ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

এই লেখাটি সকলের জন্যই আমার পক্ষ থেকে একটি স্বেচ্ছাশ্রম হিসাবে উপহার স্বরূপ। এমএলএম এর প্রতি যাদের বিশ্বাস আছে তারা এবং যারা এর বিরোধী তাদের সকলের প্রতি আমার এ সবিনয় নিবেদন। যারা এই দর্শনে বিশ্বাসী তারা আমার এই চিন্তাধারার মাধ্যমে মোটেই বিভ্রান্ত হবেন না। আমি আপনাদের বিশ্বাসকে মোটেই খাট করে দেখিনা। কারণ আপনাদের বিশ্বাস তৈরী হয়েছে আপনাদের জ্ঞান, চিন্তাধারা, পারিপার্শিক প্রভাব, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নিজেকে স্বাবলম্বী করার ইচ্ছা, আপনার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার কোন এক মুহুর্তে আপনাকে কি বোঝানো হয়েছিল যে কারণে আপনার গভীর বিশ্বাস তৈরী হয়েছিল ইত্যাদি আরও অনেক কিছুর সমন্বয়ে। সুতরাং এতে আপনার কিছুমাত্র দোষ বা কৃতিত্ব কোনটাই আছে বলে মনে করি না। আপনি বাস্তবনার ক্রিড়নকে পরিণত হয়েছেন। আপনি আপনার বিশ্বাস নিয়ে থকুন আর আমি আমার বিশ্বাস ও যুক্তিগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। আপনাদের কাছে অনুরোধ পুরোটা পড়ুন এবং নিজের বিবেচনা দিয়ে চিন্তা করুন।

