ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

একটি বাস্তব ঘটনা দিয়ে লেখাটি শুরু করি। আমার এক বন্ধু দেশে গিয়েছিলেন। তিনি তার বিবাহিত ভাই-বোনদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্র্যান্ট ভিসার দরখাস্ত করবেন। সে জন্য তার সেসব বিবাহিত ভাই-বোনের বার্থ সার্টিফিকেট, ম্যারেজ সার্টিফিকেট দরকার। সে জন্য তিনি তার পৌরসভার মেয়রের অফিসে গিয়েছিলেন। পৌর করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বললেন কাজগুলো করে দেয়া যাবে। তবে একটি সনদের জন্য উচ্চহারে উৎকোচ প্রদান করতে হবে। ওই কর্মকর্তা জানালেন, জন্ম সনদ এবং বিবাহ সনদের প্রকৃত দলিল যেহেতু সংরক্ষিত নেই, তাই ডুপ্লিস্নকেট তারিখ দিয়ে পুরনো তারিখে তা বানাতে হবে। তাই টাকা-পয়সা তো লাগবেই।

আমার ওই বন্ধু সরাসরি মেয়রের সঙ্গে দেখা করেন। মেয়রও হেসে হেসে বলেন, বুঝেনই তো, যেহেতু জন্ম, বিবাহ কোন সনদই ওই সময়ে সংরক্ষিত হয়নি, তাই টাকা তো লাগবেই। যা হোক, পরে টাকা-পয়সা খরচ করেই আমার ওই বন্ধু তার সনদগুলো আনতে পেরেছিলেন। কারণ তা নিবন্ধিত ছিল না।

এটা হলো একটা দিক। বাংলাদেশে এই যে প্রথা দীর্ঘদিন থেকে চালু আছে, তার আগল ভাঙবে কে? বাংলাদেশের বয়স চারদশক। কয়টি জন্ম নিবন্ধন বাংলাদেশে হয়েছে? কয়টি বিবাহ রেজিস্ট্রেশন হয়েছে? আর্থ-সামাজিক অবস্থা দেশের গোটা সমাজকে অন্ধত্বের বন্দী শিবিরে রেখেছে। এর জন্য দায়ী রাষ্ট্রব্যবস্থা। দায়ী দেশের শাসকগোষ্ঠী। যারা দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতি এবং দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করেননি। কিংবা শায়েস্তাও করেননি। বরং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে দুর্নীতির বিস্তার ঘটিয়েছেন।

দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন দেশের প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ৫৫ বছরের রাজনৈতিক জীবন তার। এমন একটি কালিমা লেপনের মাধ্যমে তার মন্ত্রিত্বের অবসান হবে, তা দেশের মানুষ কখনই ভাবেননি।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার, রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ইউসুফ মৃধা এবং কমান্ড্যান্ট এনামুল হককে যাত্রী হিসেবে নিয়ে তাদের গাড়ির ড্রাইভার, গাড়িটিসহ বিজিবি গেটে ঢুকে পড়েছিল। বিষয়টি শুরু থেকেই গোটা দেশবাসী পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ঘটনার পরপরই রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের কোন নাগরিক তার নিজস্ব টাকা-পয়সা নিয়ে চলার অধিকার অবশ্যই আছে’।

আমি নিজে টিভিতে শ্রী সেনগুপ্তের বক্তব্য শুনেছি। তার বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে তিনি সরাসরি তার এপিএসের পক্ষ নিচ্ছেন। বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোড়ন তোলে। এমনি সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় সফরে তুরস্ক চলে যান। সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, প্রধানমন্ত্রী নাকি বলেই গেছেন, রেলমন্ত্রী যেন পদত্যাগ করেন। এরপরে চলতে থাকে নানা ঘটনা। এপিএস ওমর ফারুককে বরখাস্ত করা হয়। ইউসুফ মৃধা ও এনামুল হককেও সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। সরকারপক্ষ বলে তদন্ত চলছে জোরদারভাবে। তারপর ১৫ এপ্রিল রোববার রাতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন। এর পরপরই গোটা দেশব্যাপী চাউর শুরু হয় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পদত্যাগ করছেন। সোমবার দুপুরেই তিনি সাংবাদিকদের সামনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

