ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা হবে, এমন কোনো সম্ভাবনা আছে বলে আমিও মনে করি না। কিছু কিছু বিষয় আছে আলোচনার পাদপ্রদীপেই থেকে যায়। বাস্তবতার পরশ পায় না। ইউনূসের বিষয়টিও তেমন। বিল ক্লিনটন ও হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে ব্যক্তিগত খাতিরের সুবাদে ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বান্ধব, তা আমরা জানি। কিন্তু তাকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করবে যুক্তরাষ্ট্র, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। তারপরও এ বিষয়ে কথা বলেছেন, ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত। বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি বিবেচনা করবে।

রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা গ্রামীণ ব্যাংকের প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, “অধ্যাপক ইউনূস যা করেছেন সে জন্য আমি তার প্রশংসা করি।” বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পদে ইউনূসের নাম প্রস্তাব প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমি নিশ্চিত এই পদে মনোনয়নে তিনি সম্মত হলে সব দিক থেকে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।”

এর আগে গেলো ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১২ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে দেখা করতে গিয়েছিল ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদল। এ সময় হাসিনা নোবেল বিজয়ী ইউনূসকে ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্বব্যাংকের প্রধান করার প্রস্তাব দেন তাদের। আমাদের জানা আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কোনো না কোনো আমেরিকান। শেখ হাসিনা এই প্রস্তাব করার পর অনেকে এর বিরূপ মন্তব্যও করেছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ড. ইউনূসকে নিয়ে কটাক্ষ করা হয়েছে। তার ভাষায় এটা ব্যঙ্গ করেই বলা হয়েছে। কিন্তু কথা হলো এই, একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন কিছু বলেন, তখন তিনি তা দায়িত্ব নিয়েই বলেন। মির্জা ফখরুল সবখানেই নেতিবাচক মানসিকতা পোষণের মনোভাব দেখাচ্ছেন কেন?

বাংলাদেশ সফররত ইউরোপীয় প্রতিনিধিদলের প্রধান জ্যঁ ল্যাম্বার্ট এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, “প্রস্তাবটি আমাদের খুবই ইতিবাচক ও আগ্রহোদ্দীপক বলে মনে হয়েছে।” আমরা দেখছি, গোটা বিশ্ব এখন একটি তীব্র অর্থনৈতিক মন্দাকাল অতিক্রম করছে। বেশ কিছুদিন থেকেই বিশ্বব্যাংক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছে, মারাত্মক মন্দার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ইউরোপ। ফলে এর প্রভাব সারা বিশ্বে পড়বে। এ মন্দা গত দশকের মন্দার চেয়েও মারাত্মক হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়ে যাচ্ছে বেশ কিছুদিন থেকেই। আর ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল ও তুরস্কের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি অনেক কমে যেতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক তাদের দ্বিবার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, দৃশ্যত মনে হচ্ছে ইউরোপ মন্দার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ২০১২ সালে ইউরোপের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাত্রা শতকরা ১.৮ ভাগ হবে বলে যে ধারণা করা হচ্ছিল এখন তা শতকরা মাইনাস শূন্য দশমিক তিন ভাগে পৌঁছাতে পারে। এ ছাড়া, ২০০৮-২০০৯ সালে বিশ্বজুড়ে যে মন্দার ধকল গেছে তার চেয়ে এবারের মন্দা মারাত্মক হবে বলে বিশ্বব্যাংক এ প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে। এর ফলে ধনী দেশগুলোর পুঁজিবাজার অচল হয়ে যেতে পারে। বিশ্বের অর্থনীতি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও মন্তব্য করেছে বিশ্বব্যাংক। এ ছাড়া, ২০১২ সালে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শতকরা ৩.৬ ভাগ হবে বলে আগে যে ধারণা করা হয়েছিল তা এখন কমে শতকরা ২.৫ ভাগে নেমে যেতে পারে। আর ২০১৩ সালে বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটবে শতকরা ৩.১ ভাগ। এর মধ্যে ধনী দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি হবে ১.৪ ভাগ। আগে এ মাত্রা ধরা হয়েছিল ২.৭ ভাগ।

তারও আগে, বিশ্বব্যাংকের প্রধান রবার্ট জোয়েলিক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, বিশ্বের অর্থনীতি বিপদের দিকে এগিয়ে চলেছে। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘চীনের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। জোয়েলিক বলেছেন, ইউরোপের অর্থনৈতিক সমস্যা ঋণ সংকটের রূপ গ্রহণ করেছে এবং অর্থ তহবিল, ব্যাংক ও কোনো কোনো দেশের জন্য তা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ঋণ ও ব্যয় নিয়ে যে সংকট দেখা দিয়েছে তার সুরাহা করা উচিত। একই সঙ্গে মার্কিন বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধির জন্য কর সংস্কার এবং অচল হয়ে পড়া বাণিজ্যনীতিকে চাঙ্গা করা উচিত বলে মনে করেন জোয়েলিক।

এ ছাড়া, চীনের কাঠামোগত সংস্কার ত্বরান্বিত করা উচিত বলেও মনে করেন বিশ্বব্যাংক প্রধান। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি নতুন বিপদের মধ্যে পড়তে চলেছে।

তিনি সিডনিতে এশিয়া সোসাইটি আয়োজিত ভোজসভায় দেয়া ভাষণে বলেছিলেন, বিশ্বের বাজার ব্যবস্থাকে নতুন বিপদের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে এবং এ বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, বিভিন্নভাবে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ঘটনা অর্থনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের ব্যবসায়ীদের আস্থা বিনষ্ট করেছে। এর সঙ্গে আরো কিছু বিষয় যোগ হয়ে বিশ্ববাজার ব্যবস্থাকে নতুন বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ সব কথা মোটেও হালকাভাবে বলা হচ্ছে না উল্লেখ করে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণের জন্য তিনি নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে বিশ্বব্যাংক বেশ চাপের মুখেই রয়েছে। এই সংকটকালীন বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রেসিডেন্ট করা হতে পারে এমন কোনো সম্ভাবনা আছে বলে আমার মনে হয় না।

মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে, এই পদ পাবার জন্য যারা বিভিন্নভাবে লবিং করছেন, তাদের মাঝে রয়েছেন দুজন। আর দুজনেই মার্কিনি শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। সম্ভাব্যদের মধ্যে দুজনের নাম আছে আলোচনার অগ্রবর্তী তালিকায়। এরা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেটস (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) হিলারি ক্লিনটন ও সাবেক অর্থমন্ত্রী লরেন্স সামারস। বর্তমান অর্থমন্ত্রী টিমোথি ফ্রাঞ্জ গেইটনর ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের প্রধান জিন স্পারলিং জোর সমর্থন দিচ্ছেন লরেন্সকে। এর আগে বিল ক্লিনটনের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্রেট দলীয় সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন লরেন্স সামারস, সর্বশেষ ২০১০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের প্রধানও ছিলেন তিনি।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তাকেই সুপারিশ করা হচ্ছে বলে হোয়াইট হাউসের ভেতরের সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে জানাচ্ছে আমেরিকান বিভিন্ন প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম। তবে বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি বিবেচনা করে, কূটনৈতিক দক্ষতা ও সুবিধা আদায়ের প্রয়োজনে হিলারি ক্লিনটনকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রেসিডেন্ট পদে বিবেচনা করছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিকের মেয়াদ শেষ হবে আগামী জুনে। এপ্রিলে বার্ষিক সভায় নতুন প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেবে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। মনোনয়ন জমা দেবার শেষ তারিখ হচ্ছে ২৩ মার্চ। ঠিক এমনি সময়ে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউনূসের নাম বিবেচনার কথা বলে মূলত আলোচনার একটি ঢেউ কিংবা ইউনূসকে লাইমলাইটে আনার চেষ্টাই করেছেন। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। কারণ বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, ন্যাটো, আইএমএফ, এমন সংস্থাগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব প্লাটফর্ম কিংবা করিডোর মনে করে, তা আজ বিশ্বের প্রতিটি সচেতন মানুষই জানেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের মতামতকে উপেক্ষা করে এই বিশ্বে এখন কোনো বড় বড় সংস্থারই কিছু করা সম্ভব নয়। কিছু উদাহরণ এখানে দেয়া যায়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রস্তাব পাস হতে পক্ষে ভোট লাগে ৯টি। আইএমএফ-এ (ইন্টারন্যাশনাল মানিটরি ফান্ড) গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে ৮৫ ভাগ ভোটের দরকার। আর এগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।

যদিও আমরা দেখি জাতিসংঘের শীর্ষ মহাসচিবের পদটিতে কখনই কোনো আমেরিকানকে বসানো হয়নি, কিন্তু তাই বলে কি জাতিসংঘে আমেরিকার দাপট কমেছে? না কমেনি। একইভাবে আইএমএফের প্রধানের পদেও কখনো কোনো আমেরিকানকে বসানো হবে না, এটাও যেন একটি অলিখিত নিয়ম।

এই পদ দুটিতে সবসময়ই অন্য কোনো দেশের নাগরিককে বসানো হয়। শুধুমাত্র ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রধানের পদটি সবসময়ই থাকে একজন আমেরিকানের জন্য। এবার কি যুক্তরাষ্ট্র এই পরিবর্তন আনবে? আমার তো মনে হয় না। আমেরিকান নন এমন দুজন প্রার্থীর নাম এর আগেও আলোচনায় এসেছিল ২০০৯ সালে। সেবার আমেরিকার অনেক প্রভাবশালী নীতি বিশ্লেষকরা প্রস্তাব করেছিলেন, আমেরিকার উচিত নিজেদের নাগরিকদের বাইরে গিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের যোগ্য ব্যক্তিদের বিশ্বব্যাংকের এ পদে নিয়ে আসা। সে বছর অনেকে ব্রাজিলের লুলা ডি সিলভা এবং ভারতের মনমোহন সিংয়ের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু সে প্রস্তাব হালে পানি পায়নি ওয়াশিংটনে। বিশ্ব অর্থনীতি এখন চরম সংকট অতিক্রম করছে। এর থেকে মুক্তি দরকার। কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? কোনো পরাক্রমশালীর হাতের পুতুল হয়ে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর টিকে থাকাই এখন বড় সাধনার বিষয়। বাংলাদেশ মোটামোটিভাবে দিনযাপন করতে পারছে। যা বিশ্বের অনেক ক্ষুদ্র দেশ পারছে না। এর প্রধান প্রাণশক্তি হচ্ছেন- বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, মেহনতি জনতা। এরাই মূলত জোগান দিয়ে যাচ্ছেন এই দেশের প্রধান রসদের। ধনিক মহাজনেরা মাঝে মাঝেই গরিবের কৃতিত্বকে হাততালি দিয়ে নিজেরাই শাণিত হন। আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশের ড. ইউনূসের নাম বিশ্বব্যাংকের ঝলকে এনে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত সেই হাততালিই দিতে চেয়েছেন। তবে তাদের উচিত বৈশ্বিক সীমাবদ্ধতার প্রাচীর তুলে নেয়া। তারা কি আসলেই তা করবেন, কিংবা পারবেন?