ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে গেলেন তিন ভিআইপি। জাপানের উপপ্রধানমন্ত্রী কাতসুয়া ওকাদা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অফ স্টেটস হিলারি ক্লিনটন এবং ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। তারা প্রায় একই সময়েই ঢাকা সফরে আসেন। ফলে ওই তিনদিন বাংলাদেশ ছিল মূলত কূটনীতির চারণ ভূমি। ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ। উপমহাদেশের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ তিনি ভালোই বোঝেন এবং জানেন। তিনি একটি চমৎকার কথা বলেছেন। যা আমার খুবই ভালো লেগেছে। তিনি বলেছেন, ভারতবর্ষ মূলত বাংলাদেশের জনগণের বন্ধু। বাংলাদেশের জনগণ যখন যে রাজনৈতিক দলকে ভোট দেয়, সেই দলই ক্ষমতায় আসে। ভারত সরকার তাই জনগণের ভোটে পাস করা সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে। কোন দল, ভারত সরকার কিংবা ভারতবর্ষের বিশেষ বন্ধু নয়। বাংলাদেশের মানুষই ভারত সরকারের প্রকৃত বন্ধু।

অত্যন্ত চমৎকার একটি কূটনৈতিক বক্তব্য। এ বক্তব্যের মাধ্যমে প্রণব মুখার্জি দুটি মেসেজ দিতে চেয়েছেন। আর তা হচ্ছে, ভারতবর্ষ বাংলাদেশে জনগণের ভোটের সরকার চায়। কোন সামরিকতন্ত্র কিংবা সামরিক সরকার চায় না। আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে, ভারত সরকার বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলকে বিশেষ কোন উদ্দেশে পৃষ্ঠপোষকতা করছে না কিংবা করবে না।
কোন গণতান্ত্রিক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের এমন মানসিকতাই থাকা উচিত। কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি যতই দরিদ্র কিংবা উন্নয়নশীল হোক না কেন, বড় প্রতিবেশী সহনশীল, সৃজনশীল আচরণ করবে সেটাই সবসময় কাম্য।

প্রণব মুখার্জি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন। বাংলাদেশে এটা একটা ধারাবাহিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে বিদেশের কোন ভিআইপি আসলে, প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে দেখা করতেই হয়। না হলে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ ঠিক থাকে না। বিশ্বের উন্নত কোন গণতান্ত্রিক দেশে অন্য কোন রাষ্ট্রের ভিআইপি সফরে গেলে সে দেশের বিরোধীদলীয় নেতা-নেত্রীর সঙ্গে দেখা করার বাধাধরা কোন নিয়ম নেই। দেখা করাটা জরুরিও নয়। কারণ যে কোন দেশের বিরোধীদল সরকারের সহযোগী শক্তি।

হিংসাত্মক মনোভাবাপন্ন প্রতিপক্ষ নয়। বিরোধীদল প্রকারান্তরে সরকারকেই দেশ চালানোর ম্যান্ডেট দেয়। কারণ সিংহভাগ মানুষ ভোট দিয়ে এ সরকারকে ক্ষমতায় পাঠায়। তাই অন্য কোন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি এসে সে দেশের বিরোধীদলের প্রধানের সঙ্গে দেখা না করলেও বিরোধীদলের কিছু যায় আসে না।

বাংলাদেশে তেমন মানসিকতা গড়ে উঠেনি। বাংলাদেশে বিদেশি কোন ভিআইপি এসে সরকারের সঙ্গে যদি দেখা করে যায় তাহলে বিরোধীদল মনে করে, কী জানি কী পরামর্শ দিয়ে গেল! আর যদি শুধু বিরোধীদলের সঙ্গে কেউ গিয়ে দেখা করে তাহলে সরকার মনে করে ওই দেশটি বুঝি সরকার পতনের পরামর্শ দিচ্ছে! তাই সমতা রক্ষার জন্য বিদেশি ভিআইপিকে দুই পক্ষের সঙ্গেই দেখা করার জন্য সময় বরাদ্দ করতে হয়।

এবার একই কাজ করেছেন হিলারি ক্লিনটনও। তিনি দুই পক্ষকেই খুব শক্ত করে বলেছেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। হিলারি ক্লিনটন ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত মি. ড্যান মজিনার বাসায় যে ব্রেকফাস্ট পার্টিতে যোগ দেন সেখানে উপস্থিত ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ফজলে হাসান আবেদ। বাংলাদেশের এই দুই কৃতী ব্যক্তিত্ব হিলারিকে জানিয়েছেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রয়োজনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প নেই।

