ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বর্তমান সরকারের ‘সমুদ্র জয়’ কিংবা মায়ানমারের সঙ্গে আইনি জয়ের পর ধন্যবাদ জানিয়েছিল দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তারা আবার সেই ‘ধন্যবাদ’ ফিরিয়ে নিয়েছে! একটা মজার খবর তো বটেই। কতোটা হিংসাপরায়ণ হলে ধন্যবাদ ফিরিয়ে নেয়া যায়, তার প্রমাণ দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। প্রমাণ করেছেন, তাদের রাজনীতি শুধুই হিংসার খাতিরে হিংসা। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা! তারা ‘ধন্যবাদ’ ফিরিয়ে না নিলেও পারতেন। এর কোনো দরকার ছিল না। তাদের ভাবা বাংলাদেশ জয়ী হয়নি, কিন্তু এমন কোনো প্রমাণ তাদের হাতে নেই। ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলে মূলত তারা নিজেরাই ‘শুভঙ্কর’ হয়ে গেছেন। যে অংকের শূন্য তাদের নিজেদেরই মেলাতে কষ্ট হচ্ছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক গোলটেবিল বৈঠকে বলেছেন, ১৪ মার্চ সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সঠিক তথ্য-উপাত্ত না জেনেই তারা ধন্যবাদ জানিয়ে বসেছিলেন। যা এখন ‘সংশোধন’ করছেন তারা।

তিনি বলেছেন- ‘সমুদ্র জয় যেভাবে সারা দেশকে নাড়া দিয়েছে, তাতে আমরা বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। প্রথমে না জেনে সরলভাবে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম। পরে আমরা যখন বিষয়টি জানলাম, তাতে মনে হয়েছে পুরোটাই শুভঙ্করের ফাঁকি। এখন উই স্ট্যান্ড কারেকটেড।’ বিএনপির এই নেতা বলেছেন, কিন্তু পরে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে তথ্য-উপাত্ত থেকে জানতে পেরেছি, এটা শুভঙ্করের ফাঁকি। একটি কথা মনে রাখা দরকার, সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর ১৪ মার্চ পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেছিলেন, ‘এটা আমাদের বিরাট বিজয়। আমরা যা যা চেয়েছি, তা সবই পেয়েছি। বঙ্গোপসাগরে এক লাখ সাত হাজার বর্গকিলোমিটার চেয়ে আমরা পেয়েছি এক লাখ ১১ হাজার বর্গকিলোমিটার।’ এই যে সত্য, তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। তাহলে বিএনপি কেন, কোন যৌক্তিক কারণে তা অস্বীকার করে মত পাল্টালো?

যে দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জয় পেয়েছে, তা পেছনে ফিরে দেখা দরকার। বাংলাদেশের দাবি ছিল, সমুদ্রসীমা নির্ধারণে ন্যায্য মাপকাঠি হওয়া উচিত উত্তর-দক্ষিণ ধারণাটি। আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার আগে মায়ানমার ও ভারত পূর্ব-পশ্চিম ধারণার মাপকাঠি অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরের অনেকটা জায়গা, প্রায় একতরফাভাবে দখল করে রেখেছিল। মায়ানমার বঙ্গোপসাগরে সেন্টমার্টিন দ্বীপের ও জলসীমার অনেকটা ভেতরে বৃত্তাকারে প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল সমুদ্র নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছিল। ভারতও পূর্ব-পশ্চিম মাপকাঠির ভিত্তিতে বাংলাদেশের অনেকটা জলসীমা নিজেদের দখলে নিয়ে রেখেছে।

ভারত ও মায়ানমার উভয় দেশের বিরুদ্ধে সমুদ্রে উত্তর-দক্ষিণ মাপকাঠির ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করেছিল। বলা যায়, বাংলাদেশ বাধ্য হয়েছিল আদালতে যেতে। কারণ মায়ানমার ও ভারতের সঙ্গে এ নিয়ে অনেক দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় শুধু সময়ক্ষেপণ হওয়া ছাড়া আর কিছুই হচ্ছিল না। উত্তর-দক্ষিণ মাপকাঠির ভিত্তিতে বঙ্গোপসাগরের সীমা নির্ধারণের দাবি আন্তর্জাতিক আদালতে বৈধতা পাওয়ায় বাংলাদেশের সৌভাগ্য ও সম্ভাবনার সীমা বহুদূর বিস্তৃত হয়েছে। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন এবং আরো দূরবর্তী জলসীমা আদালতের রায়ে বাংলাদেশের অধিকারভুক্ত হওয়ায়, সীমাহীন জলসম্পদ ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি সীমাহীন তেল-গ্যাসসহ অন্যান্য মূল্যবান খনিজসম্পদ আহরণের সুযোগও পেয়ে গেছে বাংলাদেশ।

এই যে পাওয়া, তা মেনে নিতে পারছে না বিএনপি। আর পারছে না বলেই তারা শুরু করেছে নানা রকম প্রোপাগান্ডা। তাদের ভয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগ এই জয়ের কথা বলে যদি আগামী নির্বাচনে আবার জিতে যায়!

এতো ভয় কেন তাদের? তারা ক্ষমতায় থাকতে দেশের জন্য কাজ না করে নিজেদের উদরপূর্তি করেছিল- সে জন্য?

