ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

নিউইয়র্কের মধ্য ম্যানহাটান দিয়ে হাঁকিয়ে ইয়েলো ট্যাক্সি চালাচ্ছেন মিনার মাহমুদ। পেছনে একজন কাস্টমার বসা। কাস্টমার ভদ্রলোক ফ্রান্স থেকে নিউইয়র্কে এসেছেন। আলাপ জুড়ে দিলেন ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে। মিনার মাহমুদ সগর্বে জানালেন, ‘আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ।’ ফরাসি যাত্রী ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, ওহ! ডু ইউ নো তসলিমা নাসরিন?’ মিনার মাহমুদ হেসে দিলেন। বললেন, ‘আই ওয়াজ হার হাসবেন্ড’ ‘শি ওয়াজ মাই এক্স ওয়াইফ।’ যাত্রীর চোখ তো ছানাবড়া’। ভ্রু কুঁচকালেন তিনি। লোকটা বলে কী? নিশ্চয়ই ‘বদ্ধ পাগল’ ছাড়া কিছু নয়। যাত্রী বললেন, ‘নো কোমেন্ট! ট্যাক্সির ভাড়া চুকিয়ে খুব দ্রুত ট্যাক্সি থেকে নেমে গেলেন। হয়তো যাত্রীর মনে হয়েছিল, ড্রাইভারটা হয়তো ড্রাংক। বুঝি আবার অ্যাক্সিডেন্ট করে ফেলে কি না!

ঘটনাটি সরাসরি মিনার মাহমুদের কাছ থেকে শোনা। তিনি তিন-চারটা পেশা বদল করে শেষ পর্যন্ত ইয়েলো ট্যাক্সিতে স্থিত হয়েছেন। বিষয়টা আমাদের বেশ ভালোই লাগছিল। আমরা যারা তার শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলাম, তারা চাইছিলাম, তার জীবনটা শৃঙ্খলিত হোক। স্থিতিশীল হোক।

নিউইয়র্কে যারা হলুদ ট্যাক্সিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন তারা সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ করে পাঁচ-ছয়শ ডলার রুজি করতে পারেন। কেউ কেউ আরও বেশি। ছয় দিন কাজ করলে তো বেশ ভালো পরিমাণ ডলার আয় হওয়ার কথা।

মিনার মাহমুদ তাই অন্যান্য ‘অড জব’ বাদ দিয়ে যখন এই পেশাকে বেছে নিলেন, আমরা আশ্বস্ত হলাম। ডাকসাইটে ড্রাইভার ছিলেন তিনি। দাপিয়ে গাড়ি চালাতেন। এই তো জীবন, চলুক না গাড়ির চাকা। দেখা হলেই সে কথাটি সানন্দে বলতাম আমি।

তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ঢাকায় কোন এক আড্ডায়। নব্বইয়ের দশকে। তিনি ‘বিচিত্রা’ থেকে তখন বোধহয় বেরিয়ে গেছেন। নতুন পত্রিকা করবেন। সেই আড্ডায় পরিকল্পনার কথা বললেন। নাম কী? ‘বিচিন্তা’। মানে কী জিজ্ঞাসা করি। বিশেষ চিন্তা। বিশেষ এর ‘বি’ আর ‘চিন্তা’। আমার ভালো লাগে।

মার্কিনি জীবনে আমাদের সময় তখন উত্তাল। দেশে এরশাদ শাহীর স্বৈরশাসন চলছে। আমরা শত শত তরুণ স্বদেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে বিদেশে তুমুল ক্যাম্পেন করছি। নিউইয়র্কে নিয়মিত ঢাকার ম্যাগাজিনগুলো আসে। আমি এর প্রধান খদ্দের। ‘সাপ্তাহিক বিচিন্তা’ও আসে। নিয়মিত পড়ি। ‘বিচিন্তা’ তখন তরুণদের অন্যতম প্রিয় পত্রিকা। স্বৈরশাহীর অন্যতম ‘শত্রু মিডিয়া’। বিচিন্তা ও স্বৈরশাসক এরশাদের মুখোমুখি সংগ্রাম মিনার মাহমুদের উপর নেমে আসা খড়গ, তা আজকের পাঠকদের হয়তো কেউ কেউ মনে রেখেছেন। অনেকে জানেনও না।

বাংলার পদ্মা-মেঘনা আর নিউইয়র্কের ইস্টরিভার, হাডসন নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে যায়। খুব সম্ভব ‘৯১-এর মাঝামাঝি একদিন শুনি মিনার মাহমুদ নিউইয়র্কে চলে এসেছেন। এরপর একটি সাপ্তাহিক কাগজের অফিসে আড্ডায় তার সঙ্গে দেখাও হয়ে যায়। কথা হয়। আড্ডা হয়। সেই, প্রাণবন্ত তিনি। তার সাহসী কথাবার্তা ভালো লাগে।

তারপর ‘ঝাঁকের কই’ এর মতো হারিয়ে যান তিনিও নিউইয়র্কে। মাঝে মধ্যে দেখা হয়ে যেত কোন অনুষ্ঠানে। একবার ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি যুক্তরাষ্ট্রের’ উদ্যোগে আয়োজিত এক সমাবেশে তাকে বক্তৃতা দেয়ার অনুরোধ করেছিলাম। বললেন, না আপনারা চালিয়ে যান। আমি দর্শক-শ্রোতার সারিতেই বসে থাকতে চাই। তার সঙ্গে আমার চেতনার একটি মৌলিক মিল ছিল। তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে ‘আম্মা’ বলে সম্বোধন করতেন। আর আমিও শহীদ জননীকে ডাকতাম ‘মা’। সে হিসেবে এক জননীর সন্তান ছিলাম আমরা।

মনে পড়ে, একটি পত্রিকা অফিসে এক আড্ডায় তিনি তার ব্যক্তিগত জীবনের গল্প বলছিলেন। উচ্চ হাসি দিয়ে তার সুরাপান পর্ব আর বিগত রাতটির আমোদ স্ফূর্তির বিবরণ দিচ্ছিলেন তিনি অকপটে। সেই সুযোগে আমি বলেছিলাম, ‘কমরেড, আর কত! এবার সংসারী হোন। জীবনটাকে বিন্যস্ত করুন।’

উচ্চ হেসে জবাব দিয়েছিলেন মিনার মাহমুদ ‘সংসার সবাইকে ধরে রাখতে পারে না, প্রিয় ফকির ইলিয়াস।’ তার কথা আমাকে ভাবিয়েছিল। মদ্যপান ও নারীসঙ্গ তার প্রিয় ছিল খুব। তা আমদের অজানা ছিল না। তার বোহেমিয়ান জীবনের এক সময় ইতি হয়ে সুশৃঙ্খল জীবন তার পরিধান হবে, সে প্রত্যাশা আমাদের অনেকের ছিল। কিন্তু তা বাস্তবে হয়নি।

শুনেছিলাম, নিউইয়র্কে তিনি একজন সুন্দরী রমনীকে বিয়েও করেছিলেন। বিয়ে টেকেনি খুব বেশি দিন। তারপর এক সময় মিনার নিউইয়র্ক ছেড়ে ট্যাক্সস অঙ্গরাজ্যে চলে যান। আমরা খবর পাই- সেখানেও তিনি আরেক সুন্দরী রমনীর সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। খুব বেশিদিন তাও টেকেনি।

মিনার মাহমুদ প্রায় আঠারো বছর যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। তার কি গ্রিনকার্ড হয়েছিল? সে জিজ্ঞাসা কখনো তাকে করিনি। আমার চেয়ে বেশি যারা ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তারা হয়তো সে বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন। তবে গ্রিনকার্ড না হলেও, তা হওয়াটা তার জন্য খুব কষ্টকর ছিল বলে আমি মনে করি না। সঠিক উপায় অবলম্বন করলে, তিনি খুব সহজেই গ্রিনকার্ড পেয়ে মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারতেন।

