ক্যাটেগরিঃ সিটিজেন জার্নালিজম

সিটিজেন জার্নালিজমের পরিপক্ক ভিত
সিটিজেন জার্নালিজমের জন্য একজন সচেতন নাগরিক তার নিজের জ্ঞান ও সৃজনশীলতাকে সমাজের প্রয়োজনে নিয়োজিত করতে পারেন। ব্লগিং এর জগতে বাংলা ভাষার গৌরবময় যাত্রার পর থেকে ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি বছর। পরিপক্ক হয়েছে অনেক ব্লগ, জন্মও নিয়েছে নতুন অনেক ব্লগ। লেখার নতুন নতুন বিষয় ও বৈচিত্র প্রাধান্য পেয়েছে ব্লগিং জগতের বিকাশে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে বিষয়টি সেটা হলো- বাংলা ভাষার ব্লগিং এখন অনেক দূর বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক একটি অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। ব্লগিং-এর এই অদশ্য শক্তি ও গতিকে নতুন করে আরেকটি স্তরেও সম্প্রসারণ করার বড় সুযোগ এসেছে আমাদের। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সে সুযোগটি লালন করার জন্য ধীরে সুস্থে সুষ্ঠ পরিকল্পনার ভিত্তিতেই মজবুত ভিত গড়ে উঠকু সে উদ্যোগের। হ্যাঁ। আমি বলছিলাম, নগরের, জনগনের কাছে নিজেদের প্রাত্যহিক ঘটনা থেকে শুরু করে রাজনীতি, অর্থনীতি, বা সমাজের সঙ্গতি, অসঙ্গতিকে বৃহৎ পরিসরে আরো বিন্যস্তভাবে তুলে ধরার চেষ্টা। আমরা নাগরিকের অংশগ্রহণে সে চেষ্টাকে বলছি ‘সিটিজেন জার্নালিজম’।

প্রথাগত মিডিয়া ও সিটিজেন জার্নালিজম
পত্রিকার সাংবাদিক বা টিভির সাংবাদিকের কাছে সিটিজেন জার্নালিস্ট বলার পরে মুচকি হাসি বা অট্রহাসির দেখা মেলা এখনও স্বাভাবিক! কারণ মূল ধারার সংবাদপত্র ও মিডিয়াগুলো নাগরিকদের এসব চিন্তা ও ভাবনাকে সৌখিন বলে উড়িয়ে দিতে চান। তারা মনে করেন বা বিশ্বাসও করেন, পেশাদার গণমাধ্যম কর্মী ছাড়া দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে অন্য কারো পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। অবশ্য তাদের এ ধারণা যে অনেকটাই অমূলক তার প্রমাণ তারা নিজেরাও পাচ্ছেন প্রাত্যহিক কাজে। তথ্য প্রযুক্তির কারণে অগ্রগতি ও তথ্য বিপ্লবের কারণে। তথ্য এখন সাধারণ মানুষই পৌঁছে দিচ্ছেন মিডিয়ার কাছে। সাধারণের শক্তি এখন অনেক গণমাধ্যমের বড় শক্তি। তাই এ ধারণারও ক্রম স্খলন হচ্ছে। নাগরিক তার দায়িত্বকে ও চিন্তা, সৃজনশীলতাকে আরে বড় পরিসরে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোর তাগিদ অনুভব করছেন। কাজও করছেন। অবদানও রাখছেন। আরব বিশ্বের নব গণজাগরণ আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সিটিজেন জার্নালিস্টদের কারণেই বিপ্লবী রুপ নিয়েছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি অগ্রগামী ও সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সমাজ বা রাজনীতি, অর্থনীতিই শুধু নয়, দেশের পর্যটন, আচার, অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরতে , গণমাধ্যমে জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রাখবে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’। প্রথাগত ধারণার বুকে চিড় ধরিয়ে সিটিজেন জার্নালিস্টরাও হয়ে উঠবেন আরো বেশি জনপ্রিয়। সে দিন দূরে নয়। আমাদের আশেপশেই অনেক উদাহরণ বর্তমানেই দেখতে পাই।

ঘটনার সংবাদ মূল্য
পত্রিকায় আমরা যেসব লেখা বা সংবাদ প্রকাশ হতে দেখি সেগুলোর জন্য প্রধান বিষয় হতে হয় সংবাদ মূল্য। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্যও যেকোন বিষয় ও ঘটনার সংবাদ মূল্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আপনার জীবনের অনেক বড় অর্জন বা বিসর্জন কোনো সংবাদ মূল্য থাকবে না। আপনি হাজার কষ্ট করে অনেক কিছু লিখলেন বা ব্রডকাস্ট করার মানসিকতা নিয়ে অনেক পরিশ্রম করলেন। কিন্তু পরে দেখা গেলো সে বিষয়টার আদৌ কোনো সংবাদ মূল্য নেই। পত্রিকায় বা টিভিতে যে সংবাদ প্রকাশ হয় সেটার ক্ষেত্রে মানুষের আগ্রহ ও মানুষ সেই সংবাদ পড়তে টাকা দিয়ে পত্রিকা কেনা বা সময় দিয়ে টিভি দেখা বা রেডিও শুনবে কিনা তা দেখা হয়। আপনি নাগরিক সাংবাদিক হিসেবেও খেয়াল রাখতে হবে যে কথা বা গল্প আপনি মানুষকে জানাতে চান, সেটার জন্য মানুষের আগ্রহ আছে কিনা বা হবে কিনা। পত্রিকার একটি কলামের একটি লাইন, টিভির এক সেকেন্ড বা রেডিওর সময় সব কিছু এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে সেখানে সংবাদ মূল্য ছাড়া কোনো কিছু প্রচার সম্ভব নয়। অবশ্য বিভিন্ন অবস্থায় তা কিঞ্চিৎ ভিন্ন হয়। সেখানে সংবাদ মূল্য করে তোলারও অনেক বিষয় থাকে। তবে সেটা অতি সামান্য। আপনি যা জানাতে চাইছেন সেটা কি মানুষ জানতে চায়? আপনি হলে কি সেটা জানার জন্য আকুল হতেন? আপনার আশেপাশের মানুষেরও এমন আকুলতা হবে বলে কি আপনি বিশ্বাস করেন? – এসব প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হলে বুঝবেন সেটার সংবাদ মূল্য আছে। আর সংবাদ মূল্য ছাড়া একজন জার্নালিস্টের কোনো কথা বা গল্পের কোনো মূল্য নেই।

ব্লগিং ও সিটিজেন জার্নালিজম
ব্লগারদের একটি অংশ মনে করেন। সিটিজেন জার্নালিজম নামক তকমা গায়ে প্যাঁচানের জন্য বা সেটাকে আত্মীকরণ করার জন্য কি ব্লগার পদবিটাকে ত্যাগ করতে হবে। অনেকে ভাবেন, মডারেশন ও নানা নিয়মের কিঞ্চিৎ ঝামেলার মধ্যেও ‘সিটিজেন জার্নালিস্ট’ বলার খ্যাতি বা কাজ করার সুযোগ কি বেশি জরুরি। ব্লগারদের এসব ধারণার একমাত্র জবাব হচ্ছে- যোগ্যতা ও দক্ষতাকে দিনে দিনে বা শিক্ষার নানা ধাপে যেমন আরো মজবুত ও ঝালিয়ে নেয়া হয় নতুন কাজটাও অনেকটাই তেমন। এসএসসি পাশের পর এইচএসসিতে গেলে যেমন আগের জ্ঞানটাকে আরো সহজ মনে হয় এটাকেও তেমন বলা যায়। একজন ব্লগার তার সৃজনশীলতা ও চিন্তার উৎকর্ষতার মাধ্যমে সমাজের , পরিবারের, রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ বা প্রযুক্তিসহ আরো অনেক কিছুকে নিজের মতো করে, নিজের দেখা থেকে বা পারিপার্শ্বিকতার মাধ্যমে জ্ঞানলব্ধ হয়ে সেটাকে একটি ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরছেন ব্লগের ডায়রিতে। তার এই দক্ষতার প্রতিভাটুকু আরো বিস্তৃত হতে পারে সিটিজেন জার্নালিজমে। তাই একজন সাধারণ নাগরিক থেকে একজন ব্লগার অনেকগুণ বেশি যোগ্য ও সক্রিয় ব্যক্তি হিসেবেই ”সিটিজেন জার্নালিস্ট” হতে পারেন।

বিডিনিউজ ব্লগের ‘নাগরিক সাংবাদিকতা’ রূপ নিয়ে কিছু কথা
আমি আগের পর্বে সিটিজেন জার্নালিজম নিয়ে বিডিনিউজ ব্লগের যাত্রা শুরু এবং আরো কয়েকটি ইলেকট্রনিক চ্যানেলে এটার চর্চার বিষয়ে বলেছি। বাংলা ভাষার ওয়েবসাইট, সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রম, বাংলার বিশ্বস্বীকৃতি, বাংলা ব্লগিংয়ের মান বৃদ্ধির কারণে এটা ঠিক যে, এখন সিটিজেন জার্নালিজম চর্চারও সময় এসেছে। বিডিনিউজ ব্লগ তাদের একটি টিম গুছিয়ে কাজ শুরু করেছে। ব্লগারদের এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও তাদের রয়েছে। কিন্তু সিটিজেন জার্নালিজমের পুরো বিষয়টাকে আরো পরিকল্পিতভাবে না গুছিয়েই অনেকটা অবিন্যস্তভাবেই কাজ শুরু হয়েছে সেই নাগরিক সাংবাদিকতার। নাগরিককে তৈরী না করে, নাগরিকদের মাঝে প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়গুলোর ব্যাপ্তি না ঘটিয়ে সংবাদ তৈরীর জন্য কিভাবে তারা প্রস্তুত হবেন! অন্য আরো কয়েকটা ব্লগ থেকে বিডিনিউজের সিটিজেন জার্নালিজম নির্ভর ব্লগের মোড়কে ভিন্নতা ছাড়া অন্য বিষয়গুলো তেমন গ্রহণযোগ্য নয়। বেশ কতগুলো কন্টেন্টে লেখাগুলোকে সাজানোর চেষ্টা চলছে। উপস্থাপনা বা সংবাদগুলোর তথ্যগত দিকগুলোও বেশ ভঙ্গুর। সেখানে ব্যক্তির মতামত ও অবস্থানই প্রাধান্য পাচ্ছে বেশি। মতের দিকটার সংবাদ মূল্যটাকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। কর্মশালার মাধ্যমে ব্লগ কর্তৃপক্ষ সিটিজেন জার্নালিজমে আগ্রহীদের একত্রিত করে আরো ধারণা দেয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছেন সেটা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কোনো সৃষ্টিকে বেঁচে থাকার জন্য উদ্যোক্তার ভূমিকার সঙ্গে তার চালিকাশক্তির ভূমিকাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

(এ বিষয়ে ব্লগার ও সবার মতামত প্রত্যাশা করছি। এটাকে আরো পূর্ণাঙ্গ রুপ দেয়ার ইচ্ছায় পরের পর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা)

————————————————————————–
সিটিজেন জার্নালিস্ট: আপনি নিজেই (পর্ব-১)