ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

‘জন্মেছি আভাজন হয়ে বঙ্গে, তাই শুনি মিথ নানা রঙে, নানা ঢঙ্গে।’~ নীলকণ্ঠ জয়

মিথ মানে ঠাকুরমার ঝুলি? আরে না ভাই। মিথ মানে বুঝিয়েছি বিকৃত ইতিহাসের মিথ। সত্য বিকৃতির মিথ। একধরণের ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রতিটি মানুষই জানেন এবং মনেপ্রাণে মানেন রবীন্দ্রনাথে ঠাকুর বাঙালির কবি নন। ভুল হয়েছে? দুঃখিত… বাংলাদেশের কবি নন। তিনি প্রেমের কবি। ভুল হলো? আচ্ছা, সত্যটা বলছি, তিনি মালাউন কবি, নিষ্ঠুর জমিদার কবি। তিনি দার্শনিক। আবারও ভুল হলো? তিনি নাস্তিক,ওকে?

যাই হোক মিথ ব্যবচ্ছেদ করতে আসি নি, তাই প্রসঙ্গ বদল করে ফেলার আগে কয়েকটা মিথের শিরোনাম দিয়ে যাই। এদেশের শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই এইমিথগুলো শুনেছেন এবং একদল মনেপ্রাণে মিথগুলো বিশ্বাস করেন, ধারণ করেন এবং এই ‘ব্যক্তি’ রবীন্দ্রনাথকে শূলে চড়িয়ে ব্যবচ্ছেদ করেন সময়ে-অসময়ে, সুযোগ পেলেই।
মিথ– ‘ট্যাকা-পয়সা দিয়ে নোবেল পেয়েছে তিনি, পাওয়ার কথা ছিলো কার…’
– ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছেন, যাতে এ বঙ্গের মানুষ শিক্ষিত না হয়।’
– ‘নজরুলের লগে জোর করে ভাস্তির বিয়ে দিছেন।’
– ‘চুরি করে লেখেন…’ ইত্যাদি।
নয়া মিথ– ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে বিশ্ববিদ্যালয় হলে বাংলাদেশের সব পোলাপান নাস্তিক হয়ে যাবে।’  এগুলোর ব্যবচ্ছেদ অনেক আগেই হয়েছে, অনেকেই করেছেন, মূর্খরা মুর্খ এবং চরম মুখরাই থেকে গেছেন, তাই নতুন করে এ ব্যাপারে কথা বাড়াচ্ছি না। তুমি মূর্খ এবং নির্লজ্জ মুখরা, তাতে আমার কী? নয়া মিথ ধরে আজকে পুরাতন একটি ভ্রমণ স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। সুকান্ত ভট্টাচার্য্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে আমার জানার ইচ্ছে প্রচণ্ডরকম বেশি ছিলো ছোটবেলা থেকে। এই মানুষগুলোর দর্শন আমাকে ভাবিয়েছে, আমাকে আলোর পথ দেখিয়েছে। সুকান্ত এবং নজরুলের গণসাহিত্য আমার কবিতায় প্রেরণা যোগায়, হুমায়ুন আজাদ স্যারের দর্শন আমাকে মানুষ চেনায়, রবীন্দ্র দর্শন আমাকে সৃষ্টিশীল হতে শেখায়।

গতবছর জুলাইয়ে গিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত নওগাঁর পতিসর কুঠিবাড়ি। দিগিন্তজোড়া সবুজ আর ফসলের ক্ষেত, গ্রামের পর গ্রাম পার হয়ে এক নিস্তব্দ পল্লী নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার মনিয়ারী ইউনিয়নে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পতিসর। এখানেই পটিসর কুঠিবাড়ি অবস্থিত। নওগাঁ শহর থেকে দূরত্ব সড়ক পথে ৩৬/৩৭ কি. মি.। তৎকালীন কালিগ্রাম পরগনার পতিসরে কবির ওই কুঠিবাড়িটি অবস্থিত। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর কালিগ্রাম পরগনার জমিদারি পত্তন করেন। তখন পতিসর কুঠিবাড়িকে পতিসর কাছারিবাড়ি বলা হত। ওই কাছারিবাড়িকেই কালিগ্রাম পরগনার ঠাকুর পরিবারের জমিদারি কাজকর্ম পরিচালনা করা হত। এরপর জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের মধ্যে জমিদারি ভাগাভাগি হলে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালিগ্রাম পরগনার জমিদারি প্রাপ্ত হন।