একটি কথা আমরা জানি এবং মানি, বিদেশি কোন ভিআইপি বাংলাদেশের রাজনীতির ‘সমাধান বটিকা’ অতীতেও দিতে পারেননি, ভবিষ্যতেও পারবেন না। কমনওয়েলথের স্যার নিনিয়ানের কথা আমাদের মনে আছে। তিনি বাংলাদেশে গিয়ে শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়া দুই পক্ষকে সমঝোতায় আনার অনেক চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পারেননি। তাকে ব্যর্থ হতে হয়েছিল। আর এখন তো তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিই সংবিধান থেকে খারিজ করে দেয়া হয়েছে।

কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন কীভাবে সম্ভব? দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মাঝে সহনশীলতা গড়ে উঠেনি। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে নিজেদের নিজস্ব রাজত্ব কায়েম করেছে। উভয় পক্ষেই পর্যাপ্ত পরিমাণ দুষ্টগ্রহ রয়েছে। যেসব দুষ্টগ্রহ দেশ ও মানুষ নয়, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায়ই সর্বদা তৎপর। সর্বোপরি দুটি পক্ষই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তীব্র মারমুখো।

এমন পরিস্থিতিতে একটি রেফারি গ্রুপের অবশ্যই দরকার। যারা রাষ্ট্রের জনগণের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিদান ঘটিয়ে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করতে পারবেন। যারা কোন বিশেষ দলের মুখাপেক্ষী হবেন না। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে ‘ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতিতে’ নির্বাচন হয়। বাংলাদেশে সেই পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে উঠেনি বলেই ক্ষমতার লোভে হন্যে হয়ে রাষ্ট্রপ্রতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

বিদেশের দাতাগোষ্ঠী এবং মিত্রদেশগুলো বাংলাদেশে নির্দলীয় নিরপেক্ষ প্রশাসনের হাতে নির্বাচন চাইবে, তা খুবই জানা বিষয়। বর্তমান সরকারও তা জেনেশুনেই এগোচ্ছে। বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না, সেটাও পরিষ্কার। এ সংকট এড়াতে শেষ পর্যন্ত দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটির বর্তমান সরকার আরেকটি সংশোধনী আনবে কি না, তা দেখার বিষয়।
দেশের ব্যবসায়ী সমাজ হরতাল বন্ধে আইন প্রণয়নের দাবি তুলেছে। মহাজোট সরকার এ আইনটি পাস করবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। কারণ তারা যদি ক্ষমতা হারান, তবে তাদেরই এ হরতাল হাতিয়ারটি ব্যবহার করতে হতে পারে। ব্যবসায়ীরা দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সমানসংখ্যক প্রতিনিধিদের সমন্বয় সরকার গঠনের মাধ্যমে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশের ইগোনির্ভর রাজনৈতিক শক্তিগুলো তা মানবে কি না, সে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে বিদেশের প্রেসক্রিপশন বাড়ছে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসবে, এ প্রেসক্রিপশন আরও বাড়বে। মনে রাখা দরকার, হিলারি ক্লিনটন ঢাকা সফরের সময় গার্মেন্টস শ্রমিক আমিনুল ইসলাম হত্যা বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আমরা জানি মে দিবসের সূচনা এ আমেরিকার শিকাগো শহরেই হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ঘটা করে মে দিবস পালন করে না। এই সেই যুক্তরাষ্ট্র যেখানে এখনো সর্বনিম্ন প্রতিঘণ্টা বেতনে লাখ লাখ শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করছেন। আইএলও সনদে যুক্তরাষ্ট্র এখনো স্বাক্ষর করেনি।

মুখে অনেক কথাই বলা যায়। কথায় ও কাজে অমিল বিশ্বের অনেক পরাক্রমশালীদেরও আছে। প্রণব মুখার্জি বলে গেছেন, ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সব চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক ও বদ্ধপরিকর। তাদের এ আন্তরিকতার স্বরূপ কী? সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বাংলাদেশে ভারতের অনেকগুলো স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখানো হলেও ভারতে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো দেখানো হয় না কেন? এর জবাবে প্রণব মুখার্জি ‘ক্যাবল অপারেটর’দের দায়ী করেন। এটা কেমন কথা? দুই রাষ্ট্রের সমঝোতার মাধ্যমে এমন অনেক বিষয়েই ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

বিদেশি ব্যবস্থাপত্রনির্ভর বাংলাদেশের রাজনীতির গন্তব্য কোথায়? এ প্রশ্ন অনেকের। দুই পক্ষের সমঝোতা মুক্তি দিতে পারে এ মাটি ও মানুষকে। কাজটিতে যত দেরি হবে, ততই বাড়বে দুর্ভোগ।