ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সত্যিতো এই যে, ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন এর লেখা `চুয়াল্লিশ বছরে বাংলাদেশ’ প্রবন্ধ থেকে নেয়া নিচের উদ্ধৃতিটি ।

‘বাংলাদেশের অর্থনীতির যে নীরব বিপ্লব হয়েছে এবং হচ্ছে তা মূলত শুরু হয় ১৯৯০-এর পর দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অদক্ষতা আর সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত রাজনীতিবিদরা গত দুই দশকে হয়তো আমাদের কল্পিত স্বর্গ উপহার দিতে পারেননি; তবে তা নিশ্চিতভাবে সেনাশাসিত সেই জলপাই রঙের অন্ধকার আর নরক থেকে মঙ্গলজনক ছিল। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না হলেও গণতন্ত্রের কল্যাণে বিকশিত হয়েছে বেসরকারি খাত। সাড়ে তিন কোটি টন শস্য ফলাচ্ছেন কৃষক। ব্যক্তি উদ্যোগে বিদেশ গিয়েছেন প্রায় ৮০ লাখ বাঙালি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেড়েছে তিন লাখ ৭৩ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা। সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে রফতানি আয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগও (এফডিআই) বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। সারা বিশ্বে এফডিআইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছয় ধাপ এগিয়েছে। পাকিস্তান, শ্রীলংকাকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন দ. এশিয়ায় দ্বিতীয়। এসবই স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাংলাদেশকে।’

এই যে স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাংলাদেশকে তাকে বাস্তবে রূপায়িত করতে হলে পাঁচটি ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে।

প্রথমটি হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা
দ্বিতীয়টি সর্বময় দুর্নীতি
তৃতীয়টি সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাব
চতুর্থ হচ্ছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতসহ অবকাঠামোগত ঘাটতি,
পঞ্চম হচ্ছে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়।
এসব চ্যালেঞ্জ আমাদের সবার সামনে পরিষ্কার।

সর্বপ্রথমেই রাজনৈতিক অস্থিরতা। বিশেষ করে সারাবিশ্বের এক নতুন অস্থিরতার নাম জঙ্গিবাদ যার প্রভাব আমাদের দেশেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।

এই অস্থিরতা মোকাবিলায় গত দুই দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে সাদৃশ্যগুলি চিহ্নিত করে তাদের উভয়ের একটি যৌথ ঘোষণায় বাধ্য করানো এখন সময়ের দাবী। জনগনই রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ বা তারো বেশি জনগনই এই দুই দলের সমর্থক, কর্মী। বিরোধগুলো তার জায়গায় রাখলেও এই সব সাদৃশ্যগুলি সুস্পষ্ট।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সাদৃশ্য সমুহ:
ক. উভয় দলই মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে গর্ববোধ করে।
খ. উভয় দলই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করতে চায়।
গ. উভয় দলই কযেক টার্মে ক্ষমতাগ্রহন এবং বিরোধীদলের ভুমিকা অবতীর্ণ হয়েছে।
ঘ. উভয় দলই বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ আন্দোলন করেছে এবং করছে।
ঙ. উভয় দলই সরকারী দলে থাকা অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছে এবং করছে।
চ. উভয় দলের কেহই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করছে না।
ছ. উভয় দলই পরাজিত শক্তির সাথে নির্বাচনী জোট করছে।
বিএনপি ৭১ এর পরাজিত শক্তির সাথে, আওয়ামীলীগ ৯০ এর এরং ৭২-৭৫ এর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ/ পরাজিত জোটের সাথে ।

এই সব সাদৃশ্যগুলির আলোকে স্বপ্নে দেখা আওয়ামীলীগ ও বিএনপির ঐতিহাসিক ঘোষণা:

ক. আমরা উভয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সর্বোচ্চ মর্যদা দিব, মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকার কথা জনগনের কাছে তুলে ধরব।
খ. আমরা উভয়ে একমাত্র নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহন এবং ক্ষমতাত্যাগ করব।
গ. নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করব, পরাজিত হলে বিজয়ীদলকে অভিনন্দন জানাব এবং সংসদকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিব। বিরোধী দলে থাকলে সংসদ বর্জন করা থেকে বিরত থাকব, রাজপথের আন্দোলনের দিকে ধাবিত হব না।
ঘ. সংবিধানের ভিতরে থেকে নিরপেক্ষ নির্বচানের জন্য যে কোন পদক্ষেপকে স্বগত জানাব।
ঙ. কোন অবস্থায়ই নির্বাচন প্রভাবিত হয় এমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করব না।
চ. কোন বিচার বিশষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেরর ব্যাপারে বিচার ব্যবস্থার উপর কোনরূপ হস্তক্ষেপ করব না।
ছ. পরাজিত শক্তিকে কখনও ক্ষমতার ভাগ বসাতে দিব না।

আমাদের স্বপ্ন আছে। আমরা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। আমরা স্বপ্ন দেখি রাজনৈতিক সহাবস্থানের। আমরা স্বপ্ন দেখি জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশের। গত দুই দশকের ইতিহাস সাক্ষী, যখন বাংলাদেশের প্রধান এই দুই, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে কোন আন্দোলনের ডাক দেয় বা কর্মসূচি হাতে নেয়, তা ব্যর্থ হয় নাই।