ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

কোন ভাষা মরমে পশি’
আকুল করে তোলে প্রাণ?
কোথায় গেলে শুনতে পা’ব-
বাউল সুরের মধুর গান?
সে আমাদের বাংলাদেশ-
আমাদেরই বাংলা রে।

আসুন ছবিতে দেখে আসি এই ভাষার পিছনে যাদের অবদান তাদেরকে-সেই সময়কে।

ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিনঃ

রফিক উদ্দিনের পিতার নাম আবদুল লতিফ ও মাতার নাম রাফিজা খাতুন। তাঁর পিতা আবদুল লতিফ ছিলেন ব্যবসায়ী, কলকাতায় ব্যবসা করতেন। রফিকউদ্দিনের শৈশবের পড়ালেখা শুরু কলকাতার ‘মিত্র ইনস্টিটিউটে’। এরপরে মানিকগঞ্জের ‘বায়রা স্কুলে’। সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামে ছিল তাঁদের বাড়ি।১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রফিকউদ্দিনের পিতা ঢাকায় চলে আসেন। এখানে বাবুবাজারে আকমল খাঁ রোডে পারিল প্রিন্টিং প্রেস নামে ছাপাখানা চালু করেন। বায়রা স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করে রফিকউদ্দিন মানিকগঞ্জ ‘দেবেন্দ্রনাথ কলেজে’ বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। আই.কম. ক্লাস পর্যন্ত পড়লেও পরে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকায় এসে পিতার সঙ্গে প্রেস পরিচালনা করতে শুরু করেন। পরে আবার জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫২ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজের ছাত্র ছিলেন।

ঘটনার সময় শহীদ রফিকের বয়স হয়েছিল ২৬ বছর। পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের কারণে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ব্যারাকে আশ্রয় নেওয়ার সময় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন রফিক। গুলিতে তাঁর মাথার খুলি উড়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তখনই মারা যান তিনি।মেডিকেল হোস্টেলের ১৭ নম্বর রুমের পূর্বদিকে তার লাশ পড়ে ছিল। ছয় সাত জন ধরাধরি করে তার লাশ এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায় এনে রাখেন। তাদের মাঝে ডাঃ মশাররফুর রহমান খান রফিকের গুলিতে ছিটকে পড়া মগজ হাতে করে নিয়ে যান।

প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ওবায়দুল্লাহর উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা পড়ান আজিমপুর মসজিদের ইমাম হাফেজ আবদুল গফুর। সংগোপনে, আত্মীয়-স্বজনের অজ্ঞাতে আজিমপুর কবরস্থানের অসংরক্ষিত এলাকায় দাফন করা হয় শহীদ রফিকের মরদেহ।

ভাষা শহীদ আবুল বরকতঃ

আবুল বরকতের পিতার নাম মরহুম শামসুদ্দিন, মাতার নাম হাসিনা বেগম। তাঁর জন্ম অবিভক্ত ভারতবর্ষের মুর্শিদাবাদ (বর্তমানে ভারতের একটি জেলা) জেলার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে। শহীদ বরকত সেখানকার় তালিবপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে মেট্রিক এবং বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে আই.এ পাস করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে চতুর্থ হয়ে বি.এ. অনার্স পাস করেন। অতঃপর স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তি হন।

“বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বিক্ষোভ প্রদর্শনরত ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ গুলি চালালে হোস্টেলের ১২ নম্বর শেডের বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হন আবুল বরকত। ঢাকা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ভর্তি অবস্থায় রাত আটটার দিকে মৃত্যুবরণ করেন।২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালের রাতে আবুল বরকতের আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে আজিমপুর গোরস্তানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।

মহান ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগের জন্য ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার শহীদ বরকতকে একুশে পদক প্রদান করে।”

