ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

তুমি ডিজিটাল, আমি ডিজিটাল, বাংলাদেশ ডিজিটাল।

ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে বুক ফুলিয়ে ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, বিজ্ঞাপন, প্রজ্ঞাপন, গান, নাটক, টক শো ইত্যাদি করে বর্তমান সরকার অনেক খুশি। বাংলাদেশের সীমাহীন উন্নতি হয়েছে। আজকে রিকশাওয়ালার কাছেও স্মারটফোন পৌঁছে গেছে। তিনি ইন্টারনেট ব্যাবহার করতে জানেন।

ইন্টারনেট- জাদুর জগৎ- এটা এখন বাচ্চারাও জানে। আজকে আমার কি নিয়ে সমস্যা?

কোনই সমস্যা নাই। আমি খুশি। বাংলাদেশ ডিজিটাল হচ্ছে বলে কথা!

পুরানো কথা বাসি হলে যেমন ফলে তেমনি চক চক করলেই সোনা হয় না। আজকে ঢাকা শহর যতটা চক চক করে ততটাই ধুলা আর মরচে পড়ে আছে মানুষের মস্তিষ্কে। আর সোজা করে বলি, বাংলাদেশের সব মানুষের হাতে স্মার্টফোন, সবার হাতের নাগালে ইন্টারনেট নিয়ে আসলেই কিন্তু দেশ ডিজিটাল হবে না। এক দেশ ভর্তি অলস মানুষ তৈরি হবে। হাতের মুঠয় প্রযুক্তি এসে গেছে যেগুলোর একটাও বাংলাদেশের কোন তরুণ বা বিজ্ঞানী বানায় নি। হয়ত বাটি চালান দিলে দুই একজনকে খুঁজে পাওয়া যাবে। অন্যের প্রবর্তিত, বানানো জিনিশ জীবনে ধারণ করতে পেরে বাংলাদেশের সরল সোজা বোকা মানুষগুলো অনেক খুশি। আররেহ,ডিজিটাল! বলে, দাও চিৎকার!

এই দেশে এখন ডিজিটাল মস্তিষ্ক বানানোর উদ্যোগ যে নেয়া হয় নি এই নিয়ে আমি চিন্তিত। আমার চিন্তায় কার কি এসে যায় ? কারো না। তাও, আমি যে আজকে টাইপ করছি। তথ্যের জন্য ইন্টারনেট ঘাঁটছি, ফেসবুকে আমার ব্লগের লিঙ্ক শেয়ার করছি, ওয়া্টসঅ্যাপে গেজাচ্ছি। এর কোনটাই আমাকে ডিজিটাল বানায় না। আমি প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই প্রযুক্তি গুলা প্র আমার উপর নির্ভরশীল না। তাদের উন্নতি আমার হাতে নির্ভর করছে না। তাদের কে ছাপিয়ে নতুন কিছু তৈরী করার জ্ঞান ও দক্ষতা আমার নেই। বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ প্রযুক্তি নির্মাতারা বাগিয়ে নিচ্ছে আমাদের অথর্ব বানিয়ে।

বাংলাদেশের মানুষ অন্যের বানানো এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল। আজকে যখন দেখা যায় ছোট ছোট বাচ্চারা স্কুল থেকে এসেই কম্পিউটার গেইম খেয়া শুরু করে দিচ্ছে, আরেকটু বড় হলে(টিন এজাররা) তারা বাঘা বাঘা গেইম খেলে ও এই নিয়ে শো অফ করছে, তখন কোনো এক দেশে অষ্টম শ্রেণী থেকে বিজ্ঞানের ছাত্রদের সরাসরি জাভা, পাইথনে কোডিং শিখানো শুরু হয়ে গেছে। কোন কোন স্কুলে তা দশম শ্রেণী থেকে শুরু হয়ে চলছে দ্বাদশ শ্রেণী অব্ধি। অতএব, এই বাচ্চার দুই থেকে চার বছরের কোডিং এর জ্ঞ্যন দিয়ে দিব্বি আজকে ছোট খাট আপ থেকে শুরু করে, গেইম এবং পরবর্তিতে অনেকেই ভাল সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কলেজ/ ইউনিভার্সিটি শেষ করার আগেই।

স্কুলে কি তাদের অপশনালি পড়ানো হচ্ছে? না। এইটা পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্গত। ভালো শিক্ষকেরা তাদের পড়ায়। আমাদের দেশে যেখানে নিয়ম আছে, যে বাচ্চা বিজ্ঞান পড়বে সে হয় জীববিজ্ঞান নিবে, না হলে কম্পইউটার নামক একটা অজনপ্রিয় বিষয় নিবে। জীববিজ্ঞান নেয়ার প্রবণতা বেশি কারণ,

১।বাংলাদেশে কে কোথায় চান্স পায় ঠিক নাই।

২। আসলে ১৬-১৮ বছরের ছেলেমেয়েরা আসলে কি হতে চায় জানে না। তাদের কোনদিন career counseling দেয়া হয় নাই।

৩। জীববিজ্ঞান নিলে মেডিকেলে পরীক্ষা দিতে পারবে( সে ডাক্তার হতে না চাইলেও- আরেহ অপশন সব ওপেন রাখতে হবে!)।

৪।জীববিজ্ঞান যে কেউ পড়াতে পারে!( মুখস্থ করে, ভালমত ছবিগুলা প্র্যাকটিস করলেই এ+)

উপরোক্ত তিনটি কারনের চেয়ে আর বেশি কারণ আছে। আপনারা সংযোজন করে নিবেন।

এখন আসি কেন কম্পিউটার পরতে অনীহা?

১। কম্পিউটার নিলে তো মেদিকেলে পরীক্ষা দিতে পারবে না!

২। আসলে ১৬-১৮ বছরের ছেলেমেয়েরা আসলে কি হতে চায় জানে না। তাদের কোনদিন career counseling দেয়া হয় নাই।

৩। কম্পিউটার পড়ানোর ভাল শিক্ষক নাই।

৪। বুঝে পড়ার বিষয়। যদি সৃজনশীল প্রশ্নেও কমন না পরে?(!!)

হ্যাঁ। প্রতি বছর এই প্রশ্নগুলো অনেক ছেলেমেয়ের মাথায় আসে। দুই একজন সাহস করে ধরেন কম্পিউটার পরল। তারা কোডিং এর অধ্যায় টা সম্পূর্ণ ভাবে ছেড়ে পরীক্ষায় এ+ যোগার করতে সক্ষম হবে। কারণ হল, আমাদের প্রানপ্রিয় জাফর ইকবাল স্যার আন্দোলন করে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করালেও, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যাবস্থা মারাত্মক সৃজনশীলতা দেখিয়েছে, একি সৃজনশীল প্রশ্ন পুনরায় দেয়ার মাধ্যমে/এই প্রশ্ন আর ওই প্রশ্নের মধ্যে যেকোন একটা উত্তর দিলে হবে/অপশন রাখার পদ্ধতি/এটা অথবা ওইটা উত্তর দাও – এই সবের মাঝে কোডিং এর বেচারা অধ্যায়টা আজও অপশনাল। কিছু অধ্যায় ছেড়ে যাওয়া, না পড়েও ঠিক ঠাক নম্বর তুলে নেয়ার রেওয়াজ বাংলাদেশের ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে বিরাজমান। তার উপরে গত বছর যে প্রশ্নগুলো এসেছে ওইগুলা তোহ পড়ে যাবেই না!

বাংলাদেশের সরকার যদি কোডিং শেখা স্কুল থেকে বাধ্যতামূলক না করে। আর পরীক্ষা গুলোতেও এই বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রশ্ন এবং যথাযথ ব্যাবহারিক( practical) পরীক্ষা না রাখে। আমরা ডিজিটাল গ্যাজেটের দাস হয়েই মারা যাব। ১৭ কোটি মানুষের দেশ আসলে ছোট দেশ না। বাংলাদেশের আশিটা প্রইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলোতেই কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং

পড়ানো হয়। আর আছে ১৫-১৬ তা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সহ সেখানেও হয় সি এস ই অথবা শুধু সি এস পড়ানো হয়।

এত যে কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ার প্রতি বছর বের হচ্ছেন তারা যাচ্ছেন কোথায় ? সত্যি কথা হল, বেশীরভাগই দেশ ছাড়েন। যারা থাকেন, তারা প্রথমে টেনে- টুনে কষ্টে- সৃষ্টে থাকেন এর পর পলায়ন করেন। দেশামাতার প্রতি অগাধ প্রেমও তাদের ধরে রাখতে পারে না। দেশ তাদের ধরে রাখতে সক্ষম না। গলাবাজি করে লাভ নেই। আমি সরকারের প্রচেষ্টার বিরোধী বা উদ্যোগের বিপরীতে কথা বলছি না। সরকার আজকে ডিজিটাল ডিজিটাল বলে যতই চিল্লাক না কেন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে উদ্ভাবন এবং নতুন সফটওয়্যার, আপ, গেইম বানানোর মজা এবং ভীত না ঢুকিয়ে দিলে প্রযুক্তির দৌড় সেলফি তোলা আর আপলোড করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ২০১২ সালের MDG আর ২০৪১ সালের SGD ধরতে গিয়ে আগামী ১০-১৫ বছরে বাংলাদেশ কোন যায়গায় কতদূর পিছিয়ে থাকবে তা এখনি বলে দেয়া যায়। ব্যাপারটা হবে বাংলাদেশের ইংরেজি শিক্ষার মত। যারা পড়ায় তারাও ঠিকমতো গ্রামার জানে না। যারা পড়ে তারাও শিখে না। এইটা চক্রাকারে চলতেই থাকে। আজও চলছে।

আমার কথাবার্তা ইংরেজি নিয়ে না। এখন ইংরেজির সাফাই গাইলে কোন বাঙালি বোদ্ধা বলবেন মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষার কথা! ইংরেজি উঠায় দিয়ে সবকিছু বাংলায় করে ফেলার কথা!

ওইসব ছাড়লাম। ভাষা যেটা আসলেই শেখা উচিৎ তা হল programming language। আমাদের পার্শবর্তী একটা বিশাল দেশ আছে। সেখানে দুনিয়ার বড় বড় আইটি কোম্পানিগুলো কেন আসে? তাদের বাজার এতটা প্রসারিত কেন? কেন তারা আজকে সবচেয়ে বেশি সিইও উৎপাদনকারী দেশ ?

ভারতে ইঞ্জিনীরিং পড়ার সময় প্রথম বর্ষেই বাংলাদেশের ছাত্ররা ধাক্কা খায়। এটা তারা বিশ্বের যেকোন দেশে গিয়ে পড়তে গেলেই খায়। গুটিকয়েক সফল ছাত্রের উদাহরণ বাদ দিয়ে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রি ভ্যাবলার মত c programming ক্লাসে তাকিয়ে থাকে আর পরীক্ষার আগে রাজ্যের দুশ্চিন্তায় মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। এদিকে দেখা যায় ভারতীয় ছাত্র ছাত্রীরা এই পরীক্ষার আগে দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা ইঞ্জিনীরিং পড়তে আসবে এটা নবম দশম শ্রেণী থেকেই জানত, আর জানত বিধায় এক একটা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য আমাদের দেশের বাচ্চাদের মত সিলেক্টিভ প্রশ্ন পড়ে এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর কোচিং করে নি। তারা প্রত্যেকে একাদশ ও দশম শ্রেণিতে পুঙ্খানুপুঙ্খু ভাবে পড়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রথম বর্ষে বাদধ্যতামূলক coding and programming course থাকে বলে তারা স্কুলে ভালমতো প্রোগ্রামিং শেখে না। তাদের শিক্ষা ব্যাবস্থা সুদূরপ্রসারী যেটা আমাদের দেশে কল্পনার অতীত। আজ থেকে অন্তত ১০-১৫ বছর আগে থেকেই ভারতীয় শিক্ষা ব্যাবস্থায় বিজ্ঞান ছাত্রদের জন্য একরকম বাধ্যতামূলক ‘ডিজিটাল’ শিক্ষা দেয়া শুরু হয়েছে। আপনি মানুন আর নাই মানুন তারা আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে। বিশ্বের অনেক দেশ থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে। আমি ভারতের গুণগান গাইছি না। ভারতের গুন তুলে ধরছি। যেখান থেকে আমাদের এখনি শিখতে হবে আর শিক্ষা নিতে হবে কারণ এমিনিতেও অনেক দেরি হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে ভাল কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসসি বিষয়ের শিক্ষার্থীরদের সাথে কথা বলে আমি জেনেছি তারাও অকপটে স্বীকার করে যে, স্কুলে এই বিষয় টা ভালভাবে বিজ্ঞানের ছাত্রদের পড়ালে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক কাজে দিত। ছোটবেলায় আমরা অনেক কিছু দ্রুত শিখতে পারি। এবং প্রোগ্রামিং শিখলে এবং অনুশিলন করলে মস্তিষ্কের ভাল চর্চা হয় এটাও গবেষকরা বলে থাকেন। তাহলে কেন না ? দেশের এত এত ছেলেমেয়ে যে সিএসসি পড়ে বের হয় তারা সবাই বিশাল programmer হবে তা না। কিন্তু তারা ছোট বাচ্চাদের basic programming অবশ্যই শেখাতে সক্ষম। এতে তাদের উন্নতি ও বাধ্যতামূলক। এই দেশের তরুণদের ধরে রাখতে হবে কাজ দিয়ে, সুযোগ দিয়ে। এই অগণিত computer engineer রা অনায়সে শিক্ষক হতে পারেন। স্কুলের বাচ্চাদের coding শেখায় সহযোগীতা করতে পারেন। আরও অনেক কিছু সরকার করতে পারে। আমরাও পারি। আমি আপাতত এই নিয়ে নিয়মিত গলাবাজি করব। আজকে যদি অষ্টম/নবম শ্রেণী থেকে শুধু বিজ্ঞান না, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষার বাচ্চারাও coding শেখা শুরু করে, প্রত্যেকদিন এক এক জন হয়ত একটা করে MS WORD বানাতে সক্ষম হত। বা এর চেয়েও ভাল কিছু বানাতো! Computer science and engineering এক সৃজনশীল বিষয়। এর ব্যাপ্তি আমাদের কল্পনার বাইরে। এর ভবিষ্যৎ আগামী ৩০-৪০ বছরে সমানভাবে উজ্জ্বল। এমন এক যুগে আমরা বসবাস করি যেখানে সবাইকে টাইপ করা, ফেইসবুক ব্যাবহার করা শিখানো, স্কুলের শিক্ষকদের পাওয়ার পয়েন্টে প্রেজেন্টেশন দেয়া শেখানো মুখ্য হতে পারে না। উদ্ভাবনী শক্তি আর সৃজনশীলতা একটা দেশের সমাজকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তা আমরা আনুমান করতে পারব না। কিন্তু হ্যা, আজকে থেকেও যদি জোড়েশোরে বাচ্চাদের coding সেখান শুরু করা হয় আজ থেকে অন্তত ১০ বছর পর বিশ্ব আমাদের দেশের দিকে আসলেই গোল গোল চোখ করে তাকাবে, এই দেশের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বিশ্বের বাজারে রাজত্ব করতেও পারে। যেদিন ছেলেমেয়েরা নিজেরাই নিজেদের প্রযুক্তি ও তার উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হবে সেদিন SDG এবংMDG নিয়ে অত লাফালাফি করার দরকার পড়বে না। বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা শুধু যে নানাবিধ প্রকৌশল পড়বে, তা না। যদিও সবধরণের ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে এখন computer softwares এবং programming জানতে হয় । কোথায় এটা লাগে না বলা মুশকিল। ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে চিল্লাতে চিল্লাতে এই দেশ শুধু অপারেটর বানাচ্ছে কোটিতে কোটীতে। আমাদের প্রযুক্তি রপ্তানি করতে হবে। এইটা মাথায় রাখলেই চলবে। আবার বলি, প্রযুক্তি ব্যাবহার করতে জানাটাই ডিজিটাল হওয়া না। আমারা প্রযুক্তির দাস হতে পারি না কিন্তু নতুন প্রযুক্তি বানিয়ে আমরা অনেককিছুই বশীভূত করতে পারি।