ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

সাধারণ তর্কঃ
বাংলা ভাষায় লিখিত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র বহুল আলোচিত এবং বহুল পরিচিত উপন্যাস ‘লালসালু।‘ট্রি উইদাউট রুটস’ নামে উপন্যাসটির একটি ইংরেজি অনুবাদ(বা অনুসৃষ্টি)সাধারণ পাঠকমহলে প্রায়-অনুচ্চারিত হলেও বর্তমান অধিপতি ধারার একাডেমিক-সাহিত্য-বাজারে হামেশাই এর দেখা পাওয়া যায়।উপন্যাসটির(বা উপন্যাস দুটির)কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম মজিদ।চরিত্রটি জটিল নয়;খুবই সাধারণঃ অন্তত পন্ডিতেরা তাই মনে করেন।মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মৌলভী বেঁচে থাকার তাগিদে কীভাবে নতুন একটি এলাকায় গিয়ে বসতি স্থাপন করে;কীভাবে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে সে তৈরী করে তার চারপাশের দূর্ভেদ্য ও শক্তিশালী ক্ষমতা-বলয়;কীভাবে গ্রামের মানুষের অজ্ঞতা আর কুসংস্কারের সুযোগ নিয়ে সে প্রতিষ্ঠা করে মাজার-সংস্কৃতিকে এবং কীভাবে এ মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে তার ধর্ম ব্যবসায় এবং প্রতিনিয়ত নিজের এসব কর্মকান্ডের জন্য কীভাবে এবং কতরকমে সে অনুশোচনায় কাতর হয় কিংবা কাতর হতে হতে কীভাবে সে হঠাৎ আত্ন-সচেতন হয়ে উঠে এবং নিজের ধর্ম-ব্যবসাকেই আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আবার- এ সবকিছুই পন্ডিতেরা আলোচনা করেছেন ও করছেন।সাহিত্যের বাজারে ব্রাত্যজন হওয়ার পরও আমরা উপন্যাসটি নিয়ে আরেকবার আলোচনা করতে ইচ্ছুক।দেখতে ইচ্ছুক, উপন্যাসটিতে ইতর-বিশেষ কিছু আছে কিনা।দেখতে চাই যারা মজিদকে প্রতারক ও ঠগবাজ হিসেবে মূল্যায়ন করছেন,তারা কোন চেয়ারে বসে আছেন।মজিদ ‘প্রতারক’ ও ‘ঠকবাজ’- আপাতত এ কথা মেনে নিলেও-আমরা দেখতে ইচ্ছুক যারা মজিদকে ‘প্রতারক’ ও ‘ঠকবাজ’ বানাচ্ছেন তারা নিজেরাই ঠকবাজ ও প্রতারক নন তো?মজিদকে ‘প্রতারক’ ও ‘ঠকবাজ’ বানালে তাদের কোন লাভ হয় না তো?আমরা তর্কটি উত্থাপন করতে চাই।কেননা,তর্কটি চালিয়ে নেয়া জরুরি;বিশেষত,মৌলবাদী মজিদকে উপস্থাপন করতে পারলে আমাদের দেশের সাহিত্য-বাজারের আনাচে-কানাচে টুল বেঞ্চ চেয়ার টেবিল দখল করে জেঁকে বসা বুদ্ধিজীবী এবং দোকানগুলোতে ঝুলতে থাকা চর্বিযুক্ত বুদ্ধিজীবীদের কোন ফায়দা হয় কি-না সেটাও বের করা জরুরি। কেননা,আমরা জানি, ‘উপায়’ এক থাকলেও ‘উদ্দেশ্য’ নানাজনের নানারকম হতে পারে।এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে নিতে আমরা বারবার ফিরে যাবো উপন্যাসটির ইংরেজি সংস্করণ ‘ট্রি উইদাউট রুটস’-এর দিকে।আমরা দেখতে ইচ্ছুক সেই ১৯৬৭ সনেই ইউনেস্কো ঠিক কোন কারণে আগ্রহ পোষণ করলো এই উপন্যাসটির প্রতি এবং কোন ধরণের আগ্রহের জায়গা থেকে ইউনেস্কো উপন্যাসটির ইংরেজি সংস্করণ ইউরোপে ছড়িয়ে দিতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলো।আমরা ইউনেস্কোর ‘আগ্রহ’ ও ‘অনুপ্রেরণা’র জায়গাগুলোকে ধরতে চাই।এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালোঃগাছের পাতায় ‘সবুজ’ রঙের উপস্থিতির কারণ জানতে গিয়েও যারা সাম্রাজ্যবাদের কিংবা পুঁজিবাদের ‘জুঁজুঁবুড়ি’কে খুঁজে বেড়ান তাদের থেকে কয়েকশো হাত দূরে থেকে আমরা এ আলোচনা শুরু করতে চাই।

পদ্ধতিগত তর্কঃ
একটি প্রশ্ন উপস্থাপন করা যাকঃইংরেজ সাম্রাজ্যের যেকোন চাকুরীজীবী কি শুধু ইংরেজ সরকারের চাকর না-কি তার আরো কোন পরিচয় আছে?ভারতবর্ষের কাছে কিংবা আরো সঠিকভাবে বললে ভারতবর্ষের সচেতন অংশের কাছে তার আরো কোন পরিচয় আছে কি? কোনদিকের পরিচয় মুখ্য?এবং কোনদিকের পরিচয় নৈতিক?এবং কে কোনভাবে নির্ধারণ করে থাকে নৈতিকতার মাপকাঠি?

প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরি।অন্ততঃ এর আলোচনাটা চালিয়ে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ।কেননা, এ প্রশ্ন কয়টির উত্তরের উপর নির্ভর করে নানাকিছু।আমাদের সংগ্রাম ও লড়াকু চিন্তার ইতিহাসে এ প্রশ্নগুলো কীভাবে এসেছে এবং কী করে এর মোকাবেলা করা হয়েছে কিংবা মোকাবেলা করার চেষ্টা করা হয়েছে সেসব জানাটা খুব জরুরি।

‘পৃথিবীর ইতিহাস শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস’ হওয়ার পরেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্থান কালে পৃথিবীর ইতিহাস বিজয়ীর ইতিহাসই বটে।অর্থ্যাৎ,বলা চলে,শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসা বিজয়ীরাই ইতিহাস তৈরি করে এবং লিখে এবং ভবিষ্যতেও লিখবে ও তৈরী করবে।আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে বলা যেতে পারে,পৃথিবীর সামাজিক ও রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাস শক্তিমানেরই ইতিহাস।তত্ত্বীয়ভাবে বললে, ক্ষমতা-কাঠামোর কেন্দ্রে যাদের বসবাস তারাই প্রতিষ্ঠা করে ‘কর্তৃত্বের ইতিহাস’কে।ইতিহাসের প্রত্যেকটি ধাপে ক্ষমতা-কাঠামোর এ পরিবর্তন পালটে দেয় অনেক কিছুকেই।অধীনতার এক নতুন ইতিহাস শুরু হয়।নতুন ক্ষমতা-কাঠামোর প্রান্তে যাদের স্থান হয়, বা যাদেরকে আমরা ‘প্রান্তীয়’ বলি কিংবা যাদেরকে শাসনাধীন রেখে শাসক শ্রেণীর কর্মকান্ড পরিচালিত হয়,সেই সব ‘প্রান্তীয়’রাও প্রাক্তন ক্ষমতা-কাঠামোর প্রান্তীয়দের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে না।নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এ ক্ষমতা-কাঠামো বদলে দেয় অনেক কিছুকেইঃ বদলে যায় শাসক ও শোষিত শ্রেণীর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নিয়ম কানূন।আর এর মধ্য দিয়েই নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে ইতিহাসের সেই নির্দিষ্ট ধাপে তৈরী হওয়া প্রতিষ্ঠানসমূহ।কিন্তু একটি ব্যাপার সব সময়ই ক্রিয়াশীল থাকে। দেখতে পাই, শোষণ ও আধিপত্যের এক কঠিন শৃংখল ক্রিয়া করছে পৃথিবীর মানুষের সমস্ত ইতিহাস জুড়ে।