** এমএলএম মানবিক বা আত্মিয়তার সম্পর্ক নষ্ট করে:

এমএলএম-এর প্রথম পাঠে আপনাকে বলা হয় একটি দ্রব্য কিনে সদস্য হতে হবে। আপনি হলেন। মানে আপনি তখন ক্রেতা। দ্বিতীয় কাজ- এখন আপনাকে আরও দুজনকে সদস্য করতে হবে। মানে আপনি এখন বিক্রেতা, দুজন ক্রেতা জোড়ার করবেন। তাহলে আপনার পাতে কিছু অর্থ জুটবে। আপনি কাকে বলবেন সদস্য হবার জন্য? আপনাকে বলা হয়- আপনার আপনজন, আত্মিয় পরিজন, পরিচিত বন্ধুবান্ধব, সহপাঠি এভাবে ক্রমান্বয়ে স্বল্প পরিচিত ব্যক্তির কাছে এই প্রস্তাব করবেন। কারণ আপনজনরা আপনার কথা ফেলতে পারবেনা। তারা আপনার ভালর জন্য ভালমন্দ বিবেচনা না করে, কিছু না বুঝে, অনিশ্চিতভাবে সামান্য কিছু যদি আয় হয়েই যায় ইত্যাদি ভেবে আপনাকে আপনার চাহিদামতো কিছু টাকা দিয়ে আপনাকে বিদায় করলো। মানে আপনি আপনার ভাই বা বোন বা স্ত্রী বা বাবা অধবা মায়ের কাছে কোন জিনিস বিক্রি করলেন। এভাবে যদি ভেবে দেখেন আপনার গর্ভধারিনী মায়ের কাছে কোন দ্রব্য বিক্রি করলেন। চিন্তা করেন, বিক্রি করলেন কি না? আপনার মায়ের লাভ হবে কি হবেনা সেটা একটু পরে ভাবেন। ঐ স্তর পর্যন্ত যদি চিন্তা করেন তাহলে উত্তরটা দাঁড়াবে হ্যা, বিক্রি করলাম। তহলে মা এবং ছেলে বা মেয়ের সম্পর্ক দাঁড়ালো বিত্রেতা এবং ক্রেতার সম্পর্ক। আপনি হয়তো এই বিষয়টা ভেবেই দেখেননা। কারণ আপনাকে বলা হয়, আপনি আপনার মাকেইতো প্রথম ঢোকাবেন- কারণ অল্প কিছুদিনের মধ্যেইতো আপনি লাভবান হবেন এবং আপনি লাভবান হলেতো আপনার মা লাভবান হবেন। আপনি দেখছেন আপনার, আপনার পরিবারের, আপনার পরিচিতজনদের লাভ বিবেচনা (এমএলএম কোম্পানীর প্রচারকদের মতে) করে আপনি চেষ্টা করবেন তাদেরকে আগে ঢোকাতে। আপনি একে একে আপনার মা, বোন, স্ত্রী, ভাই, ভাগনে এরকমভাবে পর্যয়ক্রমে নিম্মগামী পরিচিতজনদের ঢোকাতে চাইবেন। কাউকে পারবেন, কাউকে পারবেননা। তবে আপনার পরিবারের সদস্যদের কিন্তু অবশ্যই ঢোকাতে পারবেন। আপনাকে এও বলা হয়, নিজের পরিবারের সদস্যদেরই যদি না ঢোকাতে পারেন তাহলে আর এমএলএম করে কি কৃতিত্ব দেখালেন। তারপর আপনার মা তাঁর মা, বাবা, ভাই, বোন এভাবে ক্রমান্বয়ে নিম্নতম পরিচিতজনদের ঢোকাবেন। তাঁর সম্পর্কও তাঁর পরিচিতজনদের সাধে তখন দাঁড়াবে ক্রেতা এবং বিক্রেতা হিসাবে। একসময় দেখা যায় আপনার পরিচিতজনরা আপনার কাছ থেকে দূরে সরতে থাকে আপনাকে আপদ ভেবে। এভাবে তাদের সাথে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে আপনি হয়তো আপনার পরিচিতজনের কাছে মালামাল বিক্রয় করে সময়ীক কিছু টাকা পেয়ে ভাবছেন দু’এক কদম এগিয়েছেন, কিন্তু অন্যরা আপনার মতো মটিভেটেড নয় তাই তারা লাভবান হয়নি এবং ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন। তখন আপনি টাকা ছারা কারও সাথে সম্পর্ক রাখতে চান না- এমন মনোভাব সৃষ্টি হয়। আপনার আত্মিয় এমনকি পরিবারও তখন যদি আপনার কাছে আত্মিয়তার সুবাদে অর্থ দাবী করে তখন তা আপনাকে পিড়িত করে এবং তাদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়। আপনি একা হয়ে পরেন এবং পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পরেন এমএলএম- এর দিকে। সুতরাং খুব সুক্ষভাবে দেখলে আপনি দেখবেন যে আপনাকে লাভবান করে দেবার আড়ালে আত্মিয়তার যে পবিত্র সম্পর্ক ও আকর্ষণ তাকে এ ব্যবসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। আমি জানিনা আমার কথাগুলো সবাইকে বোঝাতে পেরেছি কি না।

** এমএলএম মানুষকে লোভী করে:

এমএলএম- এর মাধ্যমে মানুষকে লোভ দেখানো হয় যে অল্প সময়ের মধ্যে আপনি অনেক অর্থের অধিকারী হয়ে উঠবেন। মানুষকে অধিক লাভের লোভ দেখায়। বিনা পুজিতেঁ ব্যবসা করার লোভ দেখায়। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে সে লোভী এবং সে অতি অল্প সময়ে ও পরিশ্রমে অধিক আয় করতে চায়। মানুষের আরও অনেক সহজাত প্রবৃত্তি আছে সে বিষয়ে পরে আসছি। সুতরাং এ কারণে মানুষ লোভে পরে যায় এবং এমএলএম- এ জড়িয়ে পরে। অন্যদিকে পুঁজি ছাড়া ব্যবসা করার লোভও তাকে তাড়িত করে এমএলএম- এর দিকে। তবে একথাও সত্য যে পুজিঁ ছাড়া পৃথিবীতে কোন ব্যবসা নেই। যে বাদাম কিক্রি করে তারও পাঁচ সাতশ টাকার বেশি পুজি আছে। তবে পুজি ছাড়া দুটো পেশা আছে। আমরা তাকে ব্যবসা বলতে পারি কিনা জানিনা। আপনারাই বিবেচনা করেন- তাহল ভিক্ষা ও পতিতাবৃত্তি। তারা মানুষকে স্বপ্ন দেখায়, স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথও দেখায় তবে ব্স্তব আর স্বপ্ন যে এক নয় তা প্রথমে বুঝতে দেয়না। স্বপ্ন দেখা ভাল, স্বপ্ন মানুষকে অনেকদূর নিয়ে যায়। তবে ভুল স্বপ্ন মানুষকে ভুলপথে তাড়িত করে এবং তার পরিনতী হয় মারত্মক।

