ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

না এখনও ইলিয়াস আলীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এলজিআরডি মন্ত্রী বলেছেন, শিগগির তার খোঁজ পাওয়া যাবে। এদিকে আসছে রোববার থেকে আবারও হরতালের কবলে পড়তে পারে দেশ।সবমিলিয়ে বাংলাদেশে আবারও তীব্র সংকটের ঘনঘটা।

গত রবি, সোম ও মঙ্গলবার হরতাল হয়েছে। আবার আগামী রবি ও সোমবার ৪৮ ঘণ্টার হরতাল দিতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। লাগাতার হরতাল দিয়ে দেশ অচল হওয়ার পূর্বাবস্থা আমরা লক্ষ্য করছি। বিমানবন্দরগুলোতে আটকা পড়েছেন বিদেশগামী এবং বিদেশ থেকে আগত যাত্রীরা। এমন অবস্থায় দেশে প্রথমেই মুখ থুবড়ে পড়বে যে কাজটি, তা হচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগ। না, কোন চরম অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে যে কেউই ব্যবসা-বিনিয়োগ করতে চাইবে না।

বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর গোটা রাষ্ট্রে তোলপাড় শুরু হয়েছে। না, তার কোন হদিস দিতে পারেনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পূবাইলের একটি বাড়িতে তার খোঁজে অপারেশন চালানো হলেও তা ব্যর্থ হয়। ওই অপারেশনে ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা সরকারি বাহিনীর সঙ্গেই ছিলেন। পূবাইল অপারেশন ব্যর্থ হওয়ার পরই তাহসিনা রুশদীর খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। একান্ত বৈঠকের পরপরই তিনি সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যান। মিডিয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা সব কিছুকেই তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে খবর বেরিয়েছে। পরে আবার যে কোন শর্তে স্বামীর মুক্তি দাবি করেছেন তিনি।

খালেদা জিয়া একটি দলের প্রধান। যে দলটি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য চরম সংগ্রাম করছে। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার দুই ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনা, রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়া, তার মিত্র জামায়াতের কয়েকজন নেতার (যারা যুদ্ধাপরাধী বিবেচনায় বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছেন) বিনাশর্তে মুক্ত করে আনার এজেন্ডা নিয়ে খালেদা জিয়া মাঠে রয়েছেন। এ মুহূর্তে এসব ইস্যুতে জিতে যাওয়া বিএনপির জন্য মোটেই সহজ কাজ নয়। তাই চরম কোন সংকট তৈরি করা ছাড়া তারা ‘ওয়ে আউটের’ কোন পথ দেখছিলেন না।

অন্যদিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের নানা ধরনের অমনোযোগিতা ও গাফিলতি গোটা রাষ্ট্রে নাভিশ্বাস ছড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ সংকট, দলীয় ছত্রছায়ায় লুটপাট দেশে তীব্র অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। যা মোকাবিলায় সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দেশের একজন সিনিয়র রাজনীতিক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের অর্থ কেলেঙ্কারি, মন্ত্রীর পদত্যাগ, শ্রী সেনগুপ্তকে আবার দফতরবিহীন মন্ত্রী করা ইত্যাদি ঘটনা রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর মনোভাবের অভাব প্রজন্মকে হতাশ করেছে। অথচ এ প্রজন্মই সম্পূর্ণ আস্থা রেখে বর্তমান নবম জাতীয় সংসদকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছিল।

দেশের বর্ষীয়ান আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, সুরঞ্জিত ইস্যু থেকে জনগণের চোখ ফেরানোর জন্য ইলিয়াস আলী ইস্যু তৈরি করা হয়েছে। ইস্যু যেভাবেই তৈরি হোক না কেন, যেই তৈরি করুক না কেন ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হয়েছেন, সেটাই সত্য এবং তাকে খুঁজে বের করাই সরকারের দায়িত্ব। এভাবে ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা মেনে নেয়া যায় না।

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড-, সৌদি কূটনীতিক ফালাক হত্যাকাণ্ড, নরসিংদীর মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ড- সাম্প্রতিক সময়ের অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা। সরকার এসব ঘটনার সুষ্ঠু সুরাহা করতে পারেনি। কেন পারেনি, এর জবাব রাষ্ট্র প্রশাসন জনগণকে দিতে পারছে না।

অন্যদিকে হরতালের কারণে জনজীবন ক্রমেই বিষিয়ে উঠছে। হরতালকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন নিহত হয়েছেন। সিলেটের বিশ্বনাথে থানা ঘেরাও করতে চেয়েছে এলাকাবাসী। ইলিয়াস আলীর নিজ গ্রাম রামধানা এবং এর আশপাশের এলাকা থেকে মারমুখো জনতা বিশ্বনাথ থানা অভিমুখে মিছিল করেছে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রসহ। এ খবর পত্রপত্রিকায় ফলাও করে প্রচার পেয়েছে। বিশ্বনাথে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

রাষ্ট্রপক্ষ এবং জনগণের মাঝে এমন সংঘর্ষ চলতে পারে না। ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর বাসে আগুন লাগিয়ে যে ড্রাইভারকে পুড়িয়ে মারা হল, তা তো কোন সভ্য সমাজ মানতে পারে না। আরেকজন ড্রাইভার আক্রমণ থেকে বাঁচতে গিয়ে সড়কের পাশে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নিহত হয়েছেন। কী মর্মান্তিক সে দৃশ্য!

প্রকৃতপক্ষে দেশে দুটি লুটেরা পক্ষের মুখোমুখি সংঘর্ষ আপাতত শুরু হয়ে গেছে বলে ধরে নেয়া যায়। একটি পাখি যতই সুশোভিত হোক না কেন, তার সব পালক খসে পড়লে তার আর কোন সৌন্দর্য থাকে না। কোন মানুষ যতই সুদর্শন-সুদর্শনা হোক না কেন বিবস্ত্র হয়ে গেলে চক্ষুলজ্জায় অন্য মানুষ আর তার দিকে তাকাতে পারে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক চরিত্র তেমনি আজ বিবস্ত্র হয়ে পড়েছে। আর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাই রাষ্ট্রের জনগণের প্রধান পোশাক। সেই পোশাক যেন আজ ক্রমেই খসে পড়ছে। বাড়ছে মানুষের জিম্মি দশার দীর্ঘতর জীবন। এই জীবন পাওয়ার জন্য কি মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? সে প্রশ্নটি আজ বারবার আসছে।

এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশ অনেক কিছু হারাবে। বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ তালিকা থেকে দেশটির নাম খারিজ করে দেবে। প্রবাসী বাংলাদেশি প্রজন্ম মুখ ফিরিয়ে নেবে দেশটি থেকে। ক্রমেই কমে যাবে বিদেশি রেমিট্যান্স। আসছে গ্রীষ্মকালে, জুলাই-আগস্ট মাসে লাখ লাখ প্রবাসী দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ সময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে গিয়ে খরচ ইত্যাদি বাবদ প্রায় ২০০ কোটি টাকা বাংলাদেশেরই পাওয়ার কথা। চলমান গভীর অচলাবস্থা চলতে থাকলে প্রবাসী বাঙালিরা এ মৌসুমেই দেশ ভ্রমণ বাতিল করতে পারেন। পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন তো দূরের কথা, নিজ দেশে পরবাসী হয়ে যাচ্ছে এ অভিবাসী প্রজন্ম। এর দায় সরকার অনুভব করছে বলে মনে হচ্ছে না।

বাংলাদেশে এখন যা চলছে তা হচ্ছে লুটেরা শ্রেণীর পটপরিবর্তনের রক্তাক্ত মহড়া। ক্ষমতায় টিকে থেকে লুটপাট করা এবং ক্ষমতায় গিয়ে লুটপাট করা একই সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা কোন স্বাধীন রাষ্ট্রে এমনভাবে চলতে পারে না।