সংঘাতের ইতিহাসের এ ধারাপরিক্রমায় আমরা প্রান্তীয়রা কি চাই?কোথায় দাঁড়াতে হবে আমাদের?এবং দাঁড়াবোই বা কেন আমরা?আমরাও কি চাই ক্ষমতা-কাঠামোর কেন্দ্রে চলে যেতে?নিয়ন্ত্রণ করতে চাই সবকিছুকেই?যদি আমাদের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়,তবে আমরা তর্কটি নিয়ে ভাবতে পারি।দেখতে পাই, উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকূল ‘ক্ষমতা-কাঠামো’ সব সময়ই ধ্বংস করে দেয় সংখ্যালগিষ্ঠের শাসন-শোষণ ও ক্ষমতা-কাঠামোকে।ফলে,শোষণবাদী শক্তি ও কাঠামোর উচ্ছেদ ঘটে।এর সাথে সাথে উচ্ছেদ ঘটে অধিপতি ধারার সংস্কৃতি ও সাহিত্যের এবং এ সংক্রান্ত সমস্ত মহান(!) তত্ত্বের।‘অধিপতি ধারার সংস্কৃতি ও সাহিত্যের উচ্ছেদজনিত ব্যাপার’টাকে আরেকটু পরিষ্কার করা যাকঃ দিল্লী ও কলকাতার ক্ষমতা-বলয়ে অধিষ্ঠিত শ্রেণী যেভাবে আমাদের কাছে উপস্থাপন করেন রবীন্দ্রনাথকে,আমরা তার বিরোধীতা করি;আমরা বিরোধীতা করি শাসক শোষক শ্রেণীর কোলে প্রতিপালিত হওয়া কলকাতা ও বাংলাদেশের রাবীন্দ্রীক বুদ্ধিজীবীদের রবীন্দ্রনাথ সংক্রান্ত বয়ান ও পঠন-পাঠনের।ক্ষমতা বলয়ের উচ্ছিষ্ট খেয়ে জীবন ধারণ করা এই সব চক্রান্তকারী বুদ্ধিজীবীদের রবীন্দ্র পঠন-পাঠন ও ব্যাখ্যার বিরোধীতা করার মানে রবীন্দ্র-সাহিত্যের বিরোধীতা নয়।এইখানে আমাদের দাঁড়ানোর জায়গা।এই অবস্থান থেকে আমরা আরো কিছু ব্যাপারকে বুঝে নিতে চাই।সকলেই জানি, পাশ্চাত্য গাড়ি আবিষ্কার করেছে,ঘড়ি আবিষ্কার করেছে,রেডিও-টেলিভিশনসহ বিস্তর যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছে।আমরা সেই সব মহান বিজ্ঞানীদের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারি না পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার-প্রকল্পের পরিচালক রবার্ট ওপেনহাইমারের কাছে;কিংবা আমাদের আরাধ্য হতে পারেন না সেই সব বিজ্ঞানী ও প্রতিষ্ঠানেরা যারা প্রতিনিয়ত ব্যস্ত জটিল ও সূক্ষ্ম মরণঘাতি যুদ্ধাস্ত্রের আবিষ্কারে।কিংবা আমরা মেনে নিতে পারি না ইউরোপের শিল্প পুঁজির পুঞ্জীভবন ও স্ফীতির ফলে তৈরী হওয়া রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে, যে শক্তি চিরতরে স্তব্দ করে দিয়েছে বাংলার মসলিন শিল্পকে;যে শক্তি কেটে নিয়েছে মসলিন শিল্পীদের হাতের আঙ্গুলকে।পারমাণবিক বোমা যারা তৈরী করেন,তারাই মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে আবার তৈরী করছেন রিসার্চ ল্যাবরেটরী।এ বোমার রেডিয়েশনের ফলে উদ্ভূত রোগ ও মানবদেহের ক্ষতির মোকাবেলা করার জন্য নিযুক্ত আছেন গবেষকেরা।তৈরী হচ্ছে এ সংক্রান্ত জ্ঞান ও বিজ্ঞান।বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খোলা হচ্ছে এ সংক্রান্ত নতুন নতুন সব বিভাগ।