ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

‘বাঙালির অবগুণ্ঠিত অনুভূতির শৈল্পিক প্রকাশের আরেক নাম রবীন্দ্রনাথ।
তোমার জন্মদিনে জানাই শুভেচ্ছা, অজর কীর্তিতে প্রণিপাত। ‘  শুভ জন্মদিন গুরু।

2011-05-30__art08
বাংলা সাহিত্যে দুই হীরকরত্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। দু’জনই স্বীয় প্রতিভায় প্রতিষ্ঠিত এবং মৌলিক ও যুগপ্রবর্তক সাহিত্যিক। তাঁরা দু’জন শুধু বাঙালীর কাছে নন সমগ্র বিশ্বে সমানভাবে শ্রদ্ধেয়। বাংলা সাহিত্য ভান্ডারে তাদের রেখে যাওয়া সম্পদ শুধু বাংলা সাহিত্যকে পরিপূর্ণই করেনি, করেছে বিশ্বদরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত। রবীন্দ্রনাথের লেখায় আমরা যে রেনেসাঁ প্রত্যক্ষ করেছি, তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পেরেছেন একমাত্র কাজী নজরুল ইসলাম।

রবি ঠাকুরের লেখনিতে ফুটে উঠেছিলো সর্বজনীন প্রেমানুভূতি এবং প্রেমের মাহত্ব্য । তিনি এই অনুভূতিকে কখনোই নির্মম হতে দেননি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে ভালোবাসায় তিনি গেয়েছিলেন প্রেমের জয়গান । অপরপক্ষে ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থার প্রতি তীব্র ক্ষোভ লক্ষ্য করা যায় কবি কাজী নজরুলের সাহিত্যকর্মে। তিনি সবকিছু ভেঙ্গেচুরে নতুন করে গড়ে তোলার পক্ষে ছিলেন সরব। আর তাইতো তিনি বিদ্রোহী কবি। যে প্রেম দিয়ে সমাজ গড়ার ব্যর্থ প্রয়াস করেছিলেন কবিগুরু , বিদ্রোহে, জ্বালাময়ী বক্তব্যে সেই কাজটিই করেছিলেন কবিগুরুর প্রিয়পাত্র নজরুল। তাইতো জ্বলন্ত নজরুলের আবির্ভাবে নতুন সূর্য দেখেছিলেন তিনি। বুকে টেনে নিয়ে অভিবাদন জানাতে ভুল করেন নি।

কেমন ছিলো এই দুই অসম বন্ধুর সম্পর্ক। হ্যাঁ কবিগুরুকে গুরু বলেই মেনেছিলেন নজরুল ইসলাম। আবার তরুণ নজরুলের প্রতি কবিগুরুর ছিলো অসীম স্নেহ আর ভালোবাসা। তেমন কিছু ঘটনার আলোকপাত করা হবে এই প্রবন্ধে।

শৈশবে দারিদ্রতায় জর্জরিত নজরুলের ছিলো সাহিত্যের প্রতি বিশেষ টান। তার প্রথম শিক্ষাগুরু চাচা কাজী বজলে করিমের নিকট ফার্সি ও উর্দু ভাষা শিক্ষকে থাকেন। কাজীনজরুল বাল্য কালেই পরিস্থিতির প্রভাবে অনেটকা বাউণ্ডুলে স্বভাবের হয়ে উঠেন।তিনি বিভিন্ন সময়ে পীর ফকির, সন্যাসী, বৈষ্ণব বাউল, সুফী দরবেশের আস্তানায়যেমন যেতেন ,তেমনী আশপাশের হিন্দু পরিবারে ভাগবাত, রামায়ন, মহাভারত পাঠের আসারে ও যোগ দিতেন। আবার কখনও সাধু সন্তু, পীর ফকিরের সাথে উধাও হয়ে যেতেন, আবার ফিরে আসতেন। তাঁর এরূপ খাম-খেয়ালী উদাসীনতায় কেউ কেউ তাঁকে কখনও “নজরআলী” কখন ও বা “তারা ক্ষ্যাপা” বলে ডাকতেন । উনবিংশ (বিংশ) শতাব্দীতেবাংলার গ্রামগঞ্জে কবি-কীর্ত্তন, বাউল, সারি গানের হাওয়ায় পল্লীতে প্রকৃতি মুখরিত হয়ে উঠত।

নজরুলের গ্রামেই ছিল শেখ বাক্র আলী গোদার কবিগানের দল, তিনি সে দল ভিড়ে গেলেন। অল্পদিনেই কবি দলের গোদা শেখ বক্র ক্ষুদেকবির কবিত্বে মুগ্ধ হয়ে বলে ছিলেন, “এই ব্যাঁঙাচি বড় হয়ে সাপ হবে” হয়েছিলেন ও তাই। অল্পদিনের মধ্যেই নজরুল সে দলের সেরা কবিয়াল হিসেবে সকলকে মুগ্ধ করেছিলেন।

অল্পদিনের মধ্যেই নজরুল সে দলের সেরা কবিয়াল হিসেবে সকলকে মুগ্ধ করেছিলেন। এই লেটোকবির দলে থেকে সেই বাল্যকালে তিনি “রাজপুত্র” ‘চাষার সং,কবি কালিদাস, শকুনি বধ’ প্রভৃতি পালা রচনা করেন।যেমনঃ ‘অসংখ্য গ্রাম নগরাদি/দূর্গ গুহা পর্বত আদি কত নদনদী/ দেখিলাম কিন্তুনিরবধি/ স্বদেশ জাগিছে অন্তরে” (রাজপুত্র)।

