ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 
enimg-151534-2010-01-20

আর মাত্র ২ মাস পর শুরু হবে নতুন ইংরেজী বৎসর৷ এরই মধ্যে ভাড়াটিয়াদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে এবং বাড়িওয়ালারা প্রস্তুতি নিচ্ছে এবার কত টাকা বাড়ি ভাড়া বাড়াবে৷ সাধারন ভাড়াটিয়াদের আয় বেড়েছে কিনা সেটা তাদের দেখার বিষয় নয়৷ এ যেন আমরা যারা বাড়ি ভাড়া করে থাকি তাদের নিয়তি৷ তবে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি কোন নিয়মনীতির মধ্যে হলে আমাদের কোন আপত্তি ছিল না৷ আসলে আমাদের বাড়িওয়ালারা কোন নিয়মনীতির তোয়াক্তা করতে চায় না৷ তারা শুধু বুঝে বাড়ি ভাড়া বাড়াতে হবে৷ অনেক সময় বাড়িওয়ালারা বছরের যেকোন সময়ই বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেয়৷ আবার কোন ভাড়াটিয়া চলে গেলে নতুন ভাড়াটিয়াকেও দিতে হয় পূর্বের ভাড়াটিয়ার চেয়ে বেশী বাড়া৷ কোন কোন সময় বাড়িওয়ালারা পাশ্ববর্তী বাড়িওয়ালার সাথে প্রতিযোগীতায় নামে কার চেয়ে কে কত বেশী বাড়ি ভাড়া বাড়াতে পারে৷ আর এর বলী হই আমরা সাধারন ভাড়াটিয়ারা৷

২০১১ সালের ডিসেম্বরে চাকুরীর সুবাধে চট্টগ্রাম আসি৷ জানুয়ারীতে নগরীর নয়াবাজারস্থ একটি বাসায় এক রম্নম নিয়ে উঠি এর জন্য মালিকতে মাসিক ৩৫০০/- টাকা ভাড়া দিতে হয়৷ কিন্তু মার্চ মাসে মালিক আমাকে জানায় যে, তাকে ৫০০/- ভাড়া বাড়িয়ে দিতে হবে৷ জিজ্ঞাস করলাম কেন? উত্তরে সে বললো কোন কেন নেই৷ আগামী মাস থেকে ৪০০০/- টাকা দিতে হবে নাহয় ব্যাচেলর ভাড়া দিবো না৷ যাই হোক ব্যাচেলর বাসা পাওয়া খুব কষ্টের (পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে), তাই তাকে পরবতর্ী মাস থেকে ৪০০০/- ভাড়া দেই৷ এ যেন তার মুখের কথাই আইন, এ আইন না মানলে বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে৷ আমাদের কথার কোন মূল্যই নেই৷

গত ২০০৪ সালে চাকুরীর সুবাধে চট্টগ্রামে কিছু দিন ছিলাম৷ তখন নগরীর হালিশহর এলাকার একটি বাসায় ৩ রম্নমের ফ্লাট নিয়ে ছিলাম৷ এর জন্য মালিককে দিতে হয়েছিল ২৮০০/- টাকা মাসিক ভাড়া৷ ঘটনাক্রমে আবার সেই একই বাসায় বাড়ি ভাড়ার সাইনবোর্ড দেখে গত কিছু দিন পূর্বে সেই বাসায় যাই পরিবার নিয়ে বসবাস করার জন্য৷ মালিক আমাকে দেখে চিনতে পারেনি৷ আর আমিও তাকে পরিচয় দেইনি৷ যাইহোক সেই একই ফ্লাটের জন্য মালিক এবার ভাড়া চাইলো ৮৫০০/- টাকা৷ গত ৮ বছরের ব্যবধানে একই বাসার একই ফ্লাটের ভাড়া এখন প্রায় ৩০০% এর বেশী বেড়েছে৷ কিন্তু আমাদের সেই একই পজিশনে বেতন বেড়েছে ১০০% এরও কিছু কম৷ আসলে আমাদের কষ্ট বোঝার কেউ নেই, না সরকার না আমাদের বাড়িওয়ালারা৷

