ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

আমরা বাংলাদেশি বাঙালি। আমাদের দেশ বাংলাদেশ। আমাদের দেশ ছাড়াও ভারতের কোলকাতায় আমাদের মত বাঙালির বাস। আলাদা দেশ বিধায় আমরা বাংলাদেশি আর কোলকাতার বাঙালিরা ভারতীয়। সংস্কৃতির প্রধান বাহন ভাষার মিল ছাড়াও দুই দেশের অধিবাসীদের মিল রয়েছে আরো অনেক। যাই হোক সে সব আজ আলোকপাত করছি না।

আমরা লক্ষ্য করি, আমাদের বাঙালি জাতির প্রায় অর্ধেক অধিবাসী নারী। সভ্যতার শুরু থেকেই নারী আর পুরুষ উভয়ে মিলে বর্তমানকে বিনির্মাণ করেছে, করছে। সব ক্ষেত্রেই যে নারী তার অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছে এমনটা নয়, বরং পুরুষ শাসিত আমাদের সমাজে নারীদের অবদানকে ভালভাবে দেখা হইনি, তাদের অবদানকে স্বীকার করা হইনি যথার্থভাবে। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বাঙালি নারী সমাজ এগিয়ে যেতে পারেনি বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে- এই ধারণা আমরা পোষণ করে থাকি। তবে আমি মনে করি, বাঙালি নারী সমাজ অনেক দূর এগিয়েছে। কত দূর এগিয়েছে সেটা বুঝতে হলে কোথায়, কোন অবস্থানে ছিল আমাদের বাঙালি নারী সমাজ সেটা দেখতে হবে। প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান নারীদের অবস্থা যদি লক্ষ্য করি তাহলে সেটা সহজেই অনুধাবন হবে।

প্রাচীন কালে বিভিন্ন বিশ্বাসীদের দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা আর ভয় দেখে প্রাথমিকভাবে বোধ হতে পারে- আমাদের বাঙালি নারীরা অনেক সম্মানের অধিকারী ছিল। কিন্তু বেপারটা ছিল পুরো উল্টো। প্রাচীন বাঙালি নারীরা ছিল পুরুষের শাসনের শৃঙ্খলে। মতের দাম বলতে যা বুঝায় তা মোটেই নারীদের ছিল না। নারীদের ভাবা হোতো ঘরের দাসী। সে কালে বিয়ে করতে যাবার সময় ছেলেদের মাকে বলতে হোতো- মা, তোমার জন্য দাসী আনতে যাচ্ছি। নারীরা বিচরণ করতেন কেবল ঘরে, বা বাধ্য হতেন। পর্দা করতেন ভীষণভাবে। বাড়ির উঠানে পর্যন্ত বিচরণ করতেন না, বা করতে পারতেন না। পর্দার এতটাই বাড়াবাড়ি ছিল যে, নারীরা স্বামীর ঘোড়াটির সামনেও যেতে চাইতেন না, পর্দা করতেন অপরিচিত নারীদেরকে ও । অনেকে অবশ্য বাঙালি নারীদের পর্দা প্রথার বেপারে মুসলিম শাসকদের দায়ী করেন, যদিও এর কোনো ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ নেই। প্রাচীন অভিজাত পরিবারের বাঙালি সব ধর্মের নারীরা সকলেই কঠোর পর্দা করতেন বা করতে বাধ্য হতেন। কেবল নিম্ন আয়ের নারীরা তেমন পর্দা করতেন না, বা করতে পারতেন না। সংসারের সচ্ছলতার কারণে স্বামীর সাথে নারীদের বাইরে কাজ করতেই হোতো। পর্দা কেবল উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীরা করতো। অর্থাৎ সেকালে পর্দা প্রথাটি ছিল আভিজাত্তের প্রতিক। রবীন্দ্রনাথের মা- সেও কঠোর পর্দা করতেন। তিনি গঙ্গাস্নানে যেতেন পাল্কিতে চড়ে, কিন্তু গোসলের জন্য পাল্কি হতে নামতেন না; বরং পাল্কির বেহারারা তাঁকে পাল্কিসহ গঙ্গার পানিতে চুবিয়ে আনতেন। তবে পর্দা প্রথা শুরু থেকেই বোধয় ছিল না, বিত্তবান পুরুষরা তাদের স্ত্রীদের বাইরে কাজ করতে দিতো না- ফলে নারীরা সেখান থেকে শুরু করল ঘরে থাকা।

যাই হোক, শুধু ঘরে বসে না থেকে ক্রমান্বয়ে নারীরা পর্দার কঠোরতা থেকে বেরিয়ে বাইরের যায়গাতে পুরুষের পাশাপাশি স্থান করে নেয়া শুর করল। তবে মোটেই তা সহজ ছিল না। পর্দাকে ভেদ করে বাইরে নানা কাজে নারীদের অংশগ্রহণকে সমাজ মেনে নিতে চাইনি। যেসব নারীরা সমাজে অবদান রাখলেন ডাক্তার, শিক্ষক বা উকিল হয়ে- সমাজ তাদের গ্রহণ করেছে কঠোর সমালোচনা আর ধিক্কারের সাথে। এমনকি নারীরাও নারীদের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে দারুণ সমালোচনা করতেন। নারীরা যে শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত হতে পারে- এমন ধারণাই সে সমাজে ছিল না। বরং নারীরা শিক্ষিত হলে তারা চরিত্রহীনা হবে, দ্রুত বিধবা হবে, সংসারের অমঙ্গল হবে, সংসারের কোন কাজই করবে না- এমন আরও ভয়ঙ্কর নানা কুসংস্কার বিরাজমান ছিল প্রাচীন বাঙালি নারীদের প্রতি। তাই সেখান থেকে খুব সহজে বের হওয়া যায়নি, অনেক সময় লেগেছে বর্তমান পর্যন্ত আসতে।

স্বামীর চিতার সাথে জীবন্ত নারীর অগ্নিদগ্ধ হওয়া অর্থাৎ সতীদাহ প্রথার মত লোমহর্ষক আর পাশবিক বেপারটি হিন্দু প্রাচীন বাঙালি নারীর নিয়তি ছিল। তবে একটা পর্যায়ে এর বিরুদ্ধে আইন হওয়াতে কমে আসতে থাকে এই পাশবিক প্রথা। এই প্রথা এখন বিলুপ্ত বলা যায়।

তাই অতীতের অবস্থা বিচার করে সহজেই প্রতীয়মান হয়- বাঙালি নারী অনেক এগিয়েছে, এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত- হয়ত প্রত্যাশিত নয়। আবার প্রত্যাশার কোন সীমাও থাকেনা, তবে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো নারীর এগিয়ে বা পিছিয়ে যাওয়া নিয়ে আজকের মত এত উদ্বেগের সাথে কেউ হয়তো আর বলবে বা লিখবে না।

নারী মুক্তি নয়, মানুষের মুক্তির প্রত্যাশা করি।

২৪ বৈশাখ, ১৪১৯

গ্রন্থপঞ্জি
১. গোলাম মুর্শিদ, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি (ঢাকা, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ২০১০ )