** “ব্যয় বুঝে আয় কর”- ধারণাটি সঠিক নয়:

ব্যয় বুঝে যদি আয় করা যেত তাললে মানুষের আর কোন অভাব থাকতো না। এ কথাটি বাস্তব বা যুক্তিসঙ্গত কোনটাই নয়, তবে শুনতে সুন্দর এবং কথাটির মধ্যে নতুনত্ব আছে। এজন্য অনেকেই এই দর্শনটিকে গ্রহণ করে। এই কথাটির মধ্যে স্বপ্নের গন্ধ আছে এবং কথাটি অত্যন্ত উদ্দিপক ধরণের। কথাটির মাধ্যমে একজনকে উদ্দিপ্ত করা যাবে সহজেই। কারণ এটা আমাদের সকলের মনের একান্ত চাওয়া। আমরা চাই আয় এবং ব্যয়ের সামঞ্জস্য বিধান করতে। এটা আমাদের মনের সুপ্ত চাওয়া, যা আমরা কখনো খেয়াল করে দেখিনা। কারণ মানুষের চাওয়ার শেষ নেই। আবার এও সত্য মানুষ যাহা চায় তাহা পায়না। তাই এমএলএম- এ বিক্রেতারা চিরন্তন ও শাশ্বত এবং সাধারণ একটা কথা “আয় বুঝে ব্যায় কর” এটিকে ভুল বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু এটা ভুলে যান যে, যা শাশ্বত তা চিরঞ্জীব। আর সাধারন কথার অর্থ কিন্তু “মামুলী বা মূল্যহীন কথা” নয়, সাধারণ কথা মানে হলো সর্বসাধারণ কর্তৃক স্বীকৃত ও পারীক্ষিত সত্য কথা। এই কথার সাথে নতুন কথা যোগ হতে পারে তবে তা থেকে কিছু বিয়োগ হবেনা।

** কোম্পানীর কর্ণধারদের আইডিয়াটা সৃষ্টিশীল হলেও যারা এর ক্রিড়নক তারাদের কাজটি সৃষ্টিশীল নয়:

এমএলএম- এর আইডিয়াটা সৃস্টিশীল। নইলে এর কর্ণধাররা যেখাবে তাদের আইডিয়া কাজে লাগিয়ে কতগুলো মানুষকে তাদের তথাকথিত পণ্য স্বাআগ্রহে বিক্রি করাচ্ছে এবং ক্রেতারা সাধারণ ক্রেতার মতো যাচাই বাছাই করে কেনার বদেলে বিবেচনাহীনভাবে কিনছে, যা অন্য কেউ করতে পারছে না। কিন্তু যারা এর ক্রেতা ও বিক্রেতা তাদের কাজটি কোন সৃষ্টিশীল কাজ নয়। কারণ কেনা এবং বেচা এটাকে সৃষ্টিশীল ও কল্যাণকর ব্যবসা বলা যাবেনা। সৃষ্টিশীল ও কল্যাণকর ব্যবসা হল উতপাদনমুখী ব্যবসা। এটি কেনাবেচার চেয়ে অধিক লাভজনক। কারণ এতে উতপাদন, কেনা, বেচা এরকম ত্রিমুখী জিনিস সমন্বীত থাকে। যেমন, গীতিকার গান লেখে, সুরকার সুর করে, বাদকদল বাজায়, গায়ক গান গায়, রেকর্ডিং কোম্পানী তা বাজারজাত করে, ছোট দোকানীরা তা বিক্রয় করে। এখন আপনি দেখুন কোনটা সৃষ্টিশীল ও লাভজনক? বাংলাদেশের সব মানুষ শুধু যদি বিদেশী গানের গানের সিডি নিয়ে এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তির কাছে বিক্রয় করে তাহলে সে সামান্য লাভ অবশ্যই পাবে তবে তবে তার ফলে এক সময় নিজেদের কোন গান থাকবেনা। তারা গায়ক হবেনা শুধু হবে গানের সিডি বিক্রেতা। কারণ এমএলএম তো সবাইকে স্বপ্ন দেখায় একদিন বাংলাদেশের সবাই এমএলএম- এর সদস্য হবে। এবং অন্যান্য কাজের পাশাপাশি তারা হবে মূলত বিক্রেতা শুধু সেই সমস্ত পণের যা তাদের গুরু তাদের হাতে তুলে দেবেন। সুতরাং আপনি হবেন তাদের দাস ক্রেত এবং বিক্রেতা দাস।

