ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

 

‘মানুষ দৃষ্টিহীন বলে অন্ধ নয়
মানুষ প্রজ্ঞাহীন বলেই অন্ধ।’

সুন্দর এই শ্লোগান নিয়েই যাত্রা শুরু স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনার। গত ৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলায় গিয়েছিলাম প্রাণের টানে। বাংলা একাডেমী চত্ত্বরে

দেখা মিলবে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা স্টল দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে মুদ্রিত কিছু গ্রন্থ প্রকাশ করেছে স্পর্শ। ব্রেইল প্রকাশনাগুলো বিক্রয়ের জন্য নয়, বরং বিনা মূল্যে তুলে দেয়া হবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের হাতে।

কয়েকটি বই হাতে নিলাম। যেমন- ‘হেলেন কেলারের আত্মজীবনী’, ছড়াকার লুৎফুর রহমান রিটনের ‘আকাশে অনেক ছড়া’,  ‘বেগম রোকেয়ার আত্মজীবনী’, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাব্যগ্রহ্ন ‘৭১ দেখব বলে’ ইত্যাদি। উল্লেখ্য ‘৭১ দেখব বলে’ কাব্যগ্রহ্নটির রচয়িতা আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় ব্লগার ও কবি নুরুন্নাহার শিরীন, নাজনীন খলিল, আইরিন সুলতানা এবং আফসানা কিশোয়ার লোচন।

স্টলে উপস্থিত ছিলেন সরকারী বাংলা কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মিলন[নামটি ভুল হতে পারে]। ছোট্ট করে তার একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে ফেললাম। আমার সাথে উপস্থিত ছিলেন ব্লগার জুলফিকার জুবায়ের ও মিঠু। তিনি আমাদের ‘মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাব্যগ্রহ্ন’ থেকে একটি কবিতা পড়ে শোনালেন। তাঁর কাছ থেকে অজানা কিছু তথ্য জেনেছি, নিচে পয়েন্ট আলোচনার মাধ্যমে সকলের জন্য তুলে ধরা হলোঃ

ব্রেইল কীঃ
দৃষ্টিহীন লোককে শিক্ষা দানের জন্য “লুই ব্রেইল” নামে এক জন ফরাসি একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি আবিষ্কার করেন যা ব্রেইল পদ্ধতি বলা হয়। এতে ছয়টি উঁচু বিন্দুকে বিভিন্নভাবে সাজিয়ে অক্ষর, সংখ্যা প্রভৃতি প্রকাশ করা হয়। একটি বিশেষ ছিদ্রযুক্ত ধাতব পাত অথবা টাইপরাইটার ব্যবহার করে ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা যায়। আঙুলের স্পর্শ অনুভূতি ব্যবহার করে পড়তে হয়। 
বাংলা ব্রেইল লিখন ও পঠন পদ্ধতি বিস্তারিত এখানে দেখুন- বাংলা ব্রেইল

দৃষ্টিহীনদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ও পরীক্ষার পদ্ধতিঃ
মিলন ভাই আমাদের জানালেন তাঁরা কিভাবে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষককে অনুসরণ করেন এবং পড়া বুঝে নেন। ওনার ভাষায়-

‘মূলত আমরা ক্লাসে শিক্ষকদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি। অনেকক্ষেত্রে শিক্ষকদের কথাগুলো রেকর্ড করে নেই। এতে বাসায় ফিরে পুনরায় বুঝে নিতে পারি। এছাড়া ক্লাসের বন্ধুদের কাছ থেকে বুঝে নেই পড়াগুলো। বাসায় এসে বই এর পাতায় হাত বুলিয়ে মুখস্ত করি, যেসব সাবজেক্টের ব্রেইল বই নেই সেগুলো নিজেরা নোট করে নেই ক্লাস লেকচার রেকর্ড শুনে শুনে।’

কিভাবে নোট করেন জিজ্ঞাসা করার উত্তর দিলেন-

‘মূলত তাদের জন্য আলাদা কীবোর্ড ও প্রিন্টার আছে, যা এদেশে অপ্রতুল। উক্ত কী-বোর্ডে ছয়টি ডট থাকে, যেগুলো ব্রেইল অক্ষর লিখতে সাহায্য করে। যেহেতু এই সুযোগ এদেশে নেই, সেহেতু তাঁরা রেকর্ডগুলো গুছিয়ে পুনরায় নিজেদের ভাষায় রেকর্ড করে নেন অথবা বন্ধুদের নোট কাউকে দিয়ে পড়িয়ে রেকর্ড করে নেন।’

পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন-

‘পরীক্ষার হলে লেখার জন্য একজন স্বাভাবিক দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ সহকারী হিসেবে থাকেন। তিনি পরীক্ষার্থীকে প্রশ্ন পড়ে শোনান এবং পরীক্ষার্থী যে উত্তর মুখে উচ্চারণ করেন, তিনি সেগুলো খাতায় টুকে ফেলেন।’

এছাড়া আরো অনেক কথা হলো ওনার সাথে, কথা হলো স্পর্শ প্রকাশনের সত্ত্বাধিকারীর সাথে। তিনি জানালেন ১৯ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীর মাঝে এবারের বইগুলো বিনামূল্যে প্রদান করে হবে অনাড়ম্বর এক আয়োজনের মাধ্যমে। আহ্বান জানালেন সকল লেখিয়ে বন্ধুদের, তাঁরা যেন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দৃষ্টিহীনদের জন্য অন্তত একটি করে বই প্রকাশ করেন।

বাংলা একাডেমীর সহায়তায় এই অনন্য উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। সাধুবাদ জানাই সেইসব লেখকদেরকে যারা নিজেদের খ্যাতির ও আর্থিক লাভের চিন্তা বাদ দিয়ে বন্ধুর মতো দৃষ্টিহীন মানুষগুলোর জন্য বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। অভিনন্দন সবাইকে যারা এইসকল প্রকাশনার সাথে জড়িত আছেন।

ব্লগার বন্ধুদের একবার হলেও স্পর্শ প্রকাশনা স্টলে ঘুরে আসার অনুরোধ রইলো। সর্বশেষ আমাদের সবার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ব্লগার কবি নুরুন্নাহার শিরীন, নাজনীন খলিল, আইরিন সুলতানা এবং আফসানা কিশোয়ার আপনাদের সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। এই পোস্টের মাধ্যমে জানতে চাই এই প্রকাশনার পেছনের গল্পটি…