ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

একটি সংবাদ নিয়ে বেশ তোলপাড় চলছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার পাঁচটি দেশে মার্কিন সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কর্মকান্ড রয়েছে বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। এই অঞ্চলে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমন এবং পারস্পরিক কলা-কৌশল আদান-প্রদানের লক্ষ্যে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন একজন মুখপাত্র। সংবাদটি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঢাকা মার্কিন রাষ্ট্রদূত মি. মজিনা বলেছেন, মার্কিনি বাহিনীর কোন স্থাপনা এই অঞ্চলে নেই। প্রশিক্ষণ, পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে উভয় পক্ষ কাজ করছে মাত্র।

বিভিন্ন ব্লগে, ফেসবুকে দেখেছি বাংলাদেশে মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতির বিরোধিতা করে প্রচারণা চালানো হয়েছে। সমাবেশ, র‌্যালির ডাক দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের পুলিশের জ্যাকেট গায়ে দিয়ে পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন স্কোয়াডের সঙ্গে হাসিমুখে হাত মেলাচ্ছেন। সে দৃশ্যও দেখেছি টিভির পর্দায়।

রাষ্ট্রদূত মি. ড্যান মজিনা চৌকস ব্যক্তিত্ব। এর আগেও ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। তার কথায় ভারিক্কি এবং মারপ্যাঁচ বেশ জোরালো। হঠাৎ করেই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চল সফর করে হাঁকডাক ফেলে দিয়েছেন। কোন রাষ্ট্রদূতের এমন সীমান্ত এলাকা সফর নানা কথার জন্ম দেবে। সেটাই স্বাভাবিক কথা। তার এই সফর ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত সৌহার্দ প্রতিষ্ঠার জন্য জোরদার হবে বলেই বিবেচনা করি। তাছাড়া বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশিদের আক্রান্ত হওয়া, অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের যে ঝনঝনানি, তার খোঁজখবর নেয়াও রাষ্ট্রদূতের উদ্দেশ্যের মধ্যে থাকতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে মার্কিন রাষ্ট্রদূত শান্তির অন্বেষণ করছেন তা অবলীলায় বলা যায়। শান্তি বাংলাদেশের মানুষও চান। শান্তি চান বিশ্ববাসীও। তারপরও ফিলিস্তিনে প্রতিদিন রক্ত ঝরছে। কাশ্মীরে যুদ্ধ চলছে দীর্ঘদিন থেকে। ইরাক এখন বিরাণভূমি। লিবিয়া দাঁড়িয়ে আছে কঙ্কাল সর্বস্ব হয়ে। পারস্য সাগরে যুদ্ধের রণতরী প্রতিদিন হুঙ্কার দিচ্ছে। ‘আরব বসন্তের’ নামে কিছু পশ্চিমা লুটেরা হামলে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে। এগুলোই বাস্তবতা।

মানুষ কিংবা রাজনীতিকরা কি চাইছেন না এসব অশুভ শক্তির রাহুগ্রাস থেকে বিশ্ব মুক্তি পাক? হ্যাঁ তারা চাইছেন। কিন্তু এই চাওয়ার প্রক্রিয়া সবার সমান নয়। আর সমান নয় বলেই হাজারও রক্তপাতের পর তারা বলছেন, তারা ভুল করেছিলেন। ইরাকে যে কোন পরমাণু বোমা ছিল না, তা তো জর্জ ডব্লিউ বুশ জুনিয়র তার বইয়েই স্বীকার করেছেন। তারপরও তিনি যুদ্ধের হুকুম দিয়েছিলেন কেন? একজন কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে, এই যে, জনমানুষের প্রাণ সংহারের কাজটি তিনি করলেন, তার দায়িত্ব কী তিনি নেবেন? নাকি ইতিহাস তাকে এভাবেই ক্ষমা করে দেবে?

এটা খুবই পরিতাপের কথা বিশ্ববাসী অনেক কিছু দেখে, জানে এবং বুঝে। কিন্তু তাদের কিছুই করার নেই। ধরা যাক খোদ যুক্তরাষ্ট্রের কথাই। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে এটা অনেকেরই একটা বিশেষ মাথা ব্যথার কারণ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান তো ধর্মের স্বাধীনতা দিয়েছে। তাহলে কোন কোন রাজনীতিক নতুন করে ধর্মযুদ্ধের মহড়া যুক্তরাষ্ট্রে দেখাবার চেষ্টা করছেন কেন? তাদের নেপথ্য উদ্দেশ্য কী?

