ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে পড়া-লেখার হাতেখড়ি।প্রাইমারী শিক্ষা শেষ করে মাধ্যমিক স্তরে উপনীত।শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে। মন-মানসে পরিবর্তণের ছোঁয়া।খেলা-ধুলার মধ্যে ছিল বিকেলে স্কুল মাঠে ফুটবল খেলা। আর বিনোদন বলতে রেডিওতে নাটক-নাটিকা আর গান শোনা।অঁজপাড়া গায়ে তিন-চার কিলোমিটারের মধ্যে একটি সাদা-কালো টেলিভিশন।টেলিভিশন দর্শন অনেকটা সপ্তাশ্চর্য দর্শনের মতন! তাই সহজলভ্য বিনোদনের জন্য রেডিওর ওপরই ভরসা।

সঙ্গত কারণেই কোন চ্যানেলে কোন দিন কয়টায় নাটক, কথন অনুরোধের আসর তা ব্রেনে প্রোগ্রাম করাই ছিল। নিমিষেই বলতে পারতাম এই মুহুর্তে কোন চ্যানেলে নাটক, কখন আধুনিক গান, কখন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিক্ষার আসর, কখন পল্লীগীতি, কখন দুর্বার অনুষ্ঠান, কখন সংবাদ ইত্যাদি অনুষ্ঠানমালা।সবছাপিয়ে যে অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করতাম তা হল অনুরোধের আসর। যতদুর মনে পড়ে এটা মঙ্গলবার রাত দশটায় রেডিও ঢাকা থেকে প্রচারিত হত। এ আসরে যে গানগুলোর অনুরোধ বেশি আসত তার মধ্যে শিল্পী বশির আহমেদ-এর উল্লেখ যোগ্য গান ছিল ‘কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো… সে কথা তুমি যদি জানতে…’,‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন’, ‘কত আশা ছিল মনে’, ‘আমাকে পোড়াতে যদি এতো লাগে ভালো’, ‘অনেক সাধের ময়না আমার’ ‘সজনী গো ভালবেসে এত জ্বালা কেন বল না,’ পিঞ্জর খুলে দিয়েছি, যা কিছু কথা ছিল ভুলে গিয়েছি’ ‘খুঁজে খুঁজে জনম গেল’-এর মতো কালজয়ী গানগুলো। উঠতি বয়স কিনা জানিনা তখন সবচেয়ে বেশী ভাল লাগত-‘কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো… সে কথা তুমি যদি জানতে…’-এই গানটি। নিজে কখনও চিঠি লিখে অনুরোধ জানাতে পারতাম না, তবে অপেক্ষা করতাম কখন এই গানটির অনুরোধ আসে। মনে পড়ে, সে সময় জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে বশির আহমেদ ছিলেন প্রথম সারির শিল্পী। বলাই বাহুল্য, আমার অত্যন্ত প্রিয় শিল্পীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

গ্রাম ছেড়েছি সেই কবে। এরপর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় শেষে চাকুরী এবং সংসার জীবনে প্রবেশ।রেডিও হয়ে গেছে বেতার । ডিজিটাল জীবনে নেটের কল্যাণে ফেইসবুক, টুইটার, ব্লগিং,বিভিন্ন সামাজিক মিডিয়া, অনলাইন সংবাদ ইত্যাদির ভীড়ে যেখানে টেলিভিশনের অবস্থাই করুণ তখন কে রাখে সেই কবেকার রেডিওর খবর! তবে রেডিও যে নেই তা কিন্তু নয়। এসেছেে নতুন প্রজন্মের এফ এম রেডিও। যতটুকু শুনেছি, তাতে এফ এম রেডিওগুলোতে শিল্পী বশীর আহমেদ এর মতো শিল্পীদের গান অনেকটা ভিনগ্রহের প্রাণীদের মতই কালে ভদ্রে শুনতে পাওয়া যায়। তাই ব্যস্ত জীবনে অনেকদিন শোনা হয়নি প্রিয় শিল্পীর সেই গানগুলো।

ভালবাসার বাঁধন কেটে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন প্রিয় শিল্পী বশীর আহমেদ। ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না’ইলাহে’রাজেউন।ক্ষণজম্মা এসব মানুষগুলো বাংলাদেশের সংস্কৃতির উজ্জল নক্ষত্র। মহান রাব্বুল আ’লামীন তাঁকে মাগফিরাত দিন, জান্নাত দান করুন।

প্রিয় শিল্পী বশীর আহমেদ এর মৃত্যুর খবর মনে করিয়ে দিল রেডিওতে ছোট্র বেলার সেই অনুরোধের আসর শোনার দিনগুলো। কে জানে অনুরোধের আসরে ভাল লাগা গানগুলোর সাথে কখন ভালবেসে ফেলেছি প্রিয় শিল্পী বশীর আহমেদকে।  উঠতি বয়সে ভাল লাগা বশির আহমেদের সেই গানটি অাজ তার মৃত্যুতে ভিন্ন আঙ্গিকে মনের গভীরে স্বয়ং শিল্পীকে নিয়েই অনুরণন তুলেছে-

‘কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো… সে কথা তুমি যদি জানতে…’