ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

সম্প্রতি পল্লীকবি জসীমউদদীনের অমর চরিত্র আসমানী মারা গেছেন। তাঁকে নিয়ে মিডিয়ায় প্রচারণাও যথেষ্ট হয়েছে। সরকারপ্রধান পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি শায়িত রয়েছেন কবির জন্মভূমি ফরিদপুরের রসুলপুর গ্রামে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে লেখা কবির “এক পয়সার বাঁশী” কাব্যগ্রন্থে সঙ্কলিত “আসমানী” কবিতার সুবাদে রসুলপুর গ্রামটিও বাংলার মানুষের কাছে পরিচিতি পায়।

কবিতার আসমানীকে আমরা বাস্তবে দেখেছি। মিডিয়ার কল্যাণে কবিতার চরিত্রকে আমরা দেখেছি রক্ত-মাংসের মানুষরূপে। কবি আসমানীকে দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হিশেবে যে করুণা ও সহানুভূতি ঢেলে দিয়ে রূপায়িত করেছেন সেই করুণা আমাদের কাছ থেকেও তিনি পেয়েছেন। কারণ আসমানীর ভাগ্য পরিবর্তিত কখনই হয় নি। নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যেই কেটেছে তাঁর জীবন। মিডিয়া আমাদের সামনে এই সত্যিকারের আসমানীকে তুলে এনে কবিচেতনা ও কাব্যধর্মের সর্বনাশটা করেছে। দেখা আসমানীই যে আসল আসমানী নয়, দেখা না-দেখার আড়ালে যে আসমানী আছে, তার ব্যাপ্তি যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তা কেউ ভাবে নি। এখানে অবশ্য মিডিয়ার দোষ নেই। কারণ যা কিছু প্রামাণ্য ও দৃশ্যমান রিপোর্টারের ক্ষমতা নেই তার বাইরে যাওয়ার। ফলে আমাদের মনোযোগে-সংবেদনে একজন আসমানীই আসন করে নিয়েছে। কবির দেখাকে রিপোর্টারের চোখে দেখার চেষ্টা রীতিমত ভয়ঙ্কর।

কবি যে সময়কালে কবিতাটি লিখেছেন তখন আসমানীদের অভাব ছিল না। তার চেয়ে আরও দুঃখপীড়িত কন্যাশিশুও কবির নাগালের মধ্যে না থাকার কথা নয়। এই আসমানীর সাথে কবির বিশেষ কোন সম্পর্ক বা আকৃষ্ট হবার বিশেষ কারণ ছিল বলে জানা যায় না। আসল কথা কবি আসমানীকে ব্যক্তিবিশেষরূপে দেখেন নি, তাকে দেখেছেন শ্রেণিপ্রতিনিধি হিশেবে। আসমানী তাই একজন হয়েও অনেক। আমরা একজন আসমানীকে দেখে এবং দেখিয়ে তাই কবির ভাবোদ্দেশ্যেক সঙ্কুচিত ও বিকৃত করারই প্রয়াস পাচ্ছি।

কবির কথা আর দেখা সাধারণের সাথে মিলিয়ে দেখা অবান্তর। কারণ কবির রয়েছে চর্মচক্ষুর ঊর্ধ্বে এক অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি। তাঁর অনুভূতি সর্বমানবে পরিব্যাপ্ত। তাই কবির অনুভূতি বা আবেগ পাঠক মাত্রেই তার নিজের মনে করে। কবির কথা সবারই মনের কথা। কবি একক হয়েও সর্বজনীন। কবি-সাহিত্যিকদের সৃষ্ট চরিত্রগুলিও একক হয়েও কখনো সর্বজনীন, কখনো শ্রেণী প্রতিনিধি। সৃষ্ট চরিত্র বাস্তবে থাকলেও কখনো তা কাকতালীয়, কখনো প্রতীকী, আবার কখনো উদ্দীপক মাত্র। বাস্তবের চরিত্রকে দৃষ্টিসীমায় খোঁজা শিল্পসত্যের পরিপন্থী।