ভাষা শহীদ আবদুল জব্বারঃ

স্থানীয় ধোপাঘাট কৃষিবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছুকাল অধ্যয়নের পরে দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া ত্যাগ করে পিতাকে কৃষিকাজে সাহায্য করেন আবদুল জব্বার। পনের বছরে নিজ খেয়ালে সবার অজান্তে গৃহত্যাগ করেন। নারায়ণগঞ্জে এসে সেখানে জাহাজ ঘাটে এক ইংরেজ সাহেবের সান্নিধ্যে আসেন। সাহেব তাঁকে একটি চাকরি দিয়ে বার্মায় (বর্তমানঃ মায়ানমার) পাঠান। সেখানে দশ-বারো বছর অবস্থান করেন।আবদুল জব্বারের পিতার নাম হাসান আলী এবং মায়ের নাম সাফাতুন নেছা। তাঁর অন্য ভাইদের নাম হচ্ছে – আবদুল কাদের ও এ,এইচ,এম আসাদ (নয়ন)। বার্মা থেকে দেশে ফিরে এসে আমেনা খাতুন নামে এক যুবতীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। আমেনা-জব্বার দম্পতির নূরুল ইসলাম বাদল নামে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। পরবর্তীকালে জব্বারের মৃত্যুর পর আমেনা খাতুনকে বিয়ে করেন তার সহোদর আবদুল কাদের। আমেনা-কাদের দম্পতির রফিকুল্লাহ্, আতিকুল্লাহ্ ও রাশেদা খাতুন নামে তিন সন্তান রয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১ তারিখে হৃদরোগজনিত কারণে বিনা চিকিৎসায় মারা যান আমেনা খাতুন।

বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বায়ান্নোর ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ এলোপাথাড়িভাবে গুলি চালালে আবদুস সালাম গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ৭ এপ্রিল, ১৯৫২ তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।[২]

* মহান ভাষা আন্দোলনে আবদুস সালাম অনবদ্য ভূমিকা রাখায় বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০০ সালে একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করেন।
* ফেনী স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে ২০০০ সালে ‘ভাষা শহীদ সালাম স্টেডিয়ামে’ রূপান্তর করা হয়।
* দাগনভুঞা উপজেলা মিলনায়তনকে ২০০৭ সালে ‘ভাষা শহীদ সালাম মিলনায়তন’ করা হয়।
* তাঁর নিজ গ্রাম লক্ষ্মণপুরের নাম পরিবর্তন করে ‘সালাম নগর’ রাখা হয়।

ভাষা শহীদ শফিউর রহমানঃ

২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৩ সালে শহীদ শফিউর রহমানের কবর

শফিউর রহমান বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার কোন্নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাহবুবুর রহমান ছিলেন ঢাকার পোস্ট এন্ড টেলিগ্রাফ অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট। কলকাতা গভর্ণমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজ হতে আই.কম পাস করে শফিউর রহমান চব্বিশ পরগণা সিভিল সাপ্লাই অফিসে কেরানীর চাকরি গ্রহণ করেন। ১৯৪৫ সালে কলকাতার তমিজউদ্দিনের কন্যা আকিলা খাতুনের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। দেশ বিভাগের পর পিতার সঙ্গে ঢাকায় এসে ঢাকা হাইকোর্টে হিসাব রক্ষণ শাখায় কেরানী পদে যোগ দেন।

১৯৫২‌-র ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল দশটার দিকে ঢাকার রঘুনাথ দাস লেনের বাসা থেকে সাইকেলে চড়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হন শফিউর। সকাল সাড়ে দশটার দিকে নওয়াবপুর রোডে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পূর্বদিনের পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ পুণরায় গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলি শফিউর রহমানের পিঠে এসে লাগে। আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। তাঁর শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচার সফল না হওয়ায় ঐদিন সন্ধ্যা সাতটায় মৃত্যুবরণ করেন।কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে ২২ ফেব্রুয়ারি’র মধ্যরাতে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। তাঁর কবরের পাশেই রয়েছে পূর্বদিনের শহীদ আবুল বরকতের কবর।[১]২০০৫ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শফিউর রহমানকে একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। এছাড়াও, ২০০৬ সালে অন্যান্য ভাষা আন্দোলনে শহীদ অন্যান্য পরিবারের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী বেগম আকিলা খাতুনকে আজীবন ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।

ছবিতে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসঃ

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান গণপরিষদে এর সদস্যদের বাংলায় কথা বলা এবং সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব করেন।

Dhirendra Nath Datta
In defence of Bangla: Bangla as the state language of Pakistan

Sir, in moving this– the motion that stands in my name– I can assure the House that I do so not in a spirit of narrow Provincialism, but, Sir, in the spirit that this motion receives the fullest consideration at the hands of the members. I know, Sir, that Bangla is a provincial language, but so far our state is concerned, it is the language of the majority of the People of the state. So although it is a provincial language, but as it is a language of the majority of the people of the state and it stands on a different footing therefore. Out of six crores and ninety lakhs of people inhabiting this State, 4 crores and 40 lakhs of people speak the Bangla language. So, Sir, what should be the State language of the State? The State language of the state should be the language which is used by the majority of the people of the State, and for that, Sir, I consider that Bangla language is a lingua franca of our State. It may be contended with a certain amount of force that even in our sister dominion the provincial language have not got the status of a lingua franca because in her sister dominion of India the proceedings of the constituent Assembly is conducted in Hindustani, Hindi or Urdu or English. It is not conducted in the Bangla language but so far as the Bangla is concerned out of 30 crores of people inhabiting that sister dominion two and a half crores speak the Bangla language. Hindustani, Hindi or Urdu has been given and honored place in the sister dominion because the majority of the people of the Indian Dominion speak that language. So we are to consider that in our state it is found that the majority of the People of the state do speak the Bangla language than Bangla should have an honoured place even in the Central Government.

I know, Sir, I voice the sentiments of the vast millions of our State. In the meantime I wand to let the House know the feelings of the vastest millions of our State. Even, Sir, in the Eastern Pakistan where the People numbering four crores and forty lakhs speak the Bangla language the common man even if he goes to a Post Office and wants to have a money order form finds that the money order is printed in Urdu language and is not printed in Bangla language or it is printed in English. A poor cultivator, who has got his son, Sir, as a student in the Dhaka University and who wants to send money to him, goes to a village Post Office and he asked for a money order form, finds that the money order form is printed in Urdu language. He can not send the money order but shall have to rush to a distant town and have this money order form translated for him and then the money order, Sir, that is necessary for his boy can be sent. The poor cultivator, Sir, sells a certain plot of land or a poor cultivator purchases a plot of land and goes to the Stamp vendor and pays him money but cannot say whether he has received the value of the money is Stamps. The value of the Stamp, Sir, is written not in Bangla but is written in Urdu and English. But he cannot say, Sir, whether he has got the real value of the Stamp. These are the difficulties experienced by the Common man of our State. The language of the state should be such which can be understood by the common man of the State. The common man of the State numbering four crores and forty millions find that the proceedings of this Assembly which is their mother of parliaments is being conduct in a language, Sir, which is unknown to them. Then, Sir, English has got an honoured place, Sir, in Rule 29. I know, Sir, English has got an honoured place because of the International Character.

But, Sir, if English can have an honoured place in Rule 29 that the proceedings of the Assembly should be conducted in Urdu or English why Bangla, which is spoken by four crores forty lakhs of people should not have an honoured place, Sir, in Rule 29 of the procedure Rules. So, Sir, I know I am voicing the sentiments of the vast millions of our State and therefore Bangla should not be treated as a Provincial Language. It should be treated as the language of the State. And therefore, Sir, I suggest that after the word ‘English’, the words ‘Bangla’ be inserted in Rule 29. I do not wish to detain the House but I wish that the Members present here should give a consideration to the sentiments of the vast millions of over State, Sir, and should accept the amendment that has been moved by me. {Mr Datta’s Speech in the Parliament}

যারা ভাষা আন্দোলনে অবদান রেখেছেন তাদের পুর্ণাঙ্গ একটা তালিকা পাবেন এই লিঙ্কে

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: ১৪৪ ধারার মধ্যে মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে জমায়েত ছবি: রফিকুল ইসলাম

আর্টস বিল্ডিং এর ছাদে ছাত্রদের কালো পতাকা উত্তোলন (২২শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫২)

২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে বিশাল মিছিল বের হয়।

একুশ নিয়ে প্রথম কবিতাটি লিখেছিলেন মাহবুবুল আলম চৌধুরী – “কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি” শিরোনামে। এখানে কবিতাটির অংশ বিশেষ উল্লেখ্য –

“এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে
রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়
যেখানে আগুনের ফুলকির মতো
এখানে ওখানে জ্বলছে অসংখ্য রক্তের ঘ্রাণ
সেখানে আমি কাঁদতে আসিনি।
আজ আমি শোকে বিহ্বল নই
আজ আমি ক্রোধে উন্মত্ত নই
আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল।
যে শিশু আর কোনোদিন তার
পিতার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার
সুযোগ পাবেনা
যে গৃহবধূ আর কোনোদিন তার
স্বামীর প্রতীক্ষায় আঁচলে প্রদীপ
ঢেকে দুয়ারে আর দাঁড়ায়ে থাকবে না
যে জননী খোকা এসেছে বলে
উদ্দাম আনন্দে সন্তানকে আর
বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না
যে তরুণ মাটির কোলে লুটিয়ে
পড়ার আগে বারবার একটি
প্রিয়তমার ছবি চোখে আনতে
চেষ্টা করেছিলো
সে অসংখ্য ভাইবোনের নামে
আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত
যে ভাষায় আমি মাকে সম্বোধনে অভ্যস্ত
সেই ভাষা ও স্বদেশের নামে
এখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে
আমি তাদের ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি
যারা আমার অসংখ্য ভাইবোনকে
নির্বিচারে হত্যা করেছে।

শহীদ মিনারের ইতিহাস
শহীদ স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতে ২২ ফেব্রুয়ারিতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেন।ভাষা আন্দোলনের ছাত্রকর্মীরা পুরান ঢাকার কয়েকজন রাজমিস্ত্রীর সহায়তায় রাতের বেলা এই মিনার নির্মাণ করেন।শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ কথাটি হাতে লিখে এই শহীদ মিনারে প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে দেন তাঁরা।চারদিন পর পুলিশ এটি ভেঙ্গে দেয়।

তাতক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কবি আলাউদ্দিন আজাদ লিখে ফেলেন “স্মৃতিস্তম্ভ” কবিতাটি-

স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনও
চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো! যে ভিত কখনো কোনো রাজন্য
পারে নি ভাঙ্গতে
হীরার মুকুট নিল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার
খুরের ঝটিকা ধুলায় চূর্ণ যে পদপ্রান্তে
যার বুনি ধান
গুন টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাপর চালাই
সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য।
ইটের মিনার
ভেঙেছে ভাঙ্গুক! ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরী
চার কোটি পরিবার।

এ-কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
শিয়রে যাহার ওঠে না কান্না, ঝরে না অশ্রু?
হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং
সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং
এ-কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
বিরহে যেখানে নেই হাহাকার? কেবল সেতার
হয় প্রপাতের মহনীয় ধারা, অনেক কথার
পদাতিক ঋতু কলমের দেয় কবিতার কাল?

ইটের মিনার ভেঙেছে, ভাঙ্গুক. একটি মিনার গড়েছি আমরা
চার কোটি কারিগর
বেহালার সুরে, রাঙ্গা হৃদয়ের বর্ণলেখায়।
পলাশের আর
রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়
দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই
শহীদের নাম
এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়, তোমাদের নামে।
তাই আমাদের
হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক
শপথের ভাস্কর।
কবি: আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২ – ২০০৯)

দু’বছর পর ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়।আগের শহীদ মিনারের স্থানে অস্থায়ীভাবে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।এর উদ্বোধন করেন নাট্যগুরু নুরুল মোমেন।সেই সঙ্গে এই স্থানে একটি স্থায়ী মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থপতি হামিদুর রহমান ১৯৫৭ সালে শহীদ মিনারের নির্মাণ শুরু করেন।স্থপতি হামিদুর রহমান ও ভাস্কর নভেরা আহমেদের তত্বাবধানে শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ চলতে থাকে।কিন্তু ১৯৬০ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়।এই অসমাপ্ত শহীদ মিনার ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি বুদ্ধিজীবী,ছাত্র ও সাধারণ জনতার উপস্থিতিতে উদ্বোধন করা হয়।ভাষা শহীদ আবুল বরকতের মা এই শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী সেনা বাহিনী শহীদ মিনার ধ্বংস করে দেয়।

১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় অর্জনের পর ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরির নেতৃত্বে গঠিত কমিটি আবার শহীদ মিনার নির্মানের জন্য কাজ শুরু করে।দ্রুততম সময়ে নির্মাণের জন্য হামিদুর রহমানের মূল নকশাকে পুরোপুরি অনুসরণ না করে শহীদ মিনারের বেদী ও মূল কাঠামো শুধু নির্মাণ করা হয়।যুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনারা যে ম্যুরালগুলো ধ্বংস করেছিল তা আর গড়ে তোলা হয়নি।মূল পরিকল্পনায় থাকা জাদুঘর,লাইব্রেরি ও অন্যান্য অংশও বাদ দেওয়া হয়।১৯৮৩ সালে শহীদ মিনারে আরো কিছু অংশ নির্মান করে বর্তমান চেহারায় আনা হয়।বর্তমানে শহীদ মিনারে তিন স্তর বেদীর উপর মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।মাঝখানে রয়েছে ঈষত্ অবনত সবচেয়ে বড় একটি স্তম্ভ।এর দু পাশে দুটি করে চারটি স্তম্ভ রয়েছে।বড় স্তম্ভটি দেশমাতা এবং ছোট স্তম্ভগুলো দেশমাতার সন্তানের প্রতীক।২০১০ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশের হাইকোর্ট শহীদ মিনার চত্বরে একটি জাদুঘর ও লাইব্রেরি স্থাপনের জন্য জনকর্মবিভাগের প্রতি নির্দেশ জারি করে। কিন্তু আজও সেই রায়ের বাস্তবায়ন হয় নি।আসুন সবাই মিলে দাবি জানাই শহীদ মিনারের মুল নকশার বাস্তবায়ন যেন হয় দ্রুততম সময়ে।
সুত্রঃভাষা আন্দোলনের শহীদ মিনার

একুশের প্রথম শহীদ মিনার। মাত্র চারদিনের মাথায় পাকিস্তানী পুলিশ ও আর্মি শহীদ মিনার গুড়িয়ে দেয়। (২২শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫২)

একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩: পুরান ঢাকা কলেজ প্রাঙ্গনে ইডেন কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রীদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ছবি: রফিকুল ইসলাম

প্রথম শহীদ মিনার-শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঙ্গলীঃ২১শে ফেব্রুয়ারী,১৯৫৩

শহীদ মিনারে শহীদ বরকতের মা(২১শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫৬)

১৯৬৩ সালের একুশে ফেব্র“য়ারি এ মিনার উদ্বোধন করেন শহীদ বরকতের মা হাসিনা বেগম

২১শে ফেব্রুয়ারী,১৯৬৩ঃশহীদ মিনারে জনতার ঢল

একুশের প্রথম ডাকটিকেট

ভাষা আন্দোলনের লিপিবদ্ধ ইতিহাস পাবেন এই লিঙ্কে

আজ এতগুলো বছর পরে ফেব্রুয়ারীর শুরুতে এই সব শহীদ ভাইদের প্রতি এবং ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখা সকলের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।শুধুমাত্র ২১শে ফেব্রুয়ারী নয় সারা বছরই যেন এই শ্রদ্ধা এবং সম্মানের ডালি অক্ষুন্ন থাকে এই আহবান সবার কাছে।

“মাগো তোর ছেলেকে দেখতে যাব শহীদ মিনারে,
তোর ছেলের ওই রক্তের দাগ মুছব ফুলে ফুলে,
আজ হাজার মুখের ভীড়ে মাগো কাকে খুজিস বল?
হাজার মুখের ভীড়ে মা দেখ স্বপ্নচারীর দল।”
(২১শে ফেব্রুয়ারী,নীলকন্ঠ জয়ের কবিতা) ।

** তথ্য ও ছবি সুত্রঃ
গুগল ইমেজ,উইকিপিডিয়া,ফেইসবুক ও অন্তর্জালের বিভিন্ন সাইটসমূহ।