ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

সু্যোগ পাই নি কখনো বলার, তাই বলিনি। ২ বছর আগে কাপ্তাই গিয়েছিলাম বেড়াতে। জুম্ম খীসা (ঠিক যতদূর মনে পড়ছে)নামের এক চাকমা ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হয়।ছোট চোখের পরিপাটি একজন সহজ-সরল মানুষ। জানানোর চেয়ে জানার আগ্রহটাই ছিল বেশি।আজ অনেক দিন পর হঠাৎ লোকটার সাথে আর একবার দেখা করার ইচ্ছা হলো। কিন্তু সম্ভব না।তখনকার আলাপটাকে অত বেশি গুরুত্ব দেই নি তাই তার ব্যক্তিগত অনেক তথ্য জানারও চেষ্টা করিনি।

যে লোকটাকে অত বেশি গুরুত্ব দেইনি আজ হঠাৎ কেনো এতো আগ্রহ ?

প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক।

কারণটা খুব সহজ।ওইদিনের একটা ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিব।লোকটি আমার কাছে জানতে চেয়েছিল “বাঙালি ও অবাঙালি মধ্যে তফাতটা কি জানেন?” আমি ভাষাগত পার্থক্য ছাড়া আর কোন পার্থক্য নেই বলে জানিয়েছিলাম। খীসা আমাকে বলেছিল,” আপনার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে।”মনে মনে খুব আঘাত পেয়েছিলাম।রাগটা চেপে রেখে জানতে চেয়েছিলাম কেন?সে জবাব দিয়েছিলো,”আপনারা নিজেদেরকে মানুষ মনে করেন আর আমাদেরকে ঠিক তার বিপরীতটা। দেশটা যে সকল জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে এটা আপনাদের স্বীকার করতে কষ্ট হয়” এই কথাটা শুনে আমার মেজাজটাই বিগড়ে গিয়েছিল।মনে মনে বললাম, বেটা শান্তি চুক্তি করে তোমাদের অধিকার বাস্তবায়ন করলাম আর তুমি মিয়া এভাবে অপমানের পথটা বেছে নিলে? তবে ঠান্ডা মাথায় তাকে তাদের প্রতি আমাদের সীমাহীন ভালোবাসার কথা বলেছিলাম,প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলাম দেশটা জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সকলের।লোকটা বিচিত্র একটা হাসি দিয়ে বিদায় পর্বটা সেরে চলে গিয়েছিল।তার হাসিটা আমার কাছে রহস্যময় ঠাট্টা মনে হয়েছিল।

গতকাল ছিলো “আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস”।পত্রিকা পড়েই জেনেছি।বাসায় ফিরে যখন ‘বিডিনিউজ ২৪ ডটকম’ এ একটা খবর পড়ে খুব খারাপ লাগলো।

লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে বললেন সন্তু লারমা

কারণ খুজতে সন্ধান করলাম বিভিন্ন সাইটে।যা জেনেছি তার সারমর্ম আদিবাসীদের আর আদিবাসী বলে মানতে নারাজ সরকার।তাদের ভাষায় তারা শুধুমাত্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। তাদের কথাকে কাগজে কলমে সত্য করে ফেললো সংবিধান পরিবর্তন করে।

সংশোধিত সংবিধানের উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশ নামে ২৩(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।” এখানে আদিবাসীদের ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও নৃ গোষ্ঠী বলে তাচ্ছিল্য করা হল সযত্নে।

আবার ৬ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।” এখানে অন্য ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছে সূক্ষভাবে। যেটা আদিবাসীদের নজর এড়াতে পারেনি।প্রতিবাদ করেছে তারাসহ বিভিন্ন মহল।কিন্তু তার ফলাফল হয়েছে শূন্য।অথচ আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহার-২০০৮ এ ১৮(২) এ আদিবাসী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে বলে উল্লেখ ছিলো।

যদি এমনটাই মেনে নিতে হয় তবে অস্বীকার করতে হয় বীরবিক্রম উখ্য জিং মারমা,মং সার্কেলের তৎকালীন রাজা মং প্রু সাইন,শহীদ সিপাহী হেমরঞ্জন চাকমা,বিমলেশ্বর দেওয়ান, ত্রিপুরা কান্তি চাকমা,শহীদ সিপাই অ্যামি মারমাকে।অস্বীকার করতে হয় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং যোদ্ধা গারো নারী বিপস্নবী কমিউনিস্ট নেত্রী লতিকা এন মারাক, খাসিয়া মুক্তি বেটি কাকেৎ হেনঞিতা বা কাকন বিবি, রাখাইন নারী প্রিনছা খেঁ, খাসিয়া নারী কাঁকেট, বিভা সাংমা, তেরেসা মাহাতো, প্রিংসা খেঁ, সন্ধ্যা ম্রি, ভেবোনিকা সিনমাং-এর মতো নাম না জানা বহু আদিবাসী নারী দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমর বা পরোক্ষভাবে লড়েছেন।কথিত আছে, খাগড়াছড়ি জেলার কমলছড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে চেঙ্গী নদী পার হওয়ার সময় নদীতে হাঁটু পানি থাকায় যাতে জুতা-প্যান্ট ভিজে নষ্ট না হয় সে-জন্য কমলছড়ি গ্রামের জনৈক মৃগাঙ্গ চাকমা মেজর জিয়াকে পিঠে তুলে নদী পার করে দেন। জিয়ার বাহিনীকে সহায়তা দেয়ার জন্য পাক-বাহিনী মহালছড়ির সভ্য মহাজন, গৌরাঙ্গ দেওয়ান ও চিত্তরঞ্জন কার্বারীকে ধরে নিয়ে যায়। পাকবাহিনী তাদেরকে আর ফেরত দেয়নি। তাদের লাশও পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, এজন্য অনেক জুম্ম নারী বিভিন্ন জায়গায় পাক সেনা সদস্যের ধর্ষণেরও শিকার হয়।জনবিচ্ছিন্নতার কারণে ১৯৭১ সালে রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পক্ষে তার নিজস্ব ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী (সংখ্যায় আনুমানিক ৫০ জন) নিয়ে রাজাকার ফৌজে যোগ দিলেও সাধারণ পাহাড়িরা এতে যোগ দেননি। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় প্রায় ১৫০০ আদিবাসী সমরাস্ত্র হাতে লড়াই করেছিল ১৯৭১ সালে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৱকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্য জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। মজার বিষয় এর প্রতিবাদে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ১৯৯৮ সালের ৯ জুন লং মার্চ করেন। আর পরবর্তীতে দেখা গেল শান্তিচুক্তি শুধু খাতা কলমেই রইল। বরং সংবিধান থেকে পরোক্ষভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে আদিবাসীদের নাম !!!সরকারের পক্ষ থেকে পালন পর্যন্ত করা হলোনা দিবসটি।

অথচ ওই একই সংবিধানের ২(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ অর্থ তফসিলে উল্লেখিত বিভিন্ন আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও শ্রেণীর জনগণ। একদিকে সরকার বলছে দেশে কোনো আদিবাসী নেই, আবার একই আইনে বলা হচ্ছে, আদিবাসীরাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। আজব !!!!

শীর্ষস্থানীয় সবগুলো পত্রিকা পড়ে এবং ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইট ঘুরে যা বুঝলাম তাতে সন্তু লারমার কেনইবা এতো ক্ষোভ তা বুঝতে বাকি রইলো না। আর এতোদিন পর বুঝলাম খীসা আমাকে কেন বলেছিল, “আপনারা নিজেদেরকে মানুষ মনে করেন আর আমাদেরকে ঠিক তার বিপরীতটা।” কেনইবা তার বিদায়ের শেষ হাসিটা ছিলো এত কটাক্ষ পূর্ণ।

তাই বুঝি আজ একবার ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার জন্য বিবেকের দ্বার কড়া নড়ে বার বার…।।

পুনশ্চ

এতো কিছুর উর্ধ্বে যে কথাটা না বললেই নয় তা হল সন্তু লারমার আগ্রাসী মনোভাব কখনই কাম্য নয়।তার অন্তত আলোচনার ডাক দেওয়াটাই উচিত ছিল।লড়াইয়ের ডাক নয়। আমরা আর কখনই দেখতে চাই না অশান্ত পার্বত্য অঞ্চল।কিংবা আলাদা একটি জুম ল্যান্ড। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ একটি সমাধান।শান্তিপূর্ন একটি দেশ।

[বিঃদ্রঃ পাঠক এই লেখাটি লেখার মত যথেষ্ঠ জ্ঞান ও যোগ্যতা আমার ছিল না বা নেই।সংবিধান বা আদিবাসীদের সম্পর্কে ধারণাটাও আর দশ জন সাধারণ মানুষের মতো।তাই কোথাও কোন ভুল হলে দয়া করে শুধরে দেবেন।]