** এই ধারণাটা সৃষ্টিশীল বা বিদেশ থেকে আমদানী হয়েছে তা বলা যাবেনা:

একসময় গ্রাম দেশে যাত্রা বা পালাগান বা হাউজি টাইপের অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি করার একট পদ্ধতী ছিল। তাহল, আপনি এটা টিকেট কিনে যদি আরও দুজনের কাছে দুটো টিকিট বিক্রি করতে পারেন তাহলে আপনি একটি টিকিট ফ্রি পাবেন এবং আপনি যাদের কাছে দুটো টিকিট বিক্রি করলেন তারা যদি অনুরূপভাবে দুটো দুটো চারটে টিকিট বিক্রি করতে পারে তবে তারাও একটি করে টিকিট ফ্রি পাবেন। এখন আপনি হিসেব করে দেখেন যে আপনি যদি এই টোপ গেলেন তবে বিক্রেতা তিনটি টিকিটের মূল্যে চারটি টিকিট বিক্রি করছে। সে হিসেবে সহজ করে বললে বলা যায় চারটি কিনলে একটি ফ্রি। এটাকেই ঘুরিয়ে বলছে এভাবে। পার্থক্য শুধু একটাই এর মাধ্যমে জিনিস বিক্রয় করার একটা চেইন বা বাংলায় বললে শিকল তৈরী করছে যা আপনাকে শিকলে বেঁধে ফেলছে। সে বিবেচনায় এটা নতুন কোন পদ্ধতী নয় বা এটা বিদেশ থেকে আমদানীকৃত কোন ফর্মূলা নয় যে আমরা তাকে বিদেশী উর্বর মস্তিস্ক থেকে উদ্ভুত কোন সুফলা বীজ ভেবে জমিতে রোপন করবো। কারণ সুফলা বীজ প্রথমবারই কেবল অধিক ফলন দেয়, কিন্তু বীজ হিসাবে দ্বিতীয় বছর আর তাকে বীজ হিসাবে ব্যবহার করা যায়না। তাই বলা যায় প্রয়াত রাজনীতিবিদ এম সাইফুর রহমানের কাছে মঙ্গা শব্দটা অজানা, নতুন ও অবোধ্য মনে হলেও মঙ্গাপিড়িত সাধারণ মানুষের কাছে তা কিন্তু নতুন নয়।

