ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের অনেক কিছুই উন্নত হয়েছে। জ্ঞান, বিজ্ঞান, চিন্তা-চেতনা, ধ্যান ধারণা সব কিছুতেই এখন রয়েছে আধুনিকতার ছাপ। আমাদের দেশের ধনী, মধ্যবিত্ত, দরিদ্র সবাই এখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত প্রায় সবার বাসায়ই এখন রয়েছে কম্পিউটার। যারা একটু সচেতন তারা এখন ব্যবহার করে ইন্টারনেট। তার মানে ইতোমধ্যেই আমরা ডিজিটাল যুগে পদার্পণ করেছি। সারা বিশ্বে যে ডিজিটাল জ্বর শুরু হয়েছে আমরাও এখন তার বাইরে নেই। কিন্তু এ ডিজিটাল যুগে এসে আমাদের মন মানসিকতা কি ডিজিটাল হয়েছে, নাকি হয়েছে আমাদের মন মানসিকতার নৈতিক অবক্ষয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে আমাদের তরুণদের প্রায় ৭০% মোবাইল, কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি দেখে এবং এটাকে তারা বিকল্প বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে মনে করে। আসলে এটা আমাদের তরুণদের বিনোদনের নামে সাইবার অপরাধ ভয়ানক রূপ নিয়েছে।

আমরা এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সহজেই একে অপরের সাথে কথা বলতে পারি। কখনও এসএমএস এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্যটি আদান-প্রদান করতে পারি। বর্তমানে আমাদের তরুণদের একটি বৃহদাংশ ব্যবহার করে ক্যামেরা মোবাইল ফোন। এই ক্যামেরা মোবাইল ফোনের যেমন কিছু উপকারিতা আছে তেমনি এর রয়েছে কিছু ভয়াবহ অপকারিতা। আমাদের এ তরুণরা তথাকথিত আধুনিক ও ভিডিও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়ের গোপন ছবি ধারণ করে এমএমএস বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী। আবার কখনও প্রেমিকার সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ধারণ করে তাও ইন্টারনেট কিংবা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বিশ্ব ব্যাপী। এতে অনেক মেয়ে লজ্জায় স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়েছে, অনেকে আবার বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার মতো কঠিন পথ।

অনেক তরুণ তরুণী আবার সারা রাত মোবাইল ফোনে কথা বলছে। যারা রাত জেগে কথা বলছে তাদের বেশীর ভাগই জড়িয়ে যাচ্ছে ফোন সেক্সে। অনেকে আবার মোবাইল ফোনে বিভিন্ন পর্ণো ছবি বন্ধু-বান্ধব মিলে দেখছে কিংবা নিজের ধারণ করা কোন পর্ণো ছবি অপরকে দেখাচ্ছে। যা তাদের আধুনিকতার নামে নৈতিকতার অবক্ষয় মাত্র।

আধুনিক এ যুগে যাদের বাসায় কম্পিউটার আছে তারা প্রায় সবাই ব্যবহার করছে ইন্টারনেট। আসলে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগে নিজেকে যুগের সাথে প্রতিযোগী ও আধুনিক হিসেবে উপস্থাপন করতে ইন্টারনেটের বিকল্প নেই। ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা জ্ঞান বিজ্ঞানের নতুন নতুন ধারার সাথে পরিচিত হতে পারি। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ ওয়েব সাইট যেমন-ফেইস বুক, টুইটার ইত্যাদির মাধ্যমে যেমন পুরানো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করতে পারি তেমনি নতুন বন্ধুও তৈরী করতে পারি। কিন্তু ইন্টারনেটের এত সুবিধা থাকা সত্বেও আমাদের তরুণ তরুণীরা বেশির ভাগ সময় ব্যয় করে বিভিন্ন পর্ণো ওয়েব সাইটগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন পর্ণো ছবি দেখে। তারা এর মাধ্যমে যেমন নিজেদের নৈতিকতা বিসর্জন দিচ্ছে তেমনি এটা ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের বন্ধু-বান্ধব মহলেও।

ইন্টারনেটের অনেক সাইটের মাধ্যমে একে অন্যের সাথে ফ্রি কথা বলা ও দেখা যায়। এটা এক দিকে যেমন ভালো তেমনি এর কিছু খারাপ দিকও রয়েছে। এখানে একটি বাস্তব ঘটনা বলি-আমি একদিন রাতে আমার এক বন্ধুর বাসায় ছিলাম। রাত আনুঃ ১১:০০টার সময় আমার বন্ধু আমাকে বলল আয় তোর হবু ভাবীকে দেখ, এই বলে সে স্কাইপি’র মাধ্যমে তার প্রেমিকাকে কল করল। একটি সময় দেখলাম আমার বন্ধু তার প্রেমিকাকে কি যে যেন বলল অমনি সে তার বিশেষ অঙ্গগুলো ক্যামেরার মাধ্যমে দেখাচ্ছে । তখন বন্ধুকে শুধু বললাম, এ যদি হয় তোমাদের আধুনিকতা তাহলে এই আধুনিক সমাজে কি নৈতিকতার কোন দরকার নেই? তবে দুঃখের বিষয় হলো ঐ মেয়ের সাথে আমার বন্ধুর পরবর্তীতে বিয়ে হয়নি। যাই হোক ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে আজকাল এমন অনেক কিছুই ঘটে।

