ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 

কাজটি অনেক আগেই হতে পারতো। কেন হয়নি, সে প্রশ্নটি করা যেতেই পারে। বাংলাদেশ না না যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে। সামরিক শাসকরা দেশকে পেছাতে চেয়েছে। সামনে এগিয়ে নিতে চায় নি। সামনে এগোবার জন্য যে প্রত্যয় দরকার, তার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে ওরা না না কৌশলে। ফলে, ঋণ শোধ করার মানসিকতা গড়ে উঠতে পারেনি এই প্রজন্মের।

শেষ পর্যন্ত কাজটি শুরু হয়েছে, সেই দলের হাতেই যারা বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিল। এই সত্য মানতেই হবে, অন্য কোনো সরকার কাজটি করেনি। এতে তাদের দীনতাই প্রকাশ পায়।
হ্যাঁ, সাড়ে পনেরো কোটি মানুষের রাষ্ট্রে সকল কাজগুলো একটি সরকার করতে পারবে না। পারার কথাও নয়। তুলনামূলকভাবে সেসব সামরিক, স্বৈরাচারী উত্তরসূরি দলগুলো তাদের শাসনামলে এরকম দৃষ্টান্তমূলক কিছু কাজ করতে কেন উদ্যোগ নেয়নি?

আমার মনে হয় এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিল গোটা জাতি। গোটা বিশ্ববাসী। জাতির পক্ষে,তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
যে বিদেশি বন্ধুরা মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামে প্রেরণা যুগিয়েছিলেন তাদের পরিচয় জানতে পেরেছে এই নতুন প্রজন্ম।

তাঁদের সম্মানে ‘মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ ও ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদেশি অতিথিদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, “যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে মানবিক ও নৈতিক সহায়তা করেছেন, তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”

রাষ্ট্রপতি বলেছেন,পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আপনারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের সাহস জুগিয়েছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রীও সেই ঋণ স্বীকার করেছেন বাঙালী জাতির পক্ষ থেকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতিথিদের উদ্দেশে বলেছেন, “আজ আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, আমরা জাতি হিসেবে কিছুটা দেরিতে হলেও আপনাদের সেই অমূল্য অবদানের স্বীকৃতি দিতে পারছি। আমি আমার নিজের এবং দেশবাসীর পক্ষ থেকে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল নাম জানা-অজানা বিদেশি বন্ধুর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন , “আমরা সমর্থন পেয়েছিলাম প্রতিবেশীর কাছ থেকে। সাহায্য পেয়েছিলাম কাছের এবং দূরের দেশ থেকেও। সাহায্য এসেছিল ব্যক্তি থেকে, সংগঠন থেকে। সেখানে কোন জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক ভেদাভেদ ছিল না। এই সমর্থন ছিল সার্বজনীন এবং বাছ-বিচারহীন। আমাদের জাতীয় পরিচয়, আমাদের একটি জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সংগীত অর্জনের এই সংগ্রামে আমরা আপনাদের কাছে চিরঋণী”।

সম্মাননার জন্য এবার ১০৫ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর মাঝে ৮২ জন কিংবা তাদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়েছিলেন ঢাকার এই আয়োজনে।

এবার দুই ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেয়া হয়েছে। ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ দেয়া হয় আটজনকে। অবশিষ্টরা পেয়েছেন ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা পেয়েছেন যে আটজন, তাদের মধ্যে আছেন নেপালের প্রেসিডেন্ট রাম বরণ যাদব। তার পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন নেপালি রাষ্ট্রদূত হরি কুমার শ্রেষ্ঠা। ভুটানের প্রয়াত রাজা জিগমে দর্জি ওয়াংচুকের পক্ষে ভুটানের রাজকীয় প্রাইভি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান চেঙ্কিয়াব দর্জি, প্রয়াত রুশ প্রেসিডেন্ট লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ, প্রয়াত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই ভিক্টোরভিচ, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি নিকোলোভিচের পক্ষে ঢাকায় রুশ রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার এ নিকোলাভ, সাবেক যুগোস্লাভ প্রেসিডেন্ট মার্শাল জোসেফ ব্রোঞ্জ টিটোর পক্ষে তার পুত্র আলেকজান্ডার ব্রোঞ্জ, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড রিচার্ড জর্জের পক্ষে জেমস এল্ডার এবং নেপালের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব প্রসাদ কৈরালার পক্ষে তার পুত্র প্রকাশ কৈরালা সম্মাননা গ্রহণ করেন।