এতো গেল আমার অভিজ্ঞতার কথা৷ গত কিছুদিন পূর্বে একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলের হিসাব অনুযায়ী জানতে পারলাম বাংলাদেশে গত এক দশকে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৩৫০%৷ কিন্তু সেখানে মানুষের আয় বেড়েছে মাত্র ১১০%-১২০%৷ আমাদের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারগুলো কখনো বিষয়টি কি ভেবে দেখেছে? তারা কি কখনও বুঝতে চেষ্টা করেছে যে, মানুষের আয়ের প্রায় ৭০% টাকা ব্যয় হচ্ছে বাড়ি ভাড়ার টাকা দিতে গিয়ে৷ মনে হয় না!! তারা শুধু বুলি আওরাচ্ছে যে মানুষের আয় বেড়েছে৷ আসলে আমরা যারা সাধারন মানুষ তারা বুঝি আমাদের আয় কতটা বেড়েছে এবং ব্যায় তার কতগুন বেড়েছে৷

বাড়ি ভাড়া নিয়ে আমাদের দেশে একটি আইন প্রচলিত আছে৷ যার নাম বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রন অধ্যাদেশ-১৯৯১৷ কিন্তু নেই এর বাস্ববায়ন৷ আর যারা বাসত্মবায়ন করবে তারা এ বিষয়টিতে বরাবরই উদাসীন৷ যাইহোক গত ২০১০ সালের ১৭ই মে মহামান্য হাইকোর্ট বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রন অধ্যাদেশ-১৯৯১, কেন কার্যকর করার নির্দেম দেয়া হবে না তা ৪ সপ্তাহের মধ্যে আদালতকে জানাতে সরকারের সংশিস্নষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল৷ কিন্তু অদ্যবদি সরকারের সংশিস্নষ্ট দপ্তরগুলো এ আইন বাসত্মবায়নে কোন উদ্যোগ নেয়নি৷ আসলে নিবে কেন৷ সরকারের সংশিস্নষ্ট দপ্তরগুলোর বড় বড় কর্মকর্তারা অবৈধ টাকা কামিয়ে নিজেরাই হয়েছে সু-উচ্চ অট্টালিকার মালিক৷ এ আইনের সঠিক বাসত্মবায়ন হলেতো তারাও এর বাইরে থাকবে না৷ বাড়ি ভাড়া নির্ধারনে আমাদের সিটি কর্পোরেশনগুলোও নিশ্চুপ৷ কিন্তু কেন? প্রশ্ন থাকলো সকলের বিবেকের কাছে৷ বাড়ির মালিকদের নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক ভাড়াটিয়া নিজেদের রৰা করার জন্য নিজ উদ্যোগে সংগঠন তৈরী করেছে৷ কিন্তু এগুলোও শক্তিশালী রূপ নিতে পারেনি৷ আবার সব যায়গাতেও সংগঠন নেই৷ অনেক ৰেত্রে এই সংগঠনগুলো সোচ্চার হলেও সরকার ও সংশিস্নষ্ট সিটি কর্পোরেশনগুলোর কোন সহযোগীতা তারা পায়না৷ সবাই যেন বাড়িওয়াদের পৰে!! আর হতভাগা বাড়িটিয়াদের পৰে কথা বলার কেহ নেই৷ এবার দেখি বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রন অধ্যাদেশ-১৯৯১ আইন কি বলে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে৷

ধারা-৭৷ ভাড়া বৃদ্ধির উপর বিধিনিষেধঃ এই অধ্যাদেশের বিধান সাপেৰে, কোন বাড়ির ভাড়া মানসম্মত ভাড়ার অধিক বৃদ্ধি করা হইলে উক্ত অধিক ভাড়া, কোন চুক্তিতে ভিন্নরূপ কিছু থাকা সত্ত্বেও আদায়যোগ্য হইবে না৷

ধারা-৮৷ বাড়ি-মালিক কতর্ৃক উন্নয়ন এবং আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য ভাড়া বৃদ্ধিকরণঃ যেৰেত্রে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পর বাড়ি-মালিক নিজ খরচে বাড়িতে প্রয়োজনীয় মেরামতের অনর্ত্মভূক্ত নহে এইরূপ কোন সংযোজন, উন্নয়ন অথবা পরিবর্তন করে অথবা উহাতে ব্যবহারের জন্য কোন আসবাবপত্র সরবরাহ করেন সেৰেত্রে উক্ত সংযোজন, উন্নয়ন বা পরিবর্তন বা আসবাবপত্র সরবরাহের বিষয় বিবেচনাক্রমে বাড়ি-মালিক ও ভাড়াটিয়া পরস্পর সম্মত হইয়া অতিরিক্ত ভাড়া নির্ধারন করিতে পারিবেন এবং উক্ত অতিরিক্ত ভাড়া ভাড়াটিয়া কর্তৃক মানসম্মত ভাড়ার উপর প্রদেয় হইবে৷

