ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, ব্যক্তিত্ব

বিখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর আর নেই, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে যিনি স্বাধীনতাকামী বাঙালীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বন্ধু হয়ে।মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগোর একটি হাসপাতালে মারা যান এই সঙ্গীতগুরু। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।এনডিটিভির খবরে বলা হয়,শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যার কারণে গত বৃহস্পতিবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এছাড়া আরো কিছু জটিলতায় তিনি ভুগছিলেন বেশ কিছুদিন ধরে। গত ৭ ডিসেম্বর তার দেহে অস্ত্রোপচারও করা হয়।(সুত্রঃসেতারের জাদুকর রবিশঙ্করের জীবনাবসান)

১৯২০-র ৭ এপ্রিল উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। প্রথম জীবনে নাম ছিল রবীন্দ্রশঙ্কর চৌধুরী। মাত্র দশ বছর বয়সে দাদা উদয়শঙ্করের ব্যালে ট্রুপে যোগ দিয়ে ইউরোপ সফর করেছিলেন তিনি। ১৯৩৮-এ নর্তকের জীবন শেষ করে যন্ত্রসঙ্গীতের তালিম নিতে শুরু করেন। মাইহার ঘরানায় শাস্ত্রীর সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন প্রখ্যাত সেতারশিল্পী উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কাছে। প্রিয় ছাত্র রবিশঙ্করকে ধ্রুপদ, ধামার ও খেয়ালের তামিল দিয়েছিলেন উস্তাদ আলাউদ্দিন।

সঙ্গীতশিক্ষা শেষে ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই সারে জাঁহাতে আচ্ছা গানটিতে নতুন করে সুরারোপ করে সাড়া ফেলে দেন তিনি। সাত বছর তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওর ডিরেক্টর ছিলেন। সত্যজির রায়ের পথের পাঁচালি, অপরাজিত ও অপুর সংসার, এই তিনটি ছবিরও সুরকার ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। এর বাইরেও মৌলিক সুরসৃষ্টির জন্য দেশ বিদেশের সঙ্গীতজগতের বহু সম্মান পান তিনি। রবিশঙ্কর সঙ্গীত জগতের সর্বশ্রেষ্ট পুরস্কার গ্র্যামি জিতেছেন তিনবার। ১৯৯৯ সালে ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত হন। সাম্প্রতিক অ্যালবামের জন্য চতুর্থবার গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। কিন্তু ফল ঘোষণার আগেই মারা গেলেন তিনি।(সুত্রঃসুরলোকের যাত্রায় সুরের জাদুকর)

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক পরম সুহৃদ ছিলেন তিনি, ১৯৭১ সালের ১ অগাস্ট আয়োজিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশের নেপথ্যের মানুষটির নাম পন্ডিত রবিশঙ্কর, ছাত্র জর্জ হ্যারিসন কে বলে রাজি করিয়েছিলেন এই কন্সার্ট করতে।এবারই তাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মানিত করার কথা ছিল।কিন্তু বড্ড দেরী হয়ে গেলো।নইলে জীবীত এই মানুষটিকে আমরা সম্মানীত করতে পারতাম,আর একবার শুনতে পারতাম তার ভালোবাসার কথা।এই কিছুদিন আগে “মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর” থেকে কিনে নিয়ে এসেছিলাম “কনসার্ট ফর বাংলাদেশ” অ্যালবামটি।কি ভালোবাসা আর দরদই না ছিল ওই কনসার্টে বাংলাদেশের প্রতি,এ দেশের মানুষের প্রতি।

উল্লেখ্য সত্তরে সাইক্লোন এবং একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধকালে বাংলাদেশের শরণার্থীদের সহায়তায় তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তা আয়োজন করা হয়।একাত্তরের ১ আগস্ট নিউ ইয়র্কের মেডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ওই কনসার্টে সমবেত ৪০ হাজার হর্ষোৎফুল্ল দর্শককে জর্জ হ্যারিসনের কন্ঠে ধন্যবাদ জানানো এবং সূচনা পর্বে ভারতীয় সঙ্গীত পরিবেশনার ঘোষণাটি স্থান পায়। প্রথমেই পন্ডিত রবি শংকর(সাথে ছিলেন উস্তাদ আল্লারাখা উস্তাদ আলী আকবার খান) ওই প্রোগ্রামটি বাংলাদেশের শরণার্থীদের সহায়তায় তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এবং বাংলাদেশের ওই সময়কার ম্যাসেজটিও সকলকে জানান।যে মিউজিকটি দিয়ে শুরু হয়েছিল তা ছিল বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ফোক মিউজিক,যা “ধুন” নামে পরিচত।