শৈশব থেকেই নজরুল রবীন্দ্রনাথকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন । শৈশবে দরিরামপুর স্কুলে একটি বিচিত্রানুষ্ঠান হয়, সে অনুষ্ঠানে নজরুল রবীন্দ্রনাথের ‘পুরাতনভৃত্য’, ও ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতা দুটো আবৃত্তি করে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধকরে দেন। নজরুল তাঁর ‘বড়র পিরীতি’ ‘বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘ছেলেবেলা থেকে তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধূপ-ফুল-চন্দন দিয়েসকাল-সন্ধ্যা বন্দনা করেছি।’ এ উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় নজরুল রবীন্দ্রনাথকেকতোটা শ্রদ্ধা করতেন। পরবর্তীকালে করাচিতে সৈনিক জীবনেও রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি নজরুলের কাছে থাকত। সৈনিক জীবন শেষে কলকাতায় এসেও প্রথমে নজরুল গাইতেন রবীন্দ্রনাথের গান। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর আগে ও পরে নজরুল কয়েকটি কবিতা ও গান রচনা করেছেন। সেগুলো অত্যন্ত সুন্দর।

১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের পরে নজরুলের সাংবাদিক সাহিত্যিক জীবনের শুরুতে কলকাতার সাহিত্যিকদের দু’টি বিখ্যাত আড্ডা ছিল। একটি ‘ভারতী’রকার্যালয়ে তথা সুকিয়া স্ট্রীটে (বর্তমান কৈলাস বসু স্ট্রীট) ছিল ‘‘ভারতী’-রআড্ডা’’, অন্যটি ‘গজেন্দ্র চন্দ্র ঘোষের ৩৮ নং কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটের বাড়ির ‘সাহিত্যের আসর’, যাকে বলা হত ‘‘গজেন-দা’র আড্ডা’’ সেখানে অতুলপ্রসাদ সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ অনেকেই যেতেন। সেখানেইএকদিন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তে-র সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়। প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, (কবি নজরুল পৃষ্ঠা-১২৬) নজরুল সেই আড্ডায় এসে রবীন্দ্র-সংগীত শোনাতেন।

নজরুল ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পরিচিত হওয়ার কাহিনী পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় বর্ণনা করেছেন তাঁর ‘চলমান জীবন’ দ্বিতীয় পর্বগ্রন্থে। সেখানে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত নজরুলকে জড়িয়ে ধরে বলেন,

তুমি ভাই, নতুন ঢেউ এনেছ। আমরা তো নগন্য, গুরুদেবকে পর্যন্ত বিস্মিত করেছ তুমি।’

বিহবল হয়ে প্রশ্ন করে কাজী,

গুরুদেব আমার কোনো লেখা পড়েছেন নাকি?সত্যি বলতেন কি?

বললেন সত্যেন দা,

গুরুদেবই আমাকে একদিন নিজ থেকে প্রশ্ন করলেন, কাজী নজরুল ইসলামের কোনো কবিতা পড়েছি কি না।’ তাঁর মতে, ‘ভাবের সংস্কৃতি সমন্বয়ের সাধনার এই এক নতুন অবদান আনছ তুমি।

আনন্দের আতিশয্যে মুখের কথা শেষ করতে পারে না নজরুল,

গুরুদেব বলেছেন!

 

গুরু-শিষ্যের প্রথম দেখা হওয়ার ইতিহাসঃ

পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় বর্ণিত সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কথিত রবীন্দ্রনাথেরউক্তিতে বলতে হয়, ‘রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বুঝতে পেরেছিলেন, নজরুলের লেখা-ভাবেরসংস্কৃতি সমন্বয়ের সাধনায় এ এক নতুন অবদান। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঠিক কততারিখে নজরুলের দেখা হয়, তা জানা যায় নি।‘ তবে প্রভাতকুমারের ‘রবীন্দ্রজীবনী’ পৃষ্ঠা-৮৬ থেকে জানা যায়, ‘১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১২ মে থেকে১৯২১ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় চৌদ্দ মাস রবীন্দ্রনাথ ইউরোপে ছিলেন। ইউরোপ থেকে ফিরে পুনরায় ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুলাই পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকা সফর করেন। ১৬ জুলাই বোম্বাই থেকে বর্ধমান হয়ে বোলপুর আসেন। ২০ জুলাই ১৯২১ কলকাতা আসেন আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করবার জন্য। মাঝখানে একবার শান্তিনিকেতনে ফিরে গেলেও সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখপর্যন্ত তিনি কলকাতায় ছিলেন। ওই সময়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের প্রথম দেখা হয়েছিলো সম্ভবত।

আবদুল আজিজ আল্-আমানের লেখা বইয়ে (নজরুল-পরিক্রমা’, ২২-২৪ পৃষ্ঠা) পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে গিয়ে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাতের কথা জানা যায়। নজরুল করাচি থেকে কলকাতায় ফিরে আসার পর ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হয়। তাতে তিনি সুধীসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হলেও রবীন্দ্র-দর্শন তখন পর্যন্ত হয়নি। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করবার জন্য নজরুল তখন আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। অবশেষে সুযোগ মিলেছিল। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমেই দুই কবির মধ্যে প্রথম পরিচয় হয়। একদিন পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় গেলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে। প্রয়োজনীয় কথার পর রবীন্দ্রনাথের সম্মুখে ‘মোসলেম ভারত’ দেখে পত্রিকাটি সম্পর্কে কথা তুললেন পবিত্র বাবু। সে সময় ‘‘মোসলেম ভারত’ মানেই নজরুল। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে নজরুলের কথা জিজ্ঞেস করলেন এবং বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে তাঁকে নিয়ে আসার আহবান জানালেন।শেষে নির্দিষ্ট দিনে পবিত্র বাবু নজরুলকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সামনে হাজির হলেন। সেদিন তাঁদের মাঝে বিশেষ কোনো কথা হয়নি।

তাছাড়া, সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের ‘আমাদের নজরুল’ প্রবন্ধের বর্ণনা থেকে মনে হয় কলকাতার জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের প্রথম সাক্ষাৎ হয়।

