ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্বি এবং জলবায়ূ পরিবর্তন জনিত কারণে অদূর ভবিষ্যতেই যে পৃথিবীতে খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা সমস্যা প্রকট হয়ে উঠবে এ কথাটা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। এই সমস্যা সৃষ্টিতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ সমূহের ভূমিকা নগন্য কিন্তু এইসব দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং অর্থনীতিই সবচেয়ে বেশী ঝুকির মুখে পড়েছে। জলবায়ূ পরিবর্তন মোকাবিলা করার দুইটি দিক রয়েছেঃ প্রশমন এবং খাপ খাইয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া। জলবায়ূ পরিবর্তনের হার রোধ করা লক্ষ্যে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নির্গমন মাত্রা প্রশমন করার জন্য উন্নত এবং দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ সমূহকেই এগিয়ে আস্তে হবে। কিন্তু মূল সমস্যা হলো এই যে যুক্তরাষ্ট্র সহ উন্নত বিশ্বের দেশ সমূহ জলবায়ূ পরিবর্তনে তাদের ভূমিকা মেনে নিলেও কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন প্রশমনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে দ্বিধাগ্রস্থ এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য গঠিত তহবিলে তাদের ওয়াদা মাফিক অর্থ যোগান দিচ্ছেনা। জলবায়ূ পরিবর্তন এখন যে শুধুই একটি ধারণা মাত্র নয় এ বিষয়টি কিছুটা দেরীতে হলেও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ মহলে পৌঁছুতে শুরু করেছে। যদিও এখনো আমেরিকার সাধারণ জনগণ এই সমস্যাকে তাদের জন্য প্রধান সমস্যা মনে করে না। আমেরিকানদের কাছে এটি হচ্ছে ৬ নং সমস্যা। তাদের কাছে প্রধান সমস্যা মনে হয় উত্তর কোরিয়া, ইরান, ইসলামী জঙ্গীবাদ, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ইত্যাদি। কিন্তু, পৃথিবীর মোট ৩৯ দেশের জরিপে জলবায়ূ পরিবর্তনই ভবিষ্যতের জন্য প্রধান সমস্যা হিসাবে প্রতিয়মান হয়েছে। আশার কথা হচ্ছে যে, আমেরিকার নিরাপত্তার সাথে জড়িত বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটির রিপোর্টে তারা পরিস্কারভাবে উল্লেখ করেছে যে জলবায়ূ পরিবর্তন আর সময়ের ব্যাপার নয়, এটা ঘটছে এবং তার ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যেই জাতিগত সংঘর্ষ শুরু হয়ে গিয়েছে। উদাহরন হিসাবে তারা মালির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা বলেছেন এবং এও বলেছেন যে এই রকম আরো অনেক সহিংস দাঙ্গা নিশ্চয় অন্যান্য জায়গায় হচ্ছে। জলবায়ূ পরিবর্তন সংক্রান্ত রিপোর্টটি পড়ার জন্য নীচের লিঙ্কটিতে ক্লিক করুনঃ http://www.huffingtonpost.com/2014/05/14/climate-change-national-security_n_5323148.html