এ পদত্যাগের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলস্টোন। এর কারণ হচ্ছে, গণতন্ত্রের প্রতি সম্মান দেখিয়ে, সুষ্ঠু তদন্তের কথা বিবেচনা করে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পদত্যাগ করেছেন। কথাগুলো বলেছেন তিনি নিজেই। বাংলাদেশে এমন ঘটনা খুবই বিরল।

আমরা যদি দেশের গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার দিকে তাকাই তাহলে দেখব, সব পদত্যাগই অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশের শীর্ষ ক্ষমতাসীনের ইচ্ছায়। তার পছন্দ-অপছন্দই কাজ করেছে সবচেয়ে বেশি। বেগম খালেদা জিয়ার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন বলেই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।

১৯৯৬-২০০০ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তৎকালীন বেশক’জন শীর্ষ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে নানা রকম দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ‘সিরিয়েল নিউজ’ পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ওই সময়ের রাঘববোয়াল কোন মন্ত্রীকেই পদত্যাগ করতে হয়নি। ওই সময়ে শুধু সৈয়দ আবুল হোসেনকে সরে যেতে বলা হয়েছিল।

চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে নিজামী-খালেদার সরকার দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, কিবরিয়া হত্যা, দেশব্যাপী বোমা হামলা, বিচারক হত্যাকান্ডের মতো জঘন্য কর্মকান্ড ঘটে। না, একজন মন্ত্রীকেও পদত্যাগ করতে হয়নি।

বর্তমান মহাজোটের আরও বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে নানা রকম দুর্নীতির সংবাদ পত্র-পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছে। সামান্য দফতর রদবদল ছাড়া বড় কোন বাদ দেয়ার ঘটনা ঘটেনি। শুধু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ব্যাপারেই ঘটল ব্যতিক্রমী উদাহরণ!

এ বিষয়ে কিছু ঘটনা পেছন ফিরে দেখা যাক। ওয়ান-ইলেভেনের পর শেখ হাসিনা যখন অন্তরীণ হন, তখন চারজন নেতা শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়েই ‘আওয়ামী লীগ’ চালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলেন বলে বাজারে নানা কথা শোনা যায়। যে চারজন নেতা শেখ হাসিনার সভাপতি পদের সংস্কারের পক্ষে ছিলেন বলে মিডিয়ায় গুজব ছিল তারা হলেন_ আর-এ-টি-এস। রাজ্জাক, আমু, তোফায়েল ও সুরঞ্জিত। ‘র‌্যাটস’ বলে মিডিয়ায় পরিচিতি পায় এই কোড। এই চার নেতা সংস্কারবাদী বলে পরিচিতি পান দেশে-বিদেশে।

ঘটনার ধারাবাহিকতায় মো. জিল্লুর রহমান, সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী গ্রুপ শেখ হাসিনার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন। মেঘ কেটে যায়। শেখ হাসিনা মুক্ত হন। নির্বাচন হয়। নির্বাচনে শেখ হাসিনা রাজ্জাক, আমু, তোফায়েল, সুরঞ্জিত চারজনকেই মনোনয়ন দেন। চারজন এমপি হিসেবে পাসও করেন। কিন্তু শুরুতে মন্ত্রিত্বের ভাগ্য এ চার বর্ষীয়ান নেতার ভাগ্যে ঘটেনি।

বারবার পরীক্ষার মুখোমুখি হন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। আইন মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে সংবিধান সংশোধনীতে জোরালো এবং সক্রিয় ভূমিকা রাখেন উপদেষ্টাম-লীর সদস্য হিসেবে সরকার ও মন্ত্রীদের অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে গরম কথাবার্তা বলে মিডিয়ায় নায়কের ভূমিকা রাখেন।

অবশেষে তাকে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন শেখ হাসিনা। প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে শেখ হাসিনা কি তাকে পুরোপুরি ক্ষমা করতে পেরেছিলেন? শেখ হাসিনা কি ভুলে গিয়েছেন, ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে কারা তার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছিল?

