ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

গত শতাব্দীর শেষ দিকের কথা। এরশাদের রাজত্বজকাল। এ সময় তুমুল জনপ্রিয় দৈনিক “আজকের কাগজ”-এর প্রথম পাতার শুরুর কলামে একস্লিপ নামাঙ্কিত হয়ে অনেকগুলি মজাদার চুটকি টাইপ-এর নিউজ প্রতিদিন ছাপা হত। একদিন একটি শিরোনাম আমাদের মনোযোগ কাড়ল। শিরোনামটি ছিল–“একতারিখে কদমবুসি দুইতারিখে হুইপ।” খবরটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার কারণ হল, ওই কদমবুসি করা ব্যক্তিটি ছিলেন আমাদের সম্পাদক।

আমাদের কাছে গবেষণার বিষয় ছিল ৭ ফুটি মানুষটি কী করে বক্র হয়ে পদধূলি নিলেন পিঠের অস্থি অক্ষত রেখেই। যাই হোক, তখন কায়দা করে কদমবুসি করে রাজানুগ্র্হ লাভের মচ্ছব যাচ্ছিল। একতারিখে ধানমন্ডির জাপা অফিসে সবার সামনে প্রেসিডেন্টকে সেলাম করার এনাম তিনি নগদানগদি পেয়েছিলেন, হুইপ হয়ে। এর আগে তিনি আরেকবার জায়গামত সেলাম করেছিলেন, যার এনাম স্বরূপ পেয়েছিলেন খুলনার এক উপনির্বাচনে নমিনেশন। মূল নির্বাচনই ছিল ভোটারবিহীন তাই এ নির্বাচন ছিল আরও বেশি অস্বচ্ছ।

প্রথম কদমবুসি তিনি করেছিলেন আমাদের সামনেই, পত্রিকা অফিসে। প্রেসিডেন্ট পত্রিকা অফিস পরিদর্শনে আসছেন। আমরা উত্তেজনায় থরোথরো। অবশেষে তিনি এলেন, তার পদধূলি নিয়ে স্বাগত জানালেন সম্পাদক। সন্তুষ্ট প্রেসিডেন্ট অফিস তাগের আগেই এনামের কথা জানিয়েছিলেন।

জাতীয় পার্টির মুখপত্ররূপে পত্রিকাটি ডিএফপি-র প্রচুর বিজ্ঞাপন পেলেও সাংবাদিক-কর্মচারিদের বেতন মেলে না। তখনও পত্রিকা কম্পিউটারায়ন হয় নি। পুরু কাচের চশমা পরা প্রবীণ কম্পোজিটর, প্রেসম্যান, গ্রাইন্ডারদের প্র্কাশ্য আহাজারি আর সাংবাদিকদের ভদ্রতার অন্তরালে অসহনীয় নিঃশব্দ আর্তনাদ কারো কানে যায় না। বিজ্ঞাপনের টাকা কোথায় যায় সেটা ভাবতে গিয়ে আমরা ঘেমে জবজবে। এমন সময় এরশাদ সাহেবের আগমন আমাদের মরা মনে আশার বান ডাকালো।

প্রেসিডেন্ট অফিস ঘুরে সম্পাদকের রুমে সবার সাথে বৈঠকে বসলেন। আমি তার মুখোমুখি বসেছিলাম। সম্ভবত আমার পাশে বসেছিল আমার বন্ধু, প্র্থম আলো হয়ে এখন ব্যাকে গিয়ে থিতু, কথাশিল্পী জিয়া হাশান। আমরা ইউনিভার্সিটিতে সবে ঢুকেছি। ক্ষুদ্রাকৃতির সাথে দুজনের চেহারাতেই কিশোর কিশোর ভাব। প্রেসিডেন্ট-র কবিমনটা আমাদের দেখে গলল। তিনি বললেন, এই বাচ্চা ছেলেরা এখানে কাজ করে। এদের জন্য ত আমার কিছু করা উচিত। এই বলে তিনি নগদ দানের কথা ঘোষণা করলেন। টাকার অঙ্কটা ছোট নয়। আমরা খুশিতে ডুবু ডুবু। কিন্তু সেই টাকার গন্ধও আমরা পেলাম না।