‘জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসার সময় তেমন বড়লোককেও সমীহ করে যেতে দেখেছি, অতি বাকপটুকেও ঢোঁক গিলে কথা বলতে শুনেছি কিন্তু নজরুলের প্রথম ঠাকুর বাড়িতে আবির্ভাব সে যেন ঝড়ের মত। অনেকে বলত, তোর এসব দাপাদাপি চলবে না জোড়াসাঁকোর বাড়িতে, সাহসই হবে না তোর এমনিভাবে কথা কইতে। নজরুল প্রমাণ করে দিল যে, সে তা পারে। তাই একদিন সকাল বেলা ‘‘দেগরুর গা ধুইয়ে,-এই রব তুলতে সে কবির ঘরে গিয়ে উঠল কিন্তু তাকে জানতেন বলে কবি অসন্তুষ্ট হলেন না।’’

67021_452839741444392_168344715_n

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের ইতঃপূর্বে সাক্ষাৎ হয়নি। ছোটবেলা থেকে তিনি যেভাবে রবীন্দ্রনাথকে ভক্তি ও শ্রদ্ধা করতেন, তাতে সাবিত্রী প্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় যেভাবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাতের কথা বলেছেন-তাও অদ্ভুত বলে মনে হয়। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের কথা লিখতে গিয়ে তিনি বাড়িয়ে লিখছেন কি না সে প্রশ্ন এসে যায়। কারণ যাঁর সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি, তাঁর সঙ্গে নজরুল দেখা করতে গেলেও ওভাবে রব তুলতে তুলতে গেছেন বলে মনে হয় না।

জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্র-নজরুলের সাক্ষাতের ব্যাপারে একটি তথ্য পাওয়া গেলেও প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের কোন সময়ে, কোন স্থানে সাক্ষাৎ ঘটেছিল তার কোনো তথ্যভিত্তিক প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে নজরুলের সৃষ্টিক্ষমতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ জানতেন। তাঁর চিন্তাধারা ও কর্মজগৎ সম্পর্কেও তিনি খবর রাখতেন। শান্তিনিকেতনে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনে ছিলেন সুধাকান্ত রায় চৌধুরী। তিনি রবীন্দ্রনাথের একান্তসচিব ছিলেন। নিজেও কবিতা লিখতেন এবং নজরুলের কবিতা পত্র-পত্রিকা থেকে রবীন্দ্রনাথকে পড়ে শোনাতেন।

প্রভাতকুমারের ‘রবীন্দ্রজীবনী’ তৃতীয় খন্ড পৃষ্ঠা-১২০ থেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাতের ব্যাপারে একটি তথ্য পাওয়া যায়। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের শরৎকালে পূজোর ছুটিতে নজরুলকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে গিয়েছিলেন ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্। সেবার দুর্গাপূজা ছিল ৮ই অক্টোবর। কলকাতায় গান্ধীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শান্তিনিকেতনে ফিরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ৮সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। তিনি ছিলেন শান্তিনিকেতনের প্রান্তর মধ্যস্থিত পর্ণকুটিরে। অনেকেই তখন তাঁর সাথে দেখাকরতে আসেন। তরুণ কবি নজরুলও তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন।

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাৎকারের স্মৃতিচারণ করেছেন রবীন্দ্রনাথের তখনকার একান্ত সচিব কবি সুধাকান্ত রায়চৌধুরী’র ভাই নিশিকান্ত রায়চৌধুরী ‘আমার কৈশোর স্মৃতিতে নজরুল’ প্রবন্ধে। নিশিকান্ত রায় তখন শান্তিনিকেতনের বালক-ছাত্র। পূজোর ছুটি শেষ হয়ে গেছে। শান্তিনিকেতনের আশ্রমে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষয়ত্রীরা সবাই এসে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথও বাইরের থেকে ঘুরেএসেছেন। নিশিকান্ত সবে শিশুবিভাগ থেকে নুতন গুরুপল্লীতে দাদা সুধাকান্তের বাড়িতে এসেছেন। এমন সময় নিশিকান্তের দাদা সুধাকান্ত তাঁর বন্ধু-বান্ধবদের বলছিলেন যে, হাবিলদার কবি কাজী নজরুল ইসলাম সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেদেখা করতে আসবেন। নিশিকান্তের ভাই সুধাকান্তের ওপরই ভার পড়েছিল স্টেশন থেকে নজরুলকে নিয়ে আসবার। কলাভবনের দোতলায় সান্ধ্য আসরে সুধাকান্তের সঙ্গে সচকিত মন নিয়ে নিশিকান্তও সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। সবার মাঝখানে রবীন্দ্রনাথ বসেছিলেন।

শিক্ষক-শিক্ষয়েত্রীবৃন্দ সবাই উপস্থিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পাশে বসা দু’জন আগন্তুকের একজনের দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করে সুধাকান্ত নিশিকান্তকে বললেন, ‘ঐ দেখ কবি নজরুল ইসলাম।’ সুধাকান্ত নিশিকান্তকে নজরুলকে দেখিয়ে দিলেন। এবং পরে তিনি নজরুলের পাশে গিয়ে বসলেন। নজরুলের পাশেই ফেজ-পরা কাঁচা-পাকা দাড়ি নিয়ে একজন বসে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মাঝে মাঝে আলাপ করছিলেন। নজরুলও সেই আলাপে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ডক্টরমুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্। শহীদুল্লাহ সাহেব তখন রবীন্দ্রনাথকে বলছিলেন, ‘ট্রেনে আসতে আসতে কাজী সাহেব আপনার ‘গীতাঞ্জলি’র সবক’টা গান আমাকে গেয়ে গেয়ে শুনিয়েছেন।’ রবীন্দ্রনাথ তখন বলেছিলেন, ‘তাই নাকি? অদ্ভুত স্মৃতিশক্তিতো! গীতাঞ্জলির সব গান তো আমার মনেই থাকে না।’ নজরুল তখন রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে একটি গান ও একটি কবিতার আবৃত্তি শুনতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথও নজরুলের গান ও আবৃত্তি শোনার প্রতীক্ষায় ছিলেন। তাই নজরুলকেই তাড়াতাড়ি গান গাইতে বললেন, ‘সেকি ! আমি যে তোমার কবিতা ও গানের অপেক্ষায় আছি। তাড়াতাড়ি শুরু করে দাও।’

নজরুল তখন একটা অন্তরস্পর্শী ভাব-ব্যঞ্জনা নিয়ে ‘অগ্নিবীনা’র ‘আগমনী’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথকে আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন। আবৃত্তির পরে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে গান গাওয়ার জন্য আহবান করলেন। নজরুল পুত্রবিয়োগ-ব্যথাবিধূর কণ্ঠে বিষাদঘন করুণ সুরে গেয়ে উঠলেন-

কোন্ সুদূরের চেনা বাঁশির ডাক শুনেছিস্ ওরে চখা
ওরে আমার পলাতকা!’