জলবায়ূ পরিবর্তন প্রসঙ্গে একটি কথা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই প্রনিদানযোগ্য। জলবায়ূ পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের খাদ্য, পানি, সেচ, কৃষি, নৌ-চলাচল, পরিবেশ, প্রতিবেশ, এবং জনস্বাস্থ্য খাত যে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মধ্যে ইতিমধ্যেই পড়েছে একথাটি বোধহয় নতুন করে আর বলার প্রয়োজন নেই। এরি মধ্যে অনেক মানুষ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বাস্তুহারা হয়াছে এবং শহরে কিংবা অন্যত্র জায়গা করার জীবন সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। পরিবেশ-শরণার্থী বিষয়টিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে। আমাদের দেশের অভিন্ন নদী সমূহের নিয়ন্ত্রন উজানের অঞ্চলে থাকায় সেসব নদীতে শুকনো মৌসুমে পানি এবং পলির ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার ফলে তিস্তা সহ উপকূলীয় অনেক অঞ্চলেই কৃষি, পানি, সেচ, ইত্যাদি ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। জলবায়ূ পরিবর্তন এই সমস্যাকে আরো অনেক তীব্র করে তুলেছে এবং ভবিষ্যতে আরো জটিল রুপ ধারণ করবে বলেই মনে হচ্ছে। তাই জলবায়ূ পরিবর্তনের ফলে পরিবেশগত যে বিপর্‍্যয় বাংলাদেশে নেমে এসেছে তার জন্য উজানের যেসব দেশ একতরফা ভাবে পানি নিয়ন্ত্রন করছে তাদের দায় কম নয়। সে দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশ-শরনার্থীদের দায় উজানের দেশ সমুহকে নেওয়ার কথা চিন্তা করার সময় এসেছে। বাংলাদেশ সরকারকে এই বিষয়টি সরেজমিনে খতিয়ে দেঘার জন্য উন্নত্মানের গভেষনা করা জরুরী। ওভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার লেনদেন শুধুই পানি প্রাপ্তিতেই সীমাবদ্ধ না রেখে, পানি অপ্রাপ্তির কারণে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে তার যতোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবী করাও জরুরী। সে সঙ্গে পরিবেশ-শরণার্থীদেরকেও উজানের দেশ-সমূহে গ্রহন করার দাবী তুলে ধরার সময় এসেছে। বাংলাদেশের পরিবেশ-শরণার্থী নিয়ে বিখ্যাত সায়েন্টিফিক আমেরিকান ২০০৯ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। বিস্তারিত পড়ুনঃ
http://www.scientificamerican.com/article/climate-change-refugees-bangladesh/

বাংলাদেশের পরিবেশ-শরণার্থী বিষয়ে আরো একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে। এই প্রতিবেদনে বলা হয় জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে সারা পৃথিবীতে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন এবং বাংলাদেশে কমপক্ষে ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুহারা হবে। এতে আরো বলা হয়েছে যে ইতিমধ্যেই ঢাকা শহরের ৭ মিলিয়ন বস্তিবাসির মাধ্যে প্রায় ৫ মিলিয়ন হচ্ছে পরিবেশ-শরণার্থী। বিস্তারিত পড়ুনঃ http://www.thestar.com/news/world/2013/02/16/climate_change_forcing_thousands_in_bangladesh_into_slums_of_dhaka.html

ভারতের নতুন সরকার বাংলাদেশী “অনুপ্রবেশকারী ঠেকানো জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা নির্বাচন প্রচারাভিযানের বিভিন্ন বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন। নির্বাচনের পরেও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষনা দিয়েছেন। এ বিষয়ে একটি ব্যাপার চিন্তায় আনা জরুরী। জলবায়ূ পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র-পৃষ্ঠা উপরে উঠে আসছে, আর উজানের দেশ সমুহে অভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে প্নাই এবং পলি প্রবাহ বিঘ্নিত করা হচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নিমজ্জন এবং ভূমিক্ষয় তরান্বিত হচ্ছে। অনেক মানুষকে বাস্তুহারা হয়ে জলবায়ূ-শরণার্থীতে পরিণত হতে হচ্ছে। জলবায়ূ-শরণার্থী সৃষ্টিতে উজানের দেশ সমূহ কি দায় এড়াতে পারবে? তাদের কেউ কেউ যদি উজানের দেশে আশ্রয় নিয়েও থাকে (যা কিনা প্রমাণ সাপেক্ষ) তাহলে তাদের দায় তারা কেন নেবেনা?

ব-দ্বীপের জন্মই হয় নদী বাহিত পলির স্তরায়নের ফলে এবং নিয়মিত জোয়ার ভাটার পানিতে বয়ে আসা পলির মাধ্যমে। উজানের অঞ্চলে বড় বড় বাঁধ দিয়ে শুধু পানি আটকে রাখা হয়না, সেই সাথে প্লাবনভূমি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের ঠিকে থাকার উপাদান পলিও। উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়ী বাঁধ দিয়ে পলি স্তরায়ন প্রক্রিয়াকে আরো বাধাগ্রস্থ করা হয়। তার সাথে যখন ব-দ্বীপ অঞ্চলের অবনমন (subsidence) যোগ হয় তখন জলবায়ূ পরিবর্তন জনিত কারণে সমুদ্র-পৃষ্ঠা উপরে উঠার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঠিকে থাকতে পারেনা – আস্তে আস্তে সমুদ্র গহবরে তলিয়ে যায়। এ বিষয়ে আমার একাধিক পেপার অনেক মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। এখন একই কথা বলছেন অন্যরাও। বিস্তারিত পড়ুনঃ http://www.huffingtonpost.com/peter-bosshard/lifegiving-deltas-starved_b_5380336.html

জলবায়ূ পরিবর্তনের সাথে সাথে ভবিষ্যতে বিভিন্ন ঋতুতে নদীর পানি প্রাপ্যতা অনেক সংকটের মধ্যে পড়বে। এই সংকট আরো ঘনীভুত হচ্ছে অভিন্ন নদীতে বড় বড় বাঁধ এবং ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটানোন মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার উজানের অঞ্চলে ইতিমধ্যেই নির্মিত এবং নির্মানাধীন অসংখ্য বড় বড় বাঁধের কথা উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রেই এসব বাঁধ নির্মাণ করা হয় নবায়ন-যোগ্য শক্তির উৎস হিসাবে। আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন ১৯৯৭ এবং বিদ্যমান গঙ্গা চুক্তি ১৯৯৬ এর আওতায় অভিন্ন নদীতে যেকোন বড় প্রকল্প গ্রহন করার আগেই ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান সহ পানি-সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন, কিন্তু বাস্তবে এই রকম কিছুই করা হচ্ছেনা।

সকল জল-বিদ্যুত কেন্দ্রকেই কি “নবায়ন-যোগ্য” শক্তির উৎস হিসাবে বিবেচনা করা যাবে? বড় বড় নদীর উপর বিশালাকার বাঁধ নির্মান পরিবেশ-প্রতিবেশ, প্রাকৃতিক সৌন্ধর্যই শুধু ধ্বংস করেনা, অনেক মানুষকে বাস্তুহারাও করে। এই জাতীয় জল-বিদ্যুত কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করার তেমন কোন কাজে লাগেনা, বরং বহুদূরের বড় বড় শহরের কাজে লাগানো হয়। এ জাতীয় জল-বিদ্যুত কেন্দ্রকে “নবায়ন-যোগ্য” শক্তির আঁধার হিসাবে প্রচার করা হয় কেবলই সহজে সামাজিক ছাড়পত্র পাওয়ার লক্ষ্যে। অন্যদিকে, ছোট ছোট বাঁধের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠির জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে উৎপাদিত জল-বিদ্যুত কেন্দ্রকে সত্যিকার অর্থেই নবায়ন-যোগ্য বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিস্তারিত পড়ুনঃ http://www.scidev.net/global/water/editorials/hydropower-described-as-renewable.html

এই প্রেক্ষিতে, আমাদের দেশের কর্ণফুলী জল-বিদ্যুত কেন্দ্রটিকে কি নবায়ন-যোগ্য শক্তির আঁধার বলা যাবে? প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধকে কি নবায়ন-যোগ্য বলা যাবে? তিস্তা অববাহিকায় সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গে নির্মিত অসংখ্য বাঁধ/ব্যারাজ, ডাইভার্সন ক্যানাল ইত্যাদিকে কি বাস্তব সম্মত, পরিবেশ বান্ধব, ঢেকসই, এবং নবায়ন-যোগ্য বলে বিবেচনা করা যাবে? বাংলাদেশের ভবিষ্যত এবং অস্থিত্বের স্বার্থে এখনই আমাদেরকে এসব বিষয়ে সিধান্ত নিতে হবে।