ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাড়ি ভাড়া বর্তমানে সবচেয়ে একটি আলোচিত বিষয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মিডিয়াতে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে পত্রিকাগুলো এ নিয়ে সম্পাদকীয় লিখছে, আবার কোন কোন ইলেট্রনিক মিডিয়া বিশেষ প্রতিবেদনও দেখাচ্ছে। এগুলো আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষকে আশার আলো দেখালেও কেউ কখনও বাড়ি ভাড়ার অগ্রিম/জামানত নিয়ে তেমন কিছু বলছে না। তাই এ বিষয়টি চিন্তা করে অভিজ্ঞতার আলোকে আমি কিছু লেখার চেষ্টা করছি এবং সেই সাথে এ বিষয়ে আইন কি বলে তা সকলের অবগতির জন্য এখানে উপস্থাপন করবো। জানিনা আমার লেখাটা কারও উপকারে আসবে কিনা, তবে এটুকু বুঝতে পারি যদি কোন বাড়িওয়ালা এ লেখাটা পড়ে তাহলে আমাকে আর বাড়ি ভাড়া দিবে না। তবুও সৎ সাহস এবং একজন মানবাধিকার কর্মী হিসাবে ভাড়াটিয়াদের মানবিক দিক বিবেচনা করে আমার আজকের এ লেখা।

গত বছর ডিসেম্বর মাসের ১৮ তারিখ একটি বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থায় চাকরির সুবাধে আমার চট্টগ্রাম আগমন। প্রথমে আমি নগরীর হালিশহরস্থ চাচার বাসায় উঠি। তাদের বাসায় থাকার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় একটি ব্যাচেলর বাসা খুঁজতে থাকি। কিন্তু বিধিবাম। যেখানেই যাই বাড়িওয়ালা যখন শুনে ব্যাচেলর তখন আর বাসা ভাড়া দিতে চায় না। বাড়িওয়ালাদের কাছে ব্যাচেলররা মানুষ না, ওরা অন্য কোন গ্রহ থেকে এসেছে। যাই হোক অনেক কষ্টে নগরীর নয়াবাজারস্থ একটি বাসার ৪র্থ তলায় একটি রুম পাই। কিন্তু এর জন্য মালিককে দিতে হবে মাসিক ভাড়া বাবদ ৩৫০০/- টাকা এবং জামানত ১০,০০০/-টাকা।

কিন্তু চট্টগ্রামে সবে আসাতে আমার কাছে অগ্রিম দেয়ার মতো এতো টাকা ছিল না, বাসা পেয়েছি ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে অফিস সহকর্মীদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে অগ্রিম দিলাম এবং চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম দিবসে নতুন বাসায় উঠি। নতুন বাসায় আমার ৮ মাস চলছে, কিন্তু এরই মধ্যে মালিককে বাড়িয়ে দিতে হয়েছে বাসা ভাড়া। যাইহোক, বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে পরবর্তীতে কিছু লেখার ইচ্ছা আছে, তখন সে বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা লিখবো। এরমধ্যে বাড়ি থেকে মা ও স্ত্রী ফ্যামিলী বাসা দেখার জন্য চাপ দিতে থাকে। এবার তাদের ইচ্ছা পূরণের জন্য ফ্যামিলী বাসা খুঁজতে থাকি। স্বল্প বেতনে চাকরি তাই অল্প দামের ছোট বাসাই আমার টার্গেট। এখানেও ঘটে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা।

প্রথমে আমার এক সহকর্মীকে নিয়ে নগরীর কাপাসগোলা এলাকাতে যাই এবং বিভিন্ন সাইনবোর্ড দেখে বাসা খুঁজতে থাকি। কিন্তু কোথাও আমার আয়ের সাথে সংগতি রেখে বাসা পাচ্ছি না। অনেক কষ্টে একটা বাসা পেলাম, মোটামুটি পছন্দও হলো। মালিককে জিজ্ঞাস করলাম ভাড়া ও অন্যান্য কি কি শর্ত আছে। সে প্রথমেই বললো ২০,০০০/-টাকা জামানত, ৮০০০/-টাকা ভাড়া এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আলাদা করে দিতে হবে। আমি মালিককে জানালাম আমার এতো টাকা জামানত দেয়ার সামর্থ নেই, তখন সেও রেগে বললো তাহলে আপনার বাসা ভাড়াও নেয়ার দরকার নেই। যাইহোক আর কোন বাসা না দেখে মনে দুঃখ কষ্ট নিয়ে বাসায় আসলাম। রাতে আমার কাছে থাকা বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রন অধ্যাদেশ-১৯৯১ আইনে কি আছে তা জানার চেষ্টা করলাম। আইনের ব্যাখ্যা আমি সবার শেষে দিবো। এবার আরও কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলবো।