অনেক সময় দেখা যাচ্ছে কাউকে তার বন্ধু-বান্ধব বা সমাজের কাছে ছোট করার জন্য বিভিন্ন নগ্ন ছবির সাথে তার ছবি জুড়ে তা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে যা ছড়িয়ে যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী। আবার কখনও কখনও প্রেমিক প্রেমিকারা প্রযুক্তির কল্যাণে ধারণকৃত তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি কোন কারণে মনো-মালিন্য দেখা দিলে তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েব সাইটে। এর প্রভাব থেকে বাদ যাচ্ছে না আমাদের সেলিব্রেটিরাও।

আসলে এই সাইবার অপরাধ থেকে আমাদের তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হলে পরিবারকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সন্তানদের শৈশব থেকেই দিতে হবে নৈতিকতার শিক্ষা। বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয়ে তাদের সাথে খোলা-মেলা আলোচনা করতে হবে এবং এসব বিষয়ে নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে তাদের সচেতন করে তুলতে হবে। মোবাইল ফোন কিংবা ইন্টারনেটে আমাদের সন্তানরা কি করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের দিতে হবে একটি সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক পরিবেশ, যেখানে তারা পাবে সুস্থ বিনোদন ও নৈতিকতার শিক্ষা এবং গড়ে উঠবে সচেতন জাতি হিসেবে।

এক্ষেত্রে আমাদের সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও কোন অপরাধের ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে তার প্রতিবাদ করতে হবে এবং অপরাধীকে আইনের হাতে তুলে দিতে হবে। সাইবার অপরাধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সামাজিকভাবে সচেতনতা কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে এবং এতে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

সাইবার অপরাধের করাল গ্রাস থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা সর্বাধিক। সরকারিভাবে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারে কিছু নীতিমালা তৈরী করতে হবে। ইন্টারনেটের পর্ণো ওয়েব সাইটগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা চীনকে মডেল হিসেবে নিতে পারি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে পর্ণো গ্রাফি ও সাইবার অপরাধ সম্পর্কে যে আইন আছে তার সঠিক প্রয়োগে এগিয়ে আসতে হবে। সাইবার অপরাধ যে একটি গর্হিত অপরাধ সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে সরকারিভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

আমাদের পাঠ্যক্রমে আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। যাতে আমাদের শিশু কিশোররা তথ্য প্রযুক্তির আধুনিক বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে এবং এর ভালো ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে অবগত হতে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর থেকেই সবাইকে সুষ্ঠু মানসিকতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে এবং গড়ে তুলতে হবে সচেতন জাতি হিসেবে। তরুণদের সুস্থ বিনোদনের পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে যাতে তারা বিকল্প বিনোদন হিসেবে পর্ণোগ্রাফিকে বেছে না নেয়।

এছাড়াও এসব ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলো এবং মিডিয়াও ব্যপক ভূমিকা পালন করতে পারে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচী হাতে নিতে পারে। যদিও বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা এ বিষয়ে কিছুটা কাজ করে যাচ্ছে যা ১৬ কোটি মানুষের দেশে নিতান্তই অপ্রতুল। আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তরুণ সমাজকে সচেতন করে তুলতে পারে।

আমাদের তথাকথিত প্রেমিক প্রেমিকাদের বলছি, অনুগ্রহ পূর্বক কেহ রাগ করবেন না। আপনারা আপনাদের মেলা-মেশাতে একটু সতর্ক থাকুন। তা নাহলে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি কেড়ে নিতে আপনার সর্বস্ব। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আপনি যাকে ভালোবেসে সবকিছু দিয়েছেন তার সাথে আপনার বিয়ে হবে সে নিশ্চয়তা কেহ দিতে পারবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, আমরা যদি এখনই এ সাইবার অপরাধ থেকে আমাদের তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে ও সচেতন করে তুলতে না পারি তাহলে আমরা কখনোই আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো না। আর প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠা পাবে না আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশের।

মোঃ ফয়সাল আহম্মদ, জেলা সমন্বয়কারী, রোড টু রাইটস প্রকল্প, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা