ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

সমগ্র পৃথিবীর দিকে তাকালেই দেখা যাবে প্রায় সব দেশেই চলছে চরম সাম্প্রদায়িক হানাহানি।যুগের পর যুগ ইতিহাস ঘাটলেও দেখা যাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের হাজার চিত্র।কিন্তু একটু হলেও আলাদা ছিল এই বাংলা।অসাম্প্রদায়িক এক দেশ হিসেবে খ্যাতি আছে এই দেশটির।তার বড় প্রমাণ এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। যার জন্ম কোন দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে নয়,বরং সকল ধর্ম, সকল বর্ণের মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা আর রক্তের বিনিময়ে।যাদের অনুভুতি আর ভাব-বিনিময়ের ভাষায় ছিলনা কোন পার্থক্য। কি পূজা-কি ঈদ সবখানেই সেকেলের মিলন মেলা।

দিন বদলেছে,বদলে গেছি আমরাও।

আজ আমরা ছোট বড় এই দুই এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে শিখেছি। আজ আমাদের শিক্ষার হার বেড়েছে,কমেছে দারিদ্র্যতা। আজ আমাদের প্রযুক্তিগত অগ্রসর চোখে পড়ার মত। নানা ক্ষেত্রে জয়-জয়াকার। তারপরও আমরা পিছিয়েছি এবং অধঃনমিত হয়েছি। এ অধঃনমন কতখানি তা বোঝার মতো সুবুদ্ধিটুকুও হারিয়ে ফেলেছি।হারিয়ে ফেলেছি ঐতিহ্যবাহী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।হারিয়ে ফেলেছি পারস্পারিক বিশ্বাস আর আস্থা।

আজ আমরা ভালো মন্দের বিচার করতেও অক্ষম।সুবিচার আর ন্যায় বিচার দুটি শব্দ আজ আমাদের অস্থিমজ্জা থেকে বিলুপ্ত প্রায়।আমরা বড় বেশি আবেগ প্রবন। আর তা এতোটাই বেশি যে আগে পিছে না ভেবেই ঝাঁপিয়ে পড়ি।আসলে আমরা একটু বেশিই ‘হুজুগে’। কবি শামসুর রাহমান তাই যথার্থই লিখেছেন,

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

আমাদের এতখানি অধনমনের কারন খুজতে গেলে যে কয়েকটি বিষয় বেরিয়ে আসে তার মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের ব্যক্তিত্বের বা ব্যাক্তি চরিত্রের অধগামিতা। তা আজ একটু একটু করে পরিণত হয়েছে সুবিশাল মহীরূপে। কষ্টি পাথরের সংস্পর্শে যেমন তামাও সোনা হয়ে যায় তেমনি এইসব হীনমন্যদের সংস্পর্শে এসে আমাদের জাতির অবস্থাও হয়েছে তাই।

সুতরাং সাম্প্রদায়িকতার জন্য দায়ী কোন ধর্ম নয় বরং ব্যক্তি জ্ঞান শূন্যতা।ধর্ম মানুষকে শেখায় সহমর্মিতা,সহনশীলতা আর ভালবাসা।কখনই তা উগ্রতা, উশৃঙ্খলতা কিংবা প্রতিশোধপরায়ণতা নয়।ধর্ম মানুষকে মানুষ হতে শেখায় পশু হতে নয়।তাই সাম্প্রদায়িকতার জন্য দায়ী কখনই কোন ধর্ম নয়।

ধর্মকে ভালোবাসা মানে অন্ধত্ব নয়।ধর্মকে ভালোবাসা মানে অন্য ধর্মকে খাটো করে দেখা নয়।ধর্মকে ভালোবাসা মানে অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করা নয়।সে আপনি যে ধর্মেরই হোন না কেন।তাই সাম্প্রদায়িকতা ধর্মে নয়,সাম্প্রদায়িকতা ব্যক্তি/চরিত্র বিশেষে।

অথচ কষ্ট এবং দুঃখের কথা এই যে ধর্মকে বড় করতে যেয়েই মানুষ সেটাকে করে ফেলছে মূল্যহীন এবং ছোট। এইটুকু বোঝার ক্ষমতাও বোধ হয় দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে। উগ্রতা আর প্রতিবাদ যে এক নয় এবং প্রকৃত ধার্মিক কখনই ধর্মকে মুখোশ কিংবা বর্ম হিসেবে ব্যাবহার করেনা এই সামান্য বিষয়টি বোঝার মত জ্ঞান আমাদের আর কবে হবে।

আমরা তো সোমালিয়া বা পাকিস্তান হতে চাই না। অসাম্প্রদায়িক এক রাষ্ট্র হিসেবে সবার অনুকরনীয় হতে চাই।