ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

অনেক বছরের রেকর্ড ভেঙ্গে এবার সর্ব নিন্ম তাপমাত্রা ৩ সেলসিয়াস । শীতে কাঁপছে সারা দেশ । শহরের চেয়ে গ্রামে শীতের চোখ রাঙ্গানি আনেক বেশি । পরশু গিয়েছিলাম নানা বাড়ি । কাল চলে এসেছি । ইচ্ছে ছিল কিছুদিন থেকে পিঠা পুলি আর খেজুরের টাটকা রসের স্বাদ নেব সে আশা ষোল কলা পূর্ণ না হলেও কিছু পুরন হয়েছে । শীতের তিব্রতা আমাকে সেখানে থাকতে দেয়নি । আনেক বছর পর এবার খেজুরের টাটকা রসের স্বাদ নিতে পেরেছি ।

নানা বাড়ি শ্রী –নগর মুন্সিগঞ্জ পেড়িয়ে দোহার । দোহার থানায় চর এলাকা ছাড়া মোটামুটি সব পরিবার সচ্ছল বলা যায়। এ থানায় প্রায় সব পরিবারের কেওনা কেও প্রবাসে । তাই আর্থিক সচ্ছলতা সেখান থেকে।

পরশু সকালে প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে গাজীপুর থেকে গুলিস্তান গেলাম । সেখান থেকে ঢাকা – দোহার রুটের আরাম বাসে চেপে রওয়ানা হলাম নানা বাড়ির দিকে । গাজীপুর থেকে যতটা শীত নিয়ে বের হলাম ঢাকা এসে ততোটা অনুভব করিনি । বাসের নাম আরাম হলেও ততোটা আরামে আমি যেতে পারিনি। তবে শহর পেড়িয়ে যেই গ্রামের রাস্তায় ছুটছিল দুচখে শুধুই সরষে ফুল । বাগধারায় যে মানেই হোক না কেন বাস্তবে চোখ জুড়ানোর জন্য সরষে ফুলের জুরি নেই । দু পাসে যত দূর চোখ যায় তত দূর শুধুই সরষের আবাদ । সিরাজদি খাঁ , হাসারা , বেজগাও এই সব গ্রামের মাঠে এখন এক প্রকিতি সৌন্দর্যের মেলা বসিয়ে রেখেছে । সরষে ফুল দেখতে দেখতে রািঢ় খাল চলে আসলাম ।

রািঢ় খাল আসলেই গর্বে বুকটা ভরে যায় । রািঢ় খাল সম্পর্কে একটু না বললেই নয় । রািঢ় খাল গ্রামে জন্মেছেন এ দেশের দুই বিজ্ঞানি একজন গাছের জীবন ও বেতার উদ্ভাবক জগদীশ চন্দ্র বসু আরেক জন ভাষা বিজ্ঞানি হুমায়ূন আজাদ । আপনারা চাইলে মহান এই বিজ্ঞানিদের বাড়ি ঘুরে আসতে পারেন । জগদীশ চন্দ্র বসুর বাড়ি এখন স্কুল । স্কুলে একটি জাদুঘর আছে । স্কুলে গিয়ে বললেই তা খুলে দেখাবে । যারা শহরের স্কুলে পড়াশুনা করেছেন স্কুল টি দেখলে আফসোসে পুড়বেন । আশেপাশের প্রাকিতিক পরিবেশ স্কুলটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।স্কুলের পাসে অবকাশ কেন্দ্র আছে । সেখানে ঢুকতে ফি দিতে হবে । আমি যখন গিয়েছিলাম তখন ২০ টাকা ছিল সেটাই থাকার কথা ।

গাড়ি ছুটছে তার আপন গতিতে । গাড়ি এসে থামল বালাশুর । বালাশুর থেকে একটু ভেতরে গেলে ভাগ্যকুল সেখানে আপনি পাবেন বিক্রমপুরের আসল মিষ্টি , দই । তবে ভাগ্যকুলের ঘোল খেতে একদম ভুল করবেন না । এখানকার ঘোল বেশ বিখ্যাত । ৪০ থেকে ৫০ টাকা গ্লাস । মাথা ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে দিয়ে চোঁর কে অপমান করার কারনে অনেকের ঘোল সম্পর্কে একটু নিন্দা ভাব আছে। ভাগ্যকুলের ঘোল পান করলে নিন্দা ভাব টুকু চলেও যেতে পারে । বালাশুরে কিছু শতাধিক বছরের জমিদার বাড়ি খুঁজে পাবেন । যধুনাথ রায়ের বাড়ি অন্যতম । এখানকার প্রধান সমস্যা হল নদী ভাংগন ।

রাতে শীতে আমাকে পুরো কাবু করে ফেলল । অনেক গুলো কম্বল দিয়েও শীতকে মানাতে পারলাম না । সারা রাত ঘুম হল না । শীতের তিব্রতা যে কতটা ভয়াবহ তা খানিকটা অনুভব করলাম । এ শীতে রাস্তায় কাটান মানুষরা যে কি কষ্টে থাকে টা খানিকটা টের পেলাম । গ্রামের মানুষ সব সময় প্রাকিতিক দুর্যোগের মাঝে সংগ্রাম করে চলে ।

প্রতি বছর নানা বাড়ি গেলেও খুব বেশি সময় থাকা হয় না আবারও থাকিনি । ছোট বেলা নানা বাড়ি আর এবারের দেখা পুরো পালটে গেল। ছোট বেলা পাকা বাড়ি খুব কম থাকলে কাঁচা বাড়ি অনেক কমে গেছে ।

নানা বাড়ি পোঁছে পরের দিন সকালে গ্রাম দর্শনে বের হলাম । রিকশা দিয়ে চলতে পথে আমি অবাক । ঢাকার অভিজাত এলাকার বাড়ির মত দুই এক বাড়ি পরপর গড়ে উঠেছে শৌখিন বাড়ি । এ অঞ্চলের টিনের বাড়িও সৌখিনতার ছোঁয়া আছে। এটা অন্য অঞ্চলের চাইতে বেশ আলাদা । এখানে বিয়ে বাড়ির খাওয়া ও সাজ সব সময় আভিজাত্য পূর্ণ। এখানকার যুবকেরা বেশির ভাগ প্রবাসে। যারা দেশে আছে তারা কেও অপেক্ষমান প্রবাসী । এ অঞ্চলে যুবকদের সখের জিনিস মটর বাইক । নায়ক – নায়ক ভাব নিয়ে চলতে তারা ভালবাসে । বাইকের ঝন- ঝনানি এখানে অতি মাত্রায় । এরকম স্টাইলিস যুবক যেমন আছে তেমনি সমাজ কল্যাণে ব্রত যুবক রয়েছে ।হিন্দু , মুসলিম , খ্রিস্টান সম্প্রসায়ের লোক এখানে রয়েছে । বাউল ধর্ম , মুক্ত মনা নেহায়েত কম নয় । দোহার উপজেলায় শিক্ষা ব্যবস্থা ভাল ।

গত কাল ঢাকায় ফেরা ছিল এক যুদ্ধের তাই আমাকেও সেই যুদ্ধটা করতে হয়েছে । আজ ঢাকায় বিশ্ব ইজতেমা তাই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাবলীগ জামাতের লোকের চাপে টঙ্গীতে ঢোকা বেশ কষ্টকর । অনেক কষ্টে বাস পেয়েছি তবে আরাম বাস নয় এবার বাসের নাম নগর । মাঝ রাস্তায় এসে গাড়ি নষ্ট হয়ায় বেশ সময় নষ্ট ।

গ্রামে আসার সময় খেয়াল করিনি ঢাকায় ফেরার সময় খেয়াল করেছি । সরষে ফুল দেখে যেমন মুগ্ধ হয়েছি ঠিক তেমনি সরষে খেতে বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানির সাইন বোর্ড দেখে চোখে ঠিক সরষে ফুল দেখেছি । ১০ বছর পর হয়তো বাগধারার সরষে ফুলই দেখতে হবে ।

ঢাকায় এসে গাজীপুরের বাস পেতে খুব কষ্ট হয়েছে । বাসের প্রায় সকল যাত্রীর লক্ষ ইস্তেমা মাঠ । মগ বাজার এসে পরলাম পুরো বিপদে । বাসে সামান্য আগুন ও প্রচণ্ড ধোঁয়া উঠল । আতঙ্কে সবাই জানলা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে । আমি জানলার পাশে ছিলাম তাই বাধ্য হয়ে আমিও লাফ দিলাম । লাফ দেয়ার ফলে আমার পা গেল মচকে । বিপদে পরলাম পুরো দমে । পায়ে অসহ্য ব্যথা তাই নিয়ে আরেক টা বাসে উঠে সোজা বাসায় । পায়ের ব্যথা টা কমেছে তবে পুরো নয় । তবে এবারের নানা বাড়ি বেড়ানো শীত ও নানা প্রতিকুলতায় আমাকে সত্যি কাবু করেছে ।