গত ৯ আগস্ট আমার এক সহকর্মীর পরামর্শে তাকে নিয়ে হালিশহর এলাকাতে বাসা খুঁজতে যাই। যথারীতি একটি বাসা ভাড়ার সাইবোর্ড দেখে ঐ বাসায় গেলাম। বাড়ির মালিকের স্ত্রীর প্রথম জিজ্ঞাসা (কর্কশ কণ্ঠে) আপনার বাড়ি কোন জেলায়? আমি পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়লাম (সাধারণ ভাবে হলে প্রশ্ন করতাম না), কেন? এলাকা দেখে বাসা ভাড়া দেন নাকি? উত্তরে জানালো আমরা সব এলাকার মানুষকে বাসা ভাড়া দেই না। যাই হোক এলাকার নাম বলাতে সে এবার বাসা দেখালো। শর্ত দিল বাসাতে বেশি লোক থাকতে পারবে না, বেশি মেহমান আসতে পারবে না, ৪০,০০০/-টাকা জামানত এবং ৮৫০০/-ভাড়া+গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে। আমি তাকে জানালাম বাড়ি ভাড়া আইনেতো জামানত নেয়াকে অপরাধ বলা হয়েছে। অমনি রেগে গিয়ে বললো আমাকে আইন শেখাতে হবে না, আপনার মতো কত দেখলাম, বাড়িটাতো আপনার আইন বানিয়ে দেয়নি বলেই আমাদের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো।

অতঃপর ঐ বাসা থেকে বের হয়ে যাই অন্য আরেকটি বাসায়। সেখানে বাড়ি থেকে এক লোক বের হতেই তাকে জিজ্ঞাস করলাম ভাই এখানে বাড়ি ভাড়া দেয়া হবে আমি কার সাথে যোগাযোগ করব। উনি জানালো মালিক দোতালাতে থাকে তার সাথে যোগাযোগ করেন, আর আমিই বাসা ছেড়ে দিবো। আমি তাকে জিজ্ঞাস করলাম কেনো ছেড়ে দিবেন। সে জানালো বাড়ির মালিক ভাড়া বাড়াবে তাই। আরও জানতে চাইলাম আপনি কত ভাড়া দিতেন সে জানালো ৭০০০/-টাকা এবং অগ্রিম ছিলো ২০,০০০/-। যাই হোক তার সময় নষ্ট না করে মালিকের সাথে দেখা করলাম। তিনি তার বাসা দেখালো এবং বললো ৩০,০০০/-অগ্রিম দিতে হবে, ৮০০০/-ভাড়া, পানির বিলের সাথে পানি তুলতে যে ইলেট্রিসিটি খরচ হয় তা সব ভাড়াটিয়ার সাথে সমন্বয় করে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এবং জানুয়ারি মাসে আবার ভাড়া বৃদ্ধি করা হবে। তাকে আগের ভাড়াটিয়ার অগ্রিম ও ভাড়ার কথা বলতেই সে ক্ষেপে গেলো। সে জানালো পূর্বে কি হয়েছে তা আপনার জানার দরকার নেই। নেই। আপনি, এতে রাজি হলে নিতে পারেন। এবার আর ভয়ে বাড়ি ভাড়া আইনের কথা তাকে বলিনি। আমার পক্ষে নেয়া সম্ভব না বলে এবং তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাসায় চলে আসি।

বাসায় এসে রাতে মাকে ও স্ত্রীকে ফোন করে জানালাম আমার পক্ষে মনে হয় বাসা নেয়া সম্ভব হবে না। তারা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানতে চাইল কেন? জানালাম বাসা ভাড়া নিতে অনেক টাকা অগ্রিম দিতে হয়। আমার কাছে এখন অগ্রিমের টাকা নেই। আমার কথা শুনে মা ও স্ত্রী একটু কেমন যেন ভাব দেখালো। বুঝতে আর বাকি থাকলো না যে, তারা বেশ অখুশি হয়েছে। কিন্তু আমি তো তাদের বলতে পারিনা যে, বর্তমান যুগে চাকরি করে বাড়ি ভাড়ার অগ্রিমের টাকা জমানো সম্ভব না। এতো গেল আমার অভিজ্ঞতার কথা। আমার মনে হয় যারা নতুন বাসা খুঁজছে তাদের প্রত্যেকেরই আমার মতো এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এভাবে হাজারো মানুষ যারা বাসা ভাড়া করে থাকে তারা পারছে না এতো পরিমাণ অগ্রিম টাকা দিয়ে একটি ভালো বাসা নিতে পারছে না তাদের সন্তানদের একটি ভালো পরিবেশ দিতে। এসব যেন দেখার কেউ নেই। আমি এ বিষয়ে কিছু লিখব ভেবে নগরীর কিছু বড়ুয়া বড়ুয়া কোম্পানির এ্যাপার্টমেন্ট ও বস্তি এলাকাতেও যাই। সেখানেও একই চিত্র। এ্যাপার্টমেন্টগুলোতে লাখ টাকার কম অগ্রিম নেয় না, আবার বস্তিগুলোতে স্থানভেদে ৫০০০/-১০,০০০/- টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নেয়া হয়।