ধারা-৯৷ কর প্রদানের কারণে ভাড়া বৃদ্ধিঃ যেৰেত্রে কোন বাড়ির পৌর অভিকর, কর, টোল বা উহার অংশ ভাড়াটিয়া কর্তৃক প্রদেয় হয় এবং বাড়ি মালিক ভাড়ার শর্তানুযায়ী উহা প্রদান করিরতে সম্মত হন, সেৰেত্রে বাড়ি মালক যে টাকা প্রদানে সম্মত হইয়াছেন সে টাকা ভাড়াটিয়া কর্তৃক মানসম্মত ভাড়ার অতিরিক্ত হিসাবে বাড়ি মালিককে প্রদেয় হইবে৷

ধারা-১৩৷ ভাড়া আদায়ের রশিদ প্রদানঃ ১) ভাড়াটিয়া কতর্ৃক বাড়া পরিশোধ করা হইলে বাড়ি মালিক তত্‍ৰণাত্‍ ভাড়াপ্রাপ্তির একটি রশিদ বিধি দ্বারা নির্ধারিত ফরমে স্বাৰর করিয়া ভাড়াটিয়াকে প্রদান করিবেন৷ ২) বাড়ি মালিক ভাড়ার রশিদের একটি চেকমুড়ি সংরৰণ করিবেন৷

শাস্তি:
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রন অধ্যাদেশ ১৯৯১ এর ধারা-২৩ এর (ক) ধারা ৮ বা ৯ এ বিবৃত কারণ ব্যতিরেকে অন্য কোন কারণে মানসম্মত ভাড়া অপেৰা অধিক ভাড়া প্রত্যৰ বা পরোৰভাবে গ্রহণ করেন তাহলে (অ) অনুযায়ী প্রথমবারের অপরাধের জন্য মানসম্মত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায়কৃত টাকার দ্বিগুন পর্যনত্ম অর্থদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং পরবর্তী প্রত্যেকবারের অপরাধের জন্য উক্ত অতিরিক্ত টাকার তিনগুন পর্যনত্ম অর্থদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন৷

ধারা-২৭৷ রশিদ প্রদানে ব্যর্থতার দন্ডঃ যদি কোন বাড়ি-মালিক ধারা ১৩ এর বিধান অনুসারে ভাড়াটিয়াকে ভাড়া গ্রহণের লিখিত রশিদ প্রদানে অস্বীকার করেন বা ব্যর্থ হন, তাহা হইলে তিনি ভাড়াটিয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে আদায়কৃত টাকার দ্বিগুন অর্থদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন৷

কোথায় অভিযোগ করা যাবেঃ
ধারা-৩০ এর বিধান অভিযুক্ত বাড়িটি যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার জেলা জজ আদালতে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে আপীল রম্নজু করা যাবে৷

পরিশেষে বলব আমাদের সরকারের উচিত্‍ বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রতে কিছু কঠোর সিদ্ধানত্ম নেওয়া৷ বাড়ি মালিকদের ভাড়া বৃদ্ধিতে স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধে সরকারকেই কার্যকর পদৰেপ নিতে হবে৷ আমাদের সাধারন মানুষের নাগরিক জীবনকে স্বাচ্ছন্ধ করতে সরকারকে বর্তমান আইনের যথাযথ প্রয়োগসহ যুগোপযোগী কিছু ধারা আইনে সংযুক্ত করতে হবে৷ ভাড়া বৃদ্ধির স্বেচ্ছাচারিতা আর চলতে দেয়া যায় না৷ সরকারকে যেমন এ ব্যাপারে গভীর ভাবে ভাবতে হবে, তেমনি ভাড়াটিয়াদেরও সংঘবদ্ধ হয়ে এর প্রতিকার চাইতে হবে৷

মোঃ ফয়সাল আহম্মদ
জেলা সমন্বয়কারী
রোড টু রাইটস প্রকল্প
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাসত্মবায়ন সংস্থা, চট্টগ্রাম ইউনিট৷