ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

থার্ড আই.. প্রসঙ্গ ক্ষমতা বদলের প্রকৃতিক সূত্র

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের কয়েক বছরের মধ্যে রাজনৈতিক খুন, বিচার বহির্ভূত হত্যা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরন, রাজনৈতিক অধিকার হরনের সাথে প্রকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশের রাজনীতিতে তেমন কোন উৎকর্ষতা দেখা যায়নি বরং `জাতির জনক’, `বঙ্গবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যার মধ্যে দিয়ে চরম বিপর্যয় দেখা দেয় রাজনৈতিক অঙ্গনে। এসময়ে ক্ষমতায়নে সেনাবাহিনীর অনুপ্রেবশ ঘটে। ক্যু, পাল্টা ক্যু, বামপন্থী চিন্তাধারায় অনুপ্রানিত সামরিক নেতৃত্ব ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালায়। নানাবিধ সামরিক ঘটনা প্রবাহের মধ্যে দিয়ে সামরিক বাহিনী থেকে আসা `স্বাধীনতার ঘোষক’ খ্যাত মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের উত্থান ঘটে রাজনীতিতে। সামরিক বাহিনীতে প্রায় ভেঙ্গে যাওয়া `চেইন অব কমান্ড’ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। এই সময়ে সামরিক বাহিনীতে ঘটে যায় অনেকগুলি ‘প্রহসনের বিচার এবং ফাঁসি’ যাকে হত্যা হিসাবেই ইতিহাস স্মরন রেখেছে। রাজনীতিতে স্বৈরতন্ত্রকে গনতন্ত্রের পোষাক পড়ানোর চেষ্টা চালানো হয়। নির্বাচনগুলোর ফলাফল হয় সমরিক বাহিনীর ইচ্ছাধীন, দৃশ্যত স্থিতিশীলতা বিরাজ করলেও সামরিক বাহিনীর ভিতরকার অস্থিরতায় বারবার আক্রান্ত করে এই সময়ের রাজনীতি এবং সামরিক বাহিনীর এক ক্যু-তে নিহত হন বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ মুজিবুর রহমানের পর সব চেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব জিয়াউর রহমান।

স্পষ্টত সেনাবাহিনীই নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি এবং ক্ষমতার পালাবদল। দুইটি বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাদের মধ্যে একজন স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে এবং বিজয়ীর বেশে এসে ফিরে এসে মহামানবের ভাবমূর্তি নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে থাকেন এবং সকল বিরোধী মতামতকে অগ্রাহ্য করতে থাকেন। এ সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয় নানা ধরনের হত্যা,গুম ইত্যাদি এবং নিজেই সপরিবারে নিহত হন সামরিক বাহিনীর হাতে। আর একজন, যার উত্থান সামরিক বাহিনীর নানা ক্যু আর পাল্টা ক্যুর মধ্য থেকে এবং নিহত হন সামরিক বাহিনীর হাতে। জিয়াউর রহমান নিহত হবার পরও সামরিক বাহিনীর উপর তার প্রতিষ্ঠিত দলের নিয়ন্ত্রন থাকে, স্বৈরতন্ত্রকে গণতন্ত্রের পোষাক পরানোর ধারা অব্যহাত থাকে। নির্বাচনের নামে নিজেদের স্বার্থসংরক্ষণকারী লোকদেরকে ক্ষমতায় বসানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। এই সময়ে ইসলাম পন্থী দলগুলোর মধ্যে জামায়তী ইসলামির উত্থান শুরু হয় এবং অন্য যে কোন রাজনৈতিক দলের চাইতে নিজেদের সংগঠিত, আর নিয়মতান্ত্রিকতায় নিয়ে আসার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। এই সময়ের মধ্যে মুল ধারার রাজনীতিতে জামায়তী ইসলামির কোন প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি।

রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর পদচারনা অব্যাহত থাকে। দৃশ্যত ব্যাপক জনপ্রিয় আর গনতান্ত্রিক এক সরকারকে উৎখাতের মধ্যে দিয়ে এইচ.এম.এরশাদ ক্ষমতা আরোহন করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই সময়টাতে দেখা যায় আবারও স্বৈরতন্ত্রকে গনতন্ত্রের পোষাক পরানোর প্রচেষ্টা। এক্ষেত্রে তার পূর্বসূরী জিয়াউর রহমানের দেখানো পদ্ধতি অনুসরন করতে দেখা যায়। তিনিও নির্বাচনগুলির ফলাফল নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। এরশাদ সরকারের কারচুপির নির্বাচনে যে প্রতিক্রিয়া মানুষের মনে দেখা দিয়েছিল তার একটি গ্রহনযোগ্য মীমাংসা হিসাবে এসেছিল তত্ত্ববধায়ক সরকারের ধারনা। নির্বাচনের এই প্রক্রিয়া জনমনে ব্যাপক জনসমর্থন পায়। নির্বাচন প্রক্রিয়ার এই পদ্ধতির জন্য ব্যাপক আন্দোলন চলতে থাকে। এই সময় নির্বাচনের এই পদ্ধতির জন্য যে আন্দোলন হয় তাতে মুল নেতৃত্বে বি.এন.পি, আওয়ামীলীগ থাকলেও , জামাতে ইসলামীও ব্যাপক ভূমিকা রাখে। আন্দালনের নানা পর্যায় অতিক্রম করে তা চরম আকার ধারন করলে জামাতে ইসলামীকে বাইরে রেখে তিন দলীয় ঐক্যজোট তৈরি করা হয়। খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে তিন দলীয় ঐক্যজোটের ফর্মুলা অনুসারে এইচ.এম.এরশাদ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম একটি সুষ্ঠ মীমাংসার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চালু হয়।এরশাদ সরকারের আগে বাংলাদেশের ক্ষমতা বদলের হাতিয়ার ছিল হত্যা এমনকি ক্ষমতায় টিকে থাকারও হাতিয়ারও ছিল হত্যা ও খুন। সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ ছাড়া ক্ষমতার পালাবদল যা ব্যাপকভাবে জনমনে সুস্থির অবস্থা এনে দিয়েছিল। তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনগুলো যদিও পরাজিত প্রার্থীদের মনে শান্তি এনে দিতে পারে নি তথাপিও অধিকাংশ জনগন তাকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলেই ধরে নেয় এবং সন্তুষ্ট থাকে।

অর্থাৎ নির্বাচন হয়ে উঠেছিল ক্ষমতা বদলের হাতিয়ার।

আলোচ্য আলোচনায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই কিন্তু একথা বলতেই হয় যে, বাংলাদেশে গনতন্ত্রের যা কিছু চর্চা হয়েছিল তার মধ্যে তত্ত্বাবধায় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা একমাত্র পাওনা। যদিও নির্বচানের এই পদ্ধতিটি ক্ষমতাশীন সরকারকে অবিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে জন্ম, আমাদের দেশের বাস্তবতা এই যে, এখানে যেই ক্ষমতায় যায় সেই ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী ভাবতে শুরু করে এবং নানা ধরনের কারচুপির আশ্রয় নেয়। এই কারচুপিগুলি সব সময় একেবারে সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে হয় নাই, বরং জনগনের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে , নির্বাচনের ফলাফলটি ত্রুটিপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার ফলাফলকে পরাজিত প্রার্থী বা দল মেনে নিতে না পারলেও নির্বাচনগুলো জনগনের কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়।

কিন্তু পরাজিত প্রার্থী তাদের পরাজয় মেনে নিতে পারেন না বা এ ধরনের উন্নত মানসিকতা এখানকার রাজনীতিবিদদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় না। এমনকি তারা নানা রকম আইনের নানা ফাক ফোকর খুজে। প্রথমত তারা প্রধান উপদেষ্টা পদকে বিতর্কিত করে, জৈষ্ঠতা লংঘন করে এবং ক্ষমতা থাকা অবস্থায় এই পদ্ধতিকে অস্বীকার করতে থাকে। অত্যন্ত দুঃখজনক ভাবে গনতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত হয়ে তারা স্বৈরতন্ত্রের মত আচরণ করতে থাকে। গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যা, দলীয়করণ, দলীয় বিবেচনায় সরকারী কর্মচারী নিয়োগ, হরতাল-ভাঙচুর-জ্বালাও-পোড়াও প্রভৃতি ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো গত দুই দশকে ক্রমাগত উর্ধ্বমুখী হয়েছে।

চলবে… আগামী পর্বে সমাপ্ত….