গানটি শুনে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘বাহ্ বেশ! এটি কবে লিখলে?’ তখন শহীদুল্লাহ্ সাহেব রবীন্দ্রনাথকে জানালেন, ‘সম্প্রতি কাজী সাহেব তাঁর একটি শিশুপুত্রকে হারিয়ে এই শোক-গাথাটি রচনা করে সান্ত্বনা খুঁজে ফিরছেন।’ এ কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ কিছুক্ষণ নীরব থেকে সমবেদনা প্রকাশ করলেন। নজরুল তখন রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠের একটি কবিতার আবৃত্তি ও একটি গান শুনতে চাইলে রবীন্দ্রনাথ সুললিত ও রমণীয় কণ্ঠে সম্প্রতি লেখা একটি গান কবিতায় আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন-

মাধবী হঠাৎ কোথা হতে
এল ফাগুন দিনের স্রোতে
এসে হেসেই বলে, ‘যাই যাই যাই।’

রবীন্দ্রনাথ যতক্ষণ আবৃত্তি করছিলেন, ততক্ষণই নজরুলের কালো বাবরি চুলের মাথাটি তালে তালে দুলছিল্ আবৃত্তি শেষ করেই রবীন্দ্রনাথ উঠে দাঁড়ালেন।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাতে অনেক কথা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বলেছিলেন- শান্তিনিকেতনে থেকে যেতে। সেখানে তিনি ছেলে-মেয়েদের ড্রিল শেখাবেন আর দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গান শিখবেন। নজরুল এ প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। নজরুলের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন তিনি কোন পথের পথিক। নজরুলও সে প্রস্তাব গ্রহণ না করে ভাল করেছেন। তাঁর জীবনে তা প্রমাণিত হয়েছে।

উপরে আমরা জোড়াসাঁকো ও শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের দুটো সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেছি। জোড়াসাঁকোয় সাক্ষাৎকার যদি জুলাই-সেপ্টেম্বর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক সময়ে হয় আর শান্তিনিকেতনের সাক্ষাৎকার তো অক্টোবরে হয়েছে বলে প্রভাতকুমার উল্লেখই করেছেন, তাহলে উভয় সাক্ষাৎকারের ব্যবধানে বেশি দিনের নয়। এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। আমাদের বিভিন্ন লেখকদের ওপর নির্ভর করতেই হচ্ছে। তবে আমাদের কাছে মনে হয়, যেহেতু দুই সাক্ষাৎকারের ব্যবধান বেশি নয়, তাই যে কোনো এক জায়গায়ই রবীনদ্রনাথের সঙ্গে প্রথমে দেখা হয়েছিল।

সেতুবন্ধনে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাঃ

চার চারটি পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ধূমকেতু পত্রিকাটি। ১৯২২ সালে ধুমকেতু নামে একটা পত্রিকায় ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে কাজী নজরুল লিখেছিলেন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। এই অপরাধে ১৩ মাস জেলে থাকতে হয়েছিল। বিচারাধীন বন্দি হিসাবে নজরুল ছিলেন প্রেসিডেন্সি জেলে, বিচার শেষে ১৭ জানুয়ারি নজরুলকে স্হানান্তর করা হয় আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে। পরাধীন জাতির সাম্রাজ্যবাদীদের শোষণের চিএ তুলে ধরে বন্দী নজরুল সমগ্র দেশবাসীর শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন।

১৯২৩ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য নজরুলকে উৎসর্গ করে দেশবাসীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। রবীন্দ্রনাথ পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ডেকে বলেন,

জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল। তাই আমার সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি ওকেই উৎসর্গ করেছি। সেখানা নিজের হাতে তাকে দিতে পারলে আমি খুশি হতাম, কিন্তু আমি যখন নিজে গিয়ে দিয়ে আসতে পারছি না, ভেবে দেখলাম, তোমার হাত দিয়ে পাঠানোই সবচেয়ে ভালো, আমার হয়েই তুমি বইখানা ওকে দিও।’

এই বইটি নজরুলকে উৎসর্গ করায় রবীন্দ্রনাথের অনুরাগী বেশ কয়েকজন কবি-সাহিত্যিক খুশি হতে পারেননি। তাই রবীন্দ্রনাথ তাদের উদ্দেশ্যে বলেন,

নজরুলকে আমি ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গ পত্রে তাকে ‘কবি’ বলে অভিহিত করেছি। জানি তোমাদের মধ্যে কেউ এটা অনুমোদন করতে পারনি। আমার বিশ্বাস, তোমরা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছ। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র।’

রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেন,

নজরুলের কাব্যে অসির ঝনঝনানি আছে। আমি যদি তরুণ হতাম তা হলে আমার কলমেও ওই একই ঝংকার বাজতো।’

পবিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে বইটি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ আরও বলেছিলেন,

নজরুলকে বলো, আমি নিজের হাতে তাকে দিতে পারলাম না বলে সে যেন দুঃখ না করে। আমি তাকে সমগ্র অন্তর দিয়ে অকুণ্ঠ আশীর্বাদ জানাচ্ছি। আর বলো, কবিতা লেখা যেন কোন কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জোগাবার কবিও তো চাই।’

 

নজরুল বইটি পেয়েই বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। এ প্রসঙ্গে নজরুল লিখেছেন,

এ সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক আমায় উৎসর্গ করেন। তাঁর এই আশীর্বাদ-মালা পেয়ে আমি জেলের সর্বজ্বালা, যন্ত্রণা ক্লেশ ভুলে যাই।