Naogaon-1

বর্তমানে কুঠিবাড়ির রং হয়ে উঠেছে দুধসাদা, কবির প্রিয় রবীন্দ্রসরোবর ঘাটটি করা হয়েছে মেরামত এবং নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে সামনের সিংহদ্বারটি। সামনে বিশাল প্রাঙ্গণ। আর এই প্রাঙ্গণ ঘেষে বয়ে চলেছে সেই আমলের নাগর নদী। যদিও সেই যৌবন এখন আর নেই। ঘাটে এসে বজরা থেকে নামতেন কবি। কুঠিবাড়ির অঙিনায় স্থাপন করা হয়েছে কবির ম্যূরাল। রবীন্দ্রনাথের নাগর নদীতে এখন ধান চাষ হচ্ছে। প্রশাসনের প্রতি বার বার অনুরোধ জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত কালিগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইন্সটিটিউশনে নতুন করে একটি সংগ্রহশালা স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে কবিগুরু, তার ছেলে রথীন্দ্রনাথ এবং প্রতীমা দেবীর অনেক চিঠি ডিসপ্লে করা হয়েছে।

*কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালিগ্রাম পরগনার জমিদারি প্রাপ্ত হয়ে প্রথম আসেন ১৮৯১ সালের ১৫ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে কোন একদিন। এর আগে কবি শাহজাদপুর শিলাইদহে আসতেন। ১৮৯১ সালের পর কবি বহুবার এসেছেন পতিসরের কুঠিবাড়িতে নাগর নদী পথে বজরায় করে। কবি যতবার পতিসর আসতেন অবস্থান করতেন দীর্ঘ সময় ধরে। পতিসরে বসে কবি রচনা করেছিলেন কাব্যনাটিকা বিদায় অভিশাপ, গোরা ও ঘরে বাইরে উপন্যাসের অনেকাংশ। ছোটগল্পের মধ্যে প্রতিহিংসা, ঠাকুরদা, ইংরাজ ও ভারতবাসী প্রবন্ধ। গানের মধ্যে যেমন: তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা/তুমি আমার নিভৃত সাধনা, বধূ মিছে রাগ করোনা, তুমি নবরূপে এসো প্রাণে, সহ অনেক গান। এ পতিসরে বসেই কবি রচনা করেছেন চৈতালী কাব্যের ৫৪টি কবিতা। সন্ধ্যা, দুই বিঘা জমির মত বিখ্যাত কবিতা। পদ্মা বোটে বসে কবি রচনা করেছিলেন তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/সব গাছ ছাড়িয়ে/উঁকি মারে আকাশে। বারেক তোমার দুয়ারে দাঁড়ায়ে/ফুকারিয়া ডাকো জননী। প্রান-রে তব সন্ধ্যা নামিছে। আঁধারে ঘেরিছে ধরণী। মাতার আহবানসহ এমন বহু কবিতা রচনা করেছেন এই পতিসরেই। এখানে বসেই তিনি বহু চিঠি লিখেছিলেন তার প্রিয়জনদের।

পতিসরকে ছুঁয়ে একে বেকে গেছে নাগর নদী। এই নদীতে কবি তার প্রিয় পদ্মাবোটে বসে রচনা করেছিলেন তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/সব গাছ ছাড়িয়ে/উঁকি মারে আকাশে। কবির প্রিয় সেই নাগর নদী আজও প্রবহমান। কিন’ কবির সেই মনিতলা মন্দির সংলগ্ন তালগাছটি আজ আর নেই। ১৯৬২ সালের এক প্রবল ঝড়ে ভেঙে পড়ে তালগাছটি। তালগাছটির স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে সেখানে এখনও রয়েছে একটি মাটির উচু ভিটে। মন্দির ভবনটি এখন আর নেই।*

পতিসরে ঘুরে না আসলে জানতেই পারতাম না একটি বিশাল সত্যকে। শিলাইদহ, ত্রিশাল, কুমিল্লা, খুলনা ঘুরতে হবে না, শুধুমাত্র এইটুকু সত্যই বলে দেয় এই বঙ্গের মানুষের জন্য তাঁর দরদ ছিলো কতখানি।

রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রাহক মতিউর রহমান মামুনের ভাষ্য থেকেঃ

