ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

চার দশক আগে জেগে ওঠে সার্বভৌম-স্বাধীন বাংলাদেশ। তখনকার সাধারণ চিত্র ছিল- এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন,পর্যুদস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শূন্য খাদ্যভাণ্ডার, মুদ্রা তহবিল, ভেঙে পড়া প্রশাসন, হাজার হাজার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং তিন লাখ বীরাঙ্গনার পুনর্বাসন, বৈরী আন্তর্জাতিক পরিবেশ, বিধ্বস্ত কল-কারখানামাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কার্যত প্রাকৃতিক সম্পদহীনতা, দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা বুভুক্ষ ৭০ শতাংশ জনগণ, অত্যন্ত নগণ্য বেসরকারি খাত, চাহিদা ৩০ ভাগ খাদ্য আমদানির ভয়াবহ নির্ভরশীলতা, আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের দাম কমে যাওয়া।

এই সবুজ গ্রহে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যে কয়টি রাষ্ট্র স্বাধীনতা পেয়েছে-তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। রাষ্ট্রটি কেবল আত্মত্যাগের উদাহরণ নয়; ঐতিহাসিকভাবে নিপীড়িত ও দখলকৃত জাতিগোষ্ঠীর জীবনীশক্তি ও বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দৃঢ় উচ্চারণ ঘোষণা করে। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির চার দশকের মধ্যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উল্লম্ফন (vertical raising) বিশ্বখ্যাত অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিপণন বিশেষজ্ঞের নজর কেড়েছে। আর এ কারণেই বিপণন গুরু ফিলিপস কটলার উন্নয়নের প্রধান কেস স্টাডি হিসেবে বিশ্বে উপস্থাপন করছেন বাংলাদেশকে। ক্ষুধা, দারিদ্রপীড়িত, বিদেশী সাহায্য প্রত্যাশী এ বদ্বীপ এখন আর কেবল ভারতের পাশের দারিদ্যপীড়িত ভূমি নয়; বিশ্বমন্দার মধ্যেও সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা এক স্বাধীন জাতিগোষ্ঠী।

বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত যে বাংলাদেশ পেয়েছিলেন তা থেকে কোন রাষ্ট্রনায়কের পক্ষেই গতিশীল অর্থনীতি আনয়ণ করা সম্ভব ছিল না। তবু একটি অবাক করা পরিসংখ্যান পাওয়া যায়।

আশ্চর্য হলেও সত্যি যে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ১৯৭৪ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৯.৫৯ এযাবৎ কালের মধ্যে সবচেয়ে বেশী। যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুরু হয়েছিল মাইনাস ১৩.৯৭ থেকে । ১৯৭৩ এ দাড়িয়েছিল ৩.৩৩ । বৃদ্ধির পরিমান ১৭.৩ । ১৯৭৪ এ প্রবৃদ্ধি ৯.৫৯ যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ । মাইনাস ১৩ দশমিক ৯৭ থেকে এই উত্তরন অকল্পনীয় । ১৯৭৫ এর শেষ সময়ে এসে তা দাঁড়ায় মাইনাস ৪.০৯ । স্বাধীনতার পর শুরুই হয়েছিল মাইনাস দিয়ে। সেক্ষেত্রে ১৯৭২ এর চেয়ে ১৯৭৫ এর অগ্রগতি ৯.৮৮।

১৯৭৬- ১৯৮১ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ১৯৭৬ সালে ৫.৬৬, ১৯৭৭ সালে ২.৬৭,১৯৭৮ সালে ৭.০৭, ১৯৭৯ সালে ৪.৮, ১৯৮০ সালে ০.৮২ এবং ১৯৮১ সালে ৭.২৩।

১৯৭৬-১৯৮১ এই সময়ের ভিতরে ছিল বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল বি.এন.পি-এর প্রতিষ্ঠাতা, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে উচ্চপদস্থ কোন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণাকারী, মুক্তিযুদ্ধের জেড-ফোর্সের প্রধান জিয়াউর রহমানের শাসনামল। এসময়ে দেশের উন্নয়নমূখী অর্থনীতির ভিত তৈরি হয়। এই সময়ের প্রবৃদ্ধিসূচকে লক্ষ্যনীয় দিক হলো দুই বার প্রবৃদ্ধি ৭ এর উপরে ওঠা।

১৯৮২ – ১৯৯০ সালে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৯৪।
এই সময়টা জেনারেল এরশাদের শাসনামল।
( তথ্যসূত্র: http://www.theglobaleconomy.com/compare-countries/# )

লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে এই সময়গুলিতে প্রবৃদ্ধি হারের সূচকের ওঠানামা। কোন কোন বছর প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেলেও অর্থনীতিতে এমন কোন ধরনের স্থিতিশীলতা খুঁজে পাওয়া যায় না, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন এর লেখা `চুয়াল্লিশ বছরে বাংলাদেশ’ প্রবন্ধ থেকে নেয়া নিচের উদ্ধৃতিটি লক্ষ্যনীয়।

‘বাংলাদেশের অর্থনীতির যে নীরব বিপ্লব হয়েছে এবং হচ্ছে তা মূলত শুরু হয় ১৯৯০-এর পর দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অদক্ষতা আর সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত রাজনীতিবিদরা গত দুই দশকে হয়তো আমাদের কল্পিত স্বর্গ উপহার দিতে পারেননি; তবে তা নিশ্চিতভাবে সেনাশাসিত সেই জলপাই রঙের অন্ধকার আর নরক থেকে মঙ্গলজনক ছিল। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না হলেও গণতন্ত্রের কল্যাণে বিকশিত হয়েছে বেসরকারি খাত। সাড়ে তিন কোটি টন শস্য ফলাচ্ছেন কৃষক। ব্যক্তি উদ্যোগে বিদেশ গিয়েছেন প্রায় ৮০ লাখ বাঙালি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেড়েছে তিন লাখ ৭৩ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা। সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে রফতানি আয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগও (এফডিআই) বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। সারা বিশ্বে এফডিআইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছয় ধাপ এগিয়েছে। পাকিস্তান, শ্রীলংকাকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ বৈদেশিকি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন দ. এশিয়ায় দ্বিতীয়। এসবই স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাংলাদেশকে।’

একথা আজ দৃশ্যমান যে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল ১৯৯০-এর পর দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ১৯৯০ এর পরবর্তী সময়গুলিতে পরিচালিত নানা অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, প্রবৃদ্ধি হার, আর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিগুলি বিশ্লেষণ করলে তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

পরবর্তী পোষ্টে আমরা বুঝার চেষ্টা করব `বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বিপ্লব… সূচনা, বিকাশ ও সম্ভাবনা-এর বিকাশ পর্ব।