যেসব ‘মৈত্রী বন্ধু’ নিজে গ্রহণ করেন সম্মাননা তারা হলেন ,ভারতের পূর্ণ সাংমা, মহারানী বিভু কুমারী দেবী, অরুন্ধতী ঘোষ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জেএফআর জ্যাকব, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার, আইপি গুপ্তা, ড. রাতিন দত্ত পদ্মশ্রী, রাশিয়ার প্রয়াত রিয়াল অ্যাডমিরাল সার্জে পেভলোভিচ জোনিকো ও তার দল আনাতোলি সোভলভ ও কনস্টানটিন আই সোসলিকভ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লিয়ার লেভিন, ফাদার রিচার্ড উইলিয়াম টিম, ডেভিড উইসব্রড, যুক্তরাজ্যের মিশেল বার্নেস, সাইমন ড্রিং, জুলিয়ান ফ্রান্সিস, বিমান মল্লিক, জাপানের সুয়োশি নারা, তাকায়াশি সুজুকি, ডেনমার্কের ড. ক্রিস্টেন ওয়েস্টারগার্ড, জার্মানির বারবারা দাশগুপ্ত, সুনীল দাশগুপ্ত, আয়ারল্যান্ডের ব্যারিস্টার নোরা শেরিফ।

কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্মাননা গ্রহন করেন কয়েকজন। এরা হলেন-

ভারতের মিত্র বাহিনীর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী পালাম রাজ, জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থা ইউএনএইচসিআরের পক্ষে কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ক্রেইগ সেনডার্স, বিবিসির পক্ষে গ্লোবাল নিউজ পরিচালক পিটার হরকস, আকাশবাণীর পক্ষে মহাপরিচালক এলডি মান্দালই, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্মারক সমিতির পক্ষে ড. ধ্রুব লাহিড়ী, অক্সফামের পক্ষে আঞ্চলিক পরিচালক সারা আয়ারল্যান্ড এবং ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রসের (আইসিআরসি) পক্ষে কমিটির সদস্য ফ্রান্সিস বাগনিয়ন সম্মাননা গ্রহণ করেন।

সম্মাননা প্রাপ্ত বিশিষ্টজনদের পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন তাদের প্রতিনিধিরা।

ভুটানের পরলোকগত জিগমে দর্জি ওয়াংচুকের পক্ষে ঢাকায় ভুটানের রাষ্ট্রদূত দাশো বাপ কেসাং, সাবেক যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল জোসেফ ব্রোঞ্জ টিটোর পক্ষে তার পুত্র আলেকজান্ডার ব্রোঞ্জ, যুক্তরাজ্যের প্রয়াত স্যার অ্যাডওয়ার্ড রিচার্ড জর্জ হিথের পক্ষে জেমস এল্ডার, ভারতের প্রয়াত সচিন্দ্র লাল সিংয়ের পক্ষে তার পুত্র দেবাশীষ লাল সিং, প্রয়াত সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের পক্ষে সন্তি রায়, মরহুম বিচারপতি সৈয়দ সাদাত আবুল মাসুদ পদ্ম ভূষণের পক্ষে তার স্ত্রী তাহেরা মাসুদ, প্রয়াত দিলীপ চক্রবর্তীর পক্ষে পুত্র সুগত চক্রবর্তী, প্রয়াত দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে পুত্র দেবরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়, পণ্ডিত রবিশঙ্কর ভারত রত্নের পক্ষে কার্তিক কুমার, মরহুম ওস্তাদ আলী আকবর খান পদ্মভূষণের পক্ষে পুত্র ওস্তাদ আশীষ খান, প্রয়াত আনন্দ শঙ্কর রায়ের পক্ষে সুরজিত দাশগুপ্ত, প্রয়াত ভূপেন হাজারিকার পক্ষে পুত্র তেজ হাজারিকা, প্রয়াত ব্যারিস্টার সুব্রত রায় চৌধুরীর পক্ষে পুত্র রঞ্জন রায় চৌধুরী, প্রয়াত ফিল্ড মার্শাল এসএএম মানেকশ পদ্মভূষণের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল দীপেন্দার সিং, শহীদ ল্যান্স নায়েক এলবার্ট এক্কার পক্ষে স্ত্রী বালাম দিনি এক্কা, প্রয়াত রওশন আরা বেগম সাংমার পক্ষে পুত্র বর্তমানে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমা, প্রয়াত দশরথ দেব বর্মণের পক্ষে স্ত্রী মগলেশ্বরী দেব বর্মণ, প্রয়াত ডিপি ধরের পক্ষে পুত্র বিজয় ধর, মেজর জেনারেল এসএস উবানের পুত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিএস উবান, প্রয়াত পিএন হাকসারের পক্ষে কন্যা নন্দিতা হাকসার, ড. করণ সিংয়ের পক্ষে পুত্র এমকে আজাতসাত সিং, প্রয়াত সরদার সরণ সিংয়ের পক্ষে নাতি জিবিএস সিধু, প্রয়াত অংশুমান রায়ের পক্ষে পুত্র ভাস্কর রায়, রাশিয়ার প্রয়াত ভ্লাদিমির স্টেনিসের পক্ষে কন্যা স্টেনিস এলেনা ভ্লাদিমিরনভা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিচার্ড কে টেলরের পক্ষে স্টিফেন হলিমিন, আনা ব্রাউন টেলরের পক্ষে সিমন সুলতানা, প্রয়াত আর্চার কে ব্লাডের পক্ষে কন্যা বারবারা ব্লাড রেনকিন, প্রয়াত ড. জোসেফ গ্রাস্টের পক্ষে কন্যা লিন্ডা গ্রাস্ট গুপ্তা, প্রয়াত সিনেটর ফ্রাঙ্ক ফরেস্টার চার্চের পক্ষে গেরিভি উইনসেকে, ড. উইলিয়াম গ্রিনগের পক্ষে ডেভিড ওয়েসবোর্ড, প্রয়াত অ্যাডওয়ার্ড সি দিমকের পক্ষে পুত্র অ্যাডওয়ার্ড সি দিমক ত্রি, সিনেটর উইলিয়াম বি সেক্সবির পক্ষে পুত্র ড. উইলিয়াম বি সেক্সবি জুনিয়র, কর্নেলিয়াস অ্যাডওয়ার্ড গেলেয়ারের পক্ষে করটেনি স্টেনফোর্ড, শহীদ ফাদার উইলিয়াম ডি ইভানসের পক্ষে ফাদার সি কুলিভান, প্রয়াত জন কেনিথ গালব্রেইথের পক্ষে স্ত্রী এলিজাবেথ এম গালব্রেইথ, যুক্তরাজ্যের প্রয়াত লর্ড পিটার ডেভিড শোরের কন্যা মিমি মাইলস, প্রয়াত ব্রুস ডগলাস মানের পক্ষে নাতি আলেকজান্ডার ডগলাস মান, ইতালির শহীদ ফাদার মারিও ভেরোনাইসের পক্ষে ফাদার জ্যাকব গাব্বি, জাপানের প্রয়াত তাকাসি হায়াখাওয়ার পক্ষে পুত্র ড. ওসামু হায়াখাওয়া, প্রয়াত নাউকি উসুইয়ের পক্ষে স্ত্রী কুনিকো উসুই, সুইডেনের প্রয়াত গানার মিরদালের পক্ষে জান মিরদাল, ফ্রান্সের প্রয়াত আন্দ্রে মালরুকসের পক্ষে ঢাকায় ফরাসি দূতাবাসের সিডিএ, আয়ারল্যান্ডের প্রয়াত শিন ম্যাকব্রিডের পক্ষে নাতি কোনলেথ হোয়াইট এবং ইউজিন হোমরিচের পক্ষে ফাদার ফ্রাঙ্ক কুলিভান সম্মাননা গ্রহণ করেন।

