ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআইয়ের কাছ থেকে বিএনপি অর্থ গ্রহণ করেছিল- এ সংবাদ এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান আলোচ্য বিষয়। পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআইয়ের সাবেক প্রধান আসাদ দুররানি পাকিস্তানের আদালতে হলফনামা দিয়ে যে সত্য স্বীকার করেছেন, বিষয়টি গোটা বাঙালি জাতির জন্য চরম দুঃসংবাদ তো বটেই, বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে অর্থ উপঢৌকন নিয়েছে(!) তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠার মতো অবস্থা।

পাকিস্তানিদের একাত্তর সালে বাঙালি জাতি একটি সশস্ত্র যুদ্ধে পরাজিত করেছিল- এই সত্য যে বাঙালি সন্তান মননে ধারণ করে না, তাকে আর যা-ই বলা হোক না কেন, আমি তাকে বাংলাদেশি কিংবা বাঙালি কোনটাই বলতে রাজি নই।

একটি ছোট ঘটনা দিয়ে শুরু করি। ক’বছর আগে নিউইয়র্কের এক অভিজাত বাড়িতে এক পারিবারিক আড্ডায় যোগ দিয়েছিলাম। সেখানে ভারতীয়, পাকিস্তানিসহ অন্যান্য দেশেরও বেশ কিছু অতিথি ছিলেন। এর মধ্যে একজন পাকিস্তানি ছিলেন, যিনি একাত্তর সালে ‘মেজর’ পদবি নিয়ে বাংলাদেশে, বাঙালি নিধনে অংশ নিয়েছিলেন। নিউইয়র্কে একটি ইন্স্যুরেন্সে কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত বিত্তবান তিনি। তার সাবেক পরিচয় জানার পর আমি তার সঙ্গে আলাপে মোটেই আগ্রহী ছিলাম না। অথচ তিনি বারবারই কথা বলতে চাইছিলেন একাত্তর নিয়ে। প্রকারান্তরে ‘শেখ মুজিব’ এবং ‘জুলফিকার আলী ভুট্টো’কে দোষ দিতে চাচ্ছিলেন তিনি। তার কথার মর্মার্থ ছিল ক্ষমতার লোভেই ‘মুজিব’ এবং ‘ভুট্টো’ পাকিস্তানটিকে ভাগ করেছিলেন। মুসলিম ঐক্য বিনষ্ট করেছিলেন!

এমন বক্তব্য যে আমি আগে শুনিনি, তা নয়। তাই উত্তরগুলো আমার কাছে বিশদভাবেই তৈরি ছিল। কারণ আমি জানি, সব দোষ মুজিব ও ভুট্টোর ওপর দিয়েই সেদিন হানাদার পাক আর্মিরা বাংলার নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেই কাসুন্দি তারা সময় পেলে এখনও ঘাঁটতে চায়।

সেদিনের আড্ডায় লক্ষণীয় বিষয় ছিল, সেই সাবেক পাক মেজর সুযোগ পেলেই ‘উর্দু’ ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করছিলেন। একপর্যায়ে আমি তাকে জানিয়ে দিই- তিনি উর্দু নয়, ইংরেজিতেই যেন আলাপ-আলোচনা করেন। এতে তিনি কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন, তা বুঝতে আমার বাকি থাকল না। তার ‘ডোমিনেটিং মেন্টালিটি’র কথা আমি তাকে জানিয়ে দেয়ার পর তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমার ওপর চড়াও হলেন। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুললেন। আমি সাফ জানিয়ে দিলাম, মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখেছি এবং আমার মননে মহান মুক্তিযুদ্ধ এখনো সমুজ্জ্বল।

আক্রমণের একপর্যায়ে ওই সাবেক মেজর আমাকে এটাও বলতে ভুললেন না, আমার জন্মও তদানীন্তন পাকিস্তানে হয়েছিল। জবাবে আমি বললাম, আমি যে মাটিতে জন্মেছিলাম, সে মাটি একাত্তরে পাক হায়েনারা পুড়িয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেসব হায়েনা এ মাটি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেনি। ওরা পরাজিত হয়ে ফিরে গিয়েছিল। এটাও জানিয়ে দিলাম, বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির অভ্যুদ্বয় ১৯৪৭ সালেই হওয়া উচিত ছিল।

তিনি উর্দু এবং ইংরেজি মিশিয়ে আমার ‘দেশপ্রেম’, ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ নিয়েও প্রশ্ন তুললেন। আমি কেন উর্দু জানি না, সেটাও বললেন। আমিও খুব জোর গলায় তার বক্তব্য খন্ডন করে গেলাম। ততক্ষণে আমার অন্যান্য বন্ধুও তার ওপর হামলে পড়েছে তর্কের হাতিয়ার নিয়ে। এদের বললাম, তোমরা থামো। আমিই পারব এই হানাদার মেজরের বক্তব্যের জবাব দিতে।

ছাত্র জীবনে বিতার্কিক হিসেবে আমার মোটামুটি পরিচিত ছিল। তাই ঐতিহাসিক যুক্তি দেয়া এবং সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আমি পিছপা ছিলাম না কোন সময়ই। কিন্তু সেদিন দেখলাম গোঁয়ার প্রকৃতির সেই মেজর গলার জোরেই সবকিছু বাগে নিতে চাইছেন। অন্যদের অনুরোধে সেদিনের বাকযুদ্ধ আমি শেষ করেছিলাম ঠিকই। কিন্তু সেদিনের কথাটি আমার কানে বাজছিল বার বার- যা সেই সাবেক মেজর বেশ দম্ভ করেই বলেছিলেন। তার ভাষ্য ছিল- ‘দে উইল নট লিভ ইউ অ্যালোন।’ আমি প্রশ্ন করেছিলাম, ‘হু আর দে।’ মেজর বলেছিলেন, ‘ইউ উইল সি ইট।’

অর্থাৎ তার বক্তব্য ছিল, তারা তোমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে না। এই ‘তারা’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন সেই মেজর? হ্যাঁ, এরাই সেই কূটচাল প্রদানকারী গোয়েন্দা- যারা বারবার বাংলাদেশের ওপর আঘাত হানতে চেয়েছে। বাংলাদেশে তৈরি করেছে তাদের অনুগত কিছু মোসাহেব। বানিয়েছে নিজস্ব ক্রীড়নক।

আইএসআই পঁচাত্তর সালে জাতির জনক হত্যাকন্ডে মদত দিয়েছিল, তা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। সেই সময় থেকেই তারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তিকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। যেহেতু রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর শীর্ষ হোতারা সমাজে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলে যথেষ্ট চিহ্নিত, তাই তার ডানপন্থি মোর্চাকে নতুন মিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে সেই পঁচাত্তর সাল থেকেই।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, আইএসআইয়ের সাবেক প্রধান যে হলফনামা দিয়েছেন, তাতে খালেদা জিয়ার নাম নেই। কিন্তু তারা যে রুপিগুলো বিএনপিকে দিয়েছে, তা তো বলেছে। আর যেহেতু খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন, তাই এর দায় অবশ্যই তার ওপর বর্তায়।

আমরা দেখেছি, বিএনপি এরই মধ্যে সংসদেও যোগ দিয়েছে। নিশ্চয়ই এ বিষয়ে সংসদে আলোনার ঝড় উঠবে। খালেদা জিয়া এবং তার দোসররা কী বলেন, তা দেখার অপেক্ষায় আছে জাতি। কারণ তাকে এ বিষয়ে কিছু তো অবশ্যই বলতে হবে।

এটা খুবই দুঃখজনক, একটি পরাজিত শক্তির গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশের রাজনীতির কলকাঠি নাড়ার জন্য অর্থ বরাদ্দ করছে। মাত্র পাঁচ কোটি রুপির মতো অর্থ নিয়ে দেশের একটি রাজনৈতিক দল আইএসআইয়ের কাছে নাকে খত দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে- তিরিশ লাখ শহীদ কি এ জন্য তাদের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে এই দেশটি স্বাধীন করেছিলেন?

দল চালাতে হলে অর্থের দরকার হয়। আর সে অর্থ আসে রাষ্ট্রের ভেতর থেকে। ফান্ড রাইজিং করে অর্থ সংগ্রহের রেওয়াজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আছে। বাংলাদেশে পলিটিক্যাল ফান্ড রাইজিং হয় না। কেন হয় না?

বিশ্বের বিভিন্ন সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনী খরচের জন্য যে ফান্ড সংগ্রহ করা হয়, তার হিসাবও জনগণকে দিতে হয়। ফান্ড রেইজিং এই অর্থের ঘাপলার জন্য বিশ্বের অনেক রাজনীতিককে কারাবরণ করতে হয়েছে। তাদের ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে- এমন অনেক নজির আছে। বিশ্বের তেমন রাজনীতিক আর রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি।

বাংলাদেশে নির্বাচনী খরচের হিসাব জনগণকে দেয়া হয় না। যদি হতো, তবে রাজনীতিতে ব্যাপক স্বচ্ছতা অনেক আগেই ফিরে আসত।

আমরা জানি এবং দেখছি, বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু ‘ব্যবসায়ী দাতাগোষ্ঠী’ গড়ে উঠেছে। করপোরেট ব্যবসায়ীরা ইংল্যান্ড-আমেরিকাতেও পলিটিক্যাল ডোনেশন প্রদান করেন। এসব অর্থের সমুদয় হিসাবপত্র দলের নথিতে থাকে। বাংলাদেশে তেমন ব্যবস্থা আছে কি?

না, নেই। আর নেই বলেই মধ্যস্বত্বভোগী নানা রকম অপশক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাক গলানোর জন্য তৎপর হচ্ছে। এটা জাতিসত্তার জন্য চরম লজ্জার বিষয়।

সেই পরাজিত মেজরের কথার সূত্র ধরেই বলি, পাক তমদ্দুনপন্থি হায়েনারা বাঙালি জাতিকে অশান্ত করে তোলে, তাদের তাঁবেদারদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখতে চাইবেই। অধিকাংশ পাকিস্তানি এখন পর্যন্ত একাত্তরের পরাজয় ভুলে যায়নি। তাদের সেই মর্মজ্বালার বিস্ফোরণ ঘটাতে তাই তারা সব সময়ই বাংলাদেশ, বাঙালি জাতির অশুভ কামনা করে। এসব বিষয় বর্তমান প্রজন্মকে পরখ করা দরকার।

যে পাকিস্তান আজ জঙ্গি, তালেবান তার কট্টর মৌলবাদীদের লীলাভূমি, তারা বাংলাদেশের সুখ কোনভাবেই সহ্য করবে না, করতে চাইবে না। সেই পাকিস্তানি শকুনদের এজেন্ট হিসেবে যারা বাংলার মাটিতে গলাবাজি করছেন, রাষ্ট্র তাদের ক্ষমা করবে না; করতে পারে না। আইএসআইয়ের উৎকোচ প্রদানের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে তাদের মিত্রদের বিশ্বব্যাপী চিনিয়ে দিয়েছে। জাতিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই স্বদেশি দালালদের বিষয়ে তারা কী করবেন!