সম্প্রতি আরেকটি ঘটনা আলোচিত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য তানজিম আহমদ সোহেল তাজ এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়। এর ক’মাস পর তিনি এ পদ থেকে পদত্যাগ করে সরকারকে লিখিত চিঠি দেন। কিন্তু তার পদত্যাগপত্র উচ্চ মহলে গৃহীত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে দফতর বিহীন প্রতিমন্ত্রী করে রাখা হয়।

অতি সম্প্রতি তিনি তার ব্যাংকে জমা হওয়া মন্ত্রীর বেতন-ভাতা নিতে অস্বীকার করেন। তিনি জানতে চান তাকে কেন এ বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে? তার পদত্যাগপত্র কেন গ্রহণ করা হচ্ছে না সেই প্রশ্নও তোলেন সোহেলে তাজ। তারপরও প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং সোহেল তাজ দুজনেই দফতর বিহীন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। এরপর সোহেল তাজ তার নিজ এলাকার মানুষ, কাপাসিয়াবাসীর সম্মানার্থে এমপি পদ থেকেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানিয়ে স্পিকারকে চিঠি দেন।

কেন সোহেল তাজের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়নি, সে প্রশ্ন গোটা দেশবাসীর। রাষ্ট্রের মানুষ জানে এবং বোঝে প্রধানমন্ত্রী প্রধান নির্বাহীর ক্ষমতাবলে অনেক কিছুই করেন, করতে পারেন। কিন্তু এখন যে সোহেল তাজ এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করলেন, তা তো আরও বেশি বিব্রতকর বিষয় সরকার এবং দলের জন্য।

সোহেল তাজ রাষ্ট্রের জনগণ ও তার এলাকাবাসীর উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। এ চিঠিতে তিনি বলেছেন, সব কথা তিনি বলতে চান না। তবে যেহেতু এলাকার মানুষের জন্য কাজ করতে পারছেন না, তাই পদত্যাগ করেছেন।

এ পদত্যাগের ঘটনা প্রমাণ করেছে সরকারের অভ্যন্তরে একটি স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। প্রমাণ করেছে আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতাসীন সরকারের মাঝে চরম সমন্বয়হীনতার অভাব। যা প্রকারান্তরে দলের, দলের বাইরের লুটেরা শ্রেণীর জন্য নানা রকম অপকর্মের দরজা খুলে দিয়েছে, দিচ্ছে।

এমপি হোস্টেলে অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর গলিত লাশ পাওয়া গেছে। এমন রক্ষিত স্থানে খুন কীভাবে সংঘটিত হলো?

সাগর-রুনির মরদেহ আবার কবর থেকে তুলে পোস্টমর্টেম করার আইনি সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাদের লাশ তুলে আবার দাফন করা হয়েছে।

কথা হচ্ছে, তাদের ভিসেরা রিপোর্ট প্রথম পোস্টমর্টেম করা হয় হয়নি কেন? এটা কেমন রাষ্ট্রীয় গাফিলতি? নাকি কোন অদৃশ্য আঙ্গুল সবকিছু নির্দেশিত করছে?

এ লেখা যখন শেষ করছি তখন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ইলিয়াস আলীকে খুঁজে দেয়ার সময় বেঁধে দিয়েছেন। বলেছেন, এরপর আরও কঠিন কর্মসূচি দিতে তারা বাধ্য হবেন। ব্যবসায়ীরা সভা করে বলেছেন, তারা হরতাল চান না। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে হরতাল চান না সিংহভাগ মানুষই। তারপরও হরতাল চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, হচ্ছে। সভ্য সমাজ কোন ‘গুম’, নিখোঁজকে যেমন সমর্থন করে না, তেমনি গরিব মানুষের ওপর চড়াও হওয়াকেও মানতে পারে না। এদেশের মেহনতি মানুষ একদিন কাজ না করলে রাতে একবেলা ভাত খেতে পারে না। বুর্জোয়া, লুটেরা রাজনীতিকরা তা ভাবছেন কি? না ভাবছেন। যদি ভাবতেন তাহলে তাদের সন্তানরা বিদেশে লেখাপড়া করছে আর গরিবের সন্তানরা মিছিলে গুলি খেয়ে মরত না।