এক সপ্তাহের প্রস্তুতিতে গান লেখা এবং ওই কনসার্টে বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, লিওন রাসেল, ব্যাডফিঙ্গার, বিলি প্রেস্টন ও বিটলস্-এর রিঙ্গো স্টারের অংশগ্রহণে সম্ভবপর হয়েছিল।ওই সময়ই উস্তাদ আল্লারাখা আর উস্তাদ আলী আকবার খান কে নিয়ে বের করেছিলেন ‘জয় বাংলা’ নামের একটি অ্যালবাম, যার জন্য রচিত হয়েছিল এই ত্রয়ীর ধ্রুপদী ‘জয় বাংলা ধুন’ ।

১৯৬৩ সালে বব ডিলানের লেখা গান, ‘এ হার্ড রেইন’স আ-গনা ফল’ আর কনসার্টটির জন্য জর্জ হ্যারিসনের অবিস্মরণীয় গান ‘বাংলাদেশ’-এর ‘মাই ফ্রেন্ড কেম টু মি, উইথ স্যাডনেস ইন হিজ আইজ/ হি টোল্ড মি দ্যাট হি ওয়ান্টেড হেল্প/ বিফোর হিজ কান্ট্রি ডাইজ’ এই কিছুদিন আগে কানাডার সিবিসি রেডিও’র অনুষ্ঠানে অরিজিন্যাল সাউন্ড ট্র্যাক থেকে পরিবেশন করা হয়।সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হ্যারিসন। একাত্তরে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ থেকে সংগৃহীত হয়েছিল ২৪৩ হাজার ৪১৮ ডলার ৫০ সেন্টস। পরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এই কনসার্টের ট্রিপল এলপি ও সিডি অ্যাপেল রেকর্ডস ছাড়াও ক্যাসেটে বের করে সোনি মিউজিক।

পুরস্কার ও সম্মাননা

১৯৬২ সালে ভারতীয় শিল্পের সর্বোচ্চ সম্মামনা পদক ভারতের রাষ্ট্রপতি পদক;
১৯৮১ সালে ভারতের সর্বোচ্চ সুশীল সমাজ পুরস্কার পদ্মভূষণ;
১৯৮৬ সালে ভারতের রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হন;
১৯৯১ সালে ফুকোদা এশিয়ান কালচারাল প্রাইজেস-এর গ্র্যান্ড প্রাইজ;
১৯৯৮ সালে সুইডেনের পোলার মিউজিক প্রাইজ (রে চার্লস্ এর সাথে)
১৯৯৯ সালে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ভারতরত্ন;
২০০০ সালে ফরাসী সর্বোচ্চ সিভিলিয়ান এওয়ার্ড লিজিয়ন অব অনার;
২০০১ সালে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক প্রদত্ত অনারারী নাইটহুড;
২০০২ সালে ভারতীয় চেম্বার অব কমার্স-এর লাইফ টাইম এচিভমেন্ট এওয়ার্ড এর উদ্বোধনী পুরস্কার;
২০০২ এ দুটি গ্র্যামি এওয়ার্ড;
২০০৩ সালে আই এস পি এ ডিস্টিংগুইশ্‌ড আর্টিস্ট এওয়ার্ড, লন্ডন;
২০০৬ সালে ফাউন্ডিং এম্বাসেডর ফর গ্লোবাল এমিটি এওয়ার্ড, স্যান ডিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র;
১৪টি সম্মানসূচক ডক্টরেট;
ম্যাগাসাসে এওয়ার্ড, ম্যানিলা, ফিলিপিন্স;
গ্লোবাল এম্বাসেডর উপাধি – ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম;
ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত পদ্মবিভূষণ
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত দেশিকোত্তম
পন্ডিত রবি শংকর আমেরিকান একাডেমী অব আর্টস্ এন্ড লেটারস্-এর অনারারী মেম্বার এবং ইউনাইটেড নেশনস্ ইন্টারন্যাশনাল রোস্ট্রাম অফ কম্পোজারস-এর সদস্য।

(সুত্রঃ পন্ডিত রবি শংকর )

এই মহান শিল্পলোকের মানুষটির প্রতি আজ সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে জানাই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।স্বর্গলোকে চিরসুখী হোন রবিশংকর এই কামনা আমাদের সকলের।যতদিন বাংলাদেশ রবে,ততদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা রবে এই মহান বন্ধুটির নাম।