রবীন্দ্রনাথের ‘বসন্ত’ উৎসর্গের পর, নজরুল আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে বসে রচনা করেন -’আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ অর্থাৎ ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা। নজরুল তার ‘সঞ্চিতা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে উৎসর্গ করেন।

১৯২৩ সালে ১৪ এপ্রিল নজরুলকে হুগলী জেলে স্হানান্তর করা হয়। হুগলী জেলের সুপার মি. আর্সটান রাজবন্দীদের সাথে অত্যন্ত দূর্ব্যবহার ও অত্যাচার করতেন, রাজবন্দীদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে নজরুল জেলে ৪০ দিন অনশন করেছিলেন।

১৯২৩ সালের ১৭ মে শরৎচন্দ্র বাজে-শিবপুর হাবড়া থেকে লীলারাণী গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে লিখেছেনঃ

‘হুগলী জেলে আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম উপুষ করিয়া মরমর হইয়াছে। বেলা ১টার গাড়ীতে যাইতেছি, দেখি যদি দেখা করিতে দেয় ও দিলে আমার আনুরোধে যদি সে আবার খাইতে রাজি হয়। না হইলে তার কোন আশা দেখি না। একজন সত্যিকার কবি। রবী বাবু ছাড়া আর বোধ হয় এমন কেহ আর এত বড় কবি নাই”। কিন্ত শরৎচন্দ্র দেখা করেত পারেন নি।

জেলের ভিতরে অনশনরত নজরুলের উপর অত্যাচার বেড়ে যায়। ডান্ডাবেড়ী, হ্যান্ডকাপ, সেল কয়েদ, ফোর্সড ফিডিং-এর চেষ্টা চলে, ক্রমশ দূর্বল হয়ে পড়েন নজরুল। মুমূর্ষ কবিকে বাঁচানোর জন্য শিলিং-এ চিঠি লেখা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, তিনি যেন নজরুলকে অনশন ভঙ্গ করতে অনুরোধ জানিয়ে পত্র লিখেন।

রবীন্দ্রনাথ পত্রের উত্তরে বিদ্রোহী-বিপ্লবী সৈনিক নজরুলের দৃঢ়তাকে সমর্থন জানিয়ে লিখেনঃ

আদর্শবাদীকে আদর্শ ত্যাগ করতে বলা তাকে হত্যা করারই সামিল। অনশনে যদি কাজীর মূত্যুঘটে তা হলেও তার অন্তরে সত্য আদর্শ চিরদিন মহিমাময় হয়ে থাকবে।”

শেষ পর্যন্ত, স্নেহভাজন নজরুলের অনশনে বিচলিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে টেলিগ্রাম করেনঃ

Give up hunger strike, our literature claims you

অত্যন্ত বিস্ময়ের বিষয়, জেল কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্রনাথের টেলিগ্রাম নজরুলকে না দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে লিখে পাঠালেন- “Addressee not found.” রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম ফেরত পেয়েই বুঝলেন এটি সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত ও হীনম্মন্যতা। অনশনের চল্লিশ দিনে বিরজাসুন্দরী দেবীর হাতের লেবুর রস পান করে নজরুল অনশন ভঙ্গ করেন।

১৯২২ থেকে১৯২৬ সাল পর্যন্ত কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথ নিয়মিত লেখা পাঠিয়েছিলেন। ধূমকেতুতে নিয়মিত লেখা পাঠানো নজরুলে সাহসীকতার পুরষ্কারই ছিলো। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় একটি লেখা পাঠিয়েছিলেন যেটি উল্লেখ না করলেই নয়।

কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু,
‘আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ্‌ অগ্নিসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয়-কেতন।
অলক্ষণের তিলক-রেখা
রাতের ভালে হোক-না লেখা–
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে
আছে যারা অর্ধচেতন।’
২৪ শে শ্রাবণ, ১৩২৯
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

সম্পর্ক যখন কাব্য ও সাহিত্যের ভাজে ভাজেঃ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘১৪০০ সাল’ কবিতা লেখেন ১৩০২ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে। কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষের পরের পাঠককে বসন্তের পুষ্পাঞ্জলি পাঠিয়েছেন।

‘আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতুহলভরে, আজি হতে শতবর্ষ পরে!’

কাজী নজরুল ইসলাম ১৩৩৪ সালের আষাঢ় মাসে তাঁর ‘১৪০০ সাল’ কবিতায় এর উত্তর লেখেন। তাতে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভক্তি।

‘আজি হ’তে শতবর্ষ আগে
কে কবি, স্মরণ তুমি করেছিলে আমাদেরে
শত অনুরাগে,আজি হ’তে শতবর্ষ আগে!’

রবীন্দ্রনাথের প্রতি নজরুলের মনোভাবের অকৃত্রিম পরিচয় ফুটে উঠেছে কবিতাটিতে।

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল এর মধ্যে সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা ও ভালবাসার তা নিয়ে এই লেখা। নজরুলের “তীর্থ পথিক” কবিতা থেকে অংশ বিশেষ। যা রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন নজরুল। কবিতাটির অংশ বিশেষঃ

‘তুমি স্রষ্টার শ্রেষ্ট সৃষ্টি বিশ্বের বিস্ময়,-
তব গুণ-গানে ভাষা-সুর যেন সব হয়ে যায় লয়।
তুমি স্মরিয়াছ ভক্তের তব, এই গৌরবখানি
রাখিব কোথায় ভেবে নাহি পাই, আনন্দে মূক বাণী।
কাব্যলোকের বাণী-বিতানের আমি কেহ নহি আর,
বিদায়ের পথে তুমি দিলে তবু কেন এ আশিস-হার?
প্রার্থনা মোর, যদি আরবার জন্মি এ ধরণীতে-
আসি যেন গাহন করিতে তোমার কাব্য-গীতে!!’

