ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

বন্ধু মানে বন্ধু। যাকে আর কোন বিশেষণে বিশেষায়িত করার দরকার নেই।”বন্ধুত্ব” বলতে তিনটি পদার্থ বুঝায়। দুই জন ব্যক্তি ও একটি জগৎ। অর্থাৎ দুই জনে সহযোগী হইয়া জগতের কাজ সম্পন্ন করা।

শুভমিতার কন্ঠে “যদি বন্ধু হও,যদি বাড়াও হাত” বন্ধুত্বের এক লৌহসম দৃঢ়তারই জয়ধ্বনি। বন্ধুত্ব সকল ধর্ম-বর্ণ-জাতি-কাল-পাত্রের উর্ধে।বন্ধুত্বের নেই কোন সংগা, নেই কোন জবাবদিহিতা।বন্ধুত্বই পারে সকল বাধাকে গুড়িয়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে,নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখাতে। বন্ধুত্বই পারে দিক-দিগন্ত জুড়ে ভালোবাসার বীজ বপন করতে, আলোক দিশা ছড়িয়ে দিতে।

তাই যুগে যুগে,কালে কালে হয়েছে বন্ধুত্বেরই জয়।সৃষ্টির আদি যুগ থেকেই বন্ধুত্ব রয়েছে। পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবীর মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। প্রাচীন ব্যাবিলন সভ্যতায় বন্ধুত্বের যে পরিসর ছিল, তার পরিচয় পাওয়া যায় ব্যাবিলনীয়দের কাব্যগ্রন্থ ‘দি এপিক অব গিলগামেশে’র মাধ্যমে। বন্ধুত্বের ইতিহাসে প্রথম দিকের সাহিত্যকর্ম মনে করা হয় এটিকে। গিলগামেশ আর এনকিডোর মধ্যে চমত্কার বন্ধুত্ব ছিল। বন্ধুত্বের গ্রিক রোমান মিথের নির্ভরযোগ্য উদাহরণ হলো অরেস্টেস এবং পাইলেডস।

কবি-সাহিত্যিকদের লেখনির মাঝেও ধরা দিয়েছে বন্ধুত্বের জয়গান।কবিগুরু বলেছেন-
“বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালোবাসা পোশাকী। বন্ধুত্বের আটপৌরে কাপড়ের দুই-এক জায়গায় ছেঁড়া থাকিলেও চলে, ঈষৎ ময়লা হইলেও হানি নাই, হাঁটুর নীচে না পৌঁছলেও পরিতে বারণ নাই। গায়ে দিয়া আরাম পাইলেই হইল। “(বন্ধুত্ব ও ভালবাসা)

বিদ্রোহী কবি বন্ধুত্বকে রেখেছেন সকল ধর্ম-বর্ণ-জাতি-কাল-পাত্রের উর্ধ্বে। তিনি বলেছেন-
“কেউ বলেন আমার বানী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনটাই না। আমি শুধু হিন্দু মুসলিম কে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করেছি, গালাগালি কে গলাগলি তে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।”

বিখ্যাত সাহিত্যিক ফ্রান্সিস বেকন বলেন বন্ধুহীন জীবন পশুর মত।এভাবেই ব্যাখ্যা করেন তিনি-
‘ ম্যাগনা সিভিটাস, ম্যাগনা সলিচিউডো ‘ – ল্যাটিন ভাষার এই উক্তিটি সত্যের অনেক কাছাকাছি। এর অর্থ ‘যত বড় শহর, ততই বেশি একাকীত্ব আর নির্জনতা’। বড় শহরে বন্ধুরা থাকেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তাদের প্রতিবেশী হিসেবে সব সময় পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা আর এক ধাপ এগিয়ে বলতে পারি, যাঁদের তেমন কোন সত্যিকারের বন্ধু নেই, তাঁরা সর্বদাই নির্জনতার মধ্যে বাস করেন। কোন বন্ধু ছাড়া পৃথিবী তো আসলে জঙ্গলের মতই। (বন্ধুত্ব,অনুবাদক – অলোক কুমার বসু )

বন্ধুত্ব মানুষে মানুষে যেমন বন্ধুত্ব হতে পারে, ঠিক তেমনি সৃষ্টি জগতের অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গেও মানুষের বন্ধুত্ব হতে পারে।
“বন্ধু ও বন্ধুত্বের প্রান্তর এত বেশি প্রসারিত যে, সেখানে চষে বেড়ানো যায় আজীবন। বন্ধুত্ব মানে প্রশান্তির অবিরাম ছায়া। সেখানে বন্ধু আছে, সেখানে দুজনে মিলে তৃতীয় একটা পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন থাকে। মানুষে মানুষে যেমন বন্ধুত্ব হতে পারে, ঠিক তেমনি সৃষ্টি জগতের অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গেও মানুষের বন্ধুত্ব হতে পারে।”(সীমাহীন বন্ধুত্ব | ইব্রাহিম নোমান)

চিকিৎসকেরা বলেন বন্ধুত্ব হলো সকল রোগের মহৌষধ।
“বন্ধু আর বন্ধুত্ব মানুষকে সুখে রাখে, সুস্থ রাখে। ভালো বন্ধু পেলে জীবন হয় আনন্দময়। ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গে যখন একত্র হওয়া যায়, তখন হৈ হুল্লোড় করে মন এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। শরীরও সুস্থ হয়ে যায়, মনে হয় আয়ুও বেড়ে গেল। উৎসব-আনন্দে, সুখ-দুঃখে রাজদ্বারে, শ্মশানে সর্বত্র যে থাকে, সে-ই তো বন্ধু। শাস্ত্রের কথা হলেও এমন বন্ধু এখন পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবু বিপদ-আপদে যে পাশে থাকে, সে-ই তো বন্ধু। অস্ট্রেলিয়ায় জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সিনিয়র সিটিজেন নিয়ে ১০ বছরের গবেষণায় দেখা যায়, প্রত্যাশিত গড় আয়ুর একটি বড় ভবিষ্যৎ সূচক হলো গাঢ় বন্ধুত্ব। ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধনের চেয়েও জোরালো এই সূচক। পরিতৃপ্ত বন্ধুত্ব রক্ষা করতে পারে মানুষকে স্থূলতা, বিষণ্নতা ও হৃদরোগ থেকে অনেকটাই।”(অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী,দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারী ১১, ২০০৯)

বন্ধু দিবসের পিছনের ইতিহাসটা ঠিক এ রকম,
১৯৩৫ সালে আমেরিকার সরকার এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। দিনটি ছিল আগস্টের প্রথম শনিবার। তার প্রতিবাদে পরের দিন ওই ব্যক্তির এক বন্ধু আত্মহত্যা করেন। এরপরই জীবনের নানা ক্ষেত্রে বন্ধুদের অবদান আর তাদের প্রতি সম্মান জানানোর লক্ষ্যে আমেরিকান কংগ্রেস ১৯৩৫ সালের আগস্ট মাসের প্রথম রোববারকে বন্ধু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ধীরে ধীরে এই দিবসটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

‘হাত বাড়ালেই বন্ধু পাওয়া যায় না/বাড়ালেই হাত বন্ধু সবাই হয় না’ গানটির কথাগুলো সত্যিই মনে হয়। বন্ধুত্বের জন্য প্রয়োজন সুন্দর একটি মন।

সবাইকে বন্ধু দিবসের শুভেচ্ছা।