ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

Sydney+4

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পহেলা জানুয়ারীকে নববর্ষ হিসেবে পালন করা তুলনামূলক নতুন একটি ঘটনা বলা চলে। আমাদের নিজস্ব পঞ্জিকা থাকায় নববর্ষ পালনের বিষয়টা ঐতিহ্যগতভাবেই অন্যদের থেকে ভিন্ন। তবে ইংরেজি সাল গণনা আন্তর্জাতিক রীতি হয়ে ওঠায় আমরাও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পহেলা জানুয়ারীকে বরণ করে নেওয়া শুরু করেছি বেশ কয়েক দশক হলো। এক্ষেত্রে একটা ভুল আমরা প্রায়শই করে থাকি। আমরা এই উৎযাপনটিকে ইংরেজি নববর্ষ হিসেবে পালন করলেও মূলত এটি খ্রিষ্টীয় নববর্ষ। তাই ২০১৫ইং লেখাটি রীতিসম্মত নয়, বরং ২০১৫ খ্রিঃ লেখাই রীতিসম্মত।

সর্বপ্রথম নববর্ষ পালন করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ২০০০সালের দিকে মেসেপোটেনিয়ায়, বর্তমান ক্যালেণ্ডারের হিসাবে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে। তবে পার্সিয়ান ও মিশরীয়ানরা সেই সময়ে নববর্ষ পালন করতো শরৎকাল বেছে নিয়ে। আবার গ্রীসের অধিবাসীরা পালন করতো শীতকালের শেষের দিকে উপযুক্ত সময় বুঝে।

প্রাচীন রোমান ক্যালেণ্ডারঃ মার্চকে বছরের প্রথম ধরে বর্ষচক্র হিসাবঃ

প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারে মার্চের ১তারিখকে বর্ষসূচনা দিবস ধরে বছরের হিসাব শুরু করা হয়। উক্ত ক্যালেণ্ডারে সব মিলিয়ে মাস ছিলো ১০টি। মজার বিষয় হলো এখনকার দ্বাদশ মাস ডিসেম্বর ছিলো দশম মাস। ল্যাটিন ‘ডিসেম’ অর্থ হলো দশ, এজন্যই দশম মাসের নাম ছিলো ডিসেম্বর। একইভাবে ‘সেপ্টেম’ অর্থ সাত, ‘অক্টো’ অর্থ আট, ‘নভেম’ অর্থ নয়। [ সূত্রঃ A move from March to January by Borgna Brunner] ব্যাবিলনিয়ায় নববর্ষ শুরু হতো মহাবিষুবের দিনে ২০ মার্চ। অ্যাসিরিয়ায় শুরু হতো জলবিষূবের দিনে ২১ সেপ্টেম্বর। মিসর, ফিনিসিয়া ও পারসিকদের নতুন বছর শুরু হতো ২১ সেপ্টেম্বর। গ্রীকদের নববর্ষ শুরু হতো খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত ২১ ডিসেম্বর।

ক্যালেণ্ডারে জানুয়ারির আগমনঃ
খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ অব্দের শুরুতে রোমের দ্বিতীয় রাজা নুমা পন্টিলিয়াস রাজকীয় কার্য পরিচালনার সুবিধার জন্য ‘জানুয়ারি’ ও ‘ফেব্রুয়ারি’ নামে দুইটি নতুন মাস ক্যালেণ্ডারে যোগ করেন এবং পহেলা জানুয়ারীকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে ঘোষণা দেন। তিনিই প্রথম রাষ্ট্রীয় ক্যালেণ্ডারের প্রচলন করেন। কিন্তু তখনও নববর্ষ পালন করার জন্য মানুষ মার্চের ১ তারিখকেই বেছে নিতো। খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩ অব্দে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে পহেলা জানুয়ারীকে নববর্ষ হিসেবে পালন করা হয়।

জুলিয়ান ক্যালেণ্ডারঃ পহেলা জানুয়ারীর অফিসিয়াল স্বীকৃতি প্রাপ্তিঃ
খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সম্রাট জুলিয়াস সিজার প্রথমবারের মতো সৌরপঞ্জিকা চালু করেন, যা প্রাচীণ রোমান ক্যালেণ্ডারকে নতুন এবং গ্রহণযোগ্য ভিত্তি প্রদান করে। তিনিই সর্বপ্রথম পহেলা জানুয়ারীকে বছরের প্রথমদিন হিসেবে পালন করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। আস্তে আস্তে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সৌর পঞ্জিকাটি, যা বহুলাংশে নির্ভূল ছিলো।

মধ্যযুগঃ নববর্ষ হিসেব পহেলা জানুয়ারীর বিদায়ঃ
মধ্যযুগে এসে ইউরোপিয়ান স্কলাররা পহেলা জানুয়ারীকে বর্ষবরণের দিন হিসেবে পালন থেকে সরে আসতে উদ্বুদ্ধ করেন জনগণকে এবং পহেলা জানুয়ারীকে নববর্ষের দিন হিসেবে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। তখন মানুষ বিক্ষিতভাবে বিভিন্ন দিবসকে বর্ষবরণের দিন হিসেবে বেছে নেয়। যিশু খ্রিস্টের জন্মতারিখ ২৫ ডিসেম্বরেই বেশি বর্ষবরণ করা হতো। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে নববর্ষ শুরু হতো ২৫ মার্চ, কারণ তাঁরা মনে করতেন এইদিনটিতে দেবদূত গ্যাব্রিয়েল যিশুমাতা মেরির কাছে যিশু খ্রিস্টের জন্মবার্তা জ্ঞাপন করে। অ্যাংলো-স্যাকসন ইংল্যান্ডে নববর্ষের দিন ছিল ২৫ ডিসেম্বর। অনেকে আবার মার্চের ১ কিংবা ২০ তারিখকে বেছে নিয়েছিলেন অথবা নিজেদের মতো করে।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেণ্ডারঃ পহেলা জানুয়ারীর প্রত্যাবর্তনঃ
১৫৮২সালে, গ্রেগরিয়ান ক্যালেণ্ডার পুনরায় সুবিনস্ত করে পহেলা জানুয়ারীকে বছরের প্রথমদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ধীরে ধীরে সকল ক্যাথলিকপ্রধান দেশগুলো এই নতুন ক্যালেণ্ডারের সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে সারাবিশ্বে জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় ক্যালেণ্ডারটি। এভাবেই আন্তর্জাতিকভাবে পহেলা জানুয়ারী নববর্ষ হিসেবে পালনের দিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রথমদিকে ব্রিটেন এবং আমেরিকা মেনে না নিলেও ১৭৫২ সাল থেকে পহেলা মার্চের পরিবর্তে পহেলা জানুয়ারীকে বছরের প্রথমদিন ধরে বর্ষবরণ পালন করা শুরু করেন।

উপমহাদেশে পহেলা জানুয়ারী বর্ষবরণঃ
মূলত উপমহাদেশে ব্রিটিশদের আগমনের পর থেকে খ্রিষ্টীয় ক্যালেণ্ডারের সূচনা হয়, অবশ্য ততদিনে সম্রাট আকবর উপমহাদেশের জন্য আলাদা স্বকীয় বর্ষপঞ্জি প্রত্যাবর্তন করে ফেলেছিলেন। বর্ষবরণ অবশ্য ইদানিংকালের ঘটনা।

সবাইকে নতুন বছরের প্রীতি এবং শুভেচ্ছা।

তথ্যসূত্রঃ
A History of the New Year by Borgna Brunner