ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

বাংলাদেশ মানে জলবায়ুর করালগ্রাসের ছোবলের অপেক্ষায় একটি দেশ, রাজনীতির হানাহানিতে জর্জরিত যে দেশটি, দুর্নীতিতে সর্বদাই প্রথম সারির যে দেশটি ।
কিন্তু এসব কিছুকেই ছাপিয়ে যে দেশটি তরতর এগিয়ে যাচ্ছে শীর্ষ অর্থনীতির দেশের কাতারে । যার কারিগর নাকি এদেশের নিরন্তর পরিশ্রমী মানুষগুলো । রাজনীতির হানাহানির মধ্যেও যার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার অবাক করার মত !!!! হয়তো রাজনীতিক স্থিতিশীলতা থাকলে এ হার একটুকু বৃদ্ধি পেতো । বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এরকমই কিছু পূর্বাভাস করা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় । তার মধ্যে কয়েকটি নিচে উল্লেখ করলামঃ

বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি পথ। একটি হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। আরেক পথ ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ছাড়িয়ে যাওয়া। আর সর্বশেষ পথটি হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে পশ্চিমা বিশ্বকে ছাড়িয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ কোন পথে যাবে?

বিশ্বব্যাংক মনে করে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পক্ষে মধ্য আয়ের দেশে উত্তরণ সম্ভব। লন্ডনের দৈনিক পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতামত নিয়ে লিখেছে, বাংলাদেশ ২০৫০ সালে পশ্চিমা বিশ্বকে ছাড়িয়ে যাবে। এ দুটি বিষয় নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে। স্বপ্নের বাংলাদেশ নিয়ে সর্বশেষ পূর্বাভাসটি দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তা-ও আবার কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয়, সরকার নিজেই।

ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্স কাউন্সিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি সংস্থা। তাদের একটি প্রধান কাজ হচ্ছে, চার বছর পর পর নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং সম্ভাব্য কৌশল নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ হবে চীন। বড় অর্থনীতির দেশ হবে ভারতও। ইউরোপ, জাপান ও রাশিয়ার মতো বড় অর্থনীতিগুলোর শ্লথগতি অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ, ব্রিকস দেশগুলোর (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন) মধ্যে একটি ছাড়া সবাই অনেক দূর এগিয়ে যাবে। তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানকে ছাড়িয়ে যাবে। প্রতিবেদনে এর পরই রয়েছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ।
২০০৫ সালে বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাক্সের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নেইল ব্রিকসের ধারণা দিয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ব্রিকস ছাড়া তিনি সম্ভাবনাময় আরও ১১টি দেশের কথা বলেছিলেন। এ দেশগুলোর অর্থনীতিও এগিয়ে আসছে বলে তাদের বলা হয়েছিল ‘নেক্সট ইলেভেন’। দেশগুলো হচ্ছে: বাংলাদেশ, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও ভিয়েতনাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ নেক্সট ইলেভেন সম্মিলিতভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশকে ছাড়িয়ে যাবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে শক্তিধর দেশ হয়েই থাকবে। তবে সামগ্রিকভাবে এশিয়া ছাড়িয়ে যাবে সবাইকে। বলা হয়েছে, ব্রিটেনের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করতে ১৫৫ বছর লেগেছিল, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের লেগেছে ৩০ থেকে ৬০ বছর। অথচ অনেক বেশি জনসংখ্যা নিয়েও ভারত ও চীনের তা লাগছে ২০ বছর। বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা বাড়লেও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরও কমবে। এখন দিনে এক ডলার ২৫ সেন্টের কম আয় করে—এমন মানুষের সংখ্যা ১০০ কোটি। আগামী ২০ বছরে এর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসবে। আর বাড়বে মধ্যবিত্তের সংখ্যা। এখন বিশ্বে মধ্যবিত্ত আছে ১০০ কোটি, এ সংখ্যা বেড়ে হবে ৩০০ কোটি। মধ্যবিত্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বাড়বে এশিয়ায়। বিপুলসংখ্যক এ মানুষের ক্রয় ক্ষমতাই বাড়াবে প্রবৃদ্ধি। সে সময় বিশ্বের জনসংখ্যা হবে ৮৩০ কোটি, যা এখন ৭১০ কোটি।
এমনিতেই বাংলাদেশের উন্নয়নকে বিস্ময় বা ধাঁধা বলা হয়। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় তিন গুণ বেড়েছে, গড় আয়ু ৫০ থেকে ৬৫ হয়েছে। গণসাক্ষরতার হার দ্বিগুণ হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩ শতাংশ থেকে কমে দেড় শতাংশে নেমে এসেছে। ১৯৭৩-৭৫ সময়েও বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এমনকি ১৯৯০ সময় পর্যন্তও গড় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। সেই প্রবৃদ্ধি এখন ৬ শতাংশের বেশি।