নজরুলের কবিতার ‘আমি’ কি কেবল নজরুলের একক ব্যক্তিসত্তায় সীমাবদ্ধ? আমিত্বের এই আস্ফালন কি তারুণ্য ও যৌবচেতনার সামগ্রিক প্রকাশ নয়? সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘নদীর স্বপ্ন’ কিবতার কানাই আর ছোকানু শুধুই ভাই-বোন? তারা তো কল্পনাপিয়াসী সকল কিশোর-কিশোরীর প্রতীক মাত্র। রবীন্দ্রনাথের ‘হৈমন্তী’ চরিত্রটির উপস্থিতি কবি-পরিবারেই ছিল বলে জানা যায়, ‘হৈমন্তী’ তো নিপীড়িত বাঙালি বধূজীবনকেই ধারণ করে আছে। কেউ যদি কবি জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেনকে খুঁজতে যান তাহলে হয়ত পণ্ডশ্রমই কেবল হবে। অনেকের ধারণা নাটোরবাসিনী কোন নারীর অস্তিত্ব হয়ত সত্যি আছে, যাকে কবি ভালোবেসেছেন। কবির জীবনী থেকে জানা যায়, কবি ভালোবেসেছিলেন চাচাত বোন শোভনাকে, যার সাথে তাঁর অবস্থানগত দূরত্ব ছিল না, কিন্তু তিনি তাকে পান নি। ধরে নিলাম নাটোরে বনলতা সেনকে পাওয়াই গেল, তাতে কি ‘বনলতা সেন’ কবিতার আবেদন বাড়বে? বরং কবিতাটির ভাববস্তু সংকীর্ণ হয়ে পড়বে। তখন কবিতার প্রেম-অভিব্যক্তি দুটি মানব-মানবীর কামনায় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়বে। অথচ কবি বনলতা সেনকে আশ্রয় করে মানব-মানবীর চিরন্তন প্রেমচেতনাকেই সর্বব্যাপ্ত করেছেন। সময় ও ভৌগোলিক সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া নর-নারীর সর্বজনীন মিলনসুখ সুনির্দিষ্ট নর-নারীর মাঝে খুঁজলে তার মাহাত্ম্য বাড়ে না।

এভাবেই আসমানীর বাস্তব উপস্থিতি কবির সর্বজনীন অভিব্যক্তিকে ক্ষুণ্ণ করেছে। আসমানী এখানে পল্লির দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষ, বিশেষত মেয়েশিশুদের প্রতীক। আর রাহিমুদ্দিরা হচ্ছে প্রান্তিক কৃষক কিংবা কৃষিশ্রমিক মাত্র। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে, কবিতাটি লেখার কালে এদেশে সামন্ত শাসনের পাষাণ চাপায় প্রান্তিক মানুষদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। ভূস্বামীদের বিপরীতে ভূমিদাসের সংখ্যা ছিল অগণন। এদেরি একজন রহিমুদ্দিন। আর তার বাড়ির-ই সদস্য আসমানী। কবি আসমানীর ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতির কোনোকিছুই বলেন নি। তিনি বলেছেন–” আসমানীদের দেখতে যদি তোমরা সবে চাও”- অর্থাৎ কবি কিন্তু একজন আসমানীর কথা বলেন নি। রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়িতে যারা থাকে তারা সবাই আসমানী। যাদের ভাগ্য আসমান বা শূন্যাকাশের মতই ফাঁকা।

কবি মূলত সামন্তশাসিত সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফলশ্রুতি আসমানীদের সর্বরিক্ত অবস্থা দিয়ে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। তারা কৃষিজীবী কিন্তু ঘরের ছাউনিতে খড়ের বদলে ভেন্নাপাতা। নড়বড়ে এই ঘরে যারা থাকে তাদের দু-মুঠো ভাত জুটে না। পাঁজড়ার হাঁড় দেখা যায় বাইরে থেকে। এখানে পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। নোংরা আর ভীষণ দূষিত জলের বদ্ধপুকুরেই চলে নাওয়া-খাওয়া। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই জীবন সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থারই ফসল। কবি এই বৈষম্য নির্মূল চেয়েছেন, যাতে আসমানীরা আর কষ্ট না করে।

মজার ব্যাপার হল, আমরা শুধু আসমানীকেই চিনি, ‘খোসমানী’কে চিনি না। কবি পাশাপাশি দুটি কবিতা লিখেছেন ‘আসমানী’ ও ‘খোসমানী’ নামে। দুটি কবিতা একইসাথে পঠিতব্য। নইলে কবির মূল চেতনা উপলব্ধি করা যাবে না। আসমানীর মত খোসমানীও একটি ছোট্ট মেয়ে। আসমানী যেখানে সর্বরিক্ত খোসমানী সেখানে সর্বভোগ্যা। আদুরে দুলালি সে। দুঃখ কী জিনিস সে জানে না। তারা দুজন দুই ভুবনের বাসিন্দা। সামাজিক বৈষম্য তাদের মাঝে যে ভাগরেখা টেনে দিয়েছে তার অপসারণ কামনা করেছিলেন কবি। বৈষম্য ও ব্যবধান কমিয়ে সমাজের অগণিত আসমানীর ভাগ্য পরিবর্তন করা যাদের দায়িত্ব তাদের আসমানীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ তাই নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।

দেখা আসমানীর আড়ালে যে বঞ্চিত আসমানীরা সমাজের মাঝে অস্তিত্বমান, তাদের প্রতি দৃষ্টি ফেরালেই তার প্রতি এবং পল্লিকবির প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হবে।।