পাশ্চাত্য আমাদের বলছে, তোমরা এসব কিছু জান না;তাই তোমরা মূর্খ; ফলে তোমরা আমাদের অধীন।আর আমাদের দেশের কিছু বুদ্ধিজীবীও সেই আদেশকে ধ্যান-জ্ঞান করে এখানে পাশ্চাত্য মডেলের সভ্যতা নির্মাণের দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে আছেন।তাদের যুক্তিও চমৎকারঃ আমরা পাশ্চাত্যে তৈরী কিংবা পাশ্চাত্য ফর্মূলায় তৈরি গাড়ি ব্যবহার করছি,উড়োজাহাজ ব্যবহার করছি,লোশন,শ্যাম্পু এমনকি টয়লেট পর্যন্ত ব্যবহার করছি,কম্পিউটার ব্যবহার করছি,মোবাইল ব্যবহার করছি এবং নানা কিছু ব্যবহার করছি,সুতরাং তাদের ‘সংস্কৃতি’কে অনুশীলন করতে আমাদের আপত্তি কোথায়? আমাদের কোন আপত্তি নেই।কোনই আপত্তি নেই।তাদের জ্ঞান ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত নানারকম ‘সংজ্ঞা’ জানতে আমাদের আপত্তি থাকবে কেন?-নাহ,আমাদের আপত্তি নেই তো।আমরা তো রাজি আছি ওদের কথা শুনতে;কিন্তু শুনার পর যদি আবার তা মেনেও নিতে হয়, ওটা আমাদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় বৈকি।আমাদের এইসব বুদ্ধিজীবী মহোদয়দের কাছে আমাদের সবিনয় আর্জি এই যে, পৃথিবীতে নানারকম রঙ আছে।এটা আপনারাও জানেন,আমরাও জানি এবং মানিও বটে।কিন্তু এই যে, আপনি ‘লাল’ রঙকে সমস্ত রঙের মধ্যে সেরা রঙ হিসেবে বিবেচনা করছেন,কোন দুঃখে আমরা তা মানতে যাবো? আর আপনারাই বা কোন দুঃখে সেটা মেনে নেয়ার জন্য আমাদের পেছনে উঠেপড়ে লেগেছেন?ও,আপনাদের ‘লাল’পানির ব্যবসা আছে বুঝি?তা আমাদের সরাসরি বললেই তো হতো।আমরা নিজেরাই না হয় ভেবে দেখতাম গাঁটের পয়সা খরচ করে ওসব খাওয়া উচিৎ হবে কিনা।কিন্তু এই যে, আপনারা ‘লাল’ রঙের মধ্যে নন্দনতত্ত্বের তকমা লাগিয়ে একটি অসাধারণ ‘জ্ঞান’ তৈরী করলেন,তা কি ঠিক হলো?এটাকি ‘চাতুরী’ হলো না?এই ‘জ্ঞান’ ও ‘সৌন্দর্য-বোধ’ আমাদের নেই বলেই কি আমরা মূর্খ হয়ে গেলাম সম্মানিত বুদ্ধিজীবীবৃন্দ?আমাদের মধ্যে অনেকেই অনেক রঙ পছন্দ করেন,কিন্তু আমাদের লুটতরাজের ব্যবসা নেই বলে আমরা কোন একটি বিশেষ রংকে ধরে নিয়ে বলছি না যে,এই রঙের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনিন্দ্য নান্দনিকতা।আমরা এসব কিছুই বলছি না।অন্যভাবে বলা যায়, বর্গীকরণ করার মধ্য দিয়ে যদি কোন একটি ‘বর্গ’কে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করা হয় তবে এর বিরোধীতা করা এবং একে প্রতিরোধ করাই আমরা আমাদের নৈতিক দ্বায়িত্ব বলে বিবেচনা করছি।

ধান ভাঙ্গতে শিবের গীত গাওয়া হয়ে গেল।তবুও, একটি নির্দিষ্ট ভিত্তিভূমির উপর দাঁড়িয়ে যেকোন কিছুকে বিচার বিশ্লেষণ ও খতিয়ে দেখতে গেলে পদ্ধতিসংক্রান্ত এ আলোচনাগুলো জরুরি ছিলো। পাশ্চাত্য জ্ঞান-তত্ত্বের আপাত নিরীহ ভালোমানুষি চেহারার পেছনে যে হিংস্র ও ভয়ানক শক্তি ও উদ্দেশ্য কাজ করছে সেসব কিছু সম্বন্ধে সচেতন হয়েই আমরা এখন ‘মজিদ’কে নিয়ে আলোচনার মাঠে নামতে চাচ্ছি।