তবে সামাজিক উন্নয়নের সূচকগুলোতেই সবচেয়ে বিস্ময়কর অগ্রগতি হয়েছে। যেমন, শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার হার অনেক বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এগুলো সম্ভব হয়েছে কারণ, বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়নসচেতন এবং সুযোগ পেলে সংগতির মধ্যে নতুন যেকোনো উন্নয়ন ধারণা পেলেই তারা গ্রহণ করে। যেমন, শিশুমৃত্যুর হার কমাতে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে খাওয়ার স্যালাইন।

নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন একাধিকবার লিখেছেন, সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ভারতের চেয়েও ভালো। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাংবাদিক সদানন্দ ধুম গত দুই বছরে তাঁর পত্রিকায় একাধিকবার লিখেছেন, বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, বরং অনেক দেশের জন্য অনুকরণীয় একটি দেশ।

স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপ থেকেই বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়েছিল। তখন কোনো অবকাঠামো ছিল না, প্রতিষ্ঠানও ছিল না। বলা হতো, বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ একটি উন্নয়নের পরীক্ষাগার। অর্থাৎ, এ রকম পরিস্থিতিতে যদি বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়, তাহলে পৃথিবীর যেকোনো দেশেরই উন্নয়ন সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় এখনো বাংলাদেশকে উন্নয়নের পরীক্ষাগার বলা হয়। তবে অন্য অর্থে। প্রশ্ন করা হয়, সুশাসনের এত অনুপস্থিতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব সত্ত্বেও বাংলাদেশে এত প্রবৃদ্ধি হলো কেমন করে? এ রকম প্রবৃদ্ধি রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার উন্নতি না হলেও ধরে রাখা যাবে কি না, এ বিষয়ে বাংলাদেশকে এখন উন্নয়নের পরীক্ষাগার বলা হয়।

আরেকটি ক্ষেত্রেও বলা যায়। এত স্বল্প মাথাপিছু আয়ের দেশে এত দিন ধরে ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক চর্চার নজির অন্য কোনো দেশে নেই। আশির দশকের শেষ দিকে অনেকগুলো উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রায়ণের জোয়ার বইছিল। কিন্তু সবাই তা ধরে রাখতে পারেনি। গণতন্ত্রের গুণগত মান যা-ই হোক, বাংলাদেশ ধরে রাখতে পেরেছে। এখানেই বাংলাদেশ আরেকটি পরীক্ষাগার। কারণ, এ রকম একটি স্বল্প আয়ের দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সুসংহতকরণ হাতে হাত রেখে চলতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। কেননা, স্বল্প আয় ও সুশাসনের অভাব পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণেই এটি একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে।
(সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো-০১-০১-২০১৩)

উল্লেখিত রিপোর্টে এই অগ্রযাত্রার স্থিতিশীলতা নিয়ে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে । যদিও এই অগ্রগতির পিছনে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কিছুটা ভূমিকা রেখেছে । আবার এ কথাও বলা হয়েছে, এই দেশটি যে অবস্থান থেকে শুরু করেছে, সেখানে এত ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক চর্চা অন্য কোন দেশে নেই । যা আমাদের জন্য সুখকর, সেজন্য আমাদের রাজনীতিক দলগুলো সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য । তাদের আর একটু সহনশীলতা, সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চাই পারে মেহনতি মানুষগুলোর পরিশ্রম সার্থক করতে, যা পূর্বাভাস করেছে বিশ্লেষকরা ।

নতুন এই আশাবাদ যেন বছরটা জুরে আমাদের আরও আশাবাদি করে, এটাই হোক রাজনীতিক আমাদের নতুন বছরের প্রথম পুরস্কার ।