ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

বৈশ্বিক জলবায়ূ পরিবর্তন এবং সমুদ্র-পৃষ্ঠা উপরে উঠে আসার কারণে এই শতকের মধ্যেই বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশ ডুবে যাবে এই কথাটা আজকাল প্রায়শই শুনা যায়। কেউ কেউ এ কথাও বলছেন যে বাংলাদেশের প্রায় ২০% অঞ্চল সমুদ্র গহবরে তলিয়ে যাবে। যদি সত্যি ২০% অঞ্চল ডুবে যায় তাহলে সেখানে বসবাসরত ৪ কোটি মানুষের ঠাঁই হবে কোথায়? এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আসলেই কি বাংলাদেশ ডুবে যাবে? বাংলাদেশ এবং এর মানুষকে কি এই মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করার কোন উপায় নেই? কি কি পদক্ষেপ নিলে এই বিপর্যয়ের গতিকে হ্রাস করা সম্ভব? এইসব প্রশ্নের বিজ্ঞান-সম্মত উত্তর খুঁজে দেখা যাক।

জলবায়ূ পরিবর্তন এবং সমুদ্র-পৃষ্ঠার উঠানামা পৃথিবীর ৪৬০ কোটি বছরের ইতিহাসের এক অচ্ছেদ্দ অংশ। বিগত ৪ লাখ বছরের ভূতাত্বিক ইতিহাস পর্যলোচনা করলেই দেখা যাবে যে এই সময়ের মধ্যে ১০ বারেরও বেশী জলবায়ূ পরিবর্তন হয়েছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠা উঠানামা করেছে। ১২৫০০০ বছর আগে সমুদ্রপৃষ্ঠা এখনকার তূলনায় ৬ মিটার উপরে ছিল এবং বাংলাদেশের সমুদ্রতটরেখা তখন টাঙ্গাইলের মধুপুর এবং রাজশাহীর বরীন্দ্র অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশী অংশ সমুদ্রের নীচে ছিল। অন্যদিকে, ১৪০০০ বছর আগের বরফ যুগে সারা পৃথিবীতে সমুদ্রপৃষ্ঠা প্রায় ১০০ মিটার নীচে ছিল, এবং বাংলাদেশের সমুদ্রতটরেখা তখন বর্তমান অবস্থান থেকে প্রায় ৭৫ কিঃমিঃ দক্ষিনে সমুদ্রতলে অবস্থিত অতল-খাদের (Swatch of No Ground) কাছে ছিল, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের আয়তন অনেক বড় ছিল। বাংলাদেশের ৮০% অঞ্চলই নদী প্লাবন ভূমি এবং বঙ্গীয় ব-দ্বীপের অংশ, যা কিনা সমুদ্র-পৃষ্ঠা উঠানামা সত্বেও পলি স্তরায়নের মাধ্যমে শুধু ঠিকেই থাকেনি বরং সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হয়েছে। আর এটা সম্ভব হয়েছিল এই কারণে যে সমুদ্রপৃষ্ঠা উপরে উঠে আসার পরিমানের চেয়ে পলি স্তরায়নের মাত্রা বেশী ছিল। উদাহরন স্বরুপ বলা যায়, গত ৭ হাজার বছরেই সমুদ্রপৃষ্ঠা ৭ মিটার পরিমাণ উপরে উঠে এসেছে এবং এই সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের মধ্য অঞ্চল থেকে শুরু করে বর্তমানের উপকূলীয় অঞ্চলের কোন কোন স্থানে নদী আর জোয়ারভাটা বাহিত পলিমাটি স্তরায়নের পরিমাণ ছিল ৩০ মিটার, অর্থাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠার তুলনায় ভূমির উচ্চতা বেড়েছিল ৪ গুন হারে। সমুদ্রপৃষ্ঠা গত ১০০০০ বছর ধরেই ক্রমান্বয়ে উপরে উঠে আসছে, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের ভূমির উচ্চতা বেড়ে চলছিল। বিগত ২০০ বছরের উপকূলীয় অঞ্চলের মানচিত্র পর্যালোচনা করলেই এ ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে। রেন্নেল (Rennel) নামের একজন ইংরেজ প্রথম উপমহাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানচিত্র তৈরী করেন ১৭৮০ সনে। সেই মানচিত্রের সঙ্গে বর্তমান সময়ের উপকূলীয় মানচিত্রের তুলনা করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের পশ্চিমাঞ্চল গত ২০০ বছর ধরে মোটামুটিভাবে একই স্থানে থাকলেও, পূর্বাঞ্চলের অনেক জায়গাতেই ভূমির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। ভোলা, হাতিয়া সহ বৃহত্তর বরিশাল, নোয়াখালী জেলার অনেক অঞ্চল গত দুইশত বছরে প্রায় ৮০ কিঃমিঃ সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে সমূদ্র-পৃষ্ঠা উপরে উঠে আসার বাৎসরিক গড় হার হচ্ছে ৪ থেকে ৮ মিঃমিঃ, অর্থাৎ একই সময়কালে ভূমি-উচ্চতা বাড়ার পরিমাণ সমুদ্র-পৃষ্ঠা উপরে উঠে আসার চেয়েও বেশীই ছিল। এক গবেষনায় দেখা যায় যে ১৯৭৩-২০০০ সময়কালে, উপকূলীয় অঞ্চলের কোন কোন স্থানে ভূমিক্ষয় হলেও প্রতি বছর গড়ে ভূমির পরিমাণ ১৮ বর্গ কিঃমিঃ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিগত কয়েক দশক ধরে সমুদ্র-পৃষ্ঠা বেড়ে উঠা এবং ভূমি-উচ্চতা বেড়ে উঠার চিত্রটা আস্তে আস্তে পালটে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বর্তমানে ভূমিক্ষয়ের পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে জলাবদ্ধতার পরিমানও। বিভিন্ন মিডিয়ার খবর এবং মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষন থেকে দেখা যায় যে যশোহরের ভবদহ এবং অন্যান্য নিম্ন-উচ্চতার উপকূলীয় ভুমি বর্তমানে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতার শিকার। ১৯৬৭-৯৭ সময়কালেই সমুদ্রের নোনা জল বৃহত্তর খুলনা, যশোহর, বরিশাল, নোয়াখালীর অনেক ভিতরে প্রবেশ করে সুপেয় পানি এবং কৃষি জমিকে ব্যবহারের অনুপোযুক্ত করে ফেলেছে। অন্যদিকে, ২০০৯ সালে ঘটে যাওয়া উপকূলীয় জলোচ্ছাস সিডরে ডুবে যাওয়া অনেক অঞ্চল থেকেই সমুদ্রের নোনা পানি আর সরে যাচ্ছেনা। গত কয়েক দশকে বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে যার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমি এবং এর জনগণকে। প্রথমতঃ, উন্নত দেশসমুহের অত্যদিক বিলাসবহুল জীবনযাত্রার ফলশ্রুতিতে অনেক বেশী পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের কারনে সৃষ্ট গ্রীন-হাউজ-এফেক্টের জন্য বৈশ্বিক জলবায়ূ পরিবর্তন হয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং সমুদ্র-পৃষ্ঠার উপরে উঠে আসার মাত্রা প্রাকৃতিক হারের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। দ্বিতীয়তঃ, বাংলাদেশের উজানের দেশসমুহে অভিন্ন নদীগুলিতে এক তরফা নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে পানি প্রবাহ এবং নদীবাহিত পলিমাটি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটানো হয়েছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে সমুদ্র-পৃষ্ঠার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উপকূলীয় ভুমি-অঞ্চলকে ঠিকে থাকতে হলে প্রাকৃতিক নিয়মে নদী-প্লাবন এবং জোয়ারভাটা বাহিত পলির স্তরায়নের মাধ্যমে ভূমি-উচ্চতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নাই। তৃতীয়তঃ, বিগত কয়েক দশক ধরে উপকূলীয় অঞ্চলে সর্বমোট ১২৩টি পোল্ডার নির্মাণ করা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে কয়েক হাজার কিঃমিঃ দীর্ঘ বেড়ীবাঁধ। এইসব বেড়ীবাঁধ ভূমি অঞ্চলকে নদী এবং জোয়ারভাটার প্লাবন থেকে আলাদা করে ফেলেছে, যার ফলে প্রাকৃতিক পলিস্তরায়নে বিঘ্ন সৃষ্টি করে ক্রমান্বয়ে উপরে উঠে আসা সমুদ্র-পৃষ্ঠার তুলনায় ভূমি-উচ্চতা কমে যাচ্ছে। এইসব বেড়ী বাঁধ উপকূলীয় জনগনের মধ্যে সাময়িক স্বস্থি নিয়ে আসলেও সময়ের ব্যাবধানে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সহ আরো অনেক দূর্যোগ বয়ে আনছে। চথুর্ততঃ ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠির প্রয়োজন মেটানোর জন্য ভূমি কর্ষন এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে ভুমিক্ষয় এবং অবঃধমনের কারণেও ভূমি-উচ্চতা হ্রাস পাচ্ছে, যার জন্য সমুদ্র-পৃষ্ঠার তুলনায় ভূমি-গঠন এবং উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছেনা।

জলবায়ূ পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতি সংঘের আন্তঃদেশীয় প্যানেলের রিপোর্ট অনুযায়ী এই শতকে সমুদ্র-পৃষ্ঠার উচ্চতা ৫৯ সেঃমিঃ বাড়বে, অর্থাৎ বছরে ০.৬৭ সেঃমিঃ বা ৬.৭ মিঃমিঃ। কোন কোন গবেষকের মতে এর পরিমাণ হবে ২ মিটারেরও অধিক, যা কিনা বছরে গড়ে ২ সেঃমিঃ এর বেশী। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের ২০% এর বেশী জায়গার উচ্চতা ২ মিটারেরও কম, এবং যদি সমুদ্র-পৃষ্ঠা ২ মিটার বেড়ে যায় তাহলে সমুদ্রতটরেখা বর্তমানের উপকূলীয় জেলাগুলি ছাড়িয়েও চাঁদপুর, ব্রাম্মনবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা এবং সুনামগঞ্জ জেলাসমুহের কোন কোন অঞ্চলে ঢুকে পড়বে। অবশ্য, এই প্রক্ষালনটি (projection) সত্য হবে যদি শুধুই সমুদ্র-পৃষ্ঠা একতরফাভাবে উপরে উঠে আসে এবং নদীপ্লাবন আর জোয়ারভাটার পলিস্তরায়ন যদি সম্পুর্ণ বন্ধ হয়ে যায় – বাস্তবতঃ যেটা হওয়ার তেমন কোন সম্ভবনা নেই, কারন শুকনো মওশুমে উজানের অঞ্চলে বিভিন্ন নদীর পানি একতরফাভাবে সরিয়ে নিলেও বর্ষাকালের প্লাবন আর পলিস্তরায়ন থামিয়ে রাখা সম্ভব হবেনা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে, বন্যার প্লাবন যতই বিপত্তিদায়ক মনে হোকনা কেন, একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, কোটি কোটি বছরের বন্যা আর জোয়ারভাটার প্লাবনেই বাংলাদেশ নামক ভূ-অঞ্চলের সৃষ্টি, এবং এই প্লাবনই বাংলাদেশকে সমুদ্র-পৃষ্ঠার নীচে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি প্রতি বছরে ২ সেঃমিঃ হারে সমুদ্র-পৃষ্ঠা উঠে আসে তাহলে বর্তমানের পলিস্তরায়নের মাধ্যমে এই হার মোকাবিলা করা সম্ভব হবে কিনা, এবং কি কি উদ্যোগ নিলে পলিস্তরায়ন বৃদ্ধি করা সম্ভব। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশে সমুদ্র-পৃষ্ঠা উপরে উঠে আসার বর্তমান হার হলো ৪ থেকে ৮ মিঃমিঃ, যা কিনা প্রাক্ষলিত হারের অর্ধেকেরও কম। উপরুন্ত, বর্তমান পলস্তরায়নের হার অঞ্চলভেদে ৪ থেকে ৫ মিঃমিঃ, যা কিনা ২ সেঃমিঃ (২০ মিঃমিঃ) এর তুলনায় অনেক কম, এমনকি জাতি সংঘ প্যানেলের প্রাক্ষলিত ৬.৭ মিঃমিঃ এর তুলনায়ও কম। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, পলিস্তরায়নের পরিমাণ বাড়ানো না গেলে সমুদ্র-পৃষ্ঠা উপরে উঠে আসাকে মোকাবিলা করা সম্বব হবেনা। তাই, কি কি উপায়ে উপকূলীয় অঞ্চলসহ অন্যান্য প্লাবনভূমিতে পলিস্তরায়ন বাড়ানো যায় সেদিকেই নজর দিতে হবে।
