয়ায় আসছে। মূল কথা হচ্ছে, সাগর ও রুনি খুন হয়েছেন- এটাই ধ্রুবসত্য। খুনি যত বড়, প্রতাপশালী কিংবা শক্তিধরই হোক না কেন, তাদের গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোপর্দ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ দায়িত্বে কোন অবহেলা মেনে নেয়া যাবে না।

সাগর-রুনির হত্যাকান্ডের ঘটনায় গর্জে উঠেছে গোটা দেশ। লন্ডন, নিউইয়র্কসহ প্রবাসের সাংবাদিক সমাজ এর তীব্র প্রতিবাদ করে সুবিচারের দাবি জানিয়েছেন। ঢাকার বিভিন্ন সাংবাদিক গ্রুপ ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমে এসে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।

আমরা সংবাদ মাধ্যমে জেনেছি সাগর ও রুনির একমাত্র সন্তান মেঘের সব দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে। প্রধানমন্ত্রী সময়োচিত যে ঘোষণা দিয়েছেন তাতে তার মানবিক গুণকেই শুধু নয়; গোটা সাংবাদিক সমাজের প্রতি তার প্রীতির প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু তারপরও যে বিষয়টি সামনে আসছে বারবার তা হচ্ছে, সাগর-রুনির হত্যাকারীদের গ্রেফতার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।

কিছুদিন আগেই নির্মমভাবে নিজ বাসায় নিহত হয়েছিলেন অগ্রজ সাংবাদিক ফরহাদ খাঁ দম্পতি। সে হত্যাকান্ডের সুবিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফতেহ ওসমানী, মানিক সাহা, শামছুর রহমানের মতো বরেণ্য সাংবাদিকদের প্রাণ দিতে হয়েছে এই বাংলাদেশে। কেন তাদের প্রাণ দিতে হয়েছিল? সত্য প্রকাশ করার অপরাধে? একটি রাষ্ট্রে কোন লুটেরা, সন্ত্রাসী, গডফাদারচক্র তো সত্যের টুঁটি চেপে ধরতে পারে না। তাহলে কেন বাংলাদেশে বারবার এমন কালো শক্তি নগ্ন আশকারা দেখানোর সাহস পেয়েছে? রাষ্ট্রের ব্যর্থতা চরমভাবেই এর জন্য দায়ী নয় কি?

সাংবাদিকতা বিশ্বজুড়ে একটি মর্যাদাশীল পেশা। শুধু জীবিকা নির্বাহের জন্যই নয়; দেশ ও জাতির বিবেককে জাগ্রত করার জন্য প্রকৃত সাংবাদিকরা কাজ করেন। কিন্তু বাংলাদেশে এসব সাংবাদিক নিগৃহীত হচ্ছেন পেশিশক্তির হাতে।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি কাজে সাংবাদিকরা সাহসী ভূমিকা রেখে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। এ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, সব স্বৈরাচার, সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন সাংবাদিকরা। আমরা দেখেছি, পত্রিকায় কলাম লিখে অথবা সম্পাদকীয়র বদলে প্রতিবাদলিপি লিখে এদেশের সাংবাদিকরা পরিশুদ্ধ সমাজের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। পত্রিকার প্রথম পাতায় কালো ব্যাজ ছেপেছেন বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবাদে।

সাগর-রুনি হত্যাকা-ের প্রতিবাদে সেই সাংবাদিক সমাজকে আমরা রাজপথে নেমে এসে প্রতিবাদী হতে দেখছি। কথা হচ্ছে, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে সাংবাদিকদের রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করতে হবে কেন? ফটো সাংবাদিকদের তাদের ক্যামেরা রাজপথের পিচঢালায় রেখে দিতে হবে কেন? এজন্য কি আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? আমরা একটি স্বাধীন মানচিত্র চেয়েছিলাম?

এদেশে প্রতিবাদী হলেই প্রাণ দিতে হয়। ইভটিজারদের বিরুদ্ধে কথা বললে অভিভাবককে প্রাণ দিতে হচ্ছে। ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করল অবলা নারীকে গ্রামগঞ্জে আরও নির্যাতিত হতে হচ্ছে। কালো শক্তির বিরুদ্ধে কথা বললে-লিখলে সাংবাদিককে প্রাণ দিতে হচ্ছে। এ যদি স্বাধীন বাংলাদেশের চালচিত্র হয় তবে তো বলা দরকার, এ প্রজন্ম একটি জিম্মি দশার মধ্যেই জীবনযাপন করছে। রাষ্ট্র প্রজন্মের মেধাবৃত্তির নিরাপত্তা দিতে পারছে না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সভ্যতার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাংবাদিকদের রাষ্ট্র, সমাজ ও ন্যায়নীতির প্রহরী বলে মনে করে। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রপ্রধানকে রিপোর্টারের তথ্যবহুল রিপোর্টের কারণে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। এমন উদাহরণ আমরা অনেক জানি এবং দেখেছি। দুর্নীতিবাজরা সত্যকে সম্মান করলে ক্ষমতাকে বিসর্জন দিতেই হয়।

সাগর ও রুনি হত্যাকা- যাতে ভিন্নখাতে প্রবাহিত না হয়, সে বিষয়টিও লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ খুনি যে-ই হোক, তার বা তাদের শিকড় যত শক্তই হোক, বিচারের কাঠগড়ায় এদের দাঁড় করাতেই হবে। আমরা জানি বাংলাদেশে অনেক পরাক্রমশালী শক্তি রয়েছে, যারা রাতারাতি অনেক কিছু পাল্টে দিতে পারে। এ বিষয়ে সরকার ও জনগণকে সতর্ক হতে হবে।

বিশ্বের সভ্য দেশগুলো নামি-দামি অনেক সাংবাদিকের শ্রেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক হয়। বাংলাদেশে এ পথটি আরও প্রসারিত হতে পারত যদি সাংবাদিকরা বিভক্তির বদলে ঐক্যবদ্ধ হতেন, হতে পারতেন। আমরা জানি, এখন অনেক করপোরেট হাউজ সংবাদপত্রের প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছে। তাই বলে একজন সাংবাদিক বিবেক বিসর্জন দিয়ে কারও হাতিয়ারে পরিণত হবেন, তা কাম্য হতে পারে না। এমন মানসিকতা পরিহার করতে না পারলে সাংবাদিকতার মতো মহান পেশায় না আশাই উত্তম।

বাংলাদেশে এখন নানাভাবে অস্থিতিশীলতার পদধ্বনি আমরা দেখছি। এ কঠিন সময়ে সৃজনশীল সাংবাদিকদের ঐক্য দরকার। তাদের পারস্পরিক সংহতি দরকার। কথায় বলে, ‘কাকে কাকের মাংস খায় না’। কিন্তু আমরা প্রত্যক্ষ করছি, স্বার্থের হীনতা হাসিলে আজ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাংবাদিক, কবির বিরুদ্ধে কবি, লেখকের বিরুদ্ধে লেখক। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাঙালি জাতিসত্তাই বারবার দুঃখ-জর্জরিত হবে ।