মায়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রবিরোধে বাংলাদেশের জয়ের খবর বিরোধী দলের গ্রহণ করতে না পারাকে লজ্জাজনক হিসেবে অভিহিত করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমনি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি কোনোভাবেই সরকারের এ সাফল্য গ্রহণ করতে পারছে না। তাই তারা সমালোচনার জন্য সমালোচনা করছে। দীপুমনি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, ধন্যবাদ দিয়ে তা প্রত্যাহারের উদাহরণ পৃথিবীতে বিরল। মায়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের মামলা ও জয়ের বিস্তারিত খবর আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা বিষয়ক আদালতের ওয়েবসাইটে রয়েছে। যে কোনো ব্যক্তি চাইলে তা পড়ে দেখতে পারে।

এটা সকলেরই জানা বিএনপি যে সময় বাংলাদেশের নানা অর্জনের বিরোধিতা করছে, তখন এই দেশে চলছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া। একটি খবর গোটা দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একাত্তরে পিরোজপুরে জামাতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধের নমুনা হিসেবে পোড়া টিন ও ঘরের খুঁটি আদালতকে দেখিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ হেলালউদ্দিন। ৯ এপ্রিল ২০১২ সোমবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসে এসব নমুনা উপস্থাপন করে তিনি। হেলালউদ্দিন আদালতকে জানান, ২০১০ সালের ১১ আগস্ট পিরোজপুরের ইন্দুরকানি থানায় টেংরাখালী ইউনিয়নের চিথালিয়া গ্রামে তদন্তের সময় আলমগীর পসারি ও মানিক পসারির বাড়ি থেকে চারটি পোড়া টিন (করোগেটেড আয়রন শিট) উদ্ধার করেন তিনি। যেগুলো একাত্তরে ঘর পুড়িয়ে দেয়ার আলামত।

একই দিনে মানিক পসারির বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় পুড়ে যাওয়া ঘরের খুঁটি। সাইদীর নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা একাত্তরে ওই দুজনের বাড়িতে আগুন দেয় বলে অভিযোগ এনেছে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। এছাড়া একাত্তরে তিন হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা বা হত্যায় সহযোগিতা, নয় জনেরও বেশি নারীকে ধর্ষণ, বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট, ভাঙচুর এবং একশ থেকে দেড়শ হিন্দুকে ধর্মান্তরে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে সাঈদীর বিরুদ্ধে, যাকে একাত্তরে তার এলাকার লোকজন ‘দেইল্লা রাজাকার’ নামে চিনতো।

কী ভয়াবহ এসব তথ্যপ্রমাণ! তারপরও এদেশের মানুষ জানে, একটি বিশেষ শ্রেণী বলবে, এগুলো মিথ্যা অপপ্রচার! হ্যাঁ, তারা তা বলতেই পারে। তারপরও একাত্তরের হায়েনাদের বিচার চায় বাংলার মানুষ। যারা একাত্তরে এদেশের ঘরবাড়ি পুড়িয়েছিল, যারা এদেশের মানুষের ধর্মের ওপর আঘাত করেছিল, তাদের তো ক্ষমা করা যায় না কোনোমতেই।

এদিকে আরেক অভিযুক্ত রাজাকার আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের দেশ ছেড়ে যাবার ঘটনা কাঁপিয়ে তুলেছে গোটা দেশ। গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে বাচ্চু রাজাকার পালালো, তা ভাবার বিষয়। এ বিষয়ে রাষ্ট্র বলছে, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পলাতক আবুল কালাম আজাদ ওরফে ‘বাচ্চু রাজাকারকে’ ফেরাতে ইন্টারপোলের সাহায্য নেয়া হবে। কথাটি জানিয়েছেন স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। তিনি বলেছেন, ‘বাচ্চু রাজাকার যদি বিদেশে পালিয়ে গিয়ে থাকে, তবে তাকে ফেরাতে ইন্টারপোলের সাহায্য নেয়া হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাচ্চু রাজাকার পালিয়ে গেছে কিনা তা আমরা তদন্ত করছি। যদি পালিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে ইন্টারপোলের সাহায্যে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। পরবর্তীকালে যেন কোনো রাজাকার পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য বর্ডার গার্ডকে সতর্ক থাকার জন্য বলা হয়েছে।’ সাহারা খাতুন বলেছেন, ‘এই সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যা, ২১ আগস্টের বিচারকাজ চলছে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারকাজ চলছে। এ সরকারের আমলেই তা সম্পন্ন করা হবে।’

এই দেশে বিচারকাজ শেষ করতে না পারলে প্রজন্ম কাউকেই ক্ষমা করবে না। মুজিব হত্যার বিচার শেষ করতে আওয়ামী লীগকেই আবার ক্ষমতায় আসতে হয়েছিল। বিএনপি-জামাত জোট তা শেষ করেনি। কথাটি ক্ষমতাসীনদের মনে রাখা দরকার।

এই সেই বাংলাদেশ, যে দেশে ৭১-এর পোড়ানো টিনচিহ্ন এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি। সেই দেশে বসেই রাজাকার আলবদরদের বাঁচাবার জন্য মরিয়া একটি মহল। এরাই না বুঝে (!!) ধন্যবাদ দিচ্ছেন। আবার ফিরিয়েও নিচ্ছেন। আয়নায় নিজেদের মুখ না দেখেই তারা পরের যাত্রাভঙ্গ করতে চাইছেন। এসব কাজ, সুস্থ রাজনীতির পরিচয় বহন করছে না। যারা গোটা বাংলাদেশকে তামার মাটি বানাবার জন্য আগুন জ্বালিয়েছিল, ৭১-এর সেসব নরঘাতকদের কোনো সভ্য মানুষ কোনোদিনই ক্ষমা করবে না। করতে পারে না।