ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

একটি বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থায় কাজ করার সুবাদে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগকারির নানাবিধ অভিযোগ শুনতে হয়। তেমনি একদিন রহিমা (ছদ্মনাম) নামীয় একজন অভিযোগকারি অফিসে আসল। তার অভিযোগ অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনলাম এবং আমার মনে হলো, এটা সবার সাথে শেয়ার করা দরকার। তাই লিখতে বসলাম-স্বামী, এক সন্তান ও শাশুড়ি নিয়ে রহিমার সংসার। রহিমা প্রতিদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে। সবার জন্য সকালের নাস্তা ও দুপুরের খাবার রান্না করে। সকলকে সকালের নাস্তা করিয়ে থালা বাসন পরিষ্কার করে এবং টিফিন কেরিয়ারে কিছু খাবার নিয়ে সকাল ৭ টার সময় নগরীর ইপিজেড এলাকার একটি গার্মেন্টসে চাকরিতে চলে যায়। অফিস শেষে সে কোনদিন সন্ধ্যা ৭ টায়, আবার যেদিন ওভারটাইম থাকে সেদিন রাত ১০ টার সময় বাসায় ফিরে। বাসায় এসে যথারীতি সে রাতের খাবার রান্না করে সকলকে খাবার খাইয়ে থালা বাসন পরিষ্কার করে ঘুমাতে যায়। এতে কিছু করার পরও যেদিন অফিস থেকে বাসায় আসতে দেরি হয়, সেদিন তার স্বামী তাকে অকারণে সন্দেহ করে গালি-গালাজ ও মারধর করে। ছেলের এমন আচরণে শ্বাশুড়িও সায় দেয়। তাই সে তার অফিসের কারও কাছ থেকে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার অফিসে ঠিকানা নিয়ে এখানে আসে এবং আমাকে জানায়; আমি যেন তার স্বামী ও শাশুড়িকে ডেকে শুধু বলে দেই যে, সে যা করছে সংসারের সকলের ভালোর জন্য এবং সংসারের জন্য তার যে অবদান, তা যেন তার স্বামী ও শাশুড়ি বুঝে।

আসলে এ ঘটনা থেকে আমার মনে হলো, আমাদের সমাজের নারীরা এখন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের যে অবদান আছে, তার স্বীকৃতি চায়। আমরা যদি আমাদের মা, স্ত্রী ও বোনকে রহিমার সাথে তুলনা করি, তাহলেও একই চিত্র দেখতে পাব। এভাবে হাজারো রহিমা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে, আমরা কি পেরেছি তাদের এ অবদানের স্বীকৃতি দিতে। এখন সময় এসেছে তাদের এ অবদানের স্বীকৃতি দেবার।

আমরা স্বাধীন হয়েছি প্রায় ৪০ বছর হলো। এ সময়ে নারী শিক্ষার প্রসারতা বৃদ্ধি পেয়েছে, হ্রাস পেয়েছে মাতৃ মৃত্যুর হার, নারীদের কাজের সুযোগ তৈরিতে আমাদের রয়েছে অসাধারণ সাফল্য, বিভিন্ন আইন ও নীতিমালার মাধ্যমে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এখনও দিতে পারেনি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের অবদানের প্রকৃত স্বীকৃতি।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের গ্রামীণ নারীরা দিনের মোট সময়ের ৫৩% সময় ব্যয় করে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষেত্রে অর্থাৎ পারিবারিক আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে। আর সেখানে পুরুষরা ব্যয় করে মাত্র ৪৭% সময়। এছাড়াও নারীরা সন্তান প্রতিপালনসহ সংসারের অন্যান্য কাজতো করেই। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থা নারীদের এগুলো সাধারণ দায়িত্ব মনে করে তাদের এ অবদানের প্রকৃত মর্যাদা ও সম্মান দিতে চায় না। আমাদের এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে, দিতে হবে নারীদের ন্যায্য মর্যাদা ও অবদানের স্বীকৃতি। এজন্য দরকার আমাদের বিকৃত মানসিকতার পরিবর্তন।

সামাজিকভাবেও নারীদের অবদান কম নয়। আমাদের দেশের অনেক নারী ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে অনেকের। করেছে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। যার মাধ্যমে অনেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে, হ্রাস পাচ্ছে বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হচ্ছে পরিবার, সমাজ তথা দেশ। এছাড়াও অনেক নারী নেতৃত্ব দিচ্ছে সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতির বিরুদ্ধে, গড়ে তুলেছে সামাজিক আন্দোলন। এতে দূর হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক অসঙ্গতি। কিন্তু আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা তাদের এ অবদানকে কখনও ভালো চোখে দেখেনি। আমাদের এ হীনমন্যতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে, দিতে হবে নারীর প্রাপ্য অবদানের স্বীকৃতি।

আমাদের দেশের ৯.৪% নারী এবং ৩৪.৫% পুরুষ পুরোপুরি অর্থ উপার্জনের কাজে নিয়োজিত। কিন্তু নারীদের এ উপার্জন আমাদের জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না। সরকার কি পারেনা নারীর এ উপার্জনকে জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করে আমাদের জিডিপি গ্রোথ বাড়িয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। নারীর অবদানের স্বীকৃতি না দিলে কোন দিনও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না। আসলে নারীর অবদানের স্বীকৃতি দিতে সরকারকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। তা না হলে নারীরা কোন দিনও তাদের প্রাপ্য মর্যাদা পাবেনা, পাবেনা তাদের অবদানের স্বীকৃতি, প্রতিষ্ঠা পাবেনা মানবাধিকার।

তবে আশার কথা হলো সম্প্রতি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও তার অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে নারীদের প্রাপ্য অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য একটি ক্যাম্পেইন প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। এর লক্ষ্যে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে মানুষকে সচেতন করে তোলা হবে। যাতে নারীরা তাদের প্রাপ্য অবদানের স্বীকৃতি পায়। আশা করি এটা আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অবদানের স্বীকৃতিকে ‘‘টনিক” হিসেবে কাজ করবে। পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের দেশের নারীরা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী, হয়েছে বিরোধী দলীয় নেত্রী, হয়েছে মন্ত্রী, করেছে এভারেস্ট জয়, বহু বড় বড় অফিসের প্রধান কর্তা ব্যক্তি হয়েছে অনেকে, নেতৃত্ব দিচ্ছে বিভিন্ন বড় বড় সামাজিক আন্দোলনের, দায়িত্ব নিচ্ছে পরিবারের। তাহলে কেন সেই নারীদের আমরা অবজ্ঞা করব, দেব না তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ও অবদানের স্বীকৃতি?? প্রশ্ন থাকল জাতির বিবেকের কাছে।

-মো. ফয়সাল আহম্মদ, জেলা সমন্বয়কারি, রোড টু রাইটস প্রকল্প, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা