ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আমার গ্রামের বাড়ি বরিশাল।অফিসের ব্যস্ততায় সময়-সুযোগের অভাবে অনেক দিন গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয়না। বাবা-মা মেডিক্যাল চেক-আপ বা বেড়াতে ঢাকা আসে তাই বাড়িতে যাওয়ার খুব একটা তাগিদও অনুভব করিনা। তাছাড়া মোবাইলে তো প্রায় প্রতিদিনই কথা হয়।তারপরও ব্যস্ত জীবনে একটি ভিন্নতা আনার জন্য বাড়িতে যাবার একটু সুযোগ যে খুঁজি না, তা নয়।তো অনেকদিন পর একটি উপলক্ষ্যও পেয়ে গেলাম।সেটি হল উপজেলা নির্বাচন।অধিকন্তু, সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের বিষয়টিও জড়িত।তাছাড়া, ইতোপূর্বে 5 জানুয়ারীর দশম সংসদ নির্বাচনে সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছি।তাই উপজেলা নির্বাচনকে ভোটাধিকার প্রয়োগের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নিলাম।একই সাথে বাড়িতে যাওয়ার কাজটাও হবে। ভাবলাম মন্দ না, রথ দেখাও হবে কলা বেচাও হবে।তাই সব ভাই মিলে ঠিক করলাম বাড়িতে যাব, যাতে একটা উৎসবের আমেজও থাকে।যথাসময়ে বাড়িতে যাই, অন্যান্য ভাইরাও চলে আসে। বাবা-মা একসাথে আমাদেরকে পেয়ে খুবই উদ্বেলিত।

ভোটের দিন সকাল বেলা ভোট দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছি।ভোট কেন্দ্র আমাদের গ্রামের হাইস্কুলে।বাবা-মাও যাবে আমাদের সাথে ভোট দিতে। ঘর থেকে বের হয়েছি এমন সময় দেখি গ্রামের অন্যান্য ভোটাররা ভোটকেন্দ্র থেকে ফিরে আসছে ভোট না দিয়েই।ভোট না দেবার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর সব এজেন্টকে মারধর করে বের করে দিয়েছে। সাধারণ ভোটারদের বলেছে- যারা আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীকে ভোট না দিবে তাদের ভোট দেবার দরকার নেই। অার কেন্দ্রে গেলে ভোট দিতে হবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সম্মুখে তাদেরকে দেখিয়ে।কেউ এর প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করে অপমান করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়!নির্বাচলে দায়িত্বরত পুলিশ এর কোন প্রতিকার তো করেই না;বরং সরকারীদলের নির্দেশ মত কাজ করে! প্রিজাইডিং অফিসারের অবস্থাও একই! তাই তারা ফিরে এসেছে।

আমাদেরকে ভোট কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করল। বলল, ওখানে গেলে ওদের কথা না শুনলে অপমান হয়ে বের হয়ে আসতে হবে।ভাবলাম, যেহেতু গ্রামে আমাদের পরিবারের একটা মান-সম্মান আছে, তাই কে কি করবে।আবার ঢাকা থেকে ভোট দিতে গেলাম আর কি-না ভোট না দিয়েই ফিরে যাব! যা আছে কপালে ভোট কেন্দ্রে যাব ভোট দিতে। অবশেষে তিনভাই একত্রে গেলাম ভোট কেন্দ্রে এবং দেখলাম একটি লাইনও আছে। লাইনে দাড়ানো সকলের হাতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর টিকেট।ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা আমাদের দেখে অাড়চোখে তাকাচ্ছে, কেউ কেউ এগিয়ে এসে বলল-আপানাদের লাইনে দাড়ানো দরকার নেই সরাসরি ভিতরে এসে ভোটটি দিয়ে চলে যান! আমরা বললাম, না, লাইনে দাড়িয়েই যথাসময়ে ভোট দিব।লাইনে দাড়িয়ে আছি এমন সময় দেখলাম দাড়ি পাকা ষাটোদ্র্ধ এক বৃদ্ধ নিজের ব্যালট পেপার বাক্সে না ফেলে হাতে নিয়ে দ্রুত বের হয়ে বের হয়ে আসছে! পেছনে সরকারী দলের কর্মীরা দৌড় দিয়ে মাঠে এসে বৃদ্ধকে জাপটিয়ে ধরল! তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, চাচা কি হয়েছে? চাচা বললেন- আমার ব্যালটে ওরা সিল মেরে দিয়েছে তাই আমি ব্যালট পেপার বাক্সে না ফেলে নিয়ে এসেছি! বৃদ্ধের নাতির বয়সী একটি ছেলে এসে দায়িত্বরত পুলিশকে নির্দেশ দিল- ”এ্যই বুড়ারে এ্যরেস্ট করেন! বুড়ায় ব্যালট পেপার চুরি কইর‌্যা লইয়্যা আইছে”। হৃদয়বান পুলিশ বৃদ্ধকে গ্রেফতার না করে তার কাছ থেকে ব্যালট পেপার নিয়ে ঐ ছেলের হাতে দিয়ে চাচাকে রাস্তায় উঠিয়ে দিয়ে বলল, যান চাচা বাড়ি যান।

একটু পরেই দেখি আরেকটি বুথের ভিতর থেকে এক যুবক আচমকা দৌড় দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে! পেছনে কেন্দ্র দখলের মহান দায়িত্বে নিয়োজিত (!) আওয়ামী কর্মীরা তাকে ঝাপটে ধরে কিল-ঘুষি-লাত্থি মারতেছে! তারপর পুলিশে সোপর্দ করল। ঐ যুবক পুলিশকে বলল- তার ব্যালট পেপারে সিল মেরে দিয়েছে তাই সে সিল নিয়ে পালাতে চেয়েছে! পেছন থেকে এক আওয়ামী নেতা হুংকার দিয়ে বলল-’ওরে মাইর‌্যা ওর আড় (হাড়) কাইট্যা সিল বানামু” এরই মধ্যে বুথের মধ্য থেকে আরেক নেতা জানান দিল সিল পাওয়া গেছে!অবশেষে তাকে ছাড়া হল!

এরই মধ্যে আমরা লাইনের সামনের দিকে বুথের কাছে চলে এলাম।ভিতরে দেখতেছি- যারা আগে ঢুকছে তাদের হাতে কালি মেখে ব্যালট পেপার প্রথমে আওয়ামী নেতার কাছে দেয়া হচ্ছে। তারপর নেতা সিল মেরে সেটাকে বক্সে ফেলার জন্য সংশ্লিষ্ট ভোটারকে দিচ্ছে! নির্দিষ্টি বিরতিতে দলবেধে সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা প্রতিটি বুথে ঢুকে মহড়া দিচ্ছে আর ভোট ডাকাতির কার্যক্রম অবাধ ও সুষ্ঠু ভাবে হচ্ছে কি-না তা তদারকী করছে! নারী-পুরুষ প্রতিটি বুথেই এ্কই পদ্ধতিতে অবাধ ও সুষ্টূ ভোটিং কার্যক্রম চলছে।মনে মনে ভাবলাম, এটাই তাহলে ডিজিটাল সরকারের ডিজিটাল ভোটিং পদ্ধতি!

নির্দিষ্ট সময় বুথে ঢুকলাম। প্রথমে বড় ভাই ঢুকল। তার পেছনে আমি, অামার পেছেনে ছোট ভাই। বড় ভাইকেও সিল মারা ব্যালট পেপার দেয়া হলে তিনি তা নিতে অস্বীকার করল। পরে পুলিং অফিসার আরেকটি ফ্রেশ ব্যালট পেপার ইস্যূ করল কিন্ত বুথের দখলি দায়িত্বে নিয়োজিত মূল সন্ত্রাসী নেতা সেটিতেও সিল মেরে দেয়। বড় ভাই অগত্যা সেটিকে নিয়ে আরেকটি সিল মেরে সেটিকে বাতিল করে দেয়।তাতে সে ক্ষেপে গিয়ে বলল -“আমনে এ্যাকজন শিকখিত মানুষ কিন্তু কাজটা করলেন অশিকথিতের মতন” তার জ্ঞান বিতরণ দেখে হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে পারছিনা। বড় ভাই বের হয়ে গেলে আমার পালা। কিন্তু এবার চেয়ারম্যান প্রার্থীর ব্যালট পেপারে সিল মেরে উক্ত নেতা আমার কাছে না দিয়ে নিজেই বাক্সে ফেলে দেয়।আমাকে বলে অাপনি চাইলে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীর ব্যালটে সিল মারতে পারেন! আমি সে দুটোতে সিল না মেরেই বাক্সে ফেলে দেই। রাগে-অপমানে অামি বের হয়ে আসি।আমাকে অনুসরণ করে ছোট ভাইও বের হয়ে আসে।

আমাদের বুথে সিল মারার দায়িত্বে ছিল এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও আওয়ামী নেতা যিনি নিজেকে একজন মু্ক্তিযোদ্ধা দাবী করেন! ইতোপূর্বে তাকে দেখেছি ঈদগাহ মাঠে দাড়িয়ে বিভিন্ন কেসসা-কাহিনী বলে নসিহত দিতে! মনে মনে বলেছি- যারা আমাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে আল্লাহ যেন ভবিষ্যতে তাদের ভোটাধিকারও কেড়ে নেন! আর এটাই সম্ভবত দুর্বলদের ফরিয়াদ! তবে সৌভাগ্য (!) যে, ইতোপূর্বে ভোট ডাকাতির কথা শুনেছি মানুষের মুখে-পেপার পত্রিকায়, আর এবার দেখলাম নিজের চোখে!