১৯২৩ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য নজরুলকে উৎসর্গ করে দেশবাসীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। রবীন্দ্রনাথের ‘বসন্ত’ উৎসর্গের পর, নজরুল আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে বসে রচনা করেন -’আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ অর্থাৎ ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা। নজরুল তার ‘সঞ্চিতা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে উৎসর্গ করেন। নজরুলের অগ্নি-বীণা, দোলন-চাঁপা, ছায়ানট, সর্বহারা, ফণি-মনসা, সিন্ধু-হিন্দোল, চিত্তনামা প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের বাছাই করা কবিতা নিয়ে ১৯২৮ সালে ‘সঞ্চিতা’ প্রকাশ হয়। নজরুল ‘সঞ্চিতা’ উৎসর্গ পত্রে লিখেছেনঃ

‘বিশ্বকবি সম্রাট শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রী শ্রীচরণারবিন্দেষু।।’

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নজরুল কয়েকটি কবিতা লিখেছেন। এসব কবিতায় রবীন্দ্রনাথের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়। নজরুলের ‘অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলী’ ও ‘কৈশোর রবি’ কবিতা দুটি রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে লেখা।

‘অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলী’ কবিতাটির রবীন্দ্রনাথের আশিতম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে রচিত-

‘চরণারবিন্দে লহ অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলী,
হে রবীন্দ্র, তব দীন ভক্ত এ কবির।
অশীতি-বার্ষিকী তব জনম-উৎসবে
আসিয়াছি নিবেদিতে নীরব প্রণাম।
হে কবি-সম্রাট, ওগো সৃষ্টির বিস্ময়,
হয়তো হহনি আজো করুণা-বঞ্চিত!
সঞ্চিত যে আছে আজো সৃষ্টির দেউলে
তব স্নেহ করুণা তোমার, মহাকবি!….
(নতুন চাঁদ, অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলী)

‘কিশোর রবি’ রবীন্দ্র প্রশস্তিমূলক কবিতা –

হে চির-কিশোর রবীন্দ্র, কোন রসলোক হতে
আনন্দ-বেণু হাতে হাতে লয়ে এলে খেলিতে ধুলির পথে?
কোন সে রাখাল রাজার লক্ষ ধেনু তুমি চুরি করে
বিলাইয়া দিলে রস-তৃষা তুরা পৃথিবীর ঘরে ঘরে ।
কত যে কথায় কাহিনীতে গানে সুরে কবিতায় তব
সে আনন্দ-গোলেকের ধেণু রূপ নিল অভিনব।
ভুলাইলে জরা, ভুলালে মৃত্যু, অসুন্দরের ভয়
শিখাইলে পরম সুন্দর চির-কিশোর সে প্রেমময়।
নিত্য কিশোর আত্মার তুমি অন্ধ তুমি বিবর হতে
হে অভয়-দাতা টানিয়া আনিলে দিব্য আলোর পথে।
(নতুন চাঁদ, কিশোর রবি)

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও জীবন নজরুল উপলদ্ধি করেছেন প্রসারতায়। তাইতো রবীন্দ্রনাথের জন্মতিথি নিয়ে তিনি লিখলেন, ‘রবির জন্মতিথি’-

‘নিরক্ষর ও নিস্তেজ বাংলায়
অক্ষর-জ্ঞান যদি সকলেই পায়,
অ-ক্ষর অ-ব্যয় রবি সেই দিন
সহস্র করে বাজাবেন তাঁর বীণ।
সেদিন নিত্য রবির পুণ্য তিথি
হইবে।মানুষ দিকে তাঁকে প্রেম-প্রীতি।’
(শেষ সওগাত, রবির জন্মতিথি)

রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক সৌহার্দ্যের; রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে যে কি স্নেহ করতেন তার একটি উদাহরণ রবীন্দ্রনাথের “গোরা” উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ছায়াছবিতে নজরুলকে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে মনোনীত করেন নরেশচন্দ্র মিএ। তখন সুরকার হিসাবে নজরুলের জনপ্রিয়তা সবার উপরে। চলচ্চিত্রটি যখন মুক্তি পেতে যাচ্ছে, তখন বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড থেকে আপত্তি ওঠে যে বোর্ডের অনুমতি না নিয়ে ছবিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত (৭টি রবীন্দ্রসঙ্গীত) ব্যবহার করা হয়েছে এবং সুরও যথাযথ নয়; অতএব ছবিটি মুক্তি পেতে পারে না। প্রযোজকের মাথায় হাত। নজরুল কালক্ষেপন না করে ফিল্মের পিন্ট ও প্রজেক্টার নিয়ে ট্যাক্সি করে শান্তি নিকেতনে রবীন্দ্রনাথের কাছে চলে গেলেন। সবশুনে রবীন্দ্রনাথ বললেন ‘কি কান্ড বলতো? তুমি শিখিয়েছ আমার গান, আর ওরা কোন আক্কেলে তার দোষ ধরে? তোমার চেয়েও আমার গান কী তারা বেশি বুঝবে? আমার গানের মর্যাদা কী ওরা বেশী দিতে পারবে’? একথা বলে আগের থেকে লিখে রাখা অনুমতিপএ নিয়ে তাতে সই ও তারিখ দিয়ে দিলেন।

নজরুল রবীন্দ্র-স্নেহ থেকে কোনদিন বঞ্চিত হননি। এটি তার একটি বড় প্রমাণ।

১৯২১-এর ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহী কবিতা রচনা করে নজরুল সরাসরি চলে যান জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। উচ্চকণ্ঠে ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’ গাইতে গাইতে নজরুল ঠাকুর বাড়িতে প্রবেশ করে ডাকলেন গুরুদেব আমি এসেছি। উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতে থাকেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি।

তিনি রবীন্দ্রনাথকে বলেন,

‘গুরুদেব আমি আপনাকে খুন করবো। ‘ রবীন্দ্রনাথ ‘বিদ্রোহী’ কবিতা শুনে কবিতার প্রশংসা করেন এবং নজরুলকে জড়িয়ে ধরে বলেন ‘সত্যিই তুই আমাকে খুন করেছিস’।

