ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

গত ‍কিছুদিন আগে বাসায় গিয়ে দেখতে পাই পাশের বাসার খালা খুবই অসুস্থ। তার দুই মেয়ে। দুই জনই গার্মেন্টসে চাকুরী করে। রাত্র আনুমানিক ৮টা পর্যন্ত তারা কেহই বাসায় আসেনি। তাই খালার অবস্থা খারাপ দেখে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাই। ডাক্তার দেখিয়ে নিচে নামতেই চোখে পড়ল একটি মেয়ে তার পায়ের জুতা একটি ছেলের দিকে ছুঁড়ে মারছে আর ছেলেটি দৌঁড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি এ সময় ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে কিছু কটূ বাক্য ছুড়ে চলে যাচ্ছে। বুঝতে আর বাকি থাকল না যে এখানে কোন ইভ টিজিং-এর ঘটনা ঘটেছে। আমার দুর্ভাগ্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক লোক মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল ‘মেয়েটির তেজ কত’। তখন প্রতিবাদের ভাষায় লোকটিকে শুধু বললাম এখানে আপনার বোন হলে কি করতেন? খালা অসুস্থ থাকায় বেশি কথা না বলে সিএনজি ঠিক করে বাসায় চলে আসলাম। সারা রাত ঘুমাতে পারলাম না। ভাবলাম কিছু একটা লিখে হলেও এর প্রতিবাদ জানাব। আমার এ লেখা কারও যদি উপকারে আসে তাহলে একজন নবীন লেখক হিসেবে নিজেকে ধন্য মনে করব।

ইভ টিজিং-কে আদালতের ভাষায় বলা হয় উত্ত্যক্তকরণ। সহজভাবে বলতে গেলে নারীদের টিটকারী মারা বা যৌন হয়রানি করা বুঝায়। বেসরকারি সংস্থাগুলো অনেক আগে থেকে ইভ টিজিংয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকলেও বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ইভ টিজিংকে রাষ্ট্রীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে আন্দোলন শুরু করেন। বর্তমানে সর্বস্তরের মানুষ, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম কর্মীরাও এ আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে।

আসলে ইভ টিজারদের বিরূদ্ধে আন্দোলনে না নেমে উপায় ছিল না। কারণ এই ইভ টিজারদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছে শিক্ষক, ভাই, মা, বাবাসহ অনেকে। অনেক ভিকটিম বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার মত নির্মম পথ। আর লাঞ্চিত হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। এছাড়াও অসংখ্য কিশোরী-তরুণী স্কুল, কলেজ কিংবা কর্মস্থলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অনেকে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

আমাদের দেশের ইভ টিজাররা কোমলমতি ছাত্রীদের স্কুল কলেজে যাবার পথে উত্ত্যক্ত করে থাকে। কোন ক্ষেত্রে ছাত্রী হোস্টেল, মহিলা হোস্টেল এর সামনে দাঁড়িয়ে কিংবা চলার পথে, কর্মস্থলে বিভিন্ন কথার মাধ্যমে বা বিভিন্ন খারাপ অঙ্গ ভঙ্গির মাধ্যমে অথবা শারীরিক লাঞ্চনার মাধ্যমে যৌন হয়রানি করে থাকে। বর্তমানে মুঠোফোনে ও ইন্টারনেটের মাধ্যমেও যৌন হয়রানি করে থাকে। আসলে আমাদের দেশের নারীরা বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, নিকট আত্মীয় কারও কাছ থেকেই নিরাপদ নয়। তারা কোথাও না কোথাও থেকে যৌন হয়রানির শিকার হয়। আর বিষয়টি ভাবতে আমার অবাক লাগে, কারণ আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী সকলেই নারী। আর সেই দেশের নারীরা আজও অধিকার হারা, পরাধীন এক পথযাত্রী।

আমি ইভটিজিংয়ের কিছু কারণ বের করার চেষ্টা করছি। যা হচ্ছে- পারিবারিক সুশিক্ষার অভাব, বেকারত্ব, নিরক্ষরতা, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে অহেতুক আড্ডা দেয়া, আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া, সচেতনতার অভাব, কোন ঘটনার প্রতিবাদ না করা, ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা, ইন্টারনেট এবং সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে কোন ঘটনা ঘটলে অবহিত না করা।

ইভ টিজিংয়ের ভয়াল থাবা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আসলে আপনাকে আমাকে সকলকেই এগিয়ে আসতে হব। আর পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে নারীদের প্রতি সম্মান করার শিক্ষা। প্রত্যেক মা-বাবার উচিত হবে, তার শিশুকে নারীদের প্রতি কিভাবে সম্মান করতে হয় তা শিখানো। তার সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় আড্ডা দিচ্ছে, কোন খারাপ কাজ করছে কিনা, ইন্টারনেটে গঠনমূলক শিক্ষার বাহিরে কি করছে, মোবাইল ফোনে কি করছে এসব খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়াও সন্তানকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নারীদের যে সম্মান দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে ধারনা দিতে হবে।

আমাদের পাঠ্যপুস্তকে নারীদের সম্মানের কথা উল্লেখ করতে হবে। নারীদের প্রতি কোন অসম্মান করা হলে, কিংবা কোন নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে আইনগতভাবে কি শাস্তির বিধান আছে সংক্ষেপে হলেও পাঠ্যপুস্তকে উল্লেখ করতে হবে এবং শিশুদের স্কুল পর্যায় থেকে সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে।

ইভ টিজিংয়ের বিভিন্ন ঘটনার দায়ভার সরকার এড়াতে পারে না। সরকারের উচিৎ ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে এদেশের লাখ লাখ বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেয়া, যাতে বেকার যুবকরা কর্মমুখী হয় এবং অহেতুক আড্ডাবাজি থেকে বিরত থাকে।

সরকারি আইন শৃংখলা বাহিনীকে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মোবাইল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে যাতে খারাপ কিছু দেখতে না পারে সে নিশ্চয়তা সরকারকেই দিতে হবে।

আমাদের সমাজও এই দায়ভার এড়াতে পারে না। সমাজে কোথাও কোন ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে প্রতিবাদ করতে হবে। যারা ইভ টিজিংয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিতে হবে। সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ইভ টিজিংয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং মিডিয়াগুলো একত্রিতভাবে কাজ করতে পারে।

পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের সমাজের অর্ধেক নারী আর অর্ধেক পুরুষ। এই অর্ধেক নারী জাতিকে বাদ দিলে সমাজ থাকবে না। আর সমাজ না থাকলে পৃথিবী থাকবে না। অতএব এই পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে হলে নারীদের সম মর্যাদা দিতে হবে ও সম্মান করতে শিখতে হবে। আর ভুলে গেলে চলবে না যে, সমাজের নারীরা কারও না কারও মা ও বোন। নারীদের প্রাপ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলেই প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠা পাবে মানবাধিকার।

-মো. ফয়সাল আহম্মদ, জেলা সমন্বয়কারি, রোড টু রাইটস প্রকল্প, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা

***
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে: http://dainikpurbokone.net