‘ট্রি উইদাউট রুটস’ উপন্যাসটির অধুনা সংস্করণের সম্পাদনার দ্বায়িত্বে ছিলেন নিয়াজ জামান।ইংরেজিতে এর ভূমিকা লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পন্ডিত ও বুদ্ধিজীবী।তাঁর বুদ্ধির উপর আমাদের আস্থা আছে।সুতরাং তাঁর লেখা ‘ভূমিকা’ অংশের কিছু আলোচনা দিয়েই আমরা বিষয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে চাইঃ

“The village is almost mythical; it is without connection with the world outside, it has no radio set; no newspaper reaches it; no school exists; even that favorite pastime of the Bengalis called politics, is absent. Life here is elemental. Even for backward Bengal such a village is exceptional. Making full use of his style, which is subtle, often ironical and always lively, the novelist compels our credence entirely”]

[(ট্রি উইদাউট উপন্যাসের)গ্রামটি বেশ কাল্পনিক;বাইরের পৃথিবীর সাথে এর কোন যোগাযোগ নেই।গ্রামটিতে কোন রেডিও নেই।কোন পত্রিকা পৌঁছায় না ওখানে;একটিও বিদ্যালয় নেই;এমনকি বাঙ্গালীর অবসর কাটানোর প্রিয় উপায় ‘রাজনীতি’ও সেখানে অনুপস্থিত।জীবন এখানে আদিম। তবুও, পশ্চাদপদ বাঙ্গলায় এরকম গ্রামের দেখা পাওয়াও দুষ্কর।ঔপন্যাসিক তার নিজস্ব শিল্পকুশলতা প্রয়োগ করে আমাদের চোখে এ গ্রামটির অস্তিত্বকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।উপন্যাসটির নির্মাণকৌশলে প্রায়ই আয়রনির দেখা মিললেও এর বর্ণনাভঙ্গি বেশ ঝরঝরে]

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমাজবাদী ঘরাণার বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমাদের দেশে পরিচিত।সমাজবাদী ঘরাণার যান্ত্রিক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে মাঝে মাঝে কিছু সমস্যা দেখা দ্যায়।তাদের অনেকেই চায়ের কাপে উড়ন্ত পোকা পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায়ও সাম্রাজ্যবাদের গন্ধ খুঁজে পান।সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সে ধরণের বুদ্ধিজীবী নন।‘ট্রি উইদাউট রুটস’ উপন্যাসের কাল্পনিক গ্রাম মহব্বতনগরে কোন রাজনীতি নেই বলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দাবি করছেন।আমরা সে দাবি মেনে নেই।পুরো উপন্যাসের কোথাও কোন রাজনৈতিক প্রচার চোখে পড়ে না।গ্রামটির ভূ-স্বামীর নাম খালেক।আর অন্যরা তার জমির বর্গাচাষীঃ একদম সরলরৈখিক একটি প্রতিবেশ।উপন্যাসের বর্ণনানুযায়ী, এই পরিবেশেই একদম উড়ে এসে জুড়ে বসে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত মজিদ।তার হাতে আর মগজে আছে ধর্মগ্রন্থ কোরান।গ্রামের মানুষদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে সে একটি মাজার প্রতিষ্ঠা করে।গ্রামের বাইরের দিকে পরিত্যক্ত একটি কবরকে আশ্রয় করে গ্রামের ক্ষমতা-কাঠামোর মধ্যে শিকড় গেড়ে বসে মজিদ এবং তার প্রতিষ্ঠিত মাজারটি।অর্থ্যাৎ এ গ্রামে বিরাজমান সাংস্কৃতিক আবহের মধ্যে থেকে গড়ে উঠে নি মাজারটি।একদম টুপ করে আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরার মতো গ্রামের সাংস্কৃতিক-কাঠামোতে আবির্ভূত হয়ে তার মধ্যে শিকড় গেড়ে বসতে চায় মজিদ;কর্তৃত্ব বিস্তার করতে চায় সে;এবং মাজারটির মধ্য দিয়ে সে তার কর্তৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চায়।সফল হয় মজিদ।এই হলো মোটামুটি উপন্যাসটির মূল বয়ান।কিন্তু আমাদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়ঃ মজিদ এবং তার মাজারটি কি আসলেই কোন এক ‘শিকড়হীন বৃক্ষ’;এটি কি আসলেই ‘ট্রি উইদাউট রুটস’?মজিদ গ্রামের মানুষদের ধর্মান্তরীত করে নি;ধর্মকে উপজীব্য করে নিজে বেঁচে থাকতে চেয়েছে সে;প্রতারণা করেছে গ্রামের লোকদের সাথে;বন্ধুত্ব করেছে ভূ-স্বামী খালেকের সাথে;কেননা, খালেকই ঐ গ্রামের ‘ক্ষমতা-কেন্দ্র’।এবং আরো অদ্ভূতভাবে, খালেকও নানাভাবে প্রতারিত হয়েছে মজিদের কাছে।অর্থ্যাৎ উপন্যাসটির মূল টার্গেট হচ্ছে মজিদ এবং মাজার এবং-সাহস করে বলতে পারি- ধর্ম;ইসলাম ধর্ম।গোটা উপন্যাসে ভূ-স্বামী খালেককে দেখানো হয়েছে অসাধারণ নিরীহ ব্যক্তি হিসেবে যে কিনা বারবার প্রতারিত হয় মজিদের কাছে;একইভাবে যেমন প্রতারিত হয় গ্রামের সাধারণ মানুষজন।অর্থ্যাৎ ভূ-স্বামী ও সাধারণ মানুষকে একই কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছেন ঔপন্যাসিক।মজিদের ‘ভিক্টিম’ হচ্ছে এ দুটি শ্রেণীঃ ভূ-স্বামী ও ভূ-প্রজা।গোটা উপন্যাসে মজিদকে দেখানো হয়েছে একমাত্র ‘ভিলেন’ হিসেবে।ভূ-স্বামীরাও নিরীহ তাহলে!বাহ,বেশ।সেই জন্যই কি ইউনেস্কো এটি প্রকাশে এতো আগ্রহ পোষণ করলো?পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীরা যে দেশে সাম্রাজ্য বিস্তার করে সে দেশেই তারা কাজ করে জমিদার কিংবা ভূ-স্বামীদের পক্ষে।কেননা, এরকম আধা সামন্তীয় সমাজ-কাঠামোতেই কেবল তারা তাদের স্বার্থ উদ্বার করতে পারে।ঐ সব দেশে যেন ঠিকমতো পুঁজিবাদ বিকশিত না হতে পারে সেই কারণেই তারা লালন পালন ও সমর্থন করে থাকে এই সব ভূ-স্বামী জমিদারকে।কেননা,প্রান্তীয় দেশগুলোতে পুঁজিবাদ বিকশিত হলেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে আবার নতুন করে প্রতিযোগীতায় নামতে হবে ঐসব দেশের পণ্য সঞ্চালন ব্যবস্থার সাথে।এ কথাগুলো নতুন নয়;সকলেই জানেন।দেখা যায়, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সবসময়ই এসব প্রান্তীয় দেশগুলোতে একদল ভৃত্যকে তৈরী করে যাদের গালভরা নাম হয় ‘জমিদার’ বা ‘ভূ-স্বামী’।এইখানেই ‘রাজনীতি’ এসে ঢুকে।রাজনীতি এইভাবেই পরতে পরতে গোপনে-অগোচরে কাজ করতে থাকে।সুতরাং অদৃশ্য রাজনীতির খেলাকে ‘নেই’ বলে উড়িয়ে দেওয়াটা যৌক্তিক নয়।সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী হয়তো বলতে চেয়েছেন,আমাদের তথাকথিত দলবাজি রাজনীতির ক্রিয়াকান্ড মহব্বতপুর গ্রামে অনুপস্থিত।আমরা সিরাজুল ইসলামের ঐ বয়ানের এই পাঠই গ্রহণ করবো।এবার আরেকটি প্রশ্ন করা যাক, এই সমাজ-কাঠামোতে কি ‘মজিদ’ কোন এক প্রতিবাদের নাম যাকে গুরূত্ব দিয়ে দেখতে হবে;কিংবা ঔপন্যাসিক যেমন দেখাতে চেয়েছেন সেরকমভাবেই কী আমরা ভাববো যে,মহব্বতপুর গ্রামের একমাত্র সমস্যা ‘মজিদ’ নামক মাজার ব্যবসায়ীটি?আমরা প্রশ্নটি নিয়ে একটু ভাবতে চাই।

বিদ্যা-বুদ্ধি বিক্রি করে যারা খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকেন তারা কি মনস্তাত্ত্বিকভাবে পরিণত হন মধ্যবিত্তে?বাংলার উৎপাদন ব্যবস্থায় কি তাহলে মধ্যবিত্ত শ্রেণী হিসেবে ধরতে হবে কেতাব ও পুঁথিধারীদের?নাকি বাংলার গ্রামীণ-কাঠামোতে কোন মধ্যবিত্ত শ্রেণী্র অস্তিত্ব ছিলো না তখন?যদি না থাকে,তাহলে এ সব কায়িক পরিশ্রম মুক্ত বুদ্ধি-ব্যবসায়ীদের পরিচয় কী হবে?সমাজে তারা কী ভূমিকা পালন করতো?সমাজ কেন মেনে নিতো এদের অস্তিত্বকে?শুধুই ভয়ে?নাকি অন্য কোন কারণ আছে?উপন্যাসে ফিরে যাই।মজিদকে মেনে নেয়ার সাথে সাথে কি গ্রামের মানুষ খালেকের সামনে একটি আলাদা ‘ক্ষমতা-বলয়’কে তৈরী করে দিচ্ছে না?খালেকও নিরীহভাবে ব্যাপারটিকে মেনে নিয়েছে;কেননা, উপন্যাসের বয়ান অনুসরণ করলে দেখতে পাই,ঔপন্যাসিক বুঝাতে চাচ্ছেন যে, খালেক এক নির্বোধ ভূ-স্বামী যার মধ্যে অতোখানি চালাকি নেই,যতখানি ‘চালাকি-বুদ্ধি’ রয়েছে কেতাব পড়া মজিদের মগজে।‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’-প্রবাদখানা এমনি এমনি তো তৈরী হয়নি।খালেক মজিদের মতো চতুর হলে মজিদকে সে গ্রামে আমন্ত্রণ জানাতো ঠিকই;কিন্তু তার মধ্যে কাজ করতো ভিন্ন এক কারণ।কেননা,ইতিহাসের পাঠ থেকে আমরা জানি ধর্ম-ব্যবসা আর ক্ষমতা-কেন্দ্র একই সাথে অসাধারণভাবে কাজ করতে পারে।এবং এ দুটি শ্রেণী পরস্পরের উপর দারুণভাবে নির্ভরশীল থাকে।কিন্তু খালেক নিরীহ এবং বোকা;ফলে সে মজিদকে কাজে লাগাতে পারে না।উল্টা মজিদই খালেককে কাজে লাগায়।আর এভাবেই ‘ট্রি উইদাউট রুটস’ উপন্যাসটি বিচারিক মামলা থেকে অব্যাহতি দান করে খালেককে এবং কাঠগড়ায় দাঁড় করায় মজিদকে।

এখন প্রশ্ন, পশ্চিমা অধিপতি ধারার জ্ঞানকান্ড আসলে আমাদের কি শেখায়?আর আমরাই বা কি বুঝি?ওই জ্ঞানকান্ড কি আমাদের এটাই বুঝাতে চায় যে, ‘মজিদ’ চরিত্রটি হচ্ছে শেকড়হীন বৃক্ষ আর এ শেকড়হীন বৃক্ষকে উপড়ে ফেলাটাই জরুরি?কেন লালসালু বা ‘ট্রি উইদাউট রুটস’ পড়ার পর আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা মজিদকে কেবল ‘প্রতারক’ হিসেবেই বিবেচনা করেন?আমাদের সবিনয় প্রশ্ন, ইউরোপের মাজার(shrine)গুলো নিয়ে ইউরোপ কী বিব্রত বোধ করে?ইউরোপের যেকোন দেশের সাহিত্যের ইতিহাস দেখলেই দেখতে পাই,ইউরোপ তার মাজারগুলোকে নিয়ে বিব্রত বোধ করেনি এবং এখনো করে না।অন্তুত, আমাদের চোখে তা পড়ে না।পশ্চিমের গর্বের ধন ‘অক্সফোর্ড’ আর ‘কেম্বরিজ’ তো মাদ্রাসাই ছিলো।ধর্মতত্ত্ব আর ফিলোলজি চর্চার জায়গা ছিলো ওগুলো।এ মাদ্রাসাগুলো থেকে পাস করার পর তারা কী করত কিংবা ওদের মৌলভীরা এখন কী করে?চার্চ এবং পাদ্রীর অভাব তো নেই গোটা ইউরোপে।ওরাও কি তাহলে ট্রি উইদাউট রুটস?আমরা এটা বুঝাতে চাইছি না যে, ইউরোপে আজেবাজে জিনিস আছে বলে আমাদেরকেও আমাদের আজেবাজে জিনিসগুলোকে আঁকড়ে ধরতে হবে।আমরাও এসবের উচ্ছেদ চাই।কিন্তু কোন পথে এবং কোন পদ্ধতিতে?কোন দিক থেকে খালেক নিরীহ হয়ে উঠে?আর মজিদ পরিণত হয় প্রতারক এবং কোন কোন ক্ষেত্রে লম্পটে?কে লেখে ‘লালসালু’ বা ‘ট্রি উইদাউট রুটস’?আর কে এর বাজার তৈরী করে?যদি ইউরোপের মোল্লারা ট্রি উইদাউট রুটস না হয়ে থাকে,তবে আমাদের নিবেদন এই যে,আমাদের মোল্লারাও শেকড়হীন বৃক্ষ নয়।এদের শেকড় আরো গভীরে, দেশীয় সংস্কৃতির অভ্যন্তরে এবং জনমানসের হৃদয়ে প্রোথিত।

উপন্যাসটির পাতায় পাতায় দেখা যায়,সাধারণ মানুষের সরল-বিশ্বাসকে পুঁজি করে মজিদ তার জীবিকা নির্বাহ করছে।সমাজ স্বীকৃত বলে আমরা তার কর্মকান্ডকে ‘পেশা’ বলতে পারি।সেই অর্থে মজিদ একজন পেশাজীবী।আমরাও কী ফেয়ার এন্ড লাভলীর মিথ্যা-বিজ্ঞাপন দ্বারা প্ররোচিত হয়ে তিনমাসের মধ্যে বা দু’সপ্তাহের মধ্যে সুদর্শন নর ও নারীতে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখি না? গাঁটের পয়সা খরচ করে কিনে আনি না ফেয়ার এন্ড লাভলী?সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কী স্যুট-বুট পরে পশ্চিমা বাবুতে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন না?-তাহলে আমরা কি একটি চাকচিক্যময় মিথ্যার জগতে বাস করছি না?সেই মিথ্যা ও মায়াময় মোহের জগতে দাঁড়িয়ে কোন মজিদকে ‘ট্রি উইদাউট রুটস’ হিসেবে সাব্যস্ত করছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ?তাহলে কি এটাই প্রমাণিত হয় না যে, অধিপতি ধারার পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের চশমা পড়ে এবং জ্ঞানকান্ডে ঝুলে ঝুলে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা সমালোচনা ও আক্রমণ করছেন শক্তিহীন প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর বুদ্ধি-ব্যবসায়ীদের?কোন অর্থে মজিদ প্রতারক এবং অধিপতি ধারার(কিংবা বলা যায়,পারমাণবিক বোমাবাজির জ্ঞানে সমৃদ্ধ) প্রতারকেরা ‘জ্ঞানী’ ও ‘সেক্যুলার?’।অবশেষে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা জরুরীঃ অন্যরা পেশাজীবী হলে মজিদকেও ‘পেশাজীবী’ বলতে বাঁধা কোথায়?