‘আসলে এই সত্যগুলো কেউ কখনো প্রচার করেন না। কেন করেন না জানি না, তবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে লুকিয়ে রাখা হয় ইতিহাসকে। আমাদের দেশের শিক্ষিত মানুষগুলো কখনো ইতিহাস, সাহিত্য এবং সভ্য ও সত্যতার চর্চা করে না। হুজুগ এবং গুজবে এদের মনকে বিষিয়ে রাখতেই পছন্দ করেন। আমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি, আপনার বয়সেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক এবং আদর্শিক গবেষণা করে আসছি। এই মানুষটি একাধারে একজন লেখক, মানবতাবাদী, দার্শনিক এবং সুবক্তা ছিলেন। তিনি নিজেকে কখনোই শাসকের মোড়কে না মিলিয়ে মানুষের সাথে মিশতে ভালোবাসতেন। এখানেই প্রতিবার তিনি ভ্রমণকালে খাজনার হিসাব নেওয়ার আগে মানুষের খোঁজ নিতেন আগে। কাছারির প্রাঙ্গণে বসাতেন সংগীতের আসর। পরগণার মানুষের ভীর জমে যেত সেই উপলক্ষ্যে। তিনি প্রচলিত ধর্মের বাইরে একজন ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন। এই পরগণার অধিকাংশ দরিদ্র মুসলিম কৃষকদের আলাদা চোখে দেখেন নি বলেই নিভৃত এই পল্লীতে গ্রামবাসীদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কালিগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইন্সটিটিউট’। কবির নিজস্ব পরিকল্পনায় নির্মিত হয় দর্শনীয় বিদ্যালয় ভবনটি। তিনি চাষিদের আত্মনির্ভর করে তোলার জন্য সমবায় ভিত্তিতে চাষাবাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তৎকালিন সময় এই প্রত্যন্ত এলাকায় কলের লাঙল (ট্রাক্টর) দিয়ে জমি চাষ শুরু করেন। কবির ট্রাক্টরের একটি ফলার ভগ্নাংশ সংগ্রহ করে কুঠিবাড়িতে রাখা হয়েছে। নিজের বেতনের [১৫০০টাক] একাংশ তিনি সন্তানহার বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য ব্যয় করতেন।

১৯০৫ সালে তিনি কৃষকদের উন্নয়নকল্পে বিনাসুদে ‘পতিসর কৃষি ব্যাংক’ সংস্থাপন করেন। কৃষকদের সংস্থাপনের টাকা কখনো ফেরত নেন নি। তিনি ১৯১৩ সালের নোবেল পুরস্কারের প্রাপ্ত টাকা থেকে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা এই কৃষি ব্যাংকে জমা দেন। এছাড়া সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পতিসরে সালিশি ব্যবস্থাপনা প্রচলন করেন। রবীন্দ্রনাথ দুস্থ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পতিসরে পল্লিসংগঠনের কাজ শুরু করেছিলেন। বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য স্থাপন করেন ‘পতিসর দাতব্য চিকিৎসালয়’। যারা ওই ধরণের মুখরোচক গল্প করে বেড়ায় এবং যারা এগুলো যাচাই বাছাই ছাড়াই বিশ্বাস করে তাদের জন্য করুণা ছাড়া অন্য কিছু বলার ভাষা আমার নেই।’

বর্তমানে কুঠিবাড়িতে আছে কবির ব্যবহৃত একটি লোহার সিন্দুক, কবির স্নানকার্যে ব্যবহৃত একটি বাথটাব, একটি ইজি চেয়ার, একটি হাতল চেয়ার, কলের ট্রাক্টরের ফলার ভগ্নাংশ, খাট, ফোল্ডিং চেয়ার, পতিসরে পাওয়া কবির স্বহসে- লিখিত ৬ পৃষ্ঠার চিঠির ফটোকপি, দেয়াল ঘড়ি, বজড়ার অয়নাযুক্ত পাল্লা, টেবিল, গ্লোব, আলমিরা, কাঠের দলিল রাখার বাক্স সহ কবি রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বয়সের ছবি সংরক্ষিত আছে। অপরদিকে রবীন্দ্রসরোবরে ঘাটের কাছে নতুনভাবে স’াপন করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে একটি ভাষ্কর্য। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর হাজারো স্মৃতিবিজড়িত নাগরনদীর তীরে পতিসর কুঠিবাড়িতে সর্বশেষ আসেন ১৯৩৭ সালে।

উপরের সামান্য সময়ের রবীন্দ্রস্মৃতিবিজড়িত ইতিহাসভূমে ভ্রমণ নিজের জানার সীমা কতখানি ক্ষুদ্র ছিলো তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে যারা বিবাদ সৃষ্টিতে ব্যস্ত তাদের উদ্দেশ্যে লেখা আমার একটি প্রবন্ধ- গুরুশিষ্য বন্দনা পড়ুন লিংক থেকে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা যাবার পর ঘু’মাইতে দাও, শান্ত রবিরে জাগায়োনা। সারা জীবন যে আলো দিল ডেকে তার ঘুম ভাঙ্গায়োনা। ‘ এই গানটি নিজের কণ্ঠে গেয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। যতবার গানটি শুনি ততবারই চোখে জল চলে আসে। লিংকঃ

তিনি আরো লিখছিলেনঃ

দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্ত পথের কোলে
শ্রাবণ মেঘ ছুটে’ এল দলে দলে
উদাস গগন-তলে।
বিশ্বের রবি ভারতের কবি,
শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি।
তুমি চলে যাবে বলে।…
বিদায়ের বেলা চুম্বন লয়ে যায় তব শ্রীচরণে,
যে লোকেই থাক হতভাগ্য এ জাতিরে রাখিও মনে।
(রবি হারা, সওগাত, ভাদ্র ১৩৪৮)

মাঝে মাঝে ভাবি আমরা কোথায় আছি, কোথায় নেমে যাচ্ছি। আশার তরী ডুবে গেছে অনেক আগেই, তাই অহেতুক স্বপ্ন দেখি না, কাউকে জাগানোর প্রচেষ্টা করি না।

আলোচনায় পতিসর কুঠিবাড়ি ভ্রমণের আলোকে উঠে আসা কয়েকটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। তিনি নওগাঁর মুসলিম অধ্যুষিত পতিসর পরগনার দরিদ্র কৃষকদের শিক্ষা, চিকিৎসা, চাষাবাদের জন্য যেটুকু কাজ করেছেন তা রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক দর্শনের বিন্দুমাত্র। আমরা অভাগা জাতি ধর্মের নামে দর্শনের রাশ টেনে ধরি বারবার।  রবীন্দ্র দর্শন বোঝার যাদের ক্ষমতা নেই তাদের কবি তিনি নন। তিনি মানুষের কবি, মানবত্তার কবি;সর্বোপরি তিনি হৃদয় দর্শনের কবি বন্ধুবরেষু কবি সুকান্ত পার্থিবের ভাষায়,‘জলকে যেমন ভাগ করা যায় না, তেমনি যুগসচেতন বাঙালির প্রাণ থেকে কোনদিনো বিচ্ছিন্ন করা যাবে না রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকে, বিশ্বসাহিত্যের প্রাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’

শেষ করছি হুমায়ুন আজাদ স্যারের একটি উক্তি দিয়েঃ

‘রবীন্দ্রনাথ যাকে বাতিলের চেষ্টা করে আসছে নষ্টরা পবিত্র পাকিস্তানের কাল থেকে, পেরে ওঠেনি। এমনই প্রতিভা ওই কবির, তাঁকে বেতার থেকে বাদ দিলে তিনি জাতির হৃদয় জুড়ে বাজেন; তাঁকে পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দিলে তিনি জাতির হৃদয়ের কাব্যগ্রন্থে মুদ্রিত হয়ে যান; তাঁকে বঙ্গভবন থেকে বাদ দেওয়া হলে তিনি সমগ্র বঙ্গদেশ দখল করেন; তাঁর একটি সঙ্গীত নিষিদ্ধ হলে তিনি জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠেন।

প্রতিক্রিয়াশীল নষ্টরা অনেক লড়াই করেছে তাঁর সাথে, পেরে ওঠেনি; তাঁকে মাটি থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি আকাশ হয়ে ওঠেন; জীবন থেকে নির্বাসিত করা হলে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন জাতির স্বপ্নালোকে। নষ্টরা তাঁকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে আপ্রাণ।যদিও তিনি জাতীয় সংগীতের রচয়িতা তবুও তিনি জাতীয় কবি নন।তাঁর নামে ঢাকায় একটি রাস্তাও নেই, সংস্থা তো নেইই। তাতে কিছু যায় আসে নি তাঁর ; দশকে দশকে বহু একনায়ক মিশে যাবে মাটিতে। তিনি বেঁচে থাকবেন বাংলায় ও বিশ্বে।’

নষ্টদের কাছে সরকার নতজানু হবে কিনা জানি না, আমাদের আধুনিক সত্ত্বা হার মানবে কিনা তাও জানি না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নাপাক, রবীন্দ্রনাথের নাম মুছে যাক দৃশ্যমান বাংলাদেশ থেকে, তাতে অদৃশ্যমান হৃদয়ের জগতে তাঁর স্থানের এতটুকুও নড়চড় হবে না। রবীন্দ্রনাথ যে সুউচ্চ আসনে ছিলেন, সেখানেই থাকবেন চিরকাল।

***তথ্যপুঞ্জিঃ
পতিসরঃ বাংলাপিডিয়া
– রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রাহক মতিউর রহমান মামুনের ভাষ্য