বাড়ি ভাড়া নিয়ে আমাদের দেশে একটি আইন প্রচলিত আছে, যা ১৯৯১ সালের বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ নামে পরিচিত। কিন্তু নেই এর বাস্তবায়ন। হয়তো অনেকে জানেই যে এমন একটি আইন আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। এবার দেখি এই অধ্যাদেশে বাড়িওয়ালাদের অগ্রিম বাণিজ্য নিয়ে কি বলে-

ধারা-১০। প্রিমিয়াম ইত্যাদির দাবি নিষিদ্ধ-ভাড়া দেওয়া বা ভাড়া নবায়ন করা বা ভাড়ার মেয়াদ বৃদ্ধি করার কারণে কোন ব্যক্তি-

(ক) ভাড়ার অতিরিক্ত কোন প্রিমিয়াম, সালামী জামানত বা অনুরুপ কোন অর্থ দাবি বা গ্রহণ করিতে বা প্রদানের জন্য বলিতে পারিবেন না, অথবা

(খ) নিয়ন্ত্রকের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে অগ্রিম ভাড়া হিসাবে এক মাসের ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা দাবি বা গ্রহণ করিতে পারিবেন না।

বিশ্লেষণ : বর্তমান ধারায় প্রিমিয়াম ইত্যাদির দাবি নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। কোন ক্ষেত্রে ভাড়া দেওয়া, ভাড়া নবায়ন কিংবা ভাড়ার মেয়াদ বৃদ্ধি করিবার কারণে বাড়ির মালিক ভাড়ার অতিরিক্ত প্রিমিয়াম, সালামী, জামানত বা অনুরূপ কোন টাকা দাবি বা গ্রহণ করিতে পারিবেনা কিংবা ভাড়াটিয়াকে প্রদান করিতে বাধ্য করিতে পারিবেনা। তবে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রকের পূর্ব অনুমোদনক্রমে অগ্রিম ভাড়া হিসাবে এক মাসের ভাড়ার সমপরিমাণ টাকা গ্রহণ করিতে পারিবে।

শাস্তি :

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৯১ এর ধারা-২৩ এর গ(ই) ধারা মতে যদি কোন ব্যক্তি জ্ঞাতসারে নিয়ন্ত্রকের লিখিত সম্মতি ব্যতিরেকে অগ্রিম ভাড়া বাবদ এক মাসের ভাড়ার অধিক ভাড়া গ্রহণ করেন; তাহা হইলে তিনি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা সরকারের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথমবারের অপরাধের জন্য প্রথম মাসের ভাড়ার অতিরিক্ত যে টাকা আদায় করা হইয়াছে উহার দ্বিগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং পরবর্তী প্রত্যেক বারের অপরাধের জন্য এক মাসের ভাড়ার অতিরিক্ত যে টাকা আদায় করা হইয়াছে উহার তিনগুণ পর্যন্ত দণ্ডনীয় হইবেন।

এতো গেল আইনের কথা। বাস্তবে বেশির ভাগ বাড়িওয়ালাই বাড়ি ভাড়া আইন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। আবার যারা জানে তারা এসব বিধিবিধান মানতে রাজি নয়। আর কেউ বলতে গেলে শুনতে হয় বাড়িওয়ালার উল্টো ধমক। আসলে এজন্য প্রথমেই আমাদের সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া সবাইকে এ আইন সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। এ আইন বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। সরকারের সাথে সাথে মিডিয়াগুলোও এগিয়ে আসতে পারে। আসলে প্রচারেই প্রসার। আমাদের মিডিয়াগুলো যদি এ আইন নিয়ে সংবাদ, টকশো ও বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচারনায় এগিয়ে আসে, তাহলে সবাই সহজেই সচেতন হতে পারবে এবং দূর হবে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের তিক্ততা।

পরিশেষে বলবো, আমাদের দেশের দোকান মালিকেরা কাস্টমারদের বলে লক্ষ্মী। আর বাড়িওয়ালাদেরও বোঝা উচিৎ ভাড়াটিয়ারা তাদের লক্ষ্মী। তাই ভাড়াটিয়াদের উপর এভাবে অগ্রিম/জামানতের টাকা না চাপিয়ে দিয়ে বেঁচে থাকার মতো একটি সুন্দর পরিবেশ দিন। কারণ ভাড়াটিয়া আছে বলেই আপনার বাড়ি ভাড়া দিতে পারছেন।

– মো ফয়সাল আহম্মদ, জেলা সমন্বয়কারী, রোড টু রাইটস প্রকল্প, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা। ই মেইল : faysal@manabadhikar.org

***
ফিচার ছবি: ব্লগার আইরিন সুলতানা