১৯২২-এর ২৫ জুন কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঐ স্মরণসভায় নজরুলকে ডেকে পাশে বসিয়েছিলেন। নজরুল আবৃত্তি করেছিলেন ‘সত্যকবি’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথ এভাবে নজরুলকে স্নেহ বন্ধনে আবদ্ধ করায় তখনও কবি-সাহিত্যিকরা ঈর্ষান্বিত হয়েছিলেন।

রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক পরে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে কিন্তু দুই কবির শ্রদ্ধা ও স্নেহের মৌলিক সম্পর্ক কখনও বিচলিত হয়নি।

বস্তুত, শনিবারের চিঠি’র সজনীকান্ত দাশ এবং মোহিতলাল মজুমদারের ঈর্ষান্বিত প্রয়াসে আধুনিক সাহিত্য নিয়ে বির্তক আর বঙ্গসাহিত্যে খুনের মামলা নিয়ে ভূল বুঝাবুঝি ছাড়া ১৯২০ থেকে ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পূর্ব কাল পর্যন্ত রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক ছিল স্নেহ ও শ্রদ্ধার।

পরিবারের সাথে বিদ্রোহী কবি

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের দার্জিলিংয়ে দেখা হয়। এ সময় নজরুল প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি তো ইতালি গেছেন সেখানে কবি দ্যনুনজিও’র সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না? রবীন্দ্রনাথ হেসে বলেছিলেন দেখা হবে কি করে তিনি যে তোমার চেয়েও পাগল।

নজরুল ১৯৩৫-এর জুন মাসে ‘নাগরিক’ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা চেয়ে চিঠি পাঠান। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ৭৫ বছর। বেশ অসুস্থ। এর উত্তরে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৬-এর ১ সেপ্টেম্বর লিখেছিলেন,

‘তুমি তরুণ কবি, এই প্রাচীন কবি তোমার কাছে আর কিছু না হোক করুণা দাবি করতে পারে। শুনেছি বর্ধমান অঞ্চলে তোমার জন্ম। আমরা থাকি পাশের জিলায় (বীরভুমের বোলপুরে)। কখনো যদি ঐ পেরিয়ে আমাদের এদিকে আসতে পারো খুশি হব।’

উক্ত চিঠির জবাবে নজরুল ‘নাগরিক’ পত্রিকায় লেখেন, কবিতাঃ

‘হে কবি, হে ঋষি অন্তর্যামী আমারে করিও ক্ষমা।
পর্বত-সম শত দোষত্রুটিও চরণে হল জমা।
তুমি শ্রষ্টার শ্রেষ্ঠ বিস্ময়-
তব গুণে-গানে ভাষা-সুর যেন সব হয়ে যায় লয়।
প্রার্থণা মোর, যদি আরবার জন্মি এ ধরণীতে,
আসি যেন শুধু গাহন করিতে তোমার কাব্য-গীতে। ‘

রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা ও নাটকে কোথাও কোথাও বৈপ্লবিক চেতনার একটি রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। তাঁর রথের রশি, ওরা কাজ করে, বাঁধ ভেঙে দাও’ ‘তাসের দেশ’ বা ‘রক্ত করবী’তে বিপ্লবীর বাণী তো আছেই। নজরুল এ থেকেও কিছুটা হলেও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এমন তো ভাবাই যায়।

মানুষ, মানবতা নিয়ে দুজনের ভাবনায় কোনো প্রভেদ নেই। নেই ধর্মপরিচয়ের বাইরে মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখার।

রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’। বলেন, মানবিক ধর্মের কথা যা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের উর্ধ্বে। একইভাবে নজরুল বলেন, ‘আমি আজও মানুষের প্রতি আস্থা হারাইনি। মানুষকে আমি শ্রদ্ধা করি, ভালবাসি। শ্রষ্টাকে আমি দেখিনি কিন্তু মানুষকে আমি দেখেছি। এই ধূলিমাখা, অসহায়, দুঃখী মানুষই একদিন বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে।’

নজরুল লিখেন, ‘গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’ সেই চিরায়ত উপলব্ধি-‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’

সাম্য, মৈত্রী, মানবপ্রেম তথা মানবিকতার প্রকাশে যেমন রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে বাস্তবে অগ্রনায়ক, রাজনৈতিক বিষয়-সংলগ্ন হয়েও তেমনি নজরুল। রবীন্দ্রনাথ যুদ্ধ বিরোধী, শান্তিবাদী, বিশ্বনাগরিক এবং মানবপ্রেমী। তার বহু রচনায় এমন প্রমাণ মেলে। নজরুলের মানবিক চেতনা সাম্যবাদী চেতনার সঙ্গে এক হয়েছে তৃণমূল স্তরের সাধারণ মানুষের কল্যাণে।

কাজী নজরুল ইসলাম গুরু বলে মান্য করতেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। নজরুল নিজের কাব্য চর্চা থেকে অন্যত্র মনোনিবেশ করায় রবীন্দ্রনাথ কাজী নজরুলকে বলেছিলেন, ‘তুমি নাকি এখন তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাছো?’ নজরুল উত্তরে লিখেছিলেন, ‘গুরু কন আমি নাকি তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাছি…।’

১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট বাংলা ১৩৪৮ সালের ২২শে শ্রাবণ বেলা বারোটা এগারো মিনিটে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ ঘটলো। কবিগুরুর আত্মা মর্ত থেকে উর্ধ্বে উঠে গেল-দেশ শূন্য, কাল শূন্য-মহাশূন্য পরে। বৈশাখের শঙ্খ স্তব্ধ হয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথের মূত্যু সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে নজরুল লেখনী হাতে তুলে নিলেন। রচনা করেন শোক কবিতা ‘রবি হারা’-

‘দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্ত পথের কোলে
শ্রাবণ মেঘ ছুটে’ এল দলে দলে
উদাস গগন-তলে।
বিশ্বের রবি ভারতের কবি,
শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি।
তুমি চলে যাবে বলে।…
বিদায়ের বেলা চুম্বন লয়ে যায় তব শ্রীচরণে,
যে লোকেই থাক হতভাগ্য এ জাতিরে রাখিও মনে।
(রবি হারা, সওগাত, ভাদ্র ১৩৪৮)

কলকাতা বেতার কেন্দ্রে এই কবিতাটি নজরুল আবৃত্তি করেছিলেন। রবীন্দ্র-প্রয়াণ নজরুলের মানসিক অবস্থা এ কবিতার মাধ্যমে বুঝা যায়। রবীন্দ্রনাথের মূত্যুর পর নজরুল ‘সালাম অস্ত-রবি’ নামে আরও একটি কবিতা লিখেছিলেন। এই কবিতাটি ও কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। এছাড়া লেখেম ঘুমাইতে দাও শান্ত রবীরে।’ 

‘শত রূপে রঙে লীলা-নিকেতন আল্লার দুনিয়াকে
রাঙায় যে জন, আল্লার কৃপা সদা তাঁরে ঘিরে থাকে।
তুমি যেন সেই খোদার রহম এসেছিলে রূপ ধরে,
আশেরি ছায়া দেখাইয়াছিলে রূপের আর্শি ভরে।
কালাম ঝরেছে তোমার কলমে, সালাম লইয়া যাও
উর্ধ্বে থাকি’ এ পাষাণ জাতিরে রসে গলাইয়া দাও!
(সালাম অস্ত-রবি, মাসিক মোহাম্মদী, ভাদ্র ১৩৪৮)

রবীন্দ্রনাথের মূত্যুতে শোকাহত দেশবাসীর উদ্দেশ্যে নজরুল গানও রচনা করেছিলেন:

‘ঘুমাইতে দাও, শান্ত রবিরে জাগায়োনা।
সারা জীবন যে আলো দিল ডেকে তার ঘুম ভাঙ্গায়োনা।’

গানটি অত্যন্ত বেদনাময় আবহের। নজরুল এই গানটি সুনীল ঘোষ, ইলা ঘোষ প্রমুখ শিল্পীকে দিযে রেকর্ড করেছিলেন। গানটি কলকাতা বেতারেও প্রচারিত হয়েছিল। সেদিন নজরুল লিখলেন –

বিশ্বের কবি,ভারতের রবি,শ্যামল বাংলার হৃদয়ের ছবি,তুমি চলে গেলে, তোমাকে নিয়ে কত গর্ব করেছি, ভগবান তোমাকে পাঠিয়েছিল আবার ফিরিয়ে নিল কেন? বিদায়ের সময় তোমার পায়ে আমার চুম্বন নিয়ে যাও। কথা দাও যেখানেই থাক এই হতভাগ্য বাঙ্গালী জাতিকে মনে রাখিও।’

নজরুল রবীন্দ্রনাথকে কতটাশ্রদ্ধা করতেন তার প্রমাণ পাই। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক বছর পরেই নজরুল চিরতরে অসুস্থ এবং ক্রমান্বয়ে সম্বিতহারা ও নির্বাক হয়ে যান। বাংলার দুই মহান কবির কণ্ঠ প্রায় একই সময়ে নীরব হয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে স্বপরিবারে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাংলাদেশে তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করেন। ধানমন্ডিতে কবির জন্য একটি বাড়ি প্রদান করেন। প্রেম, দ্রোহ, সাম্য ও জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের আগষ্টে (১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র) ঢাকার পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিনে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ৭৭ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।’ কবির ইচ্ছানুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

অসুস্থ জাতীয় কবির শয্যাপাশে বঙ্গবন্ধু

রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বাঙালি জাতি ও বাংলার দুই মহান ব্যক্তি। তাঁদের মহত্ব বাঙালির গর্বের ধন। একজন আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা, অপরজন আমাদের জাতীয় কবি।

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল জন্মগতভাবে ভারতবর্ষের অহিংসার দর্শনভূমিতে গড়ে উঠেছেন। এখানে সভ্যতার ক্রমবিকাশে বাঙালী সংস্কৃতি হয়েছে সুসংহত। তাই তাদের জীবন অহিংসার বন্ধনে আবদ্ধ এবং আজও দৃষ্টান্ত।

আজকাল কিছু নব্য এবং উঠতি মূর্খ কবি বা সাহিত্যিককে বলতে শুনি কাজী নজরুলকে হিংসা করতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অথবা আরো নিকৃষ্টভাবে এই মহান দুই কবির সম্পর্ককে হেয় করা হয়। সাধারণের মাঝে হিংসার বীজ বপন করাই এদের মূল লক্ষ্য। তাদের জ্ঞানের পরিধী এবং পড়াশুনা কতটুকু কিংবা তাদের মানসিকতা কতখানি নিচু তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এদের প্রতি তীব্র ঘৃণা জানানো ছাড়া আর কিছুই বলার নেই। আলোচ্য প্রবন্ধটি তথ্যসূত্রে বর্ণিত প্রবন্ধগুলো সহ অনেকগুলো প্রবন্ধের সার সংক্ষেপ। কিছুক্ষেত্রে হুবহু বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে কয়েকটি প্রবন্ধের।

 

তথ্যসূত্রঃ
বাঙালী মুসলমান ও রবীন্দ্রনাথঃ ভুঁইয়া ইকবাল।
বাঙালী মুসলমানের সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কঃ ফেরদৌসা রহমান।
বিশ্বকবির সাথে নজরুল ইসলামের প্রথম সাক্ষাৎ ঃ জহিরুল হক ।
বাংলা একাডেমী পত্রিকা (সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণা ত্রৈমাসিক)।।৫৩ বর্ষ : ৩য়-৪র্থ সংখা।
মাহামুদুল হাসান সুমনের ব্লগ পোষ্ট
গুরুশিষ্য সম্পর্কঃ হাবিবুর রহমান স্বপন.
বাংলা বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার নিবন্ধ।
[বিঃদ্রঃ লেখার কিছু অংশ
অপরিবর্তন সরাসরি করে প্রকাশিত। ]

উৎসর্গঃ কবিগুরুর প্রিয় শিষ্য, বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ , জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর স্মৃতির উদ্দেশ্যে। কবিগুরুর জন্মদিনে পুনঃপ্রকাশিত।