ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

বিভিন্ন সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়ে থাকে যে, ঢাকা শহরের অপ্রতুল সড়কের প্রায় ৯৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয় প্রাইভেট কার চলাচলের জন্য। অথচ প্রাইভেট কারে চলাচল করেন মাত্র নগরীর ৫ শতাংশ মানুষ। অবশিষ্ট ৯৫ শতাংশ মানুষের জন্য থাকছে মাত্র সড়কের ৫ শতাংশ জায়গা। সমীক্ষায় যানজটের জন্য দায়ী অনেকগুলো কারনের মধ্যে ঢাকার বিদ্যমান সড়কের ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত সংখ্যক প্রাইভেট কারকে অন্যতম কারন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সুতরাং রাস্তায় প্রাইভেট কারের সংখ্যা যদি কমিয়ে আনা যায় তাহলে ঢাকার যানজট একদিনেই অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে হয়।

ঢাকার যানজট এবং এর তীব্রতা পর্যবেক্ষন করলে দেখা যায় সকাল আটটা থেকে দশটা এবং বিকাল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত যানজট সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করে। ঢাকার অধিবাসীদের অধিকাংশই চাকুরীজীবি এবং তাদের অফিস সময় মোটামুটি অভিন্ন। এছাড়া ব্যবসায়ীদের একটি বিশাল সংখ্যাও একই সময়ে তাদের কর্মক্ষেত্রে এবং বাসস্থানে যাতায়াত করেন। ফলে সকালে অফিসগামী এবং বিকালে অফিস ফেরত বিপুল সংখ্যক মানুষ একসাথে রাস্তায় নেমে আসার ফলে এই দুইটি সময়ে নগরীর সকল সড়কে প্রচন্ড যানজট সৃষ্টি হয়। এই সময় রাস্তায় প্রাইভেট এবং গন পরিবহনের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়।

এ সকল তথ্য বিবেচনা করে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিরসনে এমন একটি ব্যবস্থা যদি গ্রহন করা যায় যাতে সকাল ও বিকালের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকুতে সড়ক সম্পূর্ণ যানজট মুক্ত রাখা সম্ভব। যেমন সকালে ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত দুই ঘন্টা এবং বিকালে ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এই দুই ঘন্টার জন্য প্রাইভেট কার এর চলাচল যদি নিয়ন্ত্রন করা যায় তাহলে সড়কগুলো সম্পূর্ণ যানজট মুক্ত থাকবে এতে কোন সন্দেহ নেই। এর ফলে সকাল ও বিকালের এই চার ঘন্টা সময় গন পরিবহনের চলাচলের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। ফলে বিপুল সংখ্যক বাস যাত্রী স্বল্প সময়ে তাদের গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে। প্রাইভেট কার ব্যবহারকারীগন যারা নগরীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ তারা ৯৫ শতাংশ মানুষের সুবিধার জন্য এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই চার ঘন্টা সময় তাদের প্রাইভেট কার রাস্তায় নামাবেন না। এই দুই সময়ের আগে বা পরে তারা তাদের গাড়ী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বের হবেন। অথবা সামান্য আরাম ত্যাগ করে তারা সাধারণ যাত্রীদের মত গন পরিবহনে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন। এতে করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সময় যেমনি বাঁচবে তেমনি বাড়তি খরচও কমবে কিছুটা।
যা করতে হবে-

এক.বন্ধের দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ১০টা এবং বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ঢাকার যে সব সড়কে বাস চলাচল করে সে সব সড়কে সকল প্রকার প্রাইভেট কার. জীপ ও মাইক্রোবাস চলাচল বন্ধ থাকবে।

দুই. রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীগণ, বিরোধী দলীয় নেতা, বিদেশী কূটনীতিক, বিদেশী মিশনের কর্মকর্তাগণ, সরকারের সচিব ও অতিরিক্ত সচিবগন, মিডিয়াকর্মী এবং জরুরী রুগী পরিবহনে নিয়োজিত গাড়ী এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।

তিন. ঢাকার বাইরে থেকে আগত যাত্রীবাহী বাস এই সময়ে শহরের মধ্য দিয়ে যে কোন গন্তব্যে যেতে পারবে।

চার. স্কুল. কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ছাত্র-ছাত্রী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবহনের জন্য শুধুমাত্র বাস অথবা মাইক্রোবাস ব্যবহার করতে পারবে।

এর ফলে যা হবে-

এক. উল্লেখিত সময়ে ঢাকার রাজপথ অনেকটা ফাঁকা হয়ে যাবে।

দুই. ফাঁকা রাস্তায় স্বাভাবিক গতিতে বাস ও টেক্সীসহ সকল গনপরিবহন চলাচল করতে পারবে।

তিন. অফিসগামী ও অফিস ফেরত মানুষ ন্যুনতম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন।

চার. বাস ও টেক্সিসহ গনপরিবহন গুলো আগে একটি গন্তব্যে যাতায়াত করতে যে সময় প্রয়োজন হত সেই সময় দুই থেকে চারটি ট্রিপে চলাচল করতে সক্ষম হবে। ফলে এসকল পরিবহনের যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা কমপক্ষে দ্বিগুন বাড়বে।

পাঁচ. শহর এলাকার পরিবহন ব্যবসা অধিক লাভজনক হবে। উদ্যোক্তারা আরামদায়ক বা বিলাস বহুল গাড়ী রাস্তায় নামাতে উৎসাহী হবেন। প্রয়োজনে যাত্রীপ্রতি ভাড়ার বর্তমান হার কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

ছয়. পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রাইভেট কারের আরোহীরাও এমন পরিস্থিতিতে বাসে চড়তে উৎসাহিত হবেন। ফলে রাস্থায় সার্বিকভাবে প্রাইভেট কারের সংখ্যা কমবে।

সাত. যানজটের ফলে নষ্ট হওয়া সময় ও জ্বালানির বিপুল সাশ্রয় হবে।

আট. যানজট জনিত প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ অনেক সমস্যা থেকে দেশ এবং জনগন সম্পূর্ণ না হলেও কিছুটা নিষ্কৃতি পাবে।

সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া
প্রাইভেট কারের মালিকরা যথারীতি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করবেন। সমাজের সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগী এই ৫ শতাংশ ধনিক শ্রেনী ৯৫ শতাংশ সাধারণ নাগরিকের সুবিধা বিবেচনা করে সহজেই নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করবে, এমনটা আশা করা যায়না। এক্ষেত্রে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারকে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি ৯৫ শতাংশ মানুষের সুবিধা নাকি ৫ শতাংশ মানুষের সুবিধা দেখবে। ক্ষমতায় থাকতে অধিকাংশ মানুষের সমর্থনই নিশ্চয়ই সরকারের প্রয়োজন। প্রয়োজনে প্রাইভেট গাড়ির মালিকদের বুঝাতে হবে। বুঝাতে হবে তাদের সামান্য স্বার্থ ত্যাগে দেশের কত বড় একটা সমস্যার সমাধান সম্ভব। যদিও খুব বেশী কিছু কষ্টও করতে হবেনা গাড়ী মালিকদের। সকাল ও বিকালে শুধুমাত্র চার ঘন্টা সময় তাদের গাড়ী রাস্তায় না নামালেই হল। বাকী কুড়ি ঘন্টা তো উন্মুক্তই থাকলো সকল সড়ক। যাদের একান্তই গাড়ী নিয়ে বেরাতে হবে তারা একটু আগে না হয় একটু পরে বের হবে। এতে খুব বেশী অসুবিধা হবে বলে মনে হয়না।