মিনার মাহমুদ কোন আত্মপ্রত্যয় বুকে ধারণ করে আমেরিকা এসেছিলেন তা আমি জানি না। তবে এখানে আসার পর শুরু থেকে তার সঙ্গে আলাপে-আড্ডায় বুঝেছি, তিনি মনে করেছিলেন নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ৭-৮টি প্রধান সাপ্তাহিকের এমন কোন না কোনটি, তাকে নির্বাহী সম্পাদক, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এমন কোন পদ দিয়ে লুফে নেবে। তার নামের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে এখানকার পাঠক। বাস্তবে তা হয়নি। না হওয়ার প্রধান কারণ ছিল, নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক হলো কমিউনিটি বেস পত্রিকা। এখানে সাংবাদিকতা করতে হলে আগে কমিউনিটিকে রপ্ত করতে হয়। মিনার মাহমুদের তা ছিল না বলেই তিনি স্থানীয় কোন পত্রিকায় চাকরির ডাক পাননি।

দেখা হলেই আমার একটা অনুরোধ থাকত তার কাছে। তা ছিল, ‘আপনি লেখালেখি করুন মিনার মাহমুদ।’ মনে পড়ছে নিউইয়র্কের একটি সাপ্তাহিকে তিনি একটি ধারাবাহিক কিছুদিন লিখেছিলেন। তা ছিল তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত জীবনাচার নিয়ে। প্রথমত, ওই সাপ্তাহিকটির কম সার্কুলেশনের কারণে তা পাঠকের কাছে তেমন পৌঁছেনি। আর দ্বিতীয়ত, সেই পুরনো রগরগা ইস্যুটি এতটাই পড়ে গিয়েছিল যে, পাঠক তা আর গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না মোটেও।

না, সমসাময়িক বিষয় নিয়ে মিনার মাহমুদ ওই আঠারো বছরে খুব একটা লিখেননি। ফলে তার নামটি পাঠকবিস্মৃত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ছিল।

কেউ কোন স্থান ছেড়ে এলে প্রজন্মের নতুন প্রতিনিধিরা সে স্থান দখল করে নেয়। সেটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। মিনার মাহমুদের বেলায়ও তেমনটি হয়েছিল। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, মিনার মাহমুদের হাতে গড়া অনেক সাংবাদিক, মিডিয়াকর্মী- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের বেশ কিছু দেশে অধিবাসী জীবন বেছে নিয়েছেন। তারা বিদেশে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মিনারের অনেক জুনিয়র সহকর্মী আজ বাংলাদেশেও মিডিয়াসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত। মিনার কেন পারেননি? এর জন্য তার অত্যধিক উড়নচন্ডি মনোভাবই দায়ী বলে আমি মনে করি।

মিনার দেড় যুগ পর বাংলাদেশে ফিরে দেখেছেন, তার স্থান নেই। এ জন্য দুঃখবোধের কী কারণ থাকতে পারে? অনেক শূন্যস্থানই পূরণ হয়। তারটাও হয়েছিল। মিনার মাহমুদকে নিয়ে এ পর্যন্ত অনেকেই অবিচুয়ারি লিখেছেন। হয়তো আরও অনেকে লিখবেন। লেখকদের অনেকেই সমাজকে, রাষ্ট্রকে দোষ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কারও ব্যক্তিগত সৃষ্ট কোন হতাশার দায় রাষ্ট্রের নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি না।
মিনার মাহমুদের আত্মহনন থেকে এই প্রজন্মের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে।

মনে রাখতে হব-বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে অনেক উচ্চ মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন তার জীবদ্দশায় হয় না। অনেকের মরণোত্তরও হয়নি। এটা নির্মম হলেও সত্য। ‘মেধার স্ফুরণে’ কেউ আত্মহনন করবে, তা চরম বেদনাদায়ক তো বটেই। বিশ্বের অনেক নামিদামি ব্যক্তিত্ব যদিও সে পথটি বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশে ‘লাশ কাটা ঘর’-এর অমর লেখক কায়েস আহমদ আত্মহনন করেন। এ রকম অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। কিন্তু তারপরও আত্মহনন, কোন সংগ্রামী মানুষের অভিপ্রায় হতে পারে না। জীবনে সংঘাত থাকবে। তা মোকাবিলা করার নামই জীবন। এই বৃহৎ ভূমন্ডলে মিনার বেঁচে থাকতে পারতেন। তারপরও কেন তাকে এ পথ বেছে নিতে হলো! এটাই সময়ের বিনীত জিজ্ঞাসা।