পলিস্তরায়নের জন্য নদীবাহিত পলিমাটির প্রয়োজনীয় সরবরাহ জরুরী। একটি সমীক্ষা থেকে দেখা যায় যে ১৯৬০ এর দশকে ীমানার বাইরে থেকে প্রবাহিত অভিন্ন নদী সমূহের বয়ে আনা পলির পরিমান যেখানে ছিল প্রতিবছরে গড়ে ২ বিলিয়ন টন, সেখানে বর্তমানে তার পরিমান হচ্ছে ১ বিলিয়ন টন। পলি সরবরাহ কমে যাওয়ার একটা মূল কারণ হচ্ছে গঙ্গা-যমুনা অববাহিকার উজানের অঞ্চলে অনেক বাঁধ এবং ব্যারেজ তৈরী হওয়ার কারণে বাংলাদেশে আসা পানি এবং পলির সরবরাহ কমে গেছে। এক সমীক্ষা থেকে দেখা যায় যে ভারতে নির্মিত সব বাঁধের পিছনে অবস্থিত জলাধারে বিপুল পরিমান পলি জমা হচ্ছে, যার একটা বড় অংশই কিনা বাঁধ না থাকলে বাংলাদেশে আসতো। বর্তমানের ১ বিলিয়ন টন পলির মধ্যে প্রায় অর্ধেক সমুদ্রে চলে যায়, বাকী অর্ধেক অংশ নদীর তলদেশে এবং প্লাবন ভূমিতে বন্যার সময় ছড়িয়ে পড়ে। শুকনো মওশুমে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে এবং বেড়ীবাঁধের কারণে পলিমাটি উপকূলীয় ভূমিতে প্রবেশ করতে না পারার কারণেও নদীর তলদেশে জমা হয়ে নাব্যতা এবং বহন ক্ষমতা কমিয়ে ফেলছে। এক হিসাব থেকে দেখা যায় যে, সরবরাহকৃত পলির অর্ধেক বা আধা বিলিয়ন টন যদি সারা বাংলাদেশে সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যেতো তাহলে প্রতি বছর ভূমি-উচ্চতা বাড়তো গড়ে ২ মিঃমিঃ করে। একই পরিমাণ পলি যদি শুধু উপকূলের নিম্নাঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে ভূমি-উচ্চতা বাড়বে ৫ মিঃমিঃ হারে, যা কিনা সমুদ্র-পৃষ্ঠাকে মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় ৬.৭ থেকে ২০ মিঃমিঃ এর তুলনায় অনেক কম। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশের ভিতরে বর্তমানে প্রাপ্য পলিমাটি দিয়ে ভবিষ্যতের জলবায়ূ পরিবর্তন এবং সমুদ্র-পৃষ্ঠা বেড়ে উঠাকে পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হবেনা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় কি? জলবায়ূ পরিবর্তনের ফলে উদ্ভুত সমস্যা মোকাবিলা করা জন্য সরকার ২০০৮ সালে “বাংলাদেশ জলবায়ূ পরিবর্তন কৌশল ও কর্ম্পরিকল্পনা পত্র” তৈরী করেছে, যার মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৭টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এইসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৭০০০ কিঃমিঃ দীর্ঘ বেড়ীবাঁধ নির্মাণ এবং মেরামত। তাছাড়াও রয়েছে নদী শাসনের বিভিন্ন পরিকল্পনা। বেড়ীবাঁধ নির্মাণ কিভাবে সমস্যাকে আরো জঠিল করে তুলবে তা আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে; তবে নদী শাসনের মাধ্যমে পলিমাটি উপকূলীয় অঞ্চলের নীচু জমিতে ছড়িয়ে দিয়ে ভূমি-উচ্চতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে কিছু সুফল বয়ে আনবে। পলিস্তরায়ন বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের জলাবদ্ধতা ক্রমে বেড়েই চলবে এবং বেড়ীবাঁধের অভ্যন্তরের জনগোষ্ঠীর পয়োঃনিস্কাশন ব্যবস্থা এবং সুপেয় পানি সরবরা্বে ভবিষ্যতে আরো সমস্যায় পড়বে। বেড়ীবাঁধ গুলিকে বিভিন্ন স্থানে কেটে দিয়ে বেড়ীবাঁধের পিছনের নীচু ভূমিকে প্রাকৃতিক নিয়মে জোয়ারভাটায় প্লাবিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া জরুরী। বেড়ীবাঁধ গুলির উচ্চতা বাড়িয়ে নিম্নাঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর একটা অংশকে বসবাসের জন্য ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া যায় কিনা তা বিবেচনা করা যেতে পারে। মোট কথা হচ্ছে, যে প্রাকৃতিক নিয়মে বাংলাদেশের ভূমি-অঞ্চল কোটি কোটি বছরে গড়ে উঠেছে, সেই প্রক্রিয়া বজায় রেখেই শুধু ঠিকে থাকা সম্ভব – প্রাকৃতিক নিয়মকে বাধগ্রস্থ করে নয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পানি এবং পলির সঠিক ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নদী-খাল-নালার তলদেশ থেকে মাটি কেটে বসতভিটার উচ্চতা বৃদ্ধির ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নেওয়া খুবই জরুরী। তাছাড়া, উপকূলীয় অঞ্চলের ভুমি-উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য পলিমাটি ধরে রাখার পদ্ধতি আবিস্কারের জন্য গবেষনা করাও জরুরী। উপকূলীয় অঞ্চলে অগভীর সমুদ্রে পলি আটকে রাখার পদ্ধতি উদ্ভাবন করে এবং সমুদ্রবক্ষ থেকে ড্রেজিং করে পলি এনে ভূমি-গঠন এবং ভূমি-উদ্ধার প্রকল্পের সম্ভব্যতা যাচাই করে দেখা দরকার। পৃথিবীর বিভিন্ন ব-দ্বীপ অঞ্চলেই এইরকম প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমি-গঠন প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশে ভূমি উচ্চতা-বৃদ্ধিসহ ভূমি-গঠন প্রক্রিয়া ত্বরাণ্বিত করা ছাড়া জলবায়ূ পরিবর্তন এবং সমুদ্র-পৃষ্ঠার উপরে উঠে আসার করাল গ্রাস থেকে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন এবং জীবিকা রক্ষা করা অনেক কঠিন এমনকি অসম্ভবও হতে পারে। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নিয়ম মোতাবেক যুক্তি-নির্ভর পরিকল্পনা এবং প্রকল্প হাতে নিয়ে জলবায়ূ পরিবর্তনের সংকট মোকাবিলা করার এখনই সময়।

বাংলাদেশ যেহেতু গঙ্গা-ব্রম্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলের দেশ তাই সঠিক সময়ে পরিমাণমত পানি এবং পলি সরবরাহের জন্য অববাহিকার উজানের দেশেসমুহের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। অববাহিকা ভিত্তিক সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা ব্যতিরেখে জলবায়ূ পরিবর্তন এবং সমুদ্র-পৃষ্ঠা উপরে উঠে আসার ফলে সৃষ্ট সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবেনা, কারন প্রয়োজনীয় পানি এবং পলির সরবরাহ ব্যতিরেকে এই সমস্যা মোকাবিলা করার কোন উপায় নেই। গঙ্গা-যমুনা-মেঘনা অববাহিকা অঞ্চলের সমস্ত অংশীদারকে নিয়ে দ্রুতগতিতে সমন্বিত পানি এবং পলি ব্যবস্থাপনা গ্রহন করে এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন ছাড়া বৈশ্বিক জলবায়ূ পরিবর্তন সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা বাংলাদেশের একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। উপরুন্ত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও নদী, পানিসম্পদ, এবং পলির যথাযত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মধ্যেই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ডুবে যাবে না ঠিকে থাকবে।

মোঃ খালেকুজ্জামান, অধ্যাপক ভূতত্ত্ব বিভাগ, লক হ্যাভেন ইউনিভার্সিটি, পেনসিলভেনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র