ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

যতই চিল্লাই না কেন ‘দারিদ্রতা দূর হোক,সমাজ মুক্তি পাক’ বলে,দারিদ্রতা কখনই এ দেশ থেকে যাবে না।রাগ করলেন?রাগ করলেও এ সত্য কথাটাকে এড়িয়েও যেতে পারবেন না। দারিদ্রতা দূর হোক মনেপ্রানে আমিও চাই।যদি কেউ সত্যিই রাগ করে থাকেন তবে কষ্ট করে আমার লেখাটি পড়বেন প্লিজ।ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলছি যে দেশের বেশির ভাগ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে সে দেশের দারিদ্রতা নিয়ে সবার ভাবার সময় যে পার হয়ে যাচ্ছে, তাই এ লেখাটি রসিকতা ভেবে ভুল করবেন না।

দারিদ্রতা বাংলাদেশের অভিশাপ। তবু এ দেশে জন্ম নিয়ে আমি যথেষ্ট গর্ববোধ করি কারন আমার দেশটি তো আর পয়সা দিয়ে কেনা নয়,রক্ত দিয়ে অর্জন করা।কিন্ত নিরব সত্য হলো এ অহম চাপা পড়ে আছে দারিদ্রতার হস্তীসম পদতলে।

ভাবতে পারেন যে দেশে আকাশসম অট্টালিকায় মানুষ বাস করে,ছেলেমেয়েরা ফেসবুকে ঘন্টার পর ঘন্টা ডুবে থাকে,টুইটারে টুইট মারে সে দেশ নাকি গরিব! যে দেশের মানুষের বিলাসিতার প্রধান সামগ্রী BMW,Pazero,Prado ইত্যাদি,এমনকি পরিবারের সদস্যের তুলনায় গাড়ির সংখ্যাও বেশি সে দেশ আবার গরীব হতে পারে নাকি? যে দেশে ৩৫০টি পার্টি সেন্টারে চলে নাইট শো,নারীরা লাখ টাকার শাড়ী পরে ঈদ ,পুজা পালন করে,বিজনেস ক্লাস ছাড়া গাড়িতে চড়ে না কেউ কেউ- সে দেশকে গরীব বলা ঘোরতর অন্যায়।যে দেশে কমিউনিটি সেন্টারে অগ্রীম বুকিং দিতে হয় বিয়ের জন্য কে বলবে সে দেশ গরীব?দিনে দিনে যে দেশে বেড়ে চলেছে ফাইভ স্টার হোটেল,অত্যাধুনিক শপিং মল,রেস্টুরেন্ট,ফ্যাশান হাউজের সংখ্যা সে দেশকে আর বুঝি গরীব বলা চলছে না।

তবুও আমরা দরিদ্র।হতদরিদ্র।কারন ঐ আকাশসম অট্টালিকার বিপরীতে হাজার হাজার বাস্তুহারা মানুষ রাত কাটাচ্ছে খোলা আকাশের নিচে,ফুটপাতে,রেল স্টেশনে। BMW,Pazero,Prado ‘র বিলাশীতার ঘাম ঝরছে লোকাল বাসের দরজায় ঝুলে থাকা অগনিত পরিশ্রমী মানুষের শরীর থেকে।লাখ টাকার শাড়ীর বিপরীতে কোটি কোটি মানুষের জুটছে না লজ্জা নিবারণের এক টুকরো কাপড়।পার্টি সেন্টার আর রেস্টুরেন্টের চোখ ধাধানো আলোছায়ার অপর পিঠে তিনবেলা পেটপুরে খাবারের জন্য হাহাকার চলছে লাখ লাখ ক্ষুধার্থ মানুষের,বিয়ের টাকা যোগাড় করতে না পেরে নিভৃতে আত্মহুতি দিচ্ছে কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা।

মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ যেমন এক হয়না তেমনি বিলাসিতা আর দারিদ্রতাকেও দুদিকে সরিয়ে রাখলাম।নিরাশাবাদীদের মতো শুরুতে বলেছিলাম- দারিদ্রতা কখনই এ দেশ থেকে যাবে না।এখন আশাবাদীদের দলে মিশে গেলাম।আমরা নিশ্চয়ই পারবো এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে।

শেষ করার আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “দুর্ভাগা দেশ” কবিতাটি আর একবার মনে করলাম-

হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
মানুষের অধিকারে
বঞ্চিত করেছ যারে,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে
ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে।
বিধাতার রুদ্ররোষে
দুর্ভিক্ষের-দ্বারে বসে
ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

তোমার আসন হতে যেথায় তাদের দিলে ঠেলে
সেথায় শক্তিরে তব নির্বাসন দিলে অবহেলে।
চরণে দলিত হয়ে
ধূলায় সে যায় বয়ে –
সেই নিম্নে নেমে এসো, নহিলে নাহি রে পরিত্রাণ।
অপমানে হতে হবে আজি তোরে সবার সমান।

যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে,
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।
অজ্ঞানের অন্ধকারে
আড়ালে ঢাকিছ যারে
তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

শতেক শতাব্দী ধরে নামে শিরে অসম্মানভার,
মানুষের নারায়ণে তবুও কর না নমস্কার।
তবু নত করি আঁখি
দেখিবার পাও না কি
নেমেছে ধূলার তলে হীনপতিতের ভগবান।
অপমানে হতে হবে সেথা তোরে সবার সমান।

দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়ায়েছে দ্বারে –
অভিশাপ আঁকি দিল তোমার জাতির অহংকারে।
সবারে না যদি ডাকো,
এখনো সরিয়া থাকো,
আপনারে বেঁধে রাখো চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান –
মৃত্যু-মাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান।