ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

index

 

আমার দু’টি লেখা ছিল মালিকদের বাড়ি ভাড়ার অগ্রিম বাণিজ্য নিয়ে এবং বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে। আমার আজকের লেখাটি যারা বাড়ি ভাড়া করে থাকে তথা ভাড়াটিয়াদের অধিকার নিয়ে। যারা অনেক কষ্টে বাড়িওয়ালাদের অগ্রিমের টাকা দিয়ে একটি বাসা ভাড়া নিলো, তারা আসলে ভাড়াটিয়া হিসাবে কতটুকু সুযোগ-সুবিধা পায় বাড়ির মালিকদের থেকে? হিসাব কষলে দেখা যাবে নিতান্তই সামান্য। এখানে আমি নিজেকে দিয়ে একটা উদাহরণ দেই। গত কিছু দিন পূর্বে নগরীর রামপুরাস্থ ধোপাপাড়া এলাকাতে একটি বাসা ভাড়া নেই। বাসা ভাড়া নেয়ার সময় মালিকের স্ত্রীর সাথে কথা হয়। সে জানায় পানি মোটামুটি সব সময় থাকে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সুবিধাতো আছেই। মালিকের স্ত্রীর কথায় সন্তষ্ট হয়ে বাসা ভাড়া নিই এবং গত ১ সেপ্টেম্বর নতুন বাসায় স্ত্রী-সন্তানসহ জীবন যাপন শুরু করি।

কিন্তু বিধিবাম!! বাসায় উঠে প্রথম দিন থেকেই দেখি পানি দিনে একবার দেয়, তাও আবার বিশ মিনিটের মতো। বাড়ির মালিককে জিজ্ঞেস করলাম এভাবে পানি দিলেতো স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করা মুশকিল হয়ে যাবে। তাছাড়া আপনার স্ত্রী বলেছিল পানি সব সময় থাকে। উত্তরে তিনি বলল স্ত্রী কি বলেছে তা আমি জানি না, তবে পানি এর বেশি দিতে পারবো না, বাসায় থাকলে থাকেন, না থাকলে চলে যান। তখন তাকে বললাম আপনার বাসায়তো সব সময় পানি থাকে, তাহলে ভাড়াটিয়াদের কেন একবার দিবেন? তিনি জানালেন আমি যে বাড়িওয়ালা। মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল, তাকে তখন ধমক দিয়ে বললাম আমি ঠিক মতো পানির সুবিধা না পেলে আপনার বিরূদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিবো। যাইহোক আমার মনে হয় এরকম অসুবিধা চট্টগ্রামে বসবাসরত প্রায় সব ভাড়াটিয়াদেরই। আরও অনেক জায়গায় খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি পানি নিয়ে চট্টগ্রামের বাড়িওয়ালাদের একটা বড় ম্যানিয়া আছে।

গত কিছুদিন পূর্বে নয়াবাজার এলাকাতে বসবাসরত এক বাড়ির মালিক ফোন করে জানাল, তার ভাড়াটিয়া বাড়ি ছেড়ে দিতে চাচ্ছে না সে আইনগত কি করতে পারবে। তার কাছে জানতে চাইলাম কি কারণে আপনি ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করতে চান? সে জানাল কোন কারণ নেই, ভাড়াটিয়া অনেক দিন ধরে আছে তাই যদি পরবর্তীতে কোন সমস্যা করে। আমি তাকে জানালাম পরবর্তীতে কোন সমস্যা করলে আমাদের অফিসের মাধ্যমে ফ্রি আইনগত সহায়তা দিব আপাতত: ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করার দরকার নেই। ভদ্রলোকের সাথে কথা বলে মনে খুব কষ্ট পেলাম, ভাড়াটিয়ার কোন দোষ নেই তাও তাকে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলছে। হায়রে অভাগা ভাড়াটিয়া!!

এছাড়াও কিছুদিন পূর্বে আরও এক ব্যক্তি ফোন করে জানান যে, ভাই আমি আপনার বাড়ি ভাড়া প্রসঙ্গ নিয়ে গত দু’টি লেখা পড়েছি। এবার একটু বাড়ির মালিকদের নির্যাতন নিয়ে কিছু লিখেন। আমি তাকে জানালাম চেষ্টা করবো। কারণ আমিও যে নির্যাতনের শিকার। যাই হোক উক্ত ভাড়াটিয়া এবার আমাকে তার বাড়ির মালিকের কিছু নির্যাতনের কথা জানালো। গত কিছু দিন পূর্বে গ্রামের বাড়ি থেকে মা, বোন ও ভাই তার বাসায় বেড়াতে আসে। দু’দিন যেতেই বাড়ির মালিকের স্ত্রী তাদের বাসায় এসে জানালো বাসায় এতো মেহমান কেন? বেশি লোক থাকলে বেশি পানি খরচ হয়, অতএব মেহমানদের তাড়াতাড়ি চলে যেতে বলেন। আর পরবর্তীতে বাসায় যেন এতো মেহমান এসে না থাকে। বেচারা ভাড়াটিয়া নাকি কোন উত্তর দিতে পারেনি। পরবর্তীতে সে দুঃখ কষ্টে মা, ভাই-বোনদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এ হলো আমাদের ভাড়টিয়াদের অধিকার। এত টাকা দিয়ে বাসা করে থেকে মা, ভাই-বোনরাও বেড়াতে আসতে পারবে না।