২৭ মার্চ ২০১২ দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ এই দিনটি প্রজন্মকে শিখিয়েছে কীভাবে একজন সুহৃদ বন্ধুর ঋণ শোধ করার জন্য উদ্যোগ নিতে হয়। আমাদের প্রজন্মকে স্মরণ রাখতে হবে সেসব মানুষদেরকে যারা আমাদের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের ক’জনের কথা এখানে না বললেই নয়।

তাঁদের একজন জর্জ হ্যারিসন। তাঁর সম্পর্কে সকল সচেতন বাঙালিই জানেন। ১৯৭১ সালের ১ অগাস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য তহবিল সংগ্রহের জন্য “কনসার্ট ফর বাংলাদেশ” এ সাড়া জাগানো “বাংলাদেশ” গানটি গেয়েছিলেন। ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু জর্জ হ্যারিসন।
বিখ্যাত সেতারবাদক রবিশংকর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছেন।

ডব্লিউ এস ওডারল্যান্ড। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহনকারী এবং বীর প্রতিক উপাধি লাভকারী একমাত্র বিদেশী। নেদারল্যান্ডের নাগরিক, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাটা কোম্পানীর প্রোডাকশন ম্যানেজার। বাটার কারখানায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতেন। একসময় নিজেই মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তিঁনি ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মার্কিন সাংবাদিক লেয়ার লেভিন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিঁনি দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে প্রায় ২০ ঘন্টার ভিডিও করেন। পরবর্তীতে সেইসব ফুটেজের অংশবিশেষ নিয়ে নির্মিত হয় “মুক্তির গান” এবং “মুক্তির কথা” নামক দুটি ডকুমেন্টারি। যা নির্মাণ করেন অকাল প্রয়াত পরিচালক তারেক মাসুদ।

সায়মন ড্রিং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংবাদ সংগ্রহকারী সাংবাদিকদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব। তিনি একুশে টিভির ম্যানেজিং ডিরেক্টরও ছিলেন। আমার মনে আছে, ২০১০ সালে সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসী বিশিষ্টজনেরা। সেই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে অসামান্য অবদান রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের ৬ বিশিষ্ট ব্যক্তিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব কিংবা বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হোক। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি পাঠানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ৬ বিশিষ্ট নাগরিক হলেন সিনেটর প্রয়াত এডওয়ার্ড কেনেডি, বিখ্যাত পপ গায়ক প্রয়াত জর্জ হ্যারিসন, জোয়ান বায়েজ, প্রখ্যাত সেতারবাদক ভারতীয় বংশোদ্ভূত ওস্তাদ রবিশংকর, প্রয়াত প্রফেসর ড. রবার্ট রাইন্ডস ও কূটনীতিক আর্থার ব্লার্ড।

স্মরণ করা দরকার, প্রফেসর ড. রবার্ট রাইন্ডস ছিলেন আমেরিকান ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের সভাপতি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য একাই ৬৫ হাজার ডলার সংগ্রহ করে দেন। অথচ সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি সবাই মিলে তখন সংগ্রহ করেছিলেন মাত্র ১৮ হাজার ডলার। শুধু তাই নয়, সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে অতি গোপনে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ওয়াকিটকিসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি পাঠিয়েছিলেন। এসব সরঞ্জামাদি পরিচালনার জন্য তিনি তৈয়ব উদ্দিন মাহতাব ও হাসান নামে দুজন বাংলাদেশিকে প্রশিক্ষণও দিয়ে পাঠিয়েছিলেন।

আর্থার ব্লার্ড মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল। পাকিস্তান বাহিনীর বর্বরতার সব তথ্য তিনি সংগ্রহ করে প্রতিনিয়ত যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে পাঠাতেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে সহযোগিতা চাইতেন। যদিও নিক্সন সরকারের অবস্থান ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। তার এই ভূমিকায় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। এর ফলে পুরো চাকরি জীবনে আর্থারের আর পদোন্নতি হয়নি। অবশ্য চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার ’৭১-এ তার ওই সাহসী ভূমিকার জন্য তাকে অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে।

অনেক কথাই বলা যায়। অনেক ইতিহাসই আমাদের প্রজন্মের জানা দরকার। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সমর্থন দি্যেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ের জন্য কাজ করেছিলেন। প্রায় ২০ হাজার ভারতীয় সেনাসদস্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন। বিশ্বের ইতিহাসেও এটি বিরল একটি ঘটনা।
লতা মুঙ্গেশকর বাংলাদেশের শিশুদের জন্য দিয়েছিলেন এক লাখ রুপি। ছবির সাইনিং মানি দিয়ে দিয়েছিলেন নায়িকা ওয়াহিদা রেহমান। বাংলাদেশের দুর্দশার ছবি এঁকে সেই ছবি নিয়ে মুম্বাইয়ের রাস্তায় রাস্তায় বাংলাদেশের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন মকবুল ফিদা হুসেন।

আর্জেন্টিনার ভিক্টোরিয়া ওকামেপা ৮১ বছর বয়সেও আর্জেন্টিনার রাস্তায় নেমে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার প্রতিবাদ করেছিলেন। যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই ছিল, সেই পাকিস্তানের অনেক কবি-সাহিত্যিক, মানবাধিকারকর্মীও দাঁড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে। কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ পাকিস্তানে থেকেই এর প্রতিবাদ করেছিলেন।

মনে পড়ছে, আওয়ামী লীগ সরকার ’৯৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর বিজয়ের রজতজয়ন্তী যাপন করেছিল। এর ঠিক আগে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ নিউইয়র্ক সফরে এসেছিলেন।
এস্টোরিয়া ওয়ার্ল্ড ম্যানরে তার সম্মানে সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন বৃহত্তর সিলেটবাসীরা। আমি সেখানে সামাদ আজাদের কাছে প্রস্তাব করেছিলাম রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে জর্জ হ্যারিসন এবং পণ্ডিত রবি শংকরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হোক। সামাদ আজাদ আমার প্রস্তাবকে ‘চমৎকার’ বর্ণনা করে কথা দিয়েছিলেন, উদ্যোগ নেবেন।

একই প্রস্তাব আমি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও করেছিলাম নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের একটি অনুষ্ঠানে। তিনি তাৎক্ষণিক তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে নোট করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি। জর্জ হ্যারিসনকে তার জীবদ্দশায় আমরা সম্মান জানাতে পারিনি।

যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা অব্যাহত থাকুক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পর্যায়ক্রমে সকল বিদেশী বন্ধুকে সম্মানিত করা হবে। বাংলার মানুষও তা চান। না, এই প্রজন্ম ঋণের বোঝা বইতে চায় না। শোধ করতে চায়। তাদের যেটুকু সাধ্য আছে সেভাবেই।

***
ফিচার ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত