ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা ও অপ্রতুল খাদ্য সরবরাহ এবং সুষ্ঠু খাদ্য পরিকল্পনা ও বাজার নিয়ন্ত্রের কারণে খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা ও মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়েছে যে সাধারণ মানুষ রাস্তায় লাইনে দাঁড়িয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিশেষ কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহ করছে। সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে দ্রব্যমূল্যের দাম কমানোর দাবি জানানো হলেও তা কোনভাবেই কার্যকর হচ্ছেনা। এই দাবী আরও ঘনীভূত হয়ে হয়তো অচিরেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। কয়েক বছর পূর্বে আইএমএফ-এর চেয়ারম্যান ওয়াশিংটনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, “খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং খাদ্য ঘাটতি সারা দুনিয়ার জন্য বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এমনকি এই খাদ্যের জন্য বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে”।

এক কথায় খাদ্য সংকট আজ এক গুরুতর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটে পর্যবসিত হয়েছে। সেই সাথে বিশ্বব্যাপি আশংকাজনক ভাবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটছে। ডলারের বিপরীতে সোনার মূল্য ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশসহ আমেরিকা, জাপান ও ভারত ছাড়াও বেশকিছু দেশে শেয়ার মার্কেটের নিম্নগতি বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক এমন সংকটের মুহূর্তে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর পক্ষে বাইরে থাকা সম্ভবপর নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থায় অত্যন্ত থমথমে ভাব বিরাজ করছে। চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমুল্যের বাজার অস্থিতিশীল, কর্মসংস্থানের অভাবে সাধারণ ও দরিদ্রশ্রেণীর মানুষের হাতে টাকাকড়ির অভাব, যেন এক নীরব দুর্ভিক্ষেরই প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার জন্য বিদেশী শক্তিও আমাদের পিছনে উঠে পড়ে লেগেছে।

সংবাদপত্র সমুহ তাদের চিরাচরিত ‘তিলকে তাল ও তালকে তিল’ করার কথা ফলাও করে ছাপছে। বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের তেমন আলোচনা নেই, শিল্প প্রসারের তেমন কোন উদ্দ্যোগ নেই, মানুষের জীবন ধারণের মান উন্নয়নের তেমন ফলপ্রসু প্রকল্প বাস্তবায়নের কোন পরিকণ্পনা নেই। আমাদের মূল সমস্যা বিদ্যুৎ সংকট, অপরিকল্পিত গ্যাস চুক্তি ও খাদ্যের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার প্রতি কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই, কোন আলোচনায় সম্পদ সৃষ্টির কোন কথা নেই বরং অবিবেচকের মতো উৎপাদনবিমুখ খাতে আকাশচুম্বী অর্থ ব্যায়ের পরিকল্পনা গ্রহণে সককারকে ইন্ধন যোগানোর লোকের অভাব নেই। খবরের কাগজ জুড়ে শুধু হত্যা, গুম, ধর্ষণ, খাদ্যভাব, বিদ্যুৎ সংকট, দুর্নীতি-মামলা, গণ পিটুনি আর ক্রাইম জগতের যতসব লোমহর্ষক খবর। বিদেশেও বাংলাদেশ সম্বন্ধে বিকৃত তথ্য বেড়েই চলেছে। দেশ যদি আজ খাদ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী ক্ষেত্রে তেমন কোন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় তবে কেউ যে আমরা নিরাপদে থাকবো, সে ভাবনা বোধকরি এখনো অনেককে স্পর্শ করেনি। বিশেষতঃ প্রশাসনিক দায়ভার ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড সমূহ তেমনটাই আভাষ দেয়।

মানুষ সবসময় লুন্ঠনকারিদের দ্বারা অবিরত লুন্ঠিত হতে থাকে যতক্ষণ না তার নিজস্ব উৎপাদন পদ্ধতি বা অর্থনৈতিক পথের ঠিকানা থাকে। যে জাতি সম্পদ সৃষ্টি করতে জানেনা বা সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে পারে না, সে জাতি রাখাল জাতির মত সদাসর্বদা শোষিত হতে থাকে। আমাদের ঠিকানা ও নজিরবিহীন অটেকসই অর্থনীতির কারনে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আফিম আর মাইক্রো ক্রেডিটের হেরোইন খেয়ে সমস্ত দেশ, জাতি ও জনগণ আজ প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে আছে। ১/১১/০৭ এর পরিবর্তনের পর নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমুল্য তথা চাল, ডাল, তেল, চিনির মুল্যসহ প্রায় সকল পণ্যের মুল্য গড়ে দ্বিগুন হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী একজন মানুষের আয় ন্যুনতম তিনগুন বৃদ্ধি পাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু কিভাবে সেই তিনগুন আয় বৃদ্ধি ঘটানো সম্ভব তার কোন ব্যাখ্যা বা কৌশল এখন পর্যন্ত দেশবাসীর সামনে কেউ প্রকাশ করেনি বা সেই পথ দেখায়নি। মাইক্রো ক্রেডিটের নামে শোষন এখনও অব্যাহত আছে। এই তিনগুন আয় বৃদ্ধি করার উপায় বা প্রক্রিয়াই হচ্ছে মহাউদ্দ্যোগ। কিন্তু কে সেই মহাউদ্দ্যোগ গ্রহণ বা বাস্তবায়ন করবেন? চাষী, মজুর, নিম্নবিত্তের মানুষ, বণিক, শিল্পপতি, বুদ্ধিজীবি, আইনজীবি, সাংবাদিক, আমলা, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, নাকি আমাদের চিরাচরিত ক্ষমতালিপ্সু, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্থ রাজনীতি? বর্তমানের রাজনৈতিক কালচার স্পষ্টতই দুধ ও তামাকের প্রতি সমান আগ্রহের চিত্রটাই তুলে ধরে।

যে রাজনৈতিক কালচারের কথা প্রফেসর ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ দারিদ্র বিমোচন কৌশলপত্র (পিআরএসপি) পরামর্শ সভায় অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেছেন, “পিআরএসপি এর ধারণা এসেছে দাতাদের নিকট থেকে, কিন্তু আমরা নিজস্ব শক্তিতে এ দেশের দারিদ্র দ্রুত নিরসনে দাতাদের নির্দেশের বাইরেও অনেক কিছু করতে পারি। এ জন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঐক্য ও রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা প্রয়োজন। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই অর্থনীতি বর্তমানে একটি অস্থির ও অন্তবর্তীকালীন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তিনি গুরুত্বের সাথে বলেন, ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির ফলে খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানী উভয় ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা ও মানবিক নিরাপত্তার বিষয়টি এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।”

সোজা বাংলায় দ্রব্যমুল্যের কষাঘাতে ওষ্ঠাগত মানুষকে আজ কর্মসংস্থানের ও বাড়তি আয়ের পথ দিয়ে আশ্বস্ত করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ খোলা নেই। বিগত ৪০ বছর ধরে বিদেশী দাতাদের ঋণদান পরিকল্পনা ও পদ্ধতি এবং চাণক্য অর্থনীতির কৌশলপত্রই আপততঃ আমাদের বর্তমান ব্যর্থতার গ্লানিকে দীর্ঘায়িত করছে। বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা না বদলালে, রাজনৈতিক দৃষ্টিভংগি ও অস্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বিশাল কোন পট পরিবর্তন না হলে আমাদের আর্থিক প্রগতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ব্যহত হতেই থাকবে। প্রগতি কোন কলাকৌশলের বিষয় নয়, এর জন্য প্রয়োজন যুৎসই ও টেকসই পরিকল্পনা- বাস্তবসম্মত, জনকল্যাণমূলক, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। চলমান রাজনৈতিক দলাদলি ও প্রতিহিংসা সেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে আমাদের ক্রমশঃই দূরে ঠেলে দিচ্ছে।