** পণ্যের মান খারাপ:

এমএলএম- এর বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে যেসব পণ্য দেখা যায় সেগুলোর মান যাচাই করলে দেখা যাবে তা এতটাই নিম্নমানের যে সাধারণভাবে দোকানে কিনতে গেলে আপনি বিনা পয়সায়ও ওই পণ্য কিনবেন না। যেমন ইস্ত্রি। এর তার দেখবেন দুই ফুট লম্বা। সাধারণভাবে যেখানে তা থাকে ছয় ফিট। নাড়া দিলে ইস্ত্রির ভেতরে দেখবেন ঘটঘট শব্দ হয়। পণ্যগুলো দেখবেন অপপ্রয়োজনীয়। যেমন কালিজিরার তেল। যেদেশে মানুষ ভাত খেতে ভাত পায় না সেখানে দামী কালিজিরার তেল তার খেতে হবে কেন। করণ গরীব লোক অর্থ উপার্যনের জন্য এমএলএম করবেন। কিন্তু সে কিনবে কালিজিরার তেল। ধলী লোক তা কিনতে পারে, কারণ তিনি ভোগের মাত্রা বৃদ্ধি করে নিজেকে সুস্থ রাখার তাগিদে এই তেল কিনতে পারেন তবে তার সদস্য হবার দরকার নেই যেহেতু তিনি ধ্বনী। আপনি এখন নিশ্চয়ই বলবেন এমএলএম গরীবের জন্য নয়। সচেতন, শিক্ষিত কর্মক্ষম এবং কর্মেলিপ্ত লোক সাইড ইনকাম হিসাবে এমএলএম করবে। ব্যয় বুঝে আয় করবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে অধিক আয়ক্ষম লোক আরও অধিক আয় করছে। এতে বিত্তবৈষম্য প্রকট হবার আকাংখা থেকে যায় নয় কি?

** অলস ও কর্মহীন উপাযৃনের লোভ দেখায় বা শিক্ষা দেয়:

একজন ধার্মিক লোক ধর্মকর্ম করে স্বর্গে যাবার আসায়। মানে সে ইহকালে ধর্ম- কর্ম মানে পরিশ্রম করে যাবে তবে পরপারে সে স্বর্গবাসী হবেন। তাই বিশ্বাসী মানুষ ধর্মকর্ম করেন পরকালে শান্তিতে বা কর্মহীন সুখী জীবন লাভের আশায়। এমএলএম ও তাই। আপনাকে বলা হয় আপনি কাজ করতে করতে পিএসডি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেই মুক্তি। তারপর আপনি বসে বসে টাকা আয় করতে পারবেন। তার মানে পিএসডি এর পূর্ব পর্যন্ত সময় হল ইহকাল আর পিএসডি এর পরের সময় হল পরকালের স্বর্গ। আর সে স্বর্গের দুরত্ব বেশিদূরে নয় মাত্র দু,এক বছর। ভাল করে কাজ করলে তা আরও কম। তাই সবসময় আপনার মনে থাকে ওই পর্যন্ত কোনমতে পৌঁছাতে পারলেই আমি কর্মহীন আয় করে অলস জীবনযাপন করতে পারবেন। আর যারা এই স্বপ্ন দেখেন যে এক সময় বাংলাদেশের সকল মানুষ এমএলএম- এর সদস্য হবেন তাহলে তাদের উদ্যেশ্যে বলি আপনার অবস্থাটা একটু কল্পনা করুনতো- বাংলাদেশের সব মানুষ পিএসডি। তারা সবাই বসে বসে আয় করে, তাই তারা সবাই মনের আনন্দে ঘুরে বেরায়। ঘুরে বেড়াচ্ছে গুলিস্তান, ফার্মগেট, মিরপুর, উত্তরা…। নতুন শিশুটি জন্মাবার সাথে সাথেই এমএলএম- এর সদস্য হয়ে যাবে কারণ সম্প্রতি এমএলএম এমন একটি পণ্য এনেছে যা একদিনের বাচ্চা থেকে শুরু করে নিরানব্বই বছর বয়স পর্যন্ত খাওয়া যায়… যেখানে ডাক্তাররা বলেন, ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ ছাড়া কিছুই না খাওয়াতে…

** মহিলারা প্রথম টার্গেট:

এটা একটা পুরোনো ও চিরাচরিত রীতি যে সকল কিছু প্রথমে মহিলাদের মাধ্যমে বিক্রয় বা প্রচার কর। যেমন: লেইস-ফিতা, হারিপাতিল বিক্রি বা সিটকাপড়ওয়ালা। এরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এসব বিক্রি করে কারণ সাধারণত গ্রামের সহজ সরল মহিলারাই বাড়িতে থাকেন। তারা ক্রেতা হিসাবে তেমন পারদর্শী হন না। তাই কর্তা মশাই বাজার থেকে যে পণ্য একশ টাকায় কেনে, তিনি ঘরে বসে তা কেনেন আশি টাকা দিয়ে। কিন্তু তিনি বোঝেননা যে দেখতে একরকম হলেও জিনিস কিন্তু এক না। যেকোন এনজিও বা সমিতির সদস্য করা হয় প্রথমে মহিলাদের। এখনে মহিলাদের এগিয়ে নেবার প্রশ্নও রয়েছে, রয়েছে মহিলাদের সহজে কাবু করার প্রশ্ন্ও। তাই দেখা যায় নতুন ক্রেতা হিসাব মাহিলারাই তাদের প্রথম পছন্দ।

** ক্রেতা এবং বিক্রেতা সংঘ:

এমএলএম কে কোন ব্যবসা না বলে আমরা বলতে পারি ক্রেতা বা বিক্রেতা সংঘ। এর সদস্যরা একাধারে ক্রেতা এবং বিক্রেতা শ্রেণী তবে তারা সংগবদ্ধ ও সম্মোহিত। এতেকরে তারা যে স্বপ্ন দেখায় যে তারা সাবানের কোম্পানী করবে, বিমান করবে, তেল তৈরী করবে, গাড়ী তৈরী করবে, পত্রিকা প্রকাশ করবে, টিভি চ্যানেল তৈরী করবে (চ্যানেল উদ্বোধন করবে বিদেশী নামীদামী সুপার স্টার দিয়ে) এবং এই সংগবদ্ধ ক্রেতারা তা ক্রয় করবে গুন ও মান যাচাই করে। তাদেরকে বলা হবে প্রতিদিন নয়তো সপ্তাহে একটা পত্রিকা কিনলে সেটা যেন এমএলএম- এর হয়।

** বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে, পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে, পুজিঁবাদী বিশ্বে অচল:

বর্তমান পুজিবাদী ও পূণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারের নিয়ম হচ্ছে, গুণ ও মানে ভাল এবং দামে স্বশ্রয়ী দ্রব্যই প্রতিযোগিতা করে বাজারে টিকে থাকবে। অন্যদিকে এমএলএম নামক একটি কোম্পানী সকল ক্রেতাকে কিনে নিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো পণ্য বিক্রি করবে আর অন্যান্য কোম্পানী তা চেয়ে চেয়ে দেখবে তা হয়না। তাই কোম্পানীগুলো তাদের পণ্য বিক্রির পলিসি হিসাবে যে এমএলএম- এর আশ্রয় নেবে, একসময় তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে নিজেরাই তা ভেঙ্গে দেবে। সে সময় দূরে হলেও তা হয়তো বেশি দূরে নয়।

** সব সময় নিচের সকল সদস্যের যোগফল উপরের সকল সদস্যের যোগফলের চেয়ে এক বেশি:

যদিও আমি গণিতে ভাল নই তবুও দুর্ব গাণিতিক মগজে একটা গণিতিক হিসাব আপনাদের দেখাবো। লাভবান এবং ক্ষতিগ্রস্ত লোকের সংখ্যা। সাধারণত এমএলএম-এর ধারণা বোঝানো হয় ▲ এরকম একটি ত্রিভুজ দিয়ে। ত্রিভুজের একদম চুড়ায় আপনি, তার নিচে দুইজন, তার নিচে চারজন, তার নিচে আটজন এভাবে চলতেই থাকবে। নিচের দিকে যত বাড়বে আপনি তত উপরে উঠবেন। কিন্তু আপনি আর নিচে না গিয়ে নিচের সারিতে আটজন পর্যন্ত হিসেব করে দেখেনযে, সবচেয়ে নিচের সরিতে আছে আটজন। তারমানে তারা বর্তমানে (যতক্ষণ পযৃন্ত না সে তার নিচে মা, বোন জাতীয় কাউকে ঢুকায়) ক্ষতিগ্রস্ত কারণ তার ক্রেতা অবস্থায় আছে বা আয়ের মুখ দেখেনি। আর সামান্য-০৪, মোটামুটি-০২ ও কিয়দংশ-০১ আয়ের মুখ দেখা লোকের সংখ্যা হলো সাত। এভাবে আপনি যত নিচেই যাবেন দেখবেন সবচেয়ে নিম্নস্থরের মোট সংখ্যা উপরের সকলের মোট সংখ্যার চেয়ে এক বেশি। সুতরাং বলা যায় যে সব সময় ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যাই বেশি থকবে যদি এই ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে। এতো গেল গণিতের হিসাব। কিন্তু বাস্তব অবস্থা আরও ভয়াবহ। কারণ কিছু উপরে গেলেই তার সংখ্যা আরে বেড়ে যায়। আবার মাঝপথে এসে ক্ষান্ত দেয় এমন সংখ্যাই বেশি, যাদের টাকা চিরদিনই বেড ডেব-এর মতো মালিকের পকেটে চিরতরে ঢুকে যায়।

