ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন আমাদের নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন। তার এই কথার জবাব দিয়েছেন বিএনপি নেতা খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, যারা রাজনীতির দূরে থেকে কথা বলেন, তাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে গণমানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো দরকার; কারণ এদেশে সিংহভাগ ভালো কাজই রাজনীতিকদের দ্বারা হয়েছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি সবার। এদেশের নাগরিক সমাজ জাতীয় প্রয়োজনে সবসময়ই সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সুশীল সমাজের ভূমিকা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে_ তারপরও দেশের মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার দিকে নিবিষ্ট হয়েছেন একান্তভাবেই। আর এই বুদ্ধিদীপ্ত সাহসী মানুষই ‘৫২ থেকে ‘৭১, নব্বইয়ের গণআন্দোলনে গণমানুষের চেতনার নেতৃত্ব দিয়েছেন; প্রজন্মের মননের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
এটা খুবই দুঃখের কথা, কিছু কিছু রাজনীতিকের হাতেই এই সুশীল সমাজ বিভক্ত হয়েছেন; কলুষিত হয়েছে আমাদের জাতীয় ঐক্যের কাঙ্ক্ষিত পথ। কিছু কিছু বুদ্ধিজীবীকে চড়া মূল্যে কিনে নিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কিংবা মদতপুষ্ট গোষ্ঠী।

দেশের রাজনীতিতে সুশীল সমাজ কিংবা নাগরিক প্রতিনিধিদের একটা ভূমিকা থাকবে_ তা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু পরোক্ষ সামরিকতন্ত্র কিংবা মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণকারীদের দোসর যদি কোন সুশীল ব্যক্তিত্ব হন, তবে তাকে আমরা কোন মাপকাঠিতে বিচার করব? স্বৈরশাসকের লেবাসধারী জে. জিয়া কিংবা জে. এরশাদের সময় এমন বেশ কিছু ব্যক্তিত্বের নৈতিক স্খলন এই জাতি দেখেছে, দেখেছে কিভাবে একটাকা মূল্যে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে দামি প্লট।

কোন রাষ্ট্রে বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ যদি কোন দলের কাছে বিবেক বিক্রি করে দেন, তবে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। বাংলাদেশে এমনটি বারবার হয়েছে এবং হচ্ছে। এতে কিছু সাংবাদিক, কিছু অধ্যাপক, কিছু চিকিৎসক, কিছু আইনজীবী, কিছু বুদ্ধিজীবী পাল্টে দিতে উদ্যত হয়েছেন এদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস। তারা খাটো করতে চেয়েছেন ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও। ইতিহাস বিকৃতির অব্যাহত ধারা এভাবেই রাজনীতিতে প্রশ্রয় পেয়েছে।

বাঙালি জাতি আরেকটি মহান শহীদ দিবস পালন করেছে এই একুশে ফেব্রুয়ারিতে। এদিন প্রজন্মের দৃঢ় শপথ ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার। দেশের বিশিষ্টজনরাও সেই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। অথচ আমরা দেখছি এই যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধীদের বিচার ঠেকাতে একটি রাজনৈতিক মহল খুব বেশি সক্রিয়। এরা কারা? তাদের পরিচয় কী? দেশে এই যে রাজনীতিক আগ্রাসন সৃষ্টির পাঁয়তারা একটি মহল করছে, তদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?

বাংলাদেশে এই সময় তিন ধরনের আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার আগ্রাসন চলছে। এর প্রথমটি হচ্ছে, ইতিহাস বিকৃতি ও একাত্তরের পরাজিত শক্তির পুনর্বাসন; দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ধনিক-লুটেরা শ্রেণীর গোপন পৃষ্ঠপোষকতা করে দেশের অর্থনীতিকে চিরতরে বন্ধ্যা করে দেয়ার পাঁয়তারা আর তৃতীয়টি হচ্ছে, ভাষার বিকৃতি ও অন্য ভাষার মিশ্রণের মাধ্যমে প্রজন্মকে ক্রমে দেউলিয়া করে তোলা।

ইতিহাস বিকৃতির দায় নিয়ে কোন জাতি সামনে অগ্রসর হতে পারে না। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম কিংবা স্বাধীনতার আন্দোলন কোন সেনা অফিসারের ডাকে হয়নি; হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বে। তাই একজন সেনা অফিসার মহান স্বাধীনতার ‘ত্রাতা’ ছিলেন_ এমন তথ্য প্রচার করে পরাজিত রাজাকার শক্তির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা কারও না বোঝার কথা নয়।

চোরাকারবার, কালোবাজারি, মজুদদারি করেই হোক কিংবা শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি করেই হোক, লুটপাট যারা করছে তাদের সবার একটা অলিখিত ঐক্য গড়ে উঠেছে এই বাংলাদেশে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ দহরম-মহরম থাকার কারণে রাষ্ট্র তাদের গা বাঁচিয়েই চলেছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী বলেই দিয়েছিলেন, শেয়ারবাজার লুটপাটকারীদের শিকড় বড় শক্ত। তাদের স্পর্শ করা সহজ নয়। একজন অর্থমন্ত্রী এভাবে বলার পর আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। আমরা দেখছি, এই লুটের শ্রেণী শেরাটন, সোনারগাঁওসহ পাঁচতারা হোটেলগুলোতে পাশাপাশি আসনে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করে। অথচ রাজনৈতিকভাবে তারা ভিন্ন মেরুর। আমি বলছি না, সামাজিক সম্প্রীতি থাকবে না। কিন্তু প্রকাশ্যে তারা ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কথা বলবে, আর লুটপাট করবে একসঙ্গে_ সেটা তো হতে পারে না। এর চেয়ে বিচিত্র আগ্রাসন একটি রাষ্ট্রে আর কী হতে পারে?

এবার আসা যাক ভাষা বিকৃতির আগ্রাসন বিষয়ে। অশুদ্ধ, অযথা মিশ্রিত বাংলা বিষয়ে মাননীয় আদালত বাংলাদেশে রায় দিয়েছেন। প্রিয় পাঠক, আপনারা কি লক্ষ্য করেছেন, এই সময়ে বিভিন্ন স্যাটেলাইট বাংলা চ্যানেলগুলোতে কিছু উপস্থাপক-উপস্থাপিকা কীভাবে বাংলা-ইংলিশের মিশ্রণ ঘটিয়ে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন? এ যেন এক নগ্ন প্রতিযোগিতা- কে কতটা বিদেশি ভাষার ঢং তার উপস্থাপনায় যুক্ত করতে পারলেন। ‘প্রিয় দর্শক’কে ‘ডিয়ার ভিউয়ারস’ বলার মাঝে কতটা আত্মতৃপ্তি আছে জানি না, তবে এসব উপস্থাপকদের বিনীত অনুরোধ করি- দয়া করে, ভালো ইংরেজি চ্যানেলগুলো দেখুন। জানুন তারা কীভাবে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে।

দু-চার টুকরো ইংরেজি, হিন্দি ঢুকিয়ে আপনারা উপস্থাপনার শ্রী নষ্টই শুধু করছেন না, প্রজন্মকেও বিভ্রান্ত করছেন; মিশ্র অপসংস্কৃতির আধিপত্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। বিশ্বে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ২৩০ মিলিয়ন। সেই সমৃদ্ধ বাংলা ভাষাকে এভাবে অপমান আপনারা কেন করবেন? তাছাড়া বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের, সংস্কৃতির, ঐতিহ্যের গৌরবময় ইতিহাস তো রয়েছেই।

বাংলাদেশে এই যে প্রধান তিনটি আগ্রাসন চলছে তার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ঐক্য গড়ে তোলা খুব জরুরি আর তা করার জন্য প্রয়োজন মনে-প্রাণে প্রতিজ্ঞা। চিহ্নিত করতে হবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে কারা এমন তাঁবেদারি তালুক প্রতিষ্ঠার কাজগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছে। মেধার প্রসার এই প্রজন্মের জ্ঞান-গরিমা বাড়াবেই। অর্থনৈতিক মুক্তি এলে বিশ্বে ভাষা সমাদৃত হবেই। একজন তরুণ-তরুণী যখন বুঝতে পারবে বহু ভাষার দক্ষতা তাকে বিশ্বের দরবারে একটি ভালো চাকরির নিশ্চয়তা দেবে, তখন বিদেশে বেড়ে ওঠা বাঙালি প্রজন্ম প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও বাংলা ভাষা পড়তে-লিখতে আগ্রহী হবে- এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।