ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

নব্বইয়ের দশকের সেই হাফপ্যান্ট পরা ছেলেটা এখন কেতাদুরস্ত যাপিত জীবনে অভ্যস্ত। নাটকের একটি চরিত্রের জীবনের প্রার্থনায় যে ছেলেটা তার ছোট ছোট হাত উঁচিয়ে প্রার্থনা করেছিল সেই এখন বাস্তবের মৃত্যুতেও কাঁদে না। এখন সোডিয়াম বাতির আলোতে ল্যাম্প পোস্টের গোঁড়ায় দাঁড়িয়েই চাঁদের অভাব ঘুচিয়ে ফেলে সে। জ্যোৎস্না তাকে টানে না।

চার কি পাঁচ বছর বয়সী একটা শিশু মনে প্রথম দাগ পড়েছিল ‘এইসব দিনরাত্রি’র মধ্য দিয়ে। সাদাকালোর যুগে ১৯৮৪ সালে হুমায়ূন আহমেদের সেই নাটকের কথা মনে না থাকলেও নামটাতো এখনো ভুলে যাইনি। এরপর একে একে দেখেছি ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’।

মনে আছে কোথাও কেউ নেই-এ বাকের ভাইয়ের ফাঁসির রায়ের পর আমরা মহল্লায় মিছিল করেছিলাম। কোথাও কোথাও ভাঙচুরও হয়েছে। সে খবর এসেছিল পত্রিকাতেও। একদিন খবর এল শেষ পর্বটা নতুন করে নির্মিত হবে, যেখানে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির পরিবর্তে হবে যাবজ্জীবন। কিংবা অন্যকিছু। সেই শেষ পর্বটা আর দেখানো হয়নি।

একটা বানানো, মিথ্যা চরিত্র আমাদের সত্যিকারের জীবনে কীভাবে ঢুকে পড়েছিল! ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, ঢুকে পড়েছিলেন নিজেও, হুমায়ূন আহমেদ। আমাদের মধ্যবিত্ত চিন্তা, আবেগ- সবকিছুতেই একসময় ছিল তার সরব উপস্থিতি।

হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট ওয়ালা হলাম। মাটির গন্ধ নিতে শিখলাম। জ্যোৎস্না আর ঝিঝি পোকার উথাল-পাতাল ভালোবাসার রহস্য ভেদ করতে করতে করতে কখন যে নাকের নিচে গোফ গজিয়ে গেছে টেরও পাইনি। অথচ তিনি লিখেই চলেছেন। দেখিয়ে চলেছেন। সম্মোহিত করে রেখেছেন আমাদের সময়কে।

আমাদের সেই সময়টাতে হুমায়ূন আহমেদ শুধু লেখকই ছিলেন না। ওই সময়ের একটি বিজ্ঞাপনও ছিলেন তিনি।

হুমায়ূনই আমাদের শিখিয়েছেন হিমুর মতো করে কীভাবে ভালোবাসতে হয়। কীভাবে মন ভালো করতে হয়, কীভাবে মন খারাপ করতে হয়!

জানি হলুদ পাঞ্জাবি পরে হিমু আর কখনো একা মাঝরাতে রাস্তায় হাঁটবে না। মিসির আলি আর কোন রহস্যের সমাধান করবেন না। শুভ্র আর কখনও জরির হাত ধরবে না। তিথি আর কখনও অনুভব করবে না উথাল-পাথাল ভালবাসা কারো জন্য। রুপা আর কখনও হিমুর ফোনের জন্য গভীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকবেনা। নিতু আর কখনও তার প্রিয় মানুষের হাত ধরে জ্যোৎস্নায় হাঁটতে চাবে না।

যদি বলি তিনি এই জনপদের বহু বহু তরুণ-তরুণীকে জ্যোৎস্না দেখাতে শিখিয়েছেন, তাহলে কি ভুল বলা হবে। কিংবা বৃষ্টিতে ভেজার আকুলতা আমরা তার কাছ থেকেই শিখেছি।

এক মুহূর্তের জন্যও আমার বিশ্বাস হচ্ছে না স্যার মারা গেছেন। আমার এখনো মনে হচ্ছে কিছুণ পর নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের বেলভ্যু হাসপাতালের সেই বিছানা ছেড়ে জেগে উঠে বলবেন- কুসুম (শাওন) তুমি কানতাছো কেন, আমি তো মরি নাই। তোমাগো একটু পরীক্ষা করলাম। দেখলাম তোমরা আমাকে কতো ভালোবাসো। বাচ্চা দুইডারে ডাইক্কা আনো, আমি একটু কথা কমু।

পুনশ্চঃ লেখাটিতে ফেইসবুকে দেওয়া অনেকের অনুভূতি ব্যবহার করা হয়েছে