হ্যাঁ, নেপথ্য উদ্দেশ্য আছে। আর তা হচ্ছে ধর্মীয় চেতনায় মেধার বিকাশ ঘটতে না দেয়া। পুঁজিবাদ দখলদারিত্বের মানসিকতা তো রয়েছেই। খুব সাধারণ একটি উদাহরণ এখানে দেয়া যায়। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে এক ধরনের সামন্তবাদী মহড়া চালাচ্ছেন কিছু রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী এবং খাদ্য বিক্রির দোকান মালিকরা। মধ্য ম্যানহাটনের ৩৪ স্ট্রিটের বড় বড় করপোরেট ভবনগুলোর একটি সমিতি আছে। সেই সমিতি ঘোষণা দিয়েছে, তারা স্ট্রিটের উপর দাঁড়িয়ে ভ্রাম্যমাণ ফুড ভেন্ডরদের খাদ্য বিক্রি করতে দেবে না। অথচ নিউইয়র্ক মহানগরীতে কয়েক হাজার ভ্রাম্যমাণ ফুড ভেন্ডর রয়েছে যারা প্রতিদিন চিকেন রাইস, হালাল স্যান্ডউইচ, হটডগ, শিক কাবাব, ফলমূল, আইসক্রিম, চীনাবাদাম বিক্রি করে থাকে। এক প্লেট হালাল চিকেন রাইসের দাম স্ট্রিটে পাঁচ ডলার। আর রেস্টুরেন্টগুলোতে দশ ডলার কিংবা আরও বেশি। ফলে ক্রেতারা স্ট্রিটের ফুড ভেন্ডরগুলোর প্রতি প্রত্যহই বেশি করে ঝুঁকছে। যা মধ্য ম্যানহাটনের ব্যবসায়ীদের আঁতে ঘা লাগার কারণ হচ্ছে। ব্যবসায়ী ও বিল্ডিং মালিকরা বলছেন, তারা এসব ফুড ভেন্ডরদের উৎখাত করে ছাড়বেন! কেন তাদের উৎখাত করা হবে? এরা নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ‘হেলথ অ্যান্ড হাইজিন’ এবং ফুড ডিপার্টমেন্ট থেকে লাইসেন্স প্রাপ্ত। তারা নিয়মিত ট্যাক্স দিচ্ছেন। তারা সরকারের অনুমোদন নিয়েই ব্যবসা করছেন। অপরাধ করলে সরকার তাদের জরিমানা করছে। তারা জরিমানা টিকিট ও পরিশোধ করছেন। হ্যাঁ কথা হচ্ছে, এসব ফুড বিক্রেতারা প্রায় ৯৯ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া থেকে আগত ইমিগ্র্যান্ট। বিল্ডিং অ্যাসোসিয়েশনের একজন নেতা তাদের ‘আনসিভিলাইজড সিটিজেন’ আখ্যা দিয়ে বিবৃতি দেয়ার পর পুঁজিপতি সামন্তবাদীদের মুখোশই উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। বিতর্ক চলছে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন মিডিয়ায়।

শান্তিপ্রিয় বিশ্বের মানুষ আগ্রাসন আর দেখতে চায় না। এই বিশ্ব থেকে শান্তি অন্বেষণের নামে সামন্তবাদী দলিল প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বন্ধ হওয়া দরকার। পারস্পরিক সহযোগিতার নামে নিজেদের নখের আঁচড় প্রতিষ্ঠা কোন দুস্থ মানুষও মেনে নেবে না। কারণ এমন প্রচেষ্টা শুভর আওতায় পড়ে না। ব্যবসা-বাণিজ্যে আঁতে ঘা লাগলেই নগ্ন মূর্তি ধারণ করে হামলে পড়তে হবে এমন আচরণ বিশ্ব সভ্যতা মেনে নিতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্যের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিনি মহড়া তাই নানা কারণেই গণমানুষের শঙ্কার কারণ।

দুষ্টের দমন সৃষ্টের লালন করতে চাইলে দখলদারিত্বের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকরা বেশ খোলা প্রাণেই বলেন, ‘যে রাষ্ট্রের সমস্যা সেই রাষ্ট্রের মানুষকেই তা সমাধান করতে হবে।’ কিন্তু তারা যখন পারস্পরিক সহযোগিতার নামে নিজ শক্তি প্রতিষ্ঠার মহড়া দেখান তখন তাদের কথায়ও কাজে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশ্বের অনেকগুলো রক্তক্ষয়ী সমস্যার জন্য এমন কূটচালকে এখন সহজেই চিহ্নিত করা যাচ্ছে। বেশ আশার কথা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রজন্মই সামন্তবাদী, আগ্রাসনী মনোভাবকে ঘৃণা করছে। তারা বুঝতে পারছে পুঁজিপতিদের রোষানল কীভাবে অকারণে মধ্যবিত্তকে নিয়মিত শোষণ করছে। এই জাগ্রত বিবেকবোধের উন্মেষ এখন গোটা বিশ্বব্যাপী জরুরি।