আওয়ামী লীগের আরও বেশকিছু সিনিয়র নেতা মন্ত্রিত্ব পাননি। মোহাম্মদ নাসিম, শেখ সেলিম, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, আবদুল মতিন খসরু, সাবের হোসেন চৌধুরী, মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমন আরও অনেক নাম করা যায়। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি সুলতান মুহাম্মদ মনসুর, মাহমুদুর রহমান মান্না, আখতারুজ্জামানের মতো তুখোড় নেতারা। কেন এরা বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারপ্রধানের নেকনজরে নেই, তা দেশবাসী কমবেশি জানেন এবং বোঝেন।

যে বিষয়টি বলা দরকার, মোটামুটি শেখ হাসিনার কথায়ই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে মন্ত্রী করা হয়। যোগাযোগ থেকে বের করে এনে ‘রেল মন্ত্রণালয়’ নামে নতুন মন্ত্রণালয় করা হয়। সেই মন্ত্রণালয়ে মাত্র কয়েক মাস কাজ করার মাথায়ই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে চলে যেতে হলো। এটা আমাদের জানা, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বামধারার রাজনীতিক ছিলেন। সারাজীবন মজলুম জনতার পাশে থেকে প্রগতিবাদী রাজনীতি করেছেন। তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বারবার এমপি হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীও হন।

সেই বর্ষীয়ান রাজনীতিকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কিংবা দুর্নীতির মদদ দেয়ার যে অভিযোগ উঠেছে তার শানেনজুল কী? বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী তার ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত ‘সেনগুপ্ত কমিউনিকেশন’ নামে একটি আইটি কোম্পানির লাইসেন্স নিয়েছেন। এজন্য তাকে ৫ কোটি টাকা সরকারি ফি দিতে হয়েছে। এই কমিউনিকেশন চালাতে তার আরও ৩০ কোটি টাকা দরকার। সৌমেন সেনগুপ্ত একজন আইটি ইঞ্জিনিয়ার। খবরে জানা গেছে, তিনি একটি কোম্পানিতে মাসিক ৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরিজীবী ছিলেন। সম্প্রতি নিজ ব্যবসার লাইসেন্স নিয়েছেন। আয়ের সঙ্গে ব্যবসার এই সমানুপাত সঙ্গতিপূর্ণ কি-না তা খুঁজে দেখা দরকার। পত্র-পত্রিকায় সুনামগঞ্জে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ‘সেন মার্কেট’-এর ছবি ছাপা হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে যে কেউ করতে পারেন। কিন্তু নিজ নিজ ব্যবসাগুলো বৈধ অর্থ- সম্পদের মাধ্যমে হয়েছে কি-না সেটাই খতিয়ে দেখার বিষয়।

ব্যক্তিগতভাবে আমার মন বিশ্বাস করতে চাইছে না, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। কারণ রাজনীতির এই শেষ বয়সে এসে এর বেশি কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই। তারপরও তাকে কেউ সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে কি-না, তার ইমেজ ধ্বংসের জন্য কোন ষড়যন্ত্র ছিল কি-না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার যদি আগেই অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা কামাই করে থাকে, তাহলে তাকে অনেক আগেই কেন বরখাস্ত করেননি শ্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত? মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রী জয়া সেনগুপ্ত, এই ওমর ফারুককে দু’চোখে দেখতে পারতেন না, তার দুর্নীতির কারণে। ঘটনা যদি তাই হয়, তবে সুরঞ্জিত কেন তাকে সঙ্গে সঙ্গেই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেননি?

ওই রাতে গাড়িতে কত টাকা ছিল, গাড়িটি কোথায় যাচ্ছিল, কেন যাচ্ছিল সবকিছুই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী বিচার-বিবেচনা করবেন। শ্রী সেনগুপ্ত বলেছেন, তদন্তে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। তার কথা সত্য হোক। কারণ তা না হলে বাংলাদেশে প্রগতিবাদী রাজনীতির ধারক-বাহকদের পাঁজর ভেঙে যাবে। বাংলাদেশে দুর্নীতির শিকড় আজ বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পদত্যাগের ঘটনা কি দুর্নীতি নামক কালো জোঁকের মুখে চুন ঢেলে দিতে পারবে? নাকি সবই হবে শেষ পর্যন্ত আইওয়াশ?

পাদটীকা – এই লেখার পর সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে দফতরবিহীন মন্ত্রী করা হয়েছে। ওমর ফারুক দুদকের সামনে হাজির হয়ে বলেছে, সুরঞ্জিত বাবুর কোনো দোষ নেই। টাকাগুলো তার নিজের। সবই আমরা টিভিতে দেখেছি। তাহলে হচ্ছেটা কি ? সবকিছু এভাবে হালাল হয়ে যাবে ???