** বুদ্ধি হলো অস্ত্র:

এমএলএম- প্রবক্তারা বৃদ্ধিমান বটে। করণ তা নইলে এত বুদ্ধিমান লোক এই ধারণার বশ:বর্তী হয়ে তাদের অনুসারী হচ্ছে কেন। তবে তারা তাদের এই বুদ্ধি খাটিয়েছেন মানুষকে নিজেদের আয়ত্বে এনে স্বাধীনতাহীন শৃংখলিত ক্রেতা বানাতে। এরিষ্টটল বলেছেন, সকল পশুপাখির শরীরে অস্ত্র রয়েছে কেবল মানুষ ছাড়া। কিন্তু বুদ্ধি হল মানুষের এক ধরনের অস্ত্র। পশুপাখি তাদের অস্ত্র কখনো কাজে লাগায় আত্মরক্ষার জন্য আবার কখনো তা ব্যবহার করা হয় শিকার ধরার জন্য। মানুষও তাই সে তার বুদ্ধি কখনো ব্যবহার করে কল্যাণের জন্য কখনো তা ব্যবহৃত হয় মানুষকে তার শিকারে পরিণত করার জন্য। তাই বুদ্ধিমান মানুষ একাধারে কল্যাণকর আবার তা ভয়ের কারণও বটে। তবে শ্বাসত এই যে, মহিসের সম্মিলিত আক্রমণে কখনো কখনো বনের রাজা সিংহও পিছু হটে..

উপরের যে বাক্যটি শিরোনাম হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে তার দুটো অর্থ দাড় করানো যায় উচ্চারণের তরতম্য ঘটিয়ে।
যেমন:
এমএলএম- কেন নয়? মানে হতে পারে কি কারণে আপনি এমএলএম- কে সমর্থন করবেন না। আবার-
এমএলএম- কেন নয়! মানে হচ্ছে, এমএলএম করবো না কেন, করলে ক্ষতিটা কি! এরকম
তাই বলছি বক্য একটিই অথচ অর্থ ভিন্ন হতে পারে কেবল চিহ্ন বা উচ্চারনের ভিন্নতায়। কারও উচ্চারনে এক অর্থ হয়, কারো উচ্চারণে অন্য অর্থ, কেউ এক কথার একরকম অর্থ করে আবার কেউ অন্য অর্থ। কোনটা ঠিক আর কোনটা ঠিক নয় তা বিচারের দায়িত্ব পাঠকুলের জন্য সংরক্ষিত। আবার একথাওবা কিভাবে বলি যে, এটাই ঠিক, কারণ মানুষ মাত্রই ভুল আছে, আর আমরা কতটাইবা জানি, আমরা আসলে কিছুই জানিনা, আমরা আসলে ধারণা করি, কখনো ঠিক বা ভুল। তাই বলছি এর সবই আমার ধারণা। এ ছাড়াও আরও অনেক বিষয় আছে যেগুলো চিন্তা করলে আমার কাছে মনেহয় যে এমএলএম- ভাল কোন ধারনা বা কর্মপদ্ধতী নয়। এর চেয়ে খাস জমিতে ঘাস চাষ করে তা বিক্রি করলেও গরুর উতপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং বিদেশ থেকে গরুর আমদানী কমবে। অন্যদিকে এতে দেশ ও ব্যক্তির অনেক উন্নতি হবে বলে আমার বিশ্বাস।