দলীয় তকমার এই পত্রিকার ঊদ্যোক্তা ছিলেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। এখানে দুদিন পর পর নতুন মালিক আসতেন। তাদের সংবাদপত্রের মালিক সাজার ঘোর কাটতে না কাটতে পকেট কাটা শেষ হয়ে যেত। এই প্রক্রিয়ায় আমরা একজন ঈর্ষণীয় মালিক পেয়েছিলাম। তার নাম জিনাত মোশাররফ। তার আগমনে সবার মনে প্রেসিডেন্ট-এর প্রতি হিংসার ভাব জাগা ছাড়া আর কোন লাভ হয় নি। আমাদের বেতন-ভাতা নিয়ে হাহাকার যায়নি।

সরকারি বিজ্ঞাপন আর আনুকূল্য গ্রাস করার নির্লজ্জ প্রয়াস আমরা দেখেছি কিছু না পাওয়ার কষ্ট নিয়ে। এক্ষেত্রে সংবাদপত্র হয়েছে হাতিয়ার।

আমি মফস্বল ডেস্ক চালাই। নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি আমাকে কয়েকদিন বলেন, তার কাছে একটা ব্যাংক নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য আছে। তিনি নিজে ওই ব্যাংকের এক জেলা শাখার প্রধান ছিলেন। ব্যাংকটি দেউলিয়া হবে এবং তিনি জনরোষে পড়বেন এই ভয়ে চাকুরি ছেড়ে চলে এসেছেন। রিপোর্টটা ছাপালে গণ-মানুষের উপকার হবে। বর্তমান বাংলাদেশ কমার্স লিঃ (বিসিএল) হল সেই ব্যাংক। এর কর্ণধার তখন দ্বীপবন্ধু নামে খ্যাত আঃ লীগের একজন নেতা। তিনি জনগণের আমানতের টাকা তসরুপের চূড়ান্ত করেছেন। দলিলাদি দেখে আমি নিজে ধারাবাহিক একটা রিপোর্ট-এর প্রথম কিস্তি লিখে নিউজ এডিটরকে দিলাম। তিনি বেশ উৎসাহ সহকারে লুফে নিলেন। তখনকার বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বর্তমানে বাংলাদেশ ডেভেলাপম্যান্ট ব্যাংক-বিডিবিএল) ভবনের ঠিক সামনের তরঙ্গ কমপ্লেক্স-এর (ওটি ছিল কমার্স ব্যাংকের হেড অফিস) ছবিসহ বড় আকারে নিউজটা ছাপা হল। দিনের বেলা দেখি নতুন নতুন লোকের আনাগোনা। রাতে দ্বিতীয় কিস্তির রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময় দেখলাম নিউজ এডিটর-এর মনটা খারাপ। সকালে এর মানে বুঝতে পারলাম। কোথায় রিপোর্ট? অর্ধ পৃষ্ঠা জুড়ে দ্বীপবন্ধুর ব্যাকের বিজ্ঞাপন। দুঃখ-লজ্জায় মাটির সাথে মিশে গেলাম। শুনেছি, বিরাট অংকের টাকা লেনদেন হয়েছিল বিজ্ঞাপনের আড়ালে।

এর কিছুদিন পরই ব্যাংকটি ভেঙে পড়ে। হাজার হাজার আমানতকারী পথে বসে। দেউলিয়া ব্যাংকটি পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে পাসকৃত আইনের আওতায় নতুন নাম ও ব্যবস্থাপনায় (১৯৯৮ সালে) পুনরায় চালু হয়। জনস্বার্থ উপেক্ষা করে সংবাদপত্রকে আত্মস্বার্থে ব্যবহারের এ হীন জোচ্চুরি এখন যে বন্ধ হয়েছে তা বলা যাবে না।

পুনশ্চঃ ওই সম্পাদক ও নেতা দুজনই প্রয়াত। তাই তাদের নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম।