ক্যাটেগরিঃ সিটিজেন জার্নালিজম

 

তথ্য অন্যের কাছে পৌঁছে দেওযার জন্য মানুষ যে অন্তর্জালের সাহায্য নিচ্ছে বা অন্তর্জাল নিজেই তথ্যকে পৌঁছে দেওযার মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে, সেটা ক্রমশ বাড়ছে, মানুষ তথ্য পেতে চায়। । এজন্য অনেক কিছু করতে চায়। তারপরও তথ্য সবার কাঙ্খিত। কেন তথ্য দরকার এটা দেখতে গেলে দেখা যাবে, মানুষ চায় নতুন কিছু জানতে। নিজের আশে পাশে মানুষ, ঘটনা বা প্রকৃতির রূপ, নিজের বিশ্বাস, চেতনা, ভালো লাগা ,মন্দ লাগা, সমাজের রীতি নীতি, মনুষ্য জীবনের নানা রূপ। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল ও মানুষের জীবনকালের পুরোটাই যে তথ্যকে ঘিরে।

:: তথ্য কেন সবচেয়ে বড় সম্পদ ::
আজকাল গ্লোবালইজেশনের যুগে এটাই বড় সত্য যে তথ্যই সবচেয়ে বড় সম্পদ। মানুষকে তথ্য জানানো এবং নিজে তথ্য জানতে পারা ও জেনে রাখা বড় কাজ। পারিবারিক কাজ, নিজের ছোট খাট কাজ ও কর্মজীবনসহ সবকিছুর আগে জানা প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কাজের যতটুকু সম্ভব প্রয়োজনীয় বিষয়। ব্যবসা করার জন্য হোক, ক্ষমতা চর্চা বা সেখান থেকে উৎখাত করার জন্যও হোক জানতে হবে তথ্য। ধ্বংস বা বিনাশ বা জীবনকে দুর্দশাগ্রস্ত বা চুরি, ছিনতাই ও ভাল করা যায় তথ্য ঠিকভাবে পরিপূর্ণভাবে জানা থাকলে। তবে নেতিবাচক এই প্রবণতা তথ্য জানার অধিকার হিসেবে আমরা দেখি না. এসব প্রেক্ষিতে সামনে চলে এসেছে মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। গণমাধ্যম সারা বিশ্বেই অনেক বড় শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করছে সেখানে। বিশ্বজুড়ে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিকসহ অন্যান্য মাধ্যম গণতন্ত্র ও মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রাষ্ট্রের জন্ম থেকে শুরু করে পরিচালনা ও অস্তিত্ব রক্ষায় সক্রিয় গণমাধ্যম এখন বাস্তবতা। এগুলোর সঙ্গে এসে মিলেছে নাগরিকের অংশগ্রহণ। নাগরিকরা নিজেরা বৃহত্তর পরিসরে নিজের , সমাজের , রাষ্ট্রের বিষয়কে সামনে নিয়ে আসছেন। সেটা নিয়ে হচ্ছে আলোচনা, সমালোচনা. ঘরের ভিতর, বাইরে। নাগরিকদের চেষ্টার বড় শক্তি হলো সেটা পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের ব্যক্তি সত্তার, মনে ও ঘরে. পরিবারে। মুক্তির , রুখে দাঁড়ানোর ও বলিষ্ঠভাবে বেঁচে থাকার জন্য নাগরিকের চেষ্টা আজ উদীয়মান শক্তি। তাই আমরা একে সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতা বলেই জানছি।

:: সিটিজেন জার্নালিজম কেন ::
ব্যক্তি হিসেবে সব মানুষের মত আছে। তার নিজের বিশ্বাস ও চিন্তা চেতনা, শিক্ষা ও যোগ্যতা আছে। নিজের মতকে প্রকাশের জন্য আমরা অনেক সময় চাই পরের মতকেও দমিয়ে রাখতে। কিন্তু সেটা যদি হয় সত্য কোনো বিষয় যেখানে মতকে পাশ কেটে যাওয়া মানে অস্বীকার করা, সেটা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিন্তার বিরোধী হয় বা মানুষের ক্ষতির কারণ হয় তাহলে সে মত টিকে না। এক সময় সে মত পিছু হটতে বাধ্য হয়। সমাজের মানুষের জন্য যে তথ্যটিকে আপনি বেশি জরুরি মনে করেন সেটাকে আপনি নিজেই তাদের কাছে নিয়ে যেতে পারেন। আপনি ব্যক্তি হিসেবে যেমন চান, কোনো ঘটনা কোথায় ঘটলো, কেন ঘটলো, কিভাবে বা কারা এর পেছনে জড়িত, এর সঙ্গে কি কি ঘটনা সম্পৃক্ত তা জানার জন্য। আপনি যদি সেসব প্রশ্ন ও উত্তর জানতে আগ্রহী হন তাহলে আপনি যাকে তথ্য জানাতে চাইবেন তিনিও আপনার মতই জানতে উৎসুক হবেন। আপনি সেসব তথ্য তাদের জানাতে পারেন। আপনার কাছে জানানোর জন্য প্রস্তুতি আর ইন্টারনেট সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যেভাবে ব্লগ, ফেসবুক বা টুইটারে নিজের কথা প্রকাশ করেন, নিজের চিন্তা ভাবনা ও সমাজের বিভিন্ন বিষয়, অসঙ্গতি তুলে ধরেন, মানুষের অজানা তথ্য জানাতে চেষ্টা করেন সেগুলো আপনি আরো বলিষ্ঠভাবে বৃহত্তর আঙ্গিকে তুলে ধরতে পারেন। সেজন্য আপনার ইচ্ছাশক্তি অনেক বড়। তাই একজন ব্লগার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যক্তি হতে পারেন সিটিজেন জার্নালিস্ট। তিনি নিজেই পেশাদার সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকের মতো ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা ও নিজের চিন্তা, অভিজ্ঞতাকে সমন্বিত রুপ দিয়ে ঘরে বসেই আপনি যুক্ত হতে পারবেন বিশ্বের সঙ্গে। টিভির স্ক্রিনে ও পত্রিকার পাতায় যে ঘটনা ঘটা করে প্রচার হতে পারছে না, হচ্ছে না, হচ্ছে আপনার নিজের ভাবনার চেয়েও কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে, সেটাকে আপনি করতে পারেন শক্তিশালী। আপনার মোবাইল বা ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ হতে পারে সেই নাগরিকের কন্ঠস্বরের সহযোগী। আপনি হতে পারেন নাগরিক সাংবাদিক। রাজনীতি, সহিংতা, খেলা বা বড় বিষয়ের মতো অনেক বিষয় আছে যেগুলো নাগরিক সাংবাদিকতার জন্য বড় ক্ষেত্রে হতে পারে। প্রচলিত গণমাধ্যম রাজনীতি, সন্ত্রাসের বাইরে যেখানে কম যায় সেখানে নাগরিকরা বেশি সোচ্চার ভূমিকা রাখতে পারে।

:: নাগরিক সাংবাদিক হলে যা খুশি তাই প্রকাশ?::
নাগরিক সাংবাদিক বা সিটিজেন জার্নালিস্ট হলে যে যেমন খুশি তাই প্রকাশ করবে। এখানে কোনো মডারেশন বা তথ্য যাচাই করার কোনো সুযোগ থাকে না। যে যেভাবে পারে তথ্য প্রকাশ করবে, এভাবে বিকৃতি ও অসত্য তথ্য প্রকাশ হবে। কোনো গণমাধ্যম যেভাবে তাদের নিজস্ব সাংবাদিক টিমের মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে সংবাদ প্রকাশ করে সেটা সিটিজেন জার্নালিস্টদের মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রচলিত গণমাধ্যমের মতো দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নাগরিকরা করতে পারবেন না.— এমন ধারণা ও প্রশ্ন আমাদের মন রয়েছে। এগুলোর সমাধান কিভাবে তাহলে। সমাধান আছে, সেটা নাগরিকের নিজের দায়িত্বশীলতার মাঝেই।
একজন নাগরিক হিসেবে নিজে যেমন সত্য ও সঠিক বিষয়টা গণমাধ্যমে জানতে বা পেতে চাই। একজন নাগরিক সাংবাদিক তথ্য প্রকাশ সেটাই অনুসরণ করবেন। দেশে ও বিদেশে নাগরিক সাংবাদিকতার যে ক্ষেত্রগুলো রয়েছে বা যেখানে নাগরিকদের সাংবাদিকতাকে সুযোগ দেয়া হচ্ছে সেখানে তথ্য প্রকাশে পেশাদার গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীদের মতো নির্ভরযোগ্যতা ও তথ্য যাচাইয়ের জন্য মডারেশন বোর্ড রয়েছে। তথ্যকে নির্দিষ্ট কাঠামোতে দাড় করিয়ে তারা সেটাকে প্রকাশ করেন। সেখানে কেউ নিজের পরিচয় প্রকাশ না করেও সিটিজেন জার্নালিস্ট হিসেবে অন্যকে তথ্য জানাতে পারছেন।

:: অর্থ প্রাপ্তি ::
সাংবাদিক হিসেবে গণমাধ্যমের সবাই নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সুবিধা ও অন্যান্য সুযোগ পান। পেশাদার সাংবাদিকতার মতো নাগরিক সাংবাদিকরাও তেমন সুযোগ পাবেন। বিভিন্ ক্ষেত্রে পেশাদার গণমাধ্যমে নাগরিকদের প্রস্তুতকৃত তথ্য ও সংবাদ ফলাও করে প্রকাশ হচ্ছে। সেখানে পেশাদার সাংবাদিকের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন সিটিজেন জার্নালিস্ট।

:: বাংলাদেশে সিটিজেন জার্নালিজম::
বাংলাদেশে ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমশ ব্যাপক হারে বাড়ছে। ইন্টারনেটের প্রসারের কারণে বিশেষ করে মোবাইল প্রযুক্তির কারণে সামাজিক যোগাযোগ এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিস্তৃত। এখন সময় এসেছে সিটিজেন জার্নালিজমের প্রসারের। বিডিনিউজ২৪ ডট কম বাংলাদেশে সে ধারণাকে বিস্তৃত করতে অগ্রদূত হয়ে এসেছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট সম্প্রতি স্যাটেলাইট চ্যানেল এটিএন নিজজের সঙ্গে মিলে সিটিজেন জার্নালিজমের বিকাশে নতুন একটি উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানের বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার আগ্রহীদের নিয়ে সিটিজেন জার্নালিজম টিম করার কথাও তারা ভাবছেন। এছাড়া সিটিজেন জার্নালিজম প্রসারে এই ইনস্টিটিউট আরো কাজ করছে। বাংলানিউজ২৪ ডট কম নাগরিকদের মত ও সংবাদকে গুরুত্ব দিয়ে সাধারণ মানুষের লেখাকেও তাদের নিজস্ব সাংবাদিকদের মতো গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে। প্রথম আলোসহ অন্যান্য বড় গণমাধ্যম, ভিন্নধারার জনপ্রিয় পত্রিকা আমাদের সময়সহ অন্যান্য পত্রিকাও নাগরিকদের মত প্রকাশে বেশ উদার। ব্লগারদের বড় অংশ এখন সাংবাদিকতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতাকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গেই তুলে ধরছেন। সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে সেটা দিন দিন আরো উৎকর্ষতার পথেই যাবে বলে আমার বিশ্বাস।

:: সিদ্ধান্ত আপনার ::
আপনার কাছে বলার জন্য কথা আছে। তথ্য আছে। আপনার নিজের, আশেপাশের, মানুষের গল্প আছে। আপনি সেটা মানুষকে সহজেই জানাতে পারেন। আপনার সে কথা , সেই গল্প সমাজরে বা রাষ্ট্রের নয়, একইসঙ্গে শুনবে , জানবে পুরো বিশ্ব। আপনি নিজে সেটার স্থপতি। স্থপতি যেভাবে ভবন নির্মাণের জন্য কাজ করবেন। সেখানে গল্প থাকবে, প্রশ্ন , উত্তর থাকবে। যুক্ত হতে পারে ভিডিও, অডিও বা ছবি। আরো থাকতে পারে কোন লিং বা নির্দেশনা। সবকিছুতে মিলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে আপনার সৃষ্ঠি। আপনার অর্থাৎ একজন ব্লগার বা সচেতন নাগরিকের কন্ঠ তখন হতে পারে সব নাগরিকের কন্ঠ। মনে রাখতে হবে আপনি নিজের কথা ও গল্প এজন্য বলতে চান যেখানে দল মত নির্বিশেষে সত্য ও সঠিক বিষয় মানুষ জানতে পারবে। এখানে নিজের রাজনৈতিক মত নয় , যুক্তিপূর্ণ ও সত্য বিষয় উপস্থাপন করতে হবে। আপনি যদি চান আপনার কথা ও লেখার প্রতি মানুষ মনোযোগী হোক তাহলে নিজের রাজনৈতিক বা চিন্তা, ভাবাদর্শ, ধর্ম, বিশ্বাস চাপিয়ে দেয়ার মানসিকতা ত্যাগ করবেন। মানুষের ওপর, যারা আপনার এই তথ্য জানার জন্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে আছে তাদের নিজের ওপর ছেড়ে দিন। আপনি জানান ঠিক তথ্য। সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার ছেড়ে দিন তাদের ওপর।

(বিডিনিউজ২৪ ব্লগের যাত্রা শুরুর ক্ষণে উপস্থিত হয়ে এরকম একটি লেখার চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। অবশেষে সিটিজেন জার্নালিজম নিয়ে নিজের চিন্তাগুলো শেয়ার না করে পারলাম না। লেখাটি পরে আরো একটি পর্বে শেষ করার ইচ্ছা আছে। যে কোনো মন্তব্য সাদরে আমন্ত্রণ।)

———————————————————————————————————
সিটিজেন জার্নালিস্ট : আপনি নিজেই (পর্ব-২)