আমি বিভিন্ন ভাড়াটিয়াদের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি যে, অনেক বাড়িওয়ালা রাত ১১ টার পর প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়। এরপর কোন ভাড়াটিয়াও বাসায় ঢুকতে পারে না। এ যেন আমরা টাকা দিয়ে জেল খানা ভাড়া করে থাকি। অনেকে জানিয়েছে তাদের বাড়ির মালিক/মালিকের স্ত্রী নাকি প্রতিদিন সন্ধায় এসে দরজার বাহিরে রাখা জুতা গুনে, যদি নির্ধারিত জুতার বেশি থাকে অমনি দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করে দেখে বাসায় কতজন লোক আছে। বেশি লোক থাকলে শুনতে হয় বাড়িওয়ালার ধমক। তাছাড়া তিন/চার মাস পরপর নাকি বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর জন্য মালিকরা চাপ দিতে থাকে। তাদের চাহিদা মোতাবেক ভাড়া দিতে না পারলে বাসা ছেড়ে দিতে বলে।

গত কিছু দিন থেকে আমরা নগরীর বিভিন্ন বস্তিতে তাদের সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে একটি জরিপ শুরু করি। সেখানে বিভিন্ন বস্তির মানুষের বেশির ভাগ অভিযোগই বাড়িওয়ালাদের বিরূদ্ধে। বাড়িওয়ালারা নাকি দুই তিন মাস পর পর বাসা ভাড়া ভাড়ায়। কেহ কোন কারণে বাসা ভাড়া দিতে দেরী করলে তাদের মালামাল রেখে বাসা থেকে বের করে দেয়। আবার কোন বাসাতে শুধু মাত্র মহিলা/মেয়ে থাকলে মালিকের কু-দৃষ্টি থাকে সেদিকে। অনেক বস্তিতে বিশ/ত্রিশটি ঘর নিয়ে থাকে একটি মাত্র চুলা কিংবা পানির জন্য একটি টিউবঅয়েল। কোন কারণে চুলা কিংবা টিউবঅয়েল নষ্ট হলে মালিক ঘর প্রতি চাঁদা তুলে ঠিক করে দেয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মালিক প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি টাকা তুলে।

অনেক ভাড়াটিয়া আমার কাছে অভিযোগ করেছে তাদের বাড়ির বিদ্যুৎ বিল তারা যতটুকু ব্যবহার করে তার চেয়েও বেশি আসে। কারণ হিসাবে তারা জানায় তাদের বাড়ির মালিকরা নাকি পানির মটরের সাথে বিভিন্ন ভাড়াটিয়ার বিদ্যুৎ লাইন ব্যবহার করে। অনেক ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালারা নাকি তাদের সিড়ির লাইট কিংবা বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত লাইট ভাড়াটিয়ার মিটারের সাথে জুড়ে দেয়। কোন ভাড়াটিয়া বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করলে শুনতে হয় বাড়িওয়ালার ধমক কিংবা সরকারের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যায়।

আসলে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়ার এ তিক্ততা দীর্ঘ দিনের। এর থেকে বের হয়ে আসার কোন উপায় আছে বলে আমার মনে হয় না। কারণ সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে কখনই এ তিক্ততা নিরসনে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সব সময়ই এ বিষয়ে উদাসীন। তাছাড়া বাড়িভাড়া আইনে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোন নির্দেশনা নেই। যার ফলে বাড়িওয়ালারা দিন দিন তাদের স্বেচ্ছাচারিতা বাড়িয়ে দিচ্ছে আর অসহায় ভাড়াটিয়ারা সব মুখ বুঝে সহ্য করছে। আসলে এখন আর মুখ বুঝে সহ্য করার সময় নেই। সকলেরই প্রতিবাদী হওয়া উচিৎ। মাত্র ১০% বাড়িওয়ালার কাছে ৯০% ভাড়াটিয়া জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না।

পরিশেষে বলব সরকারের উচিৎ বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের এ তিক্ততা নিরসনে এগিয়ে আসা। এ ব্যাপারে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা। কারণ ভাড়াটিয়ারা তাদের গায়ের রক্ত পানি করে আয় করা টাকার একটি বৃহদাংশ ব্যয় করে বাড়ি ভাড়ার পিছনে। কষ্টের টাকা দিয়ে বাড়ি ভাড়া করে যেন একটু শান্তিতে নিদ্রা যেতে পারে সে দিকে খেয়াল রাখা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। বাড়িওয়ালাদেরও বোঝা উচিৎ ভাড়াটিয়া আছে বলেই তারা বাড়ি ভাড়া দিতে পারছে। আর সেই ভাড়াটিয়ারা যাতে একটু সুখে শান্তিতে তার বাড়িতে থাকতে পারে সে বিষয়ে খেয়াল রাখ। বাড়িওয়ালা, ভাড়াটিয়া পরিচয় যাই হোক সবাই আমরা মানুষ। মানুষ হিসেবে আমরা যদি বিবেকহীন হই তবে আমাদের পক্ষে সবই সম্ভব।

– মো. ফয়সাল আহম্মদ , জেলা সমন্বয়কারী, এসএএইচআর প্রকল্প, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, চট্টগ্রাম ইউনিট।