ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

আজ 24 এপ্রিল, 2014। ঠিক এক বছর আগে এই দিনে ঘটে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ ও হৃদয় বিদারক ট্রাজেডী; ঢাকার অদূরে সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনা। হতবিহবল হয়ে পড়েছিল সারা দেশ। অবাক বিশ্ব তাকিয়ে রয়- কিভাবে ইট-পাথর-কংক্রিটে চাপা পড়ে ধুলিস্যাত হয়ে যায় খেটে খাওয়া দীন-হীন মানুষের স্বপ্ন-সাধ! তথ্য-প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগেও আদম সন্তান ছাদের নিচে চাপা পড়ে হয়ে যায় স্যান্ডউইচ!

এটা কি নিছক দুর্ঘটনা? নাকি সমাজের বিত্তশীলদের অর্থ লালসার কাছে দিন আনা দিন খাওয়া দরিদ্র মানুষকে আত্নহুতিতে বাধ্য করা? কারণ দুর্ঘটনাতো কখনো বলে কয়ে আসেনা কিন্তু রানা প্লাজা ট্রাজেডীর আভাস পূর্বেই পাওয়া গিয়েছিল।   ঘটনার আগের দিন রানা প্লাজার ভবনের তৃতীয় তলায় পিলারে ফাটল দেখা দেয়। তখনই চারটি গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের ছুটি দেয়। ভবনের মার্কেট বন্ধ করে দেয়া হয়। ঐদিন দুপুরে পৌর মেয়র হাজী রেফায়েত উল্লাহ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা প্রধান প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রানা প্লাজায় যান, সবাই ভবনটির ফাটল দেখে বন্ধ রাখার পক্ষে মত দেন। উপস্থিত কর্মকর্তারা মতামত দিয়েছিলেন যে রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে বিশেষজ্ঞ এনে ভবনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু ভবন মালিক সাভার পৌর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানা ওরফে রানা ওই দিন সন্ধ্যায় রাজ্জাক নামে এক প্রকৌশলীকে (!) ডেকে আনে। ঐ প্রকৌশলী ভবনের ফাটল দেখে বলেন, ফাটল নিয়ে কোন সমস্যা নেই এবং ভবনে কাজ করা যাবে। রাতে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একই সুরে বললেন, এ ফাটলে কাজ করা যাবে। রাতে শ্রমিকদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয়।(সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক)

ঐ রাতের পরের ইতিহাস হচ্ছে আলোচিত এই রানা প্লাজা ট্রাজেডীর ইতিহাস। আমরা যারা টেলিভিশনের পর্দায় সেই ট্রাজেডীর লাইভ অনুষ্ঠান দেখেছি তারা দেখেছি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে থেকে অসহায় মানুষের বাঁচার জন্য ফরিয়াদ, দেখেছি সন্তানের জন্য মায়ের বুকফাটা করুন আর্তনাদ, শুনেছি স্বামীর কাছে বিদায় বেলা প্রিয়তমা স্ত্রীর আবদার- “আমাকে বাঁচাতে পারলে বাঁচাও, না পারলে আমার আমার সন্তানকে যেন কখনো গার্মেন্টসে কাজ করতে না পাঠাও” দেখেছি মৃত্যু বেলায় এসমাজের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে গার্মেন্টসকর্মীর নুপুর পড়া উদ্যত পা, দেখিছি জীবনের শেষ বেলায় স্বামী-স্ত্রীকে জড়িয়ে থেকে ইট-পাথরের চাপায় মৃত্যুর দেশে চলে যাওয়ার ছবি। শুনেছি সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের কাছে “নড়া-চড়া” থিওরি।

সেদিনের ঘটনায় আমরা আরো দেখেছি অসহায় দুর্ঘটনা কবলিত বাবা-মা, ভাই-বোনদের জন্য ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলার দামাল ছেলেদের জান বাজি রেখে উদ্ধার কাজে ঝাপিয়ে পড়ার দৃশ্য, দেখেছি সাহানাকে বাঁচাতে অদম্য সাহসী এজাজ হোসেন কায়কোবাদের নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়ার দৃশ্য। দেখেছি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে উদ্ধারকাজে সহযোগিতার দৃশ্য, দেখেছি এনাম মেডিকেল কলেজের ডাক্তারদের আহতদের বাঁচানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা।

সময়ের চাকা ঘুরে সেই বিভীষিকাময় ঘটনার বছর পূর্তি আজ। নিহত ১১৩৫ জন শ্রমিকের স্বজনদের তীব্র কষ্টের বছর পূর্তি হচ্ছে আজ। চার শতাধিক পঙ্গু শ্রমিকের তীব্র যন্ত্রণারও আজ এক বছর। ২,৪৩৮ জন আহত শ্রমিকের দু:সহ স্মৃতি বহনের প্রথম বার্ষিকী আজ। মা হারা, বাবা হারা অবুঝ সন্তানের মা-বাবা হারানোর বছর পূর্তিও আজ। এই এক বছরে মেলেনি দাফনকৃত ১০৫ জনের পরিচয়।

আজ এই বছর পূর্তিতেও ক্ষতিপূরণের দাবিতে কফিন নিয়ে মিছিল ও সমাবেশ করতে হচ্ছে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রানা প্লাজায় নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়া, নিখোঁজ শ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, আহত শ্রমিকদের চিকিত্সা ও পুনর্বাসন প্রদান, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রাপ্ত টাকার সদ্ব্যবহারের দাবিতে। অথচ এটাই কি হওয়া উচিত ছিল না যে, দূর্ঘটনার কবলিতদের ক্ষতিপূরণ ও সর্বাত্নক সহযোগিতা দিয়ে এই কষ্টকে ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্ট করা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হয়েছে ঠিক উল্টোটা- যাদের ভুলে যাওয়ার কথা ছিল না, তারা